গল্পটা আগেও একবার করেছিলাম। যারা আমার লেখালেখির সাথে পরিচিত তাদের মনে থাকার কথা। প্রাসঙ্গিক হওয়ার কারণে এখানে আবারও টেনে আনছি।
আমি আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের শেষ বর্ষে। ফাইনাল থিসিস জমা দিয়ে তা ডিফেন্ড করলেই আমার মাস্টার্স কমপ্লিট হবে। তার আগে থিসিসের ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করার জন্যে আমাকে মাস-খানেক হাতেকলমে কাজ করতে হবে।
পাঠানো হল একটা হাই-প্রোফাইল ম্যানুফ্যাক্টারিং প্লান্টে। আয়োজন আগে হতেই সম্পন্ন ছিল তাই রিপোর্ট করা মাত্র প্লান্টের চীফ ইঞ্জিনিয়ার এসে আমাকে স্বাগত জানালেন। সংক্ষেপে সামনের একটা মাস কি করতে হবে তার বর্ণনা দিলেন। শিফট সুপারভাইজারদের অনেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
এখানে বৈদ্যুতিক মটর নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে। এবং ক্লায়েন্টের চাহিদা মোতাবেক সফল পরীক্ষার পর সে সব মটর প্রোডাকশনে পাঠানো হয়। প্রতিটা প্রোডাকশনের জন্যে সময় নির্ধারিত থাকে।
প্রথম কর্ম-দিবসের পর চীফ ইঞ্জিনিয়ার নিজে এসে খোজ নিলেন প্রডাক্টের হালচাল। মনে করিয়ে দিলেন সময়সীমা।
দ্বিতীয় দিন একই কায়দায় যাচাই করতে আসলেন আমাদের উন্নতি। চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল তিনি সন্তুষ্ট না।
তৃতীয় দিন আর নিজের ধৈর্য ধরে রাখলে পারলেন না...কথার শুরুতে চীৎকার করে বলে উঠলেন... তোর মায়েরে *দি (Ёв * твю * матъ)!
খারাপ লাগলেও অবাক হইনি। গালাগালি রুশদের রক্তে। দিনের একটা বিরাট অংশ পার করে গালাগালি করে। বাবার সাথে সন্তানের কথাবার্তায়ও চলে অবিরাম গালি। এ ভাষায় এমন সব নিকৃষ্ট গালি আছে যা বাংলায় অনুবাদ করতে গেলে আমার বন্ধু তালিকার সব মহিলারা তেড়ে আসতে বাধ্য হবেন।
একমাস শেষে চীফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ছাড়পত্র আনতে গেলে ক্ষমা চাইলেন গালাগালির জন্যে। তবে সাথে এও বললেন গালাগালি নাকি রুশ ভাষার অলংকার। একটা সমস্যার কথা মার্জিত ভাষায় বুঝাতে গেলে অনেকেই তা হালকা ভাবে নেয় এবং দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে। একই সমস্যা যখন গালাগালিতে ভরপুর ট্র্যাডিশনাল রুশ ভাষায় বলা হয়, যার জন্যে এ বক্তব্য সে নাকি দ্রুত বুঝে যায় এবং বুঝে যায় এর গুরুত্ব।
যদি ভুল না হয় ১৯৮৭ সালে সোভিয়েত জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ কোটি। এই সংখ্যার প্রত্যেকে যদি দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে ঘুমায় তাহলে জেগে থাকে বাকি ১৬ ঘণ্টা। এই ১৬ ঘণ্টায় আমি নিশ্চিত দেশটায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ২০০ কোটি বার উচ্চারিত হয়েছিল 'তোর মায়রে *দি' বাক্যটা। এবং এ তালিকায় থাকবে ভ্লাদিমির, ইভানদের মত সাধারণ রুশ হতে শুরু করে পলিটব্যুরোর মিখাইল গর্বাচেভ পর্যন্ত। গালি ওদের রক্তে, শরীরের প্রতি অঙ্গে। ভদকা আর মুখে অনর্গল গালি, এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন নাগরিক পরিপূর্ণ রুশ নাগরিক হয়ে উঠে।
জীবনের ৪টা বছর কাটিয়েছি ফিনল্যান্ডের ৪ বন্ধুর সাহচর্যে। ওদিকটার অবস্থা আরও ভয়াবহ। গালির সমুদ্রে বাস করে ওরা। মা-বাবার সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তায় গালি একটি বহুল ব্যবহৃত বিশেষণ। ওদের বক্তব্য গালি একে অ[পরকে বুঝতে ক্যাটালিস্ট হিসাবে কাজ করে।
আমেরিকাই বা বাদ যাবে কেন। হলিউডের মুভি দেখলে ইংরেজিতে গালাগালির বিশেষজ্ঞ বনতে খুব একটা সময় লাগেনা।
গালাগালি নিয়ে লেখাটার মূলে ছিল ওসমান হাদীর 'সাউ*য়া মাউয়া ছিড়্যা' ফেলা সংক্রান্ত অত্যন্ত শক্তিশালী একটা গালি। আমি মনেকরি এ গালি হাদীর বক্তব্যকে জোরালো ভাবে উপস্থাপন করার কাজে অন্যতম সহায়ক হিসাবে কাজ করেছে কেবল। এই গালি ফেলে তিনি যদি অন্য কোন পন্থায় নিজের রাগ, ক্ষোভ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে চাইতেন হয়ত ব্যবহার করতে হতো একাধিক বাক্য, ব্যয় হতো অপ্রয়োজনীয় সময়। আর যাদের উদ্দেশ্য করে এ বয়ান তারাও হয়ে যেতো বিরক্ত।
গালি আমাদের জীবনেরই অংশ। পৃথিবীর সব দেশে সব কালে গালির ব্যবহার ছিল এবং সামনেও থাকবে। গালি হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশ করার সহজ অথচ শক্তিশালী একটা মাধ্যম। আপনি হাদীর দেয়া গালিকে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হতে বিচার করছেন তাই এর মূল্যায়নও হবে রাজনৈতিক। হাদীকে আপনার পছন্দ না কারণ আপনি আওয়ামী লীগ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রোগে মগজ প্রতিবন্ধী, তাই এ গালিকে উপলক্ষ করে হাদীকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। এ আপনার ইণ্টালেকচ্যুয়াল দৈণ্যতা যা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার হয়না।