জুলাই পরিবর্তন ও স্বামীসূখ...

Submitted by WatchDog on Friday, July 3, 2026

আব্বা তখনও বেঁচে এবং নিজ হাতে গড়ে তোলা নিজের সাম্রাজ্য নিজেই সামাল দিচ্ছেন। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভুক্ত অনেক কর্মচারী। তাদের শতকরা ৯০ ভাগ সংখ্যালঘুর হিন্দু সম্প্রদায়ের। আব্বার প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল এদের উপর। পরিবারের সদস্য হিসাবে গণ্য করতেন। এমন কোন উপলক্ষ নেই যাকে ঘিরে তাদের সবাইকে বাড়িতে দাওয়াত করে বিশেষ যত্ন সহকারে আপ্যায়ন করতেন না।

তো সে বছর আব্বা সংসদ নির্বাচন করলেন। তখন চারদিকে আওয়ামী জোয়ার। ছাত্রলীগের পেশি শক্তির কাছে গোটা দেশ জিম্মি। ভাড়াটে গুণ্ডাদের অস্ত্রের মুখে সামান্য ব্যবধানে তিনি হেরে গেলেন।

কুরবানির ঈদের রাতে কর্মচারীদের দাওয়াত করে খাওয়ানো আমাদের বাড়ির অনেক পুরানো ঐতিহ্য। তেমনি এক রাতে সবাই জমায়েত হয়েছিল আমদের বাড়িতে। কর্মচারীদের বাকি ১০ ভাগ মুসলমানও ছিল সে দাওয়াতে। কথা প্রসঙ্গে অনেক কথা বেরিয়ে এলো। এবং জানা গেল সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে আমাদের ৯০ ভাগ হিন্দু কর্মচারীদের কেউ আব্বাকে ভোট দেয়নি। যদিও তাদের অনেকে আব্বার আর্থিক সহযোগিতায় বিয়ে-শাদি পরের কথা, এসএসসি পাশ পর্যন্ত করেছিল। খবরটা আব্বার কানে পৌঁছালেও এ নিয়ে তিনি উচ্চবাচ্য করেননি। বয়স কম হলেও আমি ছেড়ে দেয়ার মানুষ ছিলাম না। আমার বড় ভাইকে সাথে নিয়ে একদিন তাদের সবাই সমন পাঠালাম। জানতে চাইলাম আমাদের খেয়ে আমাদের পরে কেন আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া!

প্রথম ইতস্তত করলেও পরে স্বীকার করল আওয়ামী লয়্যালটি। আমার শুধু জানার দরকার ছিল যে আওয়ামী প্রার্থী নির্বাচনে জয়লাভ করেছে সে প্রতিটা হিন্দু ব্যবসায়ী হতে মাসিক চাঁদা নেয়, হিন্দু পরিবারে বিয়ের আয়োজন করতে গেলে তার জন্যে ৫০ হাজার টাকা নজরানা বাধ্যতামূলক থাকে, তাদের স্থাবর সম্পত্তি কেনা-বেচায় এই আদমের কমিশন দেয়া অলিখিত আইন, তারপরও কেন তাকে ভোট দেয়া।

উত্তর পেয়ে আমরা কেউ অবাক হইনি। তবে আমাদের নিজ ঘরেও এমন আইন বাধ্যতামূলক তা হজম করতে কষ্ট হয়েছিল। তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয় কারণ এই দল ক্ষমতায় থাকা মানে তাদের জন্যে ভারতের খুব কাছাকাছি থাকা। কারণে অকারণে সীমান্ত অতিক্রম করায় অনেক সুবিধা। অর্থ পাচারে নিশ্চিত থাকে নিরাপদ চ্যানেল।
ভারত তার দেশে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যে ভিসা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ভিসার জন্যে লম্বা লাইনের সাক্ষী হচ্ছি আমরা। এ নিয়ে অনেকে ঠাট্টা তামাশা করছেন। দেশের দেড় কোটি নাগরিক অন্তর দিয়ে ভারতকে ভালবাসে। গেল দেড় বছর ঐ দেশে যেতে না পারায় দম আটকে গেছে তাদের। স্বভাবতই খাঁচা হতে মুক্তি পেয়ে পাখি উড়তে চাইছে আপন ঠিকানায়। লাইন তাই অস্বাভাবিক লম্বা।

জুলাই পরিবর্তনের বয়স এখন দুই বছর। এই দুই বছরে দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। ইন্টেরিমের দেড় বছর ছিল জুলাইয়ের আলোকে মৌলিক কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিএনপির চার মাস তাদের জন্যে মরুভূমির তপ্ত সূর্যের দাপটের এক পশলার বৃষ্টির মত। ক্ষুধা তৃষ্ণায় শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাওয়া পকেটকে ঠাণ্ডা করার সোনালী উপলক্ষ। জুলাই গেছে একদিকে আর ক্ষমতাসীনদের দেশ শাসন গেছে অন্যদিকে। এক কথায় জুলাই হারিয়ে গেছে অথবা যাচ্ছে।

জুলাই নিয়ে জুয়া খেলার হয়ত এখনও অনেক বাকি। এর আল্টিমেট রেজাল্ট ক্ষমতাসীনদের হাতে মৃত্যুবরণ করলেও এই মাসে ধটে যাওয়া পরিবর্তনকে রিভার্স মুডে নিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যে সহজ হবেনা তা অনেকেই বুঝেও না বুঝার ভান করে।

মেহের আফরোজ শাওন ও নিলোফার মনিদের নিশ্চয় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কষ্টে নিশ্চয় বুক ফাইট্টা যায়। দিল্লীর দুর্গম দুর্গে আটকে থাকা শেখ বংশের শেষ সম্রাজ্ঞীর কথা মনে হলে নিশ্চয় দুচোখ বেয়ে চেরাপুঞ্জির ধারা নেমে আসে। তাতে কি জুলাই নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ আছে?

জুলাই আওয়ামী কাঠামোতে কুঠারাঘাত করেছিল। শেখ সাম্রাজ্যের সাজানো বাগান দুমরে মুচরে উপড়ে ফেলেছিল। শেখা হাসিনা তার চৌদ্দ-গুষ্টির সবাইকে নিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। শাওন আর নিলোফার মনিদের চোখের পানি কি পারবে শুকিয়ে তক্তা হয়ে যাওয়া আওয়ামী বাগানে ফুল ফোটাতে? এ প্রশ্নের জবাব আমাদের জানা আছে। হয়ত সময় ও বাস্তবতার বিবেচনায় এ নিয়ে আমাদের কথা বলতে দ্বিধা লাগে। বুকে হতাশার দলা বাসা বাধে। কিন্তু এসব খুচরা হিসাব পাশে রেখে বড় হিসাবে গেলে আসলেই কি মনে হবে দেশ ফিরে যাচ্ছে ফেলে যাওয়া আওয়ামী পথে?

আমার হিসাবে এমন সম্ভাবনা খুবই স্লিম। আওয়ামী লীগ খুব শীঘ্রই ফিরে আসেনা। আদৌ আসবে কিনা এ নিয়েও সন্দেহ আছে। অন্তত সামনের আরও দুই টার্মে বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখবে। হোক তা রেখে যাওয়া ঘৃণ্য আওয়ামী পথে।

শেখ হাসিনার দানব হয়ে উঠার অনেকে অনেক কারণ বললেও আমার বিচারে অন্যতম কারণ ছিল স্বামীসূখ হতে বঞ্চিত হওয়া। যৌণতৃপ্তি হরেক রকম রোগ নিরাময়ে দারুণ এক মহৌষধ। শেখ হাসিনা গোটা যৌবন কাল এ তৃপ্তি হতে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেকে মৃণাল নামের তৃতীয় একজনকে দৃশ্যপটে আনলেও বাস্তবের চিত্র ছিল ভিন্ন। স্বামীসূখে অতৃপ্ত শেখ হাসিনা নিজ স্বামীকে কেমন দাওয়াই দিতেন আর প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান মরহুম সাহাবুদ্দিন আহমদের কিছু লেখায়।
শাওনের স্বামী নেই। নিলোফার মনির পরকীয়ার কাহিনী নিয়ে রসালো কাহিনী চালু আছে। তৃপ্তি বঞ্চিত এদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করালে তাদের জুলাই সমীকরণ মেলানো খুব সহজ হয়ে যাবে। তাদের হাহাকার জুলাই নিয়ে না, হাহাকার নিজেদের বঞ্চনাময় জীবন নিয়ে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন