রায়হান উল্লাহর সাথে আমার পরিচয় পর্বটা ছিল ইন্টারেস্টিং। কুইন্স বুলুবার্ডের উপর একটা চেইন স্টোরে কাজ করি। কমিশনের চাকরি। বিক্রি করলে বুঝপাতা (পয়সা), না করলে তেজপাতা! সে বছর প্রচণ্ড শীতে কাবু হয়ে গিয়েছিল নিউ ইয়র্ক শহর। ৩/৪ দিন একটানা তুষারপাতে বিপর্যস্ত ছিল শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা। সন্ধ্যা নামার সাথে রাস্তা-ঘাট খালি হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে কর্কশ সুরে বেজে উঠা সাইরেনের আওয়াজ বাদ দিলে মন হয়েছিল এ যেন মৃত্যুপুরী।
এমন রাতে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে খদ্দের আশা করার কোন কারণ ছিলনা।
অনেকটা বাধ্য হয়ে গলায় টাই ঝুলিয়ে বসে আছি। একটু পর পর ঘড়ি দেখছি আর ভাবছি কখন শেষ হবে আয়-রোজগারহীন আরও একটা কর্ম দিবস। রাত প্রায় ৯টার দিকে একজনকে দেখে বিরক্ত হলাম। এখন ঘরে ফেরার সময়, এ সময়ে খদ্দেরের আগমন বিরক্তির জন্ম দেয়। হাসি মুখে স্বাগত জানাতে বাধ্য হলাম।
রায়হান উল্লাহ কারও মুখ হতে আমার কথা শুনে এখানে এসেছ। বয়স হবে হয়ত ২৫ বছর। হালকা পাতলা শরীরের উপর বড় একটা ওভারকোট ঝুলানো। সময় নষ্ট না করে বাংলায় কথা বলা শুরু করল।
দু'চারটা শব্দ বাদে ইংরেজিতে একেবারে ঠন ঠন। কাজ করে কুইন্সের এক ভারতীয় রেস্তোরায়। থাকে ব্রুকলিনে। কন্সট্রাকশনে নতুন কাজ পেয়েছে তাই একজোড়া স্টিল টো ওয়াটার প্রুফ বুট দরকার। এ জন্যেই আমার কাছে আসা। ভাষা-গত সমস্যা এড়াতে এই শীতের রাতে আগমন।
নতুন কাজ পাওয়ার পর রায়হান উল্লার আয়-রোজগার বেড়ে যায় এবং এখানেই শুরু হয় তার নতুন সমস্যা। আসলে এটা যে একটা সমস্যা সে বুঝতে পারেনা।
রায়হান উল্লার বাড়ি বিক্রমপুরের কোথাও। কেন এবং কোন পথে আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছে তার ইতিহাস অনেক লম্বা। বিস্তারিত জানাতে গেলে এ রাস্তার অনেক কালো অধ্যায় উন্মোচিত হবে তাই সে পথে গেলাম না। পকেটের অবস্থা পরিবর্তনের সাথে তার আরও অনেক কিছুতে পরিবর্তন আসে। তার অন্যতম ছিল রাজনীতিতে নাম লেখানো। দেখা হলে প্রায়ই শেখ হাসিনা খালেদা জিয়া প্রসঙ্গ টেনে মাঠ গরমের চেষ্টা করত, আমি ধৈর্য ধরে শুনতাম আর মুচকি হাসতাম।
বিক্রমপুর হতে আওয়ামী লীগের অনেকে এ শহরে বেড়াতে এসে রায়হান উল্লার সেবা নেয়। আরও সঠিক ভাবে বলতে গেলে রায়হান উল্লাহ নিজ উদ্যোগে তাদের সেবা দেয়। এয়ারপোর্টে রিসিভ করা হতে শুরু করে শহর দেখানো, রেস্তোরায় ঢু মারা, ক্লাবে লাল নীল পানীয় সহ মেয়ে মানুষ সাপ্লাইও বাদ যায়না। এসব করে রায়হান উল্লাহ আনন্দ পায়। নেতা ও মন্ত্রী এমপিদের সাথে ছবি উঠায়। আওয়ামী লীগের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে। মাঝে মধ্যে স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় মন্ত্রী এমপিদের সাথে ছবি দেখা যায় তার। জীবন তার ছবির মত বইতে থাকে।
জেক্সন হাইটসের আপনা বাজারে একদিন দেখা। চেহারা মলিন। চুল এলোমেলো। মনে হয় দাড়ি কাটেনা অনেকদিন। ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করতে প্রায় কেঁদে ফেললো। এক আওয়ামী নেতা বেড়াতে এসেছিল এবং তার পেছনে যথেষ্ট সময় ও অর্থ নষ্ট করে যথেষ্ট আদর আপ্যায়ন করেছিল। দেশে ফিরে যাওয়ার সময় নগদ আট হাজার ডলার দিয়েছিল বিক্রমপুরে বাবার হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। সে অর্থ বাবার হাতে পৌঁছেনি। নেতাকে ফোন করলে সে ফোন রিসিভ করেনা। তার বাবা টাকা চাইতে গিয়ে নেতার চামচাদের হাতে অপদস্থ হয়। এসব কারণ মন তার খারাপ।
পাশের আল্লাউদ্দিন রেস্তোরায় নাস্তার অর্ডার করে জানতে চাইলাম রায়হান উল্লার ইতিহাস। প্রশ্ন করলাম কেন মন্ত্রী এমপিদের পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট করে। তার উত্তর ছিল খুব সহজ সরল। প্রথমত একজন মন্ত্রীর সেবা করে সে ধন্য হয়। এই সেবার খবর যখন দেশে বাপ ভাইকে পাঠায় গর্বে তাদেরও বুক ভরে উঠে। স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় ছাপা তার ছবির কাটিং পাঠালে ছবি বাবা সবাইকে দেখায়। মন্ত্রীর এক হাত দূরে রায়হান উল্লার ছবি, এ যেন তার পরিবারের জন্যে স্বপ্নে পাওয়া তাবিজের মত। এসব ছবি নাকি তার নিজের ভাইরাও ব্যবহার করে থাকে নিজেদের কর্মে অপকর্মে। তাতে নাকি রায়হান উল্লার বুকের ছাতি ফুলে যায়। ধন্য হয় তার আমেরিকা আসা, ধন্য হয় তার বেঁচে থাকা।
সিলেটের বিভিন্ন স্থানে এনসিপি নেতাদের উপর আক্রমণে অংশ নেয়া অনেকের চেহারার সাথে কেন জানি রায়হান উল্লার ছায়া দেখতে পাই। ওরা বিএনপির মাঠ পর্যায়ের কর্মী। সবারই হয়ত একজন করে বড় ভাই আছে যাদের ছত্রছায়ায় চলে তাদের কর্ম জীবন। এই যে আক্রমণ তার সাথে কি কোন আদর্শ রক্ষার প্রশ্ন জড়িত ছিল? শহীদ জিয়ার স্বপ্ন? খালেদা জিয়ার স্মৃতি? গণতন্ত্র রক্ষা? স্বাধীনতা রক্ষা? বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নব উন্মেষ?
কাহিনীর ভেতর ঢুকলে দেখা যাবে আসলে উপরের কোনটাই না। আনন্দ উল্লাসে ভরপুর প্রতিটা আক্রমণের পেছনে থাকে গোপন কিছু ইচ্ছা, লালিত কিছু স্বপ্ন। এসব ইচ্ছা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে তারা সবাই আক্রমণের সামনে থাকতে চায়। প্রমাণ ধরে রাখার জন্যে কাউকে দিয়ে ছবি তোলায়, ভিডিও ধারণ করায়। এসব ছবি ও ভিডিও সাহায্য করে বড় ভাইদের দৃষ্টি আকর্ষণের কাজে। বড় ভাইদের দৃষ্টি আকর্ষণ মানে দলীয় কোন পদ, চাঁদাবাজির নিজস্ব সীমান্ত, টেন্ডার বাণিজ্য, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো সাপ্লাইয়ের কাজ, গরুর হাট অথবা টেম্পো স্ট্যান্ডের ইজারা। এসব হচ্ছে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের প্রাথমিক সিঁড়ি। এসব সিঁড়ির পরিবর্তী ঠিকানা হচ্ছে গুম, খুন অস্ত্রের ঝনঝনানি। সিলেটের পথে ঘাটে কেউ যদি সারজিস অথবা হাসনাতদের কাউকে খুন করতে পারত সে হয়ত পেয়ে যেতো রাজনীতির বড় পরিসরে প্রবেশ করার লাইসেন্স।
এ পরিসরে প্রবেশ করার প্রতিযোগিতা তীব্র। ছাত্রদলের হবিগঞ্জ মিশন হয়ত অনেকের জন্যে খুলে দেবে রাজনীতির নতুন দুয়ার। সারজিসের মাথার রক্ত, এমন একটা ছবি হাতে নিয়ে নিশ্চয় কেউ দাবি করবে, এ আমার কাজ... আমি মাঠ পর্যায়ের নিবেদিত কর্মী...জীবন বাজি রেখে সারজিসের মাথা ফাটিয়েছি...দলের ঐ পদটা আমারই প্রাপ্য...গরুর হাটের ইজারার দাবিটা আমার জন্যে বৈধ!
আমি যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন আমাদের শ্রেণীকক্ষে আমার এক সহপাঠী অন্য সহপাঠীকে ছুরি মেরে খুন করেছিল প্রেম-ঘটিত বিতর্ক নিয়ে। খুনি মোফা কিছুদিনের জন্যে জেলে ছিল। আমাদের স্কুল হতে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কয়েক বছর পর তার সাথে দেখা হয়েছিল ঢাকা কলেজে। আমরা দুজনেই ওখানকার ছাত্র। মোফা শেখ কামাল ছাত্রলীগ প্যানেলে ছাত্র সংসদের প্রার্থী। প্রার্থী পরিচিতি সভায় তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হল একজন ত্যাগী নেতা হিসাবে। বলা হল তার ত্যাগের কাহিনী, যে কাহিনীর জেরে তাকে স্কুল জীবনেই জেল খাটতে হয়েছিল। কলেজ অডিটোরিয়ামের এক কোনায় বসে আমি থুতু ফেলেছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, কাংকির পুত, তুই একটা খুনি!
দেশ-বিদেশে আমাদের অসংখ্য রায়হান উল্লাহ। স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন হতে বঞ্চিত এসব রায়হান উল্লারাই বিদেশে মন্ত্রী এমপিদের সেবা দেয়, দেশে ইঁদুর বনে হ্যামিলনের বংশীবাদকের পিছনে মিছিল করে। হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের উপর আক্রমণ করে। এ আক্রমণ কেবল সহজ সরল একটা আক্রমণ ছিলনা, এ ছিল তাদের বেঁচে থাকার মাধ্যম, প্রতিদিনের চাকরি। টেবিলে দু'বেলা দু'মুঠো খাবার যোগান দেয়ার একমাত্র পথ।