এক নেতার এক দেশ, শেখ মুজিবের বাংলাদেশ...

Submitted by WatchDog on Sunday, August 16, 2026

আগস্ট মাসটাই কেমন জানি বেরা তেরার মাস! সব ঘটনা কেন যে এই মাসে ঘটতে হবে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। ২৪'এর পরিবর্তনও এই মাসে। হাসিনার পলায়ন দিয়ে মাসের শুরু। ১৪ তারিখ পাকিস্তানের, ১৫ তারিখ ভারতের স্বাধীনতা দিবস। ১৫ তারিখ আরও দুইটি ঘটনা যা চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। একদিকে মুজিব হত্যাকাণ্ডের শোক অন্যদিকে খালেদা জিয়ার জন্মোৎসব! দুই মেরুর দুই ঘটনা যা নিয়ে বছরের পর বছর চলে আসছে তর্ক বিতর্ক।

এক ব্যক্তির এক দেশ উত্তর কোরিয়ার লৌহমানব কিম জং উনের একটা মেয়ে আছে যার নাম জু-আয়ে। বয়স ৯ কি ১০। মেয়ের জন্মের পর নাম রেখে অনেকটা ঐশ্বরিক বাণীর মত ঘোষণা করলেন, তার মেয়ের নামে উত্তর কোরিয়ার আর কোন মা-বাবা তাদের কন্যা সন্তানের নাম রাখতে পারবেনা। রাখলে, মৃত্যুদণ্ড!

১৫ই আগস্ট নিয়ে বাংলাদেশেও অনেক বিধি নিষেধ ছিল। শেখ মুজিবের মৃত্যুর দিনে দেশে কারও জন্মদিন পালন করায় ছিল অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। আইন করে পোয়াতি মায়েদের এইদিনে সন্তান প্রসব করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী ছিল যেন সময়ের দাবি। এ নিয়ে রাজনীতির মাঠ কম ঘোলা হয়নি!

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশেও একজন কিম জং উন ছিলেন। তিনিও এই দেশে এক নেতার এক দেশ তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়ার কিম ডাইনাস্টির জুচে মতবাদের মত তিনিও কায়েম করতে চেয়েছিলেন বাকশাল মতবাদ। যার সারমর্ম ছিল...এক নেতার এক দেশ, শেখ মুজিবের বাংলাদেশ!

মতবাদ বাস্তবায়নের মাহফিলে কিম জং উনের মত শেখ মুজিবের ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন ছিলনা। দেশের কতিপয় দুষ্টু সেনা অফিসার নিজেদের পারিবারিক ঝগড়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে মুজিব পরিবারের প্রায় সবাইকে খুন করেছিল।

অপরাধ ও শাস্তি দুটো কোন সাংঘর্ষিক অবস্থান না, বরং একে অপরের পরিপূরক দুটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা। ৭২ হতে ৭৫, সংক্ষিপ্ত এ সময়ে শেখ মুজিবের শাসন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ৭১ সালে যুদ্ধের শুরুতে সেনা শাসিত পাকিস্তান সরকারের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরিবারের সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে নিজে চলে যান আরও নিরাপদে। বিতর্কের শুরু ওখান হতেই। যদিও এর আরও অনেক আগে অখণ্ড পাকিস্তানের রাজনীতিতে শেখ মুজিবের ভূমিকা নিয়ে আছে লম্বা ও চাঞ্চল্যকর এক ইতিহাস। সে ইতিহাস নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের সবাইকে জানতে হবে এমনটা না। কারণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবের আসল পরিচয় উন্মোচিত হয় ১৯৭১'এর মার্চ মাসের পর হতে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালো ভাবে যারা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন তাদের প্রায় সবার জন্ম ১৯৭১ সালের পর। ৭১ হতে ৭৫'এর ইতিহাসের সাথে তাদের পরিচয় হাওয়া হতে পাওয়া খবরের মাধ্যমে। নিজেদের মত করে দলীয় প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে ইতিহাসের বয়ান দিয়েছেন নেতা-নেত্রীরা। এবং সে সব বয়ানকে আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ট্রান্সফর্ম করে ইতিহাস বানিয়ে ফেলেছি।

৭১ হতে ৭৫ ছিল অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সময়। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা জাতির চাওয়া পাওয়ার হিসাব তখনও মেলানো হয়নি। পাকিস্তান হতে উড়ে এসে সেই যে তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন হয়ত ভুলেই গিয়েছিলেন রাজনীতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন নামের কিছু শব্দ আছে যা এক ব্যক্তির এক দেশের যাঁতাকলে দমন করা যায় না।

শেখ মুজিবের বিচারে তিনিই ছিলেন বাংলাদেশ। বাকি সব ও সবাই বাধ্য ছিল তার গুণমুগ্ধ দাস বনতে। হাজার হাজার মায়ের কোল খালি করে তিনি কায়েম করেছিলেন বিভীষিকার রাজত্ব। শতাব্দীর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ গ্রাস করে নিয়েছিল দেশকে। অন্যায়, অবিচার, গুম, খুন, হত্যা আর ধর্ষণের সুনামিতে প্লাবিত হয়েছিল দেশ। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ ব্যবস্থায় কায়েম করেছিলেন হীরক রাজ্যের আইন।

১৯৭৫ সাল ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিব সপরিবারে সবাই নিহত হওয়ার পর দেশের কোথাও কোন প্রতিবাদ হয়নি। চোখের পানি ফেলার মত কেউ ছিলনা। রাজনীতির মাঠও উত্তপ্ত হয়নি। বরং ক্ষমতার রুটি হালুয়া ভাগাভাগির প্রতিযোগিতায় নেমে পরেছিলে শেখ মুজিবের সঙ্গী সাথিরা। আর দেশবাসী ফেলেছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। আপনারা যারা ৭১'এর পর জন্ম নেয়া দেশপ্রেমী তাদের এসব বুঝতে অসুবিধা হবে, বাস্তবতা হজম করতে কষ্ট লাগবে। কিন্তু এসব ঘটেছিল। শেখ মুজিবের মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছিল দেশবাসী।

মুজিবকে রাতের অন্ধকারের হত্যার নিন্দা জানাতে আমার নিজের কোন বাধা নেই। অবশ্যই নিন্দা জানাই। নিন্দা জানাই এ জন্যে এ হত্যাকাণ্ড একজন ভয়াবহ ও নির্মম স্বৈরশাসককে ইতিহাসে অমর করে রাখার রসদ যুগিয়েছে। শেখ মুজিবের প্রয়োজন ছিল বেঁচে থাকার। তিনি যে পথে হাঁটছিলেন সে পথের শেষ ছিল জনতার আদালতে। সেনা অফিসারদের বিচার ও শাস্তির চাইতে শেখ মুজিবের জন্যে বেশী দরকার ছিল পাবলিক প্রসিকিউশন। সে বিচার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে তখনই শেখ ডাইনাস্টির শেষ দেখা সম্ভব ছিল। হয়ত এ অপেক্ষা আমাদের রেহাই দিত তার কন্যা শেখ হাসিনার বর্বরতা হতে। ধিক্কার জানাই শেখ মুজিবের এই অ-সময়োচিত হত্যাকাণ্ডের জন্যে। এমন গৌরবময় বিদায় তার প্রাপ্য ছিলনা। বরং শেখ হাসিনার মত তার শেষটাও দরকার ছিল প্রতিবেশী প্রভুদের কোন দুর্গে অথবা রঙমহলে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন