জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ ও জটিল। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ ও ১৯৩ সদস্যদের সাধারণ পরিষদ যৌথভাবে প্রার্থিতার মনোনয়ন আহবান করে থাকে। ব্যক্তি নয়, সদস্য রাষ্ট্রকে তার মনোনীত প্রার্থীর জন্যে আবেদন পত্র জমা করতে হয়। আবেদন পত্র যাচাই বাছাইয়ের পর তা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হয়। সিম্পল মেজরিটির বাইরে এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে; আর তা হচ্ছে পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্যদের ভোট। এই ৫ ভোটের একটা ভোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে গেলে তাহলে তা ভেটো হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এবং এখানেই শেষ হয় প্রার্থীর ক্যানডিডেসি। ওদের কেউ যদি বিপক্ষে ভোট না দিয়ে ভোট দান হতে বিরত থাকে তাহলে অন্য কথা।
নিরাপত্তা পরিষদ একমত হলে তারা সুপারিশ পাঠায় সাধারণ পরিষদে। সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদের সিলেকশনকে সম্মান করে থাকে সাধারণ পরিষদ। এবং এক অর্থে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
উভয় পরিষদের চূড়ান্ত নির্বাচনের অন্যতম অলিখিত ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে অঞ্চল ভিত্তিক। অর্থাৎ একেক টার্মে একেক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হয় এই পদে। আন্তনিও গুতেরেস নির্বাচিত হয়েছিলেন পূর্ব ইউরোপের কোটায়। পালাক্রমে এই পদের দাবিদার এবার ল্যাটিন আমেরিকা।
ইতিমধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ দেশের প্রার্থিতার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। এ তালিকায় সবার উপর আছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেট। দেশটার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক ইতিমধ্যে ব্যাচেলেটের প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে কোন মহিলা এ পদে নির্বাচিত হননি, তাই অনেকেই আশা করছেন মিশেল ব্যাচলেট হতে যাচ্ছেন এই পদের প্রথম মহিলা সাধারণ সম্পাদক।
তালিকায় আরও আছেন আর্জেন্টিনার জাতিসংঘ পরিচালিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। তিনি নিজেই এ পদের জন্যে অনেক আগে হতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন।
আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে সদ্য বিদায়ী ইন্টেরিম সরকার প্রধান ও নোবেল লওরিয়াট ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের প্রার্থিতা নিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ প্রকাশ না পেলেও আন্দাজ করা যায় বিহাইন্ডা দ্যা সিন এ নিয়ে তারা কাজ করছে। সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমানের হঠাৎ মস্কো সফর তারাই ধারাবাহিকতা হয়ে থাকলে অবাক হবোনা। সরকারী ভাবে ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের নাম উত্থাপিত হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় প্রতিবেশী দেশ ভারত তার ঘোরতর বিরোধিতা করবে। নিরাপত্তা পরিষদের ভারতের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বন্ধু দেশ হিসাবে রাশিয়া দেশটার হয়ে কাজ করতে পারে। রাশিয়ার ভেটো ঠেকানো হতে পারে এ কাজের প্রথম পদক্ষেপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনুসের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে যাওয়ার তেমন কোন কারণ নেই। কারণ তিনি দেশটার প্রেসিডেন্টশিয়াল মেডাল বিজয়ী এবং উঁচু পর্যায়ের নেতাদের সাথে আছে নিবিড় সম্পর্ক। আমেরিকা সমর্থন দিলে তার ইউরোপীয় মিত্ররাও সমর্থন দেবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায়। বাকি থাকে চীন। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন যে কোন সময়ের চাইতে ভাল। তাদের সমর্থন আশাকরা অন্যায় হবেনা।
ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বব্যাপী। আঞ্চলিক কোটার গ্যাঁড়াকলে আটকে না গেলে এই বাংলাদেশির সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। এখানে মূল প্রশ্ন হবে তারেক রহমানের সরকার কি ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের প্রার্থিতা সমর্থন করে অফিসিয়ালি নিরাপত্তা পরিষদে পাঠাবে তার নাম।