আমাদের ইতিহাস ও বার ভাতারি শাওন...

Submitted by WatchDog on Tuesday, June 16, 2026

জন্ম যদি ১৯৭১'এর পরে হয়ে থাকে তাহলে আপনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। কারও মুখে শুনেছেন এবং নিজের মত করে বিশ্বাস করেছেন এর ইতিহাস ভূগোল।
একজন আপনাকে শোনালো ৯০ হাজার সৈন্যের ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ মারার কাহিনী এবং আপনি তা বিশ্বাস করে ফেললেন ব্যক্তি ও দলীয় সমীকরণ মেলানোর জন্যে। সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার ৩০ লাখ, অর্থাৎ শতকরা ৪ জনকে মেরে ফেললে একটা জনপদে কতটা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে তা নিয়ে সামান্যতম চিন্তা করলেন না। ৫৪ হাজার ৯৭৭ বর্গমাইলের আয়তনের একটা দেশে ৩০ লাখ লাশ দাফন করতে কতটা জায়গার প্রয়োজন হয় সেটাও একবার ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। মান ও হুসের সমন্বয়ের মানুষ হয়ে থাকলে এসব প্রশ্ন কি মগজে ধাক্কা খাওয়া ন্যাচারাল ছিলনা?

শতকরা ৪ জন! অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের ৪ জন, এমনটাই হিসাব। এমন একটা সংখ্যা মেলাতে গিয়ে একবারও নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের মাথা গুনে দেখেছেন? একবারও কি গ্রামে গিয়ে কারও কাছে জানতে চেয়েছেন '৭১এ কতজন প্রাণ হারিয়েছিল ঐ গ্রামে?

৭১'এ কি ঘটেছিল এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেন খোদার অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল। এ নিয়ে কথা বলাও পাপ। কারণ যা বলার তা আমাদের হয়ে একজনই বলে গেছেন। তার উপর কিছু বলা ও প্রশ্ন তোলার নাগরিক অধিকার আমাদের নেই। কোথায়, কার কাছে এবং কোন সূত্র হতে এ সংখ্যা পেলেন তার কোন ব্যাখ্যা তিনি দিলেন না। তিনি বললেন আর আমরা মেনে নিলাম, অথবা মানতে বাধ্য হলাম। এ যেন বান্দাদের জন্যে প্রভুর আদেশ।

আপনি কি আফ্রিকার পূর্ব-মধ্যাংশের দেশ রুয়ান্ডার ইতিহাস জানেন? সংখ্যালঘু তুতসি ও সংখ্যাগুরু হুতুদের মাঝে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে ৮ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া এ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১০০ দিন। গোটা বিশ্ব সাক্ষী হয়েছিল মানুষ হত্যার এ নির্মম অধ্যায়ের। ডাম্পিং গ্রাউন্ডে যেভাবে ময়লা ডাম্প করা হয় সেভাবেই ট্রাকের পর ট্রাক ভর্তি লাশ নালা নর্দমায় ফেলে ডাম্প করা হয়েছিল। গোটা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল। এ নিয়ে সোচ্চার ছিল বিশ্ব মিডিয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী ইতিহাসের কলঙ্ক হয়ে আছে ৬০ লাখ ইহুদি হত্যার মধ্যদিয়ে। পৃথিবীর সব দেশে সব কালে হিটলারের এই নির্মমতা মানুষকে শিক্ষা দেয় অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। আমাদের দেশে ,মাত্র ৯ মাসে হিটলারের অর্ধেক ক্রাইম করে ফেললো অথচ পৃথিবীর কোথাও এই গণহত্যার স্বীকৃতি নেই, চিন্তা করতে গেলে কি খটকা লাগেনা?

৩০ লাখ সংখ্যাটা এখন আর কেবল একটা সংখ্যা না, সব হিসাবে লাভজনক ব্যবসার একটি অবিচ্ছেদ্য পণ্য। এ পণ্যের লভ্যাংশই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা। আর ক্ষমতার সমীকরণ হচ্ছে এস আলম, সামিট গ্রুপ, দরবেশ বাবা, প্রিন্স জয়, গুম, খুন, ব্যাংক লুট, গণহত্যা। সংখ্যাটা ৩০ লাখ হওয়াটা জরুরি কারণ বাস্তব সংখ্যার ধারে কাছে গেলে ঘৃণার নোনা জলে মৎস্য শিকার সম্ভব হবেনা।

আমাদের ইতিহাস এখন আমাদের লায়াবেলিটি তাই এর সংস্কার হওয়াটা খুবই জরুরি। মিথ্যা ইতিহাসের জরায়ুতেই জন্ম নিচ্ছে শেখ হাসিনার মত শতাব্দীর নিকৃষ্ট স্বৈরাচার, বার-ভাতারি শাওন আর আনিস আলমগিরদের মত আত্ম-স্বীকৃত ম্লেচ্ছ। এদের ঠেকানো না গেলে যুগে যুগে জন্ম নেবে নতুন নতুন বারভাতারি দল এবং দেশকে রূপান্তরিত করবে লুটপাটের রঙ্গমঞ্চে।

১৯৭১ সালে একজন বাংলাদেশিকেও হত্যা করার অধিকার ছিলনা পাকিদের। তাদের পশুত্ব সংখ্যা দিয়ে নির্ণয় করা যতটা না জরুরি তার চাইতে বেশি জরুরি আমাদের নিজেদের ইতিহাস মেরামত করা। কারণ ৭১ আমাদের সমাজে ভয়াবহ রকমের বিভক্তি টেনে দিয়েছে, ন্যায় অন্যায়ের মাঝে বিশাল এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নয় মাসের অলিখিত অনাবিষ্কৃত অধ্যায়।

ভিয়েতনামের মাটি তামা তামা করেছিল মার্কিনীদের ন্যপাম বোমা। তাদের হাতে নিহত হয়েছিল ৩০ লাখ ভিয়েতনামী সামরিক বেসামরিক মানুষ। অন্যদিকে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সেনা। ভিয়েতনাম যুদ্ধ হাজার বছর আগের যুদ্ধ না যে এর বিস্তারিত জানতে আমাদের ইতিহাস ঘাটতে হবে। ঐ যুদ্ধ এখন অতীত। অতীত নিয়ে পরে থাকলে আজ মার্কিনীদের বিনিয়োগে ভিয়েতনামের মাটি সয়লাব হয়ে যেতো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিদের আক্রমণে আমেরিকার পার্ল হারবার লণ্ডভণ্ড হয়েছিল। প্রতিশোধ নিয়ে মার্কিনীরা জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে ফেলেছিল আণবিক বোমা। খুন করেছিল ১ লাখ জাপানিকে। কথায় কথায় জাপানিরা বোমা বর্ষণ নিয়ে মার্কিনীদের বিষেদগার করতে শোনা যায়না। বরং দুই দেশ এখন বন্ধু। এই বন্ধুত্ব তাদের নিয়ে গেছে উন্নতির চরম শিখরে। হিরোশিমা নাগাসাকির ১ লাখ বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এর চাইতে ভাল কোন উদাহরণ জন্ম দেয়া সম্ভব ছিল কিনা তা কারও জানা নেই।

বিশ্বায়নের যুগে শত্রু মিত্র নির্ধারিত হয় পারস্পরিক স্বার্থের দাঁড়িপাল্লায়, আবেগ আর অতিরঞ্জিত ইতিহাস পূজা করে প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে জায়গা করে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। বর্তমানের পাকিস্তান যদি ৭১'এর পাকিস্তানের যমজ ভাই হয়ে থাকে তবে তাদের আহলান ওয়া সাহলান জানানোটা অবশ্যই জরুরি। তবে একটা বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতে হবে ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ অস্ত্র হাতে আমাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামেনি, নেমেছিল দেশটার সামরিক এপ্যারেটাস। তাই ঐ দেশের জনগণের সাথে আমাদের স্থায়ী বৈরিতা থাকাটা জরুরি না। বৈরিতা থাকা জরুরি তাদের সাথে যারা আমাদের ভাতে আর পানিতে মারার জন্যে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যারা ফালানিদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে সীমান্তের কাঁটাতারে লাশ ঝুলিয়ে রাখে।

হাসিনা পর্ব চীরতরে মাটি চাপা দিতে চাইলে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের ইতিহাস মেরামত। ৭১'এর জেনারেশন এখনও বেঁচে আছে এবং তারাই সাক্ষী দিতে পারে কি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে। পেইড দালালদের মুখ হতে আমরা অনেক শুনেছি যার সত্য মিথ্যা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করিনি। এ ব্যর্থতা ও অক্ষমতাই আজকে আমাদের জন্যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন