ব্যবধান মাত্র ৪ মাসের। তিনি পালালেন আগস্টে আর বাশার আল আসাদ পালালেন ডিসেম্বরে। একজন গ্রহণ করলেন দিল্লীর আতিথেয়তা, অন্যজন মস্কোর। পালানোর ধরণও ছিল প্রায় এক। জনতার রোষ বিস্ফোরিত হয়ে প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছার আগেই পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন দুজনে।
পার্থক্য কিছুটা আছে অবশ্যই। এই যেমন আমাদের তিনি বাপে ঝি'য়ে মিলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলনে ২১ বছর, অন্যদিকে আসাদ পরিবার বাপে-পুতে মিলে দেশ শাসন করেছেন ৫৩ বছর। আমাদের তেনার পিতার মত বাশারের পিতা হাফেজকে অবশ্য মৃত্যু শয্যায় বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পরে থাকতে হয়নি। দুই পিতার মৃত্যু ছিল দুই রকম। একজনের হয়েছিল অপমৃত্যু অন্যজনের স্বাভাবিক।
ক্ষমতা যখন পারিবারিক সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয় তখন স্বাভাবিক হয়ে যায় বাপের পর ছেলে অথবা মেয়ের ক্ষমতায়ন। হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর তার ছেলে বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় বসবেন এ ছিল অলিখিত নিয়ম। সিরিয়ানদের এর বাইরে যাওয়ার উপায় ছিলনা। আর আমাদের দেশে শেখ হাসিনা শেখ ডাইনাস্টির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন পরিবারের বাকি সবার অকাল মৃত্যুতে। এখানেও ছিল পারিবারিক বাধ্যবাধকতা।
বাংলাদেশ অথবা সিরিয়ার মত একনায়ক-তান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সমস্যা দেখা দেয় যখন স্ব স্ব দেশের 'অবাধ্য' জনগণের চোখ ফুটে যায়। গ্লোবালাইজেশনের যুগে স্টীমরোলার চালিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ক্ষমতা পোক্ত ও স্থায়ী করা যে অসম্ভব তা হাসিনা ও বাশারের মত স্বৈরশাসকরা এতদিনে বুঝে ফেলার কথা।
সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের উত্থান ও পতনের সাথে রক্তের নদী জড়িত। দেশটার গৃহযুদ্ধে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। বাংলাদেশের মত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মূলেও ছিল পারিবারিক ক্ষমতা স্থায়ী করার কুৎসিত অধ্যায়। হাফিজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর, ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি তার পুত্র এবং উত্তরসূরি বাশার আল-আসাদের কাছে হস্তান্তরিত হয়, যাকে দল "তরুণ নেতা" এবং "জনগণের আশা" বলে অভিহিত করে। উত্তর কোরিয়ার কিম বংশের মডেল দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত এই সরকারি প্রচার আসাদ বংশকে ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে এবং আসাদ পিতৃপুরুষদের আধুনিক সিরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পূজা করে।
বাংলাদেশে শেখ ফ্যামিলির উত্থান ও দেশ শাসনের মডেলও ছিল উত্তর কোরিয়ান মডেলের। বাপ ও মেয়ের পূজার অপর নামই ছিল দেশটার রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি। যার সাথে খাপে খাপে মিলে যায় আল আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরের ব্রুটাল স্বৈরশাসন।
খবরে প্রকাশ মস্কোর নির্বাসিত জীবনকে বৈচিত্র্যময় করার লক্ষ্যে বাশার আল আসাদ রুশ ভাষা শিখছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচল হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এ মাধ্যমকে পুঁজি করে হারানো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন তার কোন প্রমাণ নেই। তিনি হয়ত মেনে নিয়েছেন বর্তমান বাস্তবতা। একই কথা বলা যাবেনা আমাদের পতিত স্বৈরশাসকের বেলায়। তিনি দিল্লিতে বসে একটাই ধ্যান করছেন কিভাবে ক্ষমতা ফিরে পাওয়া যায়।
আজ মঙ্গলবার মানবতা-বিরোধী অপরাধের জন্যে বাশার আল আসাদকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে দেশটার ট্রাইব্যুনাল। খুঁজলে এখানেও মিলে পাওয়া যাবে বাংলাদেশের পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পরিণতির সাথে সিরিয়ার স্বৈরশাসকের পরিণতি।
কথায় বলে, পাপ বাপকেও ছাড়েনা।
https://www.facebook.com/watchdog.bd