ইউনুস সরকারের সমালোচনা এখন খোদ ঐ সরকারের সদস্যরাই করা শুরু করেছেন। কারণ অনেকের কাছে অস্পষ্ট মনে হতে পারে। তবে আমার কাছে সবকিছু একেবারে যে অস্পষ্ট তা নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করবো।
ভদ্রলোকের নাম বোধহয় নুরুল আমিন খান পাঠান। ময়মনসিংহের কোথাও হতে আসা। উনার সাথে আমার পরিচয় কর্মসূত্রে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। একটা উপদেষ্টা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পল্লী বিদ্যুতের জন্যে কাজ করছি। আমিন সাহেব পল্লী বিদ্যুতের ঠিকাদার। করেন সাব-ষ্টেশনের কাজ। ক্ষুদ্র হলেও ভদ্রলোকের বিল পাশ করাতে আমারও একটা স্বাক্ষর লাগে। বিপত্তি এখানেই।
তিনি আমাদের অফিসে নিয়মিত আসেন। বসদের সাথে গাল-গপ্প করেন। চা-পানি খান এবং উদ্দেশ্য হাসিল করে ফিরে যান নিজ ঠিকানায়। অনেকটা অনিচ্ছায় আমার টেবিলে আসতে হয় উনাকে। বিল পাশ করার তাগাদা দেন। পকেট হতে বেনসন সিগারেট বের করে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করেন। আমি ধূমপান করিনা তাই বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দেই। এভাবেই সম্পর্কটা গড়াতে থাকে।
কাজের মাঝেই আমি বাংলাদেশে ছেড়ে লম্বা সময়ের জন্যে বিদেশ চলে যাই। ফিরে এসে আবারও জয়েন করি একই কোম্পানিতে। এবং অবাক হয়ে খবরের পাতায় দেখি পাঠান সাহেব নাম। তিনি এরশাদ মন্ত্রীসভার হাফ-মন্ত্রী।
এরশাদের পতন আমি ঢাকায় বসে উপভোগ করেছি। একই সময় লুকিয়ে থাকা এরশাদ মন্ত্রীসভার অনেক সদস্যদের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি যার অন্যতম ছিলেন কাজী জাফর ভাই, জামাল হায়দার ভাই, নিতাই রায় চৌধুরি এবং বহু বছর আগের পরিচিত সেই নুরুল আমিন খান পাঠান সাহেব।
মতিঝিলের একটা গোপন কক্ষে সপ্তাহে অন্তত একবার সবাই মিলিত হতেন। একে অপরের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন। তারই এক সেশনে পাঠান সাহেব আবেগ প্রবণ হয়ে বললেন মন্ত্রী হয়ে ঢাকার রাজপথে চলা এবং সাধারণ পাবলিক হয়ে চলার অভিজ্ঞতা। ট্রাফিক পুলিশ মন্ত্রীর গাড়ি দেখলে ঠাস করে সালাম দেয়, পাশাপাশি পাবলিক হয়ে গাড়িতে চললে চাঁদা আদায়ের জন্যে একই পুলিশ গাড়ি আটকে দেয়। তিনি বললেন, জীবনে যা কিছু আয়-রোজগার করেছেন তার সবটা দিয়ে হলেও আবার মন্ত্রী হতে চান।
ইউনুস সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কথাই ধরা যাক।
এই ভদ্রলোক মন্ত্রী মর্যাদার সরকারী পোষ্ট পাবেন স্বপ্নেও কি ভেবেছিলেন? উপদেষ্টা হয়ে হয়ত ধরেই নিয়েছিলেন এ সৌভাগ্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। উপভোগ করবেন কুড়িয়ে পাওয়া আরাম-আয়েশ।
উপদেষ্টার পোলাও কোরমায় ছাই দিয়ে ফেলেন প্রফেসর ইউনুস। দেড় বছরের মাথায় নির্বাচন দিয়ে সরে যাবেন এমনটা স্বপ্নেও কল্পনা করেননি অধিকাংশ উপদেষ্টা। গোস্বার গোঁড়াটা এখানেই।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের ব্যাকগ্রাউন্ড কি তা আমার জানা নেই। থাকলেও এ নিয়ে কথা বলা যৌক্তিক হবেনা। সংসদীয় পদ্ধতিতে একজনকে যখন সরকার গঠন করতে বলা হয় তার স্বাধীনতা থাকে নিজের মন্ত্রীসভায় কাকে অন্তর্ভুক্ত করবেন। প্রফেসর ইউনুস নিশ্চয় তৌহিদ সাহেবকে চিনতেন। বিমানে করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিয়ে গেছেন। দেশে-বিদেশে পাঠিয়েছেন নিজের এজেন্ডা প্রমোট করার জন্যে। তৌহিদ সাহেব হঠাৎ করেই বোধহয় অচিনপূরের স্বপ্নলোকে নিজকে আবিষ্কার করেছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের তৌহিদ সাহেবের। স্বপ্ন-যাত্রা বেশিদিন স্থায়ী করতে পারেননি ইউনুস স্যারের কারণে। দেড় বছরের মাথায় স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখেন সে রামও নাই, রাজত্বও নাই। সব গেছে।
তবে তৌহিদ সাহেবের জন্যে সুখবর হচ্ছে এমন স্বপ্ন তিনি একাই দেখছেন না।
নুরুল আমিন খান পাঠান সাহেবের প্রসঙ্গটা টেনেছিলাম মন্ত্রিত্ব হারানোর যাতনাটা তুলে ধরার জন্যে। পাঠান সাহেবের মত তৌহিদ সাহেবও হয়ত মান-ইজ্জত, আয়-রোজগারের সবটা ব্যায় করে মন্ত্রিত্ব ফিরে পেতে চাইছেন। এ জন্যে এক দুয়ার হতে অন্য দুয়ারে ধর্না দেয়া শুরু করেছেন। হঠাৎ করে পলাতকা আপার দেশে ফিরে আশার বায়বীয় বাণীতে তিনিও হয়ত মাছ শিকারের স্বপ্ন দেখছেন। আর তারই গ্রাউন্ড-ওয়ার্ক হিসাবে বয়ান দিচ্ছেন কিচেন টেবিল আর মার্কিন ডীপ স্টেটের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। হয়ত আশায় আছেন এসব বয়ান দিল্লীর লাল কেল্লার ফটক পেরিয়ে আপার কান পর্যন্ত পৌছবে এবং তারই দয়ায় কেবিনেট মিটিংয়ে বসে আবারও নিজকে তামাম দুনিয়ার রাজ০ধিরাজ ভাবতে পারবেন।
কথাটা না বললেই না। বাংলাদেশের ক্ষমতার চেয়ারে কোন যদু-মধু বসবে এ নিয়ে আমেরিকা নূন্যতম মাথা ব্যথার কোন কারণ নেই। পলাতকা চোরের রানী নিজের লুটপাট, গুম, খুন আর বাটপারির নির্বাচন হতে জাতিকে দূরে রাখার জন্যে এ দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অলীক ও অবাস্তব বয়ানের অবতারণা করেছেন। আমেরিকার প্লেটে পৃথিবীর ১৯৫টা দেশের তালিকায় বাংলাদেশ একটা দেশ মাত্র। নিজদের অর্থকরী আর ইন্টেলিজেন্স অপচয় করে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন করবে, এ অবস্থায় নেই আজকের আমেরিকা। বাংলাদেশে নেই কোন প্রাকৃতিক সম্পদ। উপমহাদেশে্র ভুরাজনীতিতে দেশটার নেই কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এমন একটা দেশে আমেরিকার সামান্যতম হস্তক্ষেপ খুলে দেবে মাইগ্রেশনের ফ্লাডগেট। ১৮ কোটি জনসংখ্যার প্রায় সবাই চাইবে আন্টালিকের ওপারে পাড়ি জমাতে, যেমনটা দিয়েছিল বিলাতে সিলেটি ভাইয়েরা।
জীবন্ত আপা এ দেশে নতুন করে পা রাখবেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন এমন সম্ভাবনা শূন্য। যারা এ স্বপ্নে বিভোর আছেন তাদের উচিৎ হবে মানসিক চিকিৎসা নেয়া।