বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে অস্থিরতা...

Submitted by WatchDog on Tuesday, November 3, 2026

উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পোশাক খাতের সাথে জড়িত শিল্প কারখানা। ধর্মঘটের পাশাপাশি বাংলাদেশের 'ঐতিহ্য ও গৌরব' ধ্বস ও ভাংচুর শুরু হয়েছে। মৃত্যুর কানাঘুষাও শোনা যাচ্ছে অনেক জায়গায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর যাদের সম্যক জ্ঞান আছে তাদের জন্যে এসব খবর নিশ্চয় উদ্বেগের। বিশেষকরে শিল্প মালিকদের, যারা নিজেদের পুঁজি, মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে এ খাতকে সচল রাখতে সাহায্য করছেন।
এ শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ৮০ লাখ হতে ১ কোটি সাধারণ মানুষ যার ৮০ ভাগই মহিলা। এই শিল্প গত ৫০ বছরে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমানে রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে এবং ৮১ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ হয় টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও প্রসারে পোশাক খাতের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বয়স মাত্র ২ বছর ৮ মাস। পর্যবেক্ষণ হতে বলা হয় বড় কোন বাধা-বিপত্তি ছাড়াই সরকার তার মেয়াদের অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের ভূমিকার বিশ্লেষণ করলে গেল আড়াই বছরে এমন কোন সাফল্য চোখে পরবেনা না যা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যায়। ব্যর্থতার পাল্লাটাও একই। অর্থাৎ বড় কোন ব্যর্থতা নেই যার জন্যে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে। সরকারের যা কিছু ব্যর্থতা তার প্রায় সবটাই সীমাবদ্ধ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গণ্ডিতে।

স্বভাবতই পোশাক খাতে শুরু হওয়া অস্থিরতা সরকারের জন্য এক ধরণের লিটমাস টেস্ট। সমস্যার ভেতরে প্রবেশ না করে অনেকটা আগ বাড়িয়ে সরকার ঘোষণা দিয়েছে এ সমস্যার গোঁড়ায় আছে পতিত আওয়ামী সরকার। তারাই নাকি সরকারকে ডিস্টাবিলাইজ করার অংশ হিসাবে এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী সমর্থকদের উস্কে দিচ্ছে। আসলেই কি তাই?

আমাদের গোল্ড ফিশ মেমোরি যদি বিট্রে না করে তাহলে মনে থাকার কথা বুয়েটের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন মেধাবী ও প্রতিভাবান ছাত্র আবরার কে পিটিয়ে হত্যা করার কারণ দেখিয়েছিল তার জামাতি সংশ্লিষ্টতা। অর্থাৎ ঐ আমলে আইনি বেআইনি যাকিছু ঘটেছিল তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্যে সরকার সামনে এনেছিল জামাতি ও রাজাকার ইস্যু। সদ্য শুরু হওয়া পোশাক শিল্পের অস্থিরতাকে সরকার কি একই সমান্তরালে দাঁড় করাতে চাইছে না? নিজেদের ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপানো আমাদের রাজনীতিবিদদের মজ্জাগত অভ্যাস। আওয়ামী লীগকে বলির পাঠা বানিয়ে এ যাত্রায় পাড় পাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা সহজ হবেনা বিভিন্ন কারণে।

পোশাক শিল্পে কেন এই অস্থিরতা এবং তা কি নতুন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের সমস্যার ভেতরে ঢুকতে হবে। একটা বাস্তবতা আমরা ভুলে যাই; এই শিল্পের ভারি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল সহ প্রায় সবকিছুই আমদানি নির্ভর। স্থানীয় বলতে যা আছে তা কেবল শ্রম। বিশ্ব বাজারে এই খাতে বাংলাদেশের ডমিনেন্স ফ্যাক্টর উৎপাদিত পণ্যের কোয়ালিটি অথবা বাজারজাত করার কৌশল না, বরং তুলনামূলক সস্তা শ্রম।

বাংলাদেশে সস্তা শ্রমই তার পোশাক শিল্পের অন্যতম পুঁজি। এবং এ পুঁজিই তৈরি পোশাক বাজারে জায়গা করে নিতে সাহায্য করছে।

আসুন দেখে নেই আমাদের কম্পিটেটরদের সাথে এই খাতে শ্রম মূল্যের একটা তুলনামূলক চিত্র (১ ডলার = ১২০ টাকা দরে)
দেশ প্রতি ঘণ্টায় গড় মাসিক গড় আয়
বাংলাদেশ ৫৪ টাকা ১২,৫০০ টাকা
ভিয়েতনাম ৬১৮-৭৭৭ টাকা ৪৮,০০০ টাকা (নূন্যতম)
চীন ৭২০ টাকা মাসিক আয় ভিন্ন ক্যাটাগরির ভিন্ন
ভারত ১৮৮ টাকা ৩৯,৭২০ টাকা

জীবন যাত্রার মানের সাথে উপরের আয় তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। এবং সাথে এও বুঝা যায় কেন বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের এত চাহিদা।
সস্তা শ্রম দিয়ে পোশাক উৎপাদন করে তা সস্তা দামে বিক্রি করলে বাজার প্রসারিত হতে বাধ্য। বাংলাদেশ তাই করছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে তুলনা করলে আমাদের পোশাক শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের দুরবস্থার চিত্র করুণ ভাবে ফুটে উঠে। ভারতীয়দের বার্ষিক মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে কম, কিন্তু পোশাক শিল্পে তাদের শ্রমিকদের আয় আমাদের চাইতে প্রায় ৩ গুন বেশী।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি হতে বঞ্চিত করে যে শিল্প কারখানা গড়ে উঠে তা অনাদিকাল স্থায়ী হতে পারেনা। একটা সময় ছিল যখন বিশ্ব বাজারে পোশাক শিল্পে চীনাদের একক আধিপত্য ছিল। তার পিছনেই ছিল ভারত। দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ তৃতীয় বিশ্বের আরও অনেক দেশ ছিল এ বাজারে। ওসব দেশে জীবন যাত্রার মান বাড়ার সাথে বেড়েছে শ্রমের মূল্যায়ন। স্বভাবতই বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সাথে অনেকেই ছিটকে গেছে অসম প্রতিযোগিতার কারণ। তারা ডাইভার্টসিটি এনেছে নিজেদের অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই স্তম্ভ, বিদেশে শ্রম রপ্তানি ও পোশাক শিল্পের কোনটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নেই। শ্রম বাজার কতটা ভলাটাইল ও নড়বড়ে তার প্রমাণ রেখে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ।এ বাজার সংকুচিত হয়ে এক সময় শেষ হবে, এ সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সস্তা শ্রম শক্তিকে শোষণ করে পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রা বেশিদূর এগোয় না, এর প্রমাণ ভুরি ভুরি। বাংলাদেশও তার অর্থনীতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সময় এসেছে। পোশাক শিল্পের অস্থিরতা তারই সংকেত। এ সংকেত সময় মত বুঝতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল আওয়ামী ভূতের দোহাই দিয়ে এ সমস্যা হতে জাতিকে অন্ধকারে রাখলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।

অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে তার জন্যে চাই ভিশনারী মানুষ। চাই শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। বিচার ব্যবস্থার সংস্কার। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদ জিয়ার স্বপ্ন, এসব অচল ও মেধাহীন তত্ত্ব বাজারে বিক্রি করে রাজনীতির মাঠ গরম রাখা যাবে ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির মাঠ একসময় শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাবে যা হতে ফেরার রাস্তা থাকবেনা।

আওয়ামী লুটেরা বাহিনী তাদের কর্মের ফল ভোগ করছে, এ ছিল তাদের স্বাভাবিক পরিণতি। বাস্তবতা হচ্ছে, এ রক্তাক্ত পরিবর্তন হতে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কোন শিক্ষা নেয়নি। কর্মফলের একই পরিণতি হতে তারা যে রেহাই পাবে এর কোন গ্যারান্টি নেই।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন