মাছরাঙা টেলিভিশনের কার্যালয় থেকে কাজ শেষ করে সাগর সারোয়ার যখন ঘরে ফিরছিলেন, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দেড়টা ছাড়িয়েছে। ভবনের নিরাপত্তারক্ষীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের ধারণা, বাড়ি ফেরার ঠিক কিছু পরেই এবং ভোরের ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই স্মরণকালের নৃশংসতা হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। ২০১২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক সূত্র অনুযায়ী, ঘাতকরা রাত ২টা থেকে ৫টার মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে এই দম্পতিকে হত্যা করেছিল।
ভুক্তভোগী দুজনেরই মৃত্যু হয়েছিল একাধিক ছুরিকাঘাতের কারণে। সূত্র জানায় যে সরোয়ারের হাত-পা বাঁধা ছিল এবং তার শরীরেই সবচেয়ে বেশি ছুরির আঘাত ছিল। তাদের ছেলে সকাল ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তার বাবা-মাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত দেখতে পায় এবং সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রুনির মাকে ফোন করে।
সাহারা খাতুন তখন আওয়ামী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চয়তা দিলেন ৪৮ ঘণ্টার ভেতর আসামীদের হাজির করা হবে তাদের সামনে। ২০১২ হতে ২০২৬, ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও ৪৮ ঘণ্টা আর পার হয়নি। সাংবাদিকদের সামনে আসামীদের হাজির করা দূরে থাক, তাদের যেমন ধরা যায়নি, তেমনি সনাক্ত করা যায়নি তাদের পরিচয়। নূন্যতম কোন clue নিয়ে মিডিয়াতেও স্পেকুলেশন হতে দেখা যায়নি। ১২৯ বার চেষ্টা করেও পুলিশ জমা দিতে পারেনি তাদের প্রতিবেদন।
বাংলাদেশে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডই একমাত্র হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ড না। এ ধরণের হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে এবং সামনে ঘটবে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় দেশটার পুলিশ কোন হত্যাকাণ্ডের রহস্যই অমীমাংসিত রাখেনি। সময় লাগলেও তারা খুনের ট্রেইল ধরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে কাঙ্ক্ষিত বন্দরে। মোবাইল ফোন, বিড়ি সিগারেটের পুক্কি, অসংলগ্ন কথাবার্তা, মোটিভ, একটা না একটা ট্রেইল সাহায্য করেছে আসামীদের আইনের আওতায় আনতে। মিডিয়া ঘাঁটলে এমন অনেক খবর আমাদের নজরে আসবে। হাজারও কারণে নিন্দিত আমাদের পুলিশ বাহিনীর এ ধরণের সাফল্যকে হালকা করে দেখার উপায় নেই। ব্যতিক্রম ঘটল কেবল সাগর রুনির বেলায়।
ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজার এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় ছিল সাগর ও রুনির সংসার। সেখানে এই সাংবাদিক দম্পতি তাদের পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। প্রতিবেশীরা জানান, নিহত হওয়ার আগে সরোয়ার ও রুনির অ্যাপার্টমেন্টে একাধিক অতিথির আনাগোনা ছিল। একটা গেইটেড দালানে নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত দারোয়ানদের ফাঁকি দিয়ে একদল খুনি খুনের পর অনেকটা ইনভিজিবল হয়ে বেরিয়ে গেল এমনটাই বিশ্বাস করানো চেষ্টা হয়েছে গেল ১৪ বছর।
রক্তের সাগর বয়ে গিয়েছিল রাজাবাজার ফ্লাটে। অথচ সে সাগরে খুনিদের পদচিহ্ন, আঙ্গুলের ছাপ, প্রতিরোধের আলামত, ডিএনএ কিছুই পাওয়া যায়নি, এটাও কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেক কিছুই পাওয়া গিয়েছিল এবং যার পথ ধরে পুলিশ ঠিকই খুঁজে পেয়েছিল খুনি ও খুনের পেছনে থাকা রুই কাতলাদের। খুনিদের পরিচয় সামনে আনায় ছিল সরকারী বাধা। ছিল অলিখিত বাধ্যকতা। সাগর-রুনিকে কারা খুন করেছে এটা জানার চাইতে জরুরি ছিল কারা জড়িত ছিল খুনের পেছনে। জরুরি ছিল কেন তাদের খুন করানো হয়েছে সেটা জানার।
কিলার গ্রুপকে টাকা-পয়সা দিয়ে ভাড়া করা যায়। ঢাকায় এ ধরণের গ্রুপের সন্ধান পুলিসের জানা আছে। অনেক গ্রুপ হতে তারা নিয়মিত মাসোহারা খায়। অনেক হত্যাকাণ্ডের মোটিভ খুঁজতে পুলিশ সাহায্য নেয় তাদের। কোন কিছুই কি করা হয়নি সাগর-রুনি হত্যা রহস্য সমাধানের বেলায়? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত আমাদের কোনদিনই জানা হবেনা। অথবা জানতে দেয়া হবেনা। খুনের পেছনে পাহাড় সমান কেউ জড়িত থাকলেই কেবল তা আড়াল রাখা সম্ভব। বাংলাদেশে কারা সেই পাহাড় তা উন্মোচন করতে শার্লক হোমস হওয়ার প্রয়োজন হয়না।
বর্বরতম খুন আড়াল করার ক্ষমতা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের কারও নেই। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার জন্যে ওরা একে অপরের প্রতিপক্ষ। আজকে যারা একে অপরের বন্ধু, কালকে তারা ঘোরতর শত্রু। শত্রুকে ঘায়েল করতে এমন কোন কাজ নেই তা তারা করবেনা। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনীতিবিদদের কেউ মাষ্টার-মাইন্ডে থাকলে তার পরিচয় অনেক আগেই সামনে চলে আসতো। এবং রাজনীতির মাঠেই তা প্রকাশ পেতো। বাস্তবে তা ঘটেনি। এমনকি ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের দেড় বছর বয়সী সরকারও সাহস করেনি খুনিদের পরিচয় সামনে আনতে। তাহলে তারা কারা যাদের পরিচয় সামনে আনতে ১৪ বছর সময়ও যথেষ্ট হয়নি?
সেনাবাহিনী।
আমেরিকার পাপের নগরী লাস ভেগাস নিয়ে একটা প্রবাদ বাক্য চালু আছে, what happens is Vegas stays in Vegas! অর্থাৎ লাস ভেগাসে যা কিছু ঘটে তা ওখানেই থেকে যায়। এ শহরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে পর্যটকরা ভিড় জমায়। একেক জন্যের উদ্দেশ্য থাকে একেক রকম। স্বামী তার স্ত্রীকে ফেলে প্রেমিকা নিয়ে সময় কাটাতে আসে। মদ আর জুয়ার টেবিলে আড্ডাবাজদের ভিড় জমে। অনেক কাপল আসে দ্রুত সময়ে বিয়ে রেজষ্ট্রি পর্ব সেরে নিতে।
বাংলাদেশেও এমন একটি এলাকা আছে যা সংরক্ষিত। ওখানে নিয়মিত কি ঘটে তা সাধারণ জনগণের জানার উপায় নেই। অথবা জানতে দেয়া হয়না। এমন জায়গা হচ্ছে দেশটার সেনানিবাস। উর্দির আড়ালে ওখানে চাপা পরে যায় অনেক অপরাধ। অপরাধের তালিকায় খুন থাকলে তাতেও কোন সমস্যা হয়না। চাকরির সুবাদে সেনানিবাসের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠা ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের যে দুর্নীতি ও অপরাধের সাক্ষী হয়েছি তা দেশের যে কোন মেগা দুর্নীতির চাইতে কম না। কিন্তু সে সব অপরাধের চেহারা বাইরে আসেনা। ওখানে দুদক যায়না। কাউকে নিজেদের অফিসে তলব করেনা। সেনাবাহিনীকে পবিত্র সেনাবাহিনী আখ্যা দিয়ে মানুষ খুন করার ফ্রি লাইসেন্স পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। সে লাইসেন্স নিয়ে তারা স্পেনসার ফর হায়ার কায়দায় ভাড়ায় খুন পর্যন্ত করে থাকে। র্যাব তার প্রমাণ।
আমি আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লম্বা জীবনে অনেকের কাছ হতে উপদেশ, আদেশ, নির্দেশ পেয়েছি সেনাবাহিনী নিয়ে লেখালেখি না করতে। কারণ, তাদের হাত নাকি অনেক লম্বা। চাইলে নাকি বিদেশ হতেও আমাকে শেষ করে দিতে পারবে। খুনের ঊষালগ্ন হতে আমি বলে আসছি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সাথে সেনাবাহিনী জড়িত। এবং আমার সে দাবির পক্ষে অনেক যুক্তি-তর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
গেল দুদিন ধরে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে সব তথ্য বাজারে আসছে তার সবকিছু বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। তবে একটা বিশ্বাস লালন করার যথেষ্ট কারণ আছে, তা হলো সেনাবাহিনী ছাড়া এমন একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস ভূগোল এত বছর আটকে রাখা সম্ভব ছিল না। প্রসঙ্গ উঠছে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের। দুজনের চেহারা সামনে চলে এসেছে; একজন সেনাবাহিনীর কসাই জিয়াউল আহসান, অন্যজন আওয়ামী ও ভারত-প্রেমী সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ রোকেয়া প্রাচী। এই দুইজনের নেটওয়ার্ককে যদি আগাথা কৃষ্টির হেরকোল পুয়ারো চরিত্রের কায়দায় এক-সূত্রে গাথার চেষ্টা করি যে নাম ও পরিচয় সামনে চলে আসবে সে হচ্ছে আমাদের মাইটি প্রতিবেশী ভারত।
ওসমান হাদি হত্যা নিয়ে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যে দাবি করেছেন তা আমলে নিলে মিলে যাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত থাকার সমীকরণ। এখানে বঙ্গবন্ধুর প্রেমে দেওয়ানা আসিফ নজরুল ইসলামের প্রাক্তন স্ত্রী রোকেয়া প্রাচীর কি ভূমিকা ছিল তা জানতে হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি এ হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে প্রাক্তন স্বামী আসিফ নজরুলকেও আইনের আওতায় আনাটা হবে জরুরি। নিশ্চয় স্ত্রীর জড়িত থাকার কথা তিনি জানতেন। জেনেশুনে অপরাধ চাপা দিয়ে স্ত্রীকে রক্ষা করাও আইনের চোখে অপরাধ। এ অপরাধ হতে জনাব নজরুলও মুক্ত নন। বাস্তবতা হলো, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা উঠেছে। ১৪ বছরের হীম শীতল নীরবতা ভাঙ্গতে শুরু করেছে। নাম সামনে চলে আসছে। হয়ত আরও অনেক কিছু সামনে আসবে। এবং শেষপর্যন্ত অপরাধ ও অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এবং আমরা যারা দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছি তাদের আস্থায় স্বস্তির প্রলেপ দেয়া হবে।
আসুন ধৈর্য ধরে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করি।