দিনভর অপেক্ষায় ছিলাম কারণ কথা ছিল আজকেই তিনি আসবেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর এলো, দুপর গড়িয়ে বিকেল এবং বিকেলের শেষে রাতের অন্ধকার এখন ঢেকে দিয়েছে গোটা পৃথিবী। আমার অপেক্ষার পালা আর আলোর মুখ দেখলনা। না, তিনি আসেননি।
১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরানো ঢাকার কে এম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে জন্ম নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। জন্মসূত্রে নাম পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী। ১৯৫৫ সালে দলের তৃতীয় কাউন্সিলে দলীয় নাম হতে বাদ দেয়া হয় মুসলিম শব্দটি। আজ ছিল দলটির ৭৭তম জন্ম বার্ষিকী।
অস্তিত্ব সংকটে আওয়ামী লীগ এর আগেও পরেছে। তবে সে সব সংকট ছিল কৃত্রিম। ক্যান্টনমেন্টে সৃষ্ট সংকটে জনগণের সম্পৃক্ততা ছিলনা বললেই চলে। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে দলটি মুখোমুখি হয়েছে আসল সংকটের। জনরোষ হতে বাঁচতে দলের সব লেভেলের নেতৃত্বকে এক রাতে এক কাপড়ে পালাতে হয়েছে। সাথে পালানো বায়তুল মোকারমের খতিবের উদাহরণ টানলে বুঝা যাবে পালানোর উচ্চতাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল।
আমি নিশ্চিত সম্পদের সরোবরে ভাসমান আরব আমিরাতের বিলাসী ফ্লাটে অথবা কোলকাতার অলিগলিতে প্রায় কপর্দকহীন ভবঘুরে নেতা কর্মীরা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকেন একটা ভাল খবরের। অপেক্ষার পাশাপাশি স্বপ্ন দেখেন দেশে ফিরে সোনালী অতীতকে কাছে পাওয়ার। তেমনি এক স্বপ্নের গোঁড়ায় পানি ঢেলে লতায় পাতায় বাড়ানো হয়েছিল ২৩শে জুন আপার দেশে ফেরার কাহিনী। এ নিয়ে তৃতীয় লেভেলের নেতা-কর্মীদের উচ্ছ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয়না কারণ তাদের মাথার ভেতর মগজ অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। সবচাইতে আশ্চর্যজনক লাগে অনেক উচ্চ শিক্ষিতদের প্রলাপ। এ কাতারে আরও আছেন বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, গায়ক সহ সমাজের উচুস্তরের অনেক মানুষ।
আপা ফেরার এই যে হাইপ, ইচ্ছা করে তাদের জিজ্ঞেস করতে, কোন কাঠামোর উপর ভিত্তি করে তিনি ফিরবেন। আমার হিসাবে ফেরার রাস্তার সবগুলিই পিচ্ছিল, দুর্গম।
১) অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করে জোর করে ঢুকে পরবেন এ দেশে।
২) শুভেন্দু বাবুর কামান বন্দুকের ছায়ায় ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে বসে যাবেন গণভবনে।
৩) তিনি ঢুকবেন এবং সাথে সাথে সেনা-কুঞ্জে ক্যু ঘটিয়ে উর্দিওয়ালারা
ফুলের মালা নিয়ে বরণ করে নেবে তেনাকে।
৪) লগি-বৈঠা নিয়ে আওয়ামী টেরর বাহিনী দখল নেবে গোটা বাংলাদেশের এবং ঝাণ্ডা উড়িয়ে আপাকে উড়িয়ে আনবেন গণভবনের হেলিপোর্টে।
উপরের উপলক্ষগুলোর একটাও যদি না ঘটে তাহলে আর কোন উপায়ে ফিরতে পারবেন আমাদের আপা কারও জানা আছে কি? না, ফিরে আসার আর কোন উপায় নেই কারও খাতায়। আপাকে ফিরিয়ে আনার সৈনিকেরা একটা ফ্যাক্টর ভুলে যান, দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিএনপি বলে একটা রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে। তাদের বাহুতে শক্তিও কিন্তু কম না। আপা মের মের করে ঢুকবেন আর হর হর করে গণভবনে বসে পরবেন আর বিএনপি ও তার পেটোয়া বাহিনী আঙ্গুল চুষবে আর নীরব দর্শক হয়ে আপার শাড়ি দেখবে এমনটা ভেবে থাকলে আপাদের হিসাবে ভুল আছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে বিএনপি মাঠে নামবে। সাথে যোগ দেবে জামায়েতই ইসলামের সুশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী, যাদের রেকর্ডে আছে আওয়ামী লীগের মতই নির্মমতা। এনসিপি নামের কিছু ছানাপোনা আছে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। আরও ভয়াবহ খবর হচ্ছে এই তিন দলীয় যৌথবাহিনীর সামনে পেছনে থাকবে সশস্ত্র পুলিশ। উপায়?
দল হিসাবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে দেশকে আর কখনও একদলীয় বাকশাল অথবা আমি ডামি ভোটের অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া হবেনা। এ দেশের মানুষের হৃদয় খুবই দুর্বলা। অল্পতেই তারা গলে যায়। ১৪০০ মানুষ খুনের ক্ষত শুকাবার আগে দেশে ফিরতে চাইলে এসবের কোন বিকল্প নেই। কেবল পাকি বীর্য, রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরোধী এসব সীমিত প্রলাপের আড়ালে ১৭ বছরের পাপ সমাহিত করার কোন রাস্তা খোলা নেই আওয়ামী লীগের সামনে।
দলীয় জন্ম বার্ষিকী একটার পর একটা আসতে থাকবে...আপার প্রোপাগান্ডা মেশিন একটার পর একটা হাইপ উঠিয়ে দলদাসদের পায়ের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে ঠিকই, কিন্তু আপার আর ফেরা হবেনা। আপা ও তার পরিবার সামনের ১০০ বছর বেঁচে থাকতে ধন-সম্পদের যা দরকার হবে তার সৎকার করেই তিনি ও তেনারা দেশ ছেড়েছেন। দেশে ফেরার নামে তিনি দলীয় ভৃত্যদের নিয়ে স্রেফ তামাশা করছেন, এ বাস্তবতা যত তাড়াতাড়ি তাঁরা বুঝতে পারবে নিজের ও পরিবারের প্রতি তত দ্রুতই সুবিচার করতে সক্ষম হবে।
৭৭ বছরের পুরানো একটা দল রাজনীতিতে টিকে থাকুক এটা অনেকেই চাইবে। তবে বাকশাল আর অবৈধ নির্বাচনের আওয়ামী লীগকে এ দেশের মানুষ আর কোনদিন মেনে নেবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অশুভ শক্তি হিসাবে টিকে থাকার দিন শেষ হয়েগেছে আওয়ামী লীগের জন্যে।