বাংলাদেশিদের উপর আরোপিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে ভারত। খবরটা আমাদের জন্যে খুব কি খুশির? হতে পারে অনেকের জন্যে, তবে সবার জন্যে না। এমন একটা নিষেধাজ্ঞা ভারতের চাইতে বোধহয় বাংলাদেশের জন্যে বেশী জরুরি ছিল।
সীমান্তের ওপারের দাদারা কথায় কথায় বাংলাদেশ তাদের চাল, ডাল, তেল, মরিচ, নুন খেয়ে বেঁচে থাকে প্রচার করতে পছন্দ করেন। এবং এই ন্যারেটিভের সাথে সুর মেলাতে অভ্যস্ত হয়ে পরেছিলেন দেশীয় ফ্যাসিবাদের কালচারাল উইং। আসলেই কি আমাদের দৈনন্দিন জীবন তাদের উপর নির্ভরশীল? ওরা না খাওয়ালে আমরা না খেয়ে মরবো, চিকিৎসা সেবা না দিলে হাজার হাজার মানুষের জীবন অকালে ঝরে পরবে, শাড়ি আর কসমেটিক্সের সাপ্লাই চেইন চালু না রাখলে আমাদের রমণীকুলের সংসার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পরবে, জ্ঞান হওয়া অবধি এসব আহাজারি ধারাবাহিকভাবে শুনে আসছিএবং এক সময় আমি নিজেও বিশ্বাস করতেও শুরু করেছিলাম এসব গার্বেজ।
তারপর এলো ২০২৪'এর আগস্ট। দাদাদের গৃহপালিত এজেন্টকে এ দেশের মানুষ প্যাকেট করে তুলে দিল দিল্লিগামী ওয়ান-ওয়ে ফ্লাইটে।
নিজেদের সাজানো বাগান তচনচ হয়ে যাওয়ার প্রতিশোধ হিসাবে তারা সীমন্ত বন্ধের পাশাপাশি বন্ধ করে দিল বাণিজ্য তৎপরতা। আটকে দিল বাংলাদেশিদের ভিসা।
তারা হয়ত ভেবেছিল সীমান্ত আটকে দেয়ার ফল খুব দ্রুতই ভোগ করবে 'অকৃতজ্ঞ' বাংলাদেশিরা। তাদের ঘরে ঘরে দেখা দেবে চাল-ডাল-তেল-নুন আর পেয়াজ রসুনের হাহাকার। এই হাহাকার জন্ম দিবে প্রতিবিপ্লবের। যার ফলে মানুষ রাস্তায় নেমে দাবি জানাবে দিল্লির চোরাগলিতে গাপটি মেরে থাকা শতাব্দীর সেরা সেবাদাসীকে ফিরিয়ে দিতে।
বাস্তবে এসবের কিছুই ঘটেনি। ইন্টেরিম সরকার হন্যে হয়ে সন্ধান করছিল বিকল্প বাজারের। তালিকায় যোগ হয়েছিল পাকিস্তানের পেঁয়াজ, সামনে এসেছিল, মায়ানমার তুরস্ক ও থাইল্যান্ডের চাল। দূরের দেশ ব্রাজিলও এগিয়ে এসেছিল মাংস রফতানির প্রস্তাব নিয়ে।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছিল। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং সেক্টরে এসেছিল স্থিতিশীলতা। আমদানি বাণিজ্যের অন্যতম বাধা পোর্টগুলোতে সংস্কারের কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছিল। সরকারের নিয়োজিত স্পেশাল এনভয়রা দেশে দেশে হন্যে সন্ধান করছিল বিনিয়োগের।
অর্থনৈতিক সেক্টরে এসব তৎপরতা আমাদের এক কালের কথিত প্রতিপালক ভারতকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল। আমরা ভুলতে বসেছিলাম ভারত নামে আমাদের এক প্রতিবেশী দেশ আছে যার সাথে আমাদের বাণিজ্য ছিল পৃথিবীর যে কোন দেশের চাইতে বেশী।
ভারতের বাংলাদেশ অবরোধ শেষমেশ বুমেরাং হয়ে তাদের অর্থনীতিকেই আঘাত করেছিল। কোলকাতা আর দার্জিলিংয়ের বাংলাদেশ নির্ভর ব্যবসায় লালবাতি জ্বলার করুণ চিত্র আমরা খুব কাছ হতে মনিটর করেছি দিনের পর দিন। না, ভারত সরকার তাতে টলেনি। ১৭ কোটি মানুষের লাভজনক একটা বাজারকে মাত্র একজনের জন্যে সেক্রিফাইস করেছিল জাতি হিসাবে আমাদের শাস্তি দেয়া জন্যে।
এবং বন্ধ সীমান্ত দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করলেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার বাবু ত্রিবেদী। ইতিমধ্যে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পেয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার। এ সরকারও ইন্টেরিমের রেখে যাওয়া পথে খুঁজে বেড়াচ্ছে বিনিয়োগ। এ তালিকা হতে ভারতের নাম অনেক আগেই বিস্মৃত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার সাম্প্রতিক চীন সফর নিশ্চয় ভারতকে তার বাংলাদেশ অবরোধ নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করেছে। হয়ত তারই ফল দুই বছর আটকে রাখা ভিসা নিষেধাজ্ঞার অবসান।
সত্যিকার দেশপ্রেমী কোন বাংলাদেশির ভিসা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার সুযোগ নিয়ে ভারতে নতুন করে সফরে যাওয়ার আগে একটু ভেবে দেখা উচিৎ কোথায় ও কার কাছে যাচ্ছেন তিনি। ঐ দেশের অনেক প্রদেশে মুসলমানরা কাঙ্ক্ষিত অতিথি না। তাদের জন্যে অনেক আবাসিক হোটেলে আছে নিষেধাজ্ঞা। আছে রাস্তা-ঘাটে জয় শ্রীরাম বাহিনীর হাতে অপদস্থ হওয়ার সম্ভাবনা। চিকিৎসা না হয় বাদই দিলাম, অবসর কাটানোর জন্যে ভারতই একমাত্র দেশ না যার ভুরি ভুরি প্রমাণ আমরা পেয়েছি গেল দুই বছরে।
আমরা ভিন্ন। আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন। ওদের জয় শ্রীরাম নিয়ে বিশ্বজয় করতে দিন। তাতে আমাদের কিছু আসে যাবেনা। পকেটের অর্থ খরচ করে ঐ দেশে অপমানিত হওয়ার চাইতে আপনি বাকি বিশ্বকে আবিষ্কারের চেষ্টা করুন। কোলকাতার হোটেলগুলো গেল দুই বছর যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিন। ভারত তাদের নিজস্ব স্বার্থের হিসাব শেষে লাভ লোকসানের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ভিসা উন্মুক্ত করেছে। তাদের এ ফাঁদে আমাদের পা দেয়ার মত নতুন কিছু ঘটেনি, তাই সাধু সাবধান।