এভাবেও ক্ষমতায় আসা যায়!

Submitted by WatchDog on Wednesday, July 1, 2026

কেইকো সোফিয়া ফুজিমোরে হিগিউচি সদ্য সমাপ্ত প্রেসিডেন্টসিয়াল নির্বাচনে পেরুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এত দেশ থাকতে কেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু নিয়ে ত্যানা পেঁচাচ্ছি, কারও মনে এমন প্রশ্ন উদয় হলে উত্তর হচ্ছে ওটা আমার শ্বশুরের দেশ। ঘন ঘন যাওয়া হয়, তাই দেশটার চলমান ঘটনা প্রবাহের উপর সব সময় একটা আগ্রহ থাকে। অবশ্য প্রথম বার পা রাখার আগে ঐ দেশের ইতিহাস নিয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করেছিলাম, আর তাতেই আগ্রহটা বেড়ে গিয়েছিল। আগ্রহের চাহিদা মেটাতেই প্রথম বার ঐ দেশে যাওয়া।

দেশটার অতীত জানতে ঘটনা প্রবাহের স্রোতে ভেসে চলুন কিছুটা সময়ের জন্যে এন্ডিসের চূড়ায় ঘুরে আসি।

রাজধানী লিমা হতে বাস যায় ঐ দিকটায়। এক কথায় ভার্টিকেল জার্নি। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে উঠতেই থাকে। এক সময় মনে হয় আমরা আকাশের দিকে যাচ্ছি, এ জার্নি শেষ হবার নয়।

বাসে চড়ার আগে পিছনে ফেলে আসা আত্মীয় স্বজনদের নাম ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দিতে হয় যদি এন্ডিসের কোন এক বাঁক হতে বাস আছড়ে পরে অন্তত মৃত্যুর খবরটা যেন পৌঁছানো যায়। তেমনি এক বাঁকে আমার ভবিষ্যৎ শ্বশুরের সমাধি হয়েছিল। আরও ৩০ জন যাত্রী নিয়ে চলন্ত বাস নিখোঁজ হয়েছিল এন্ডিসের গোলক ধাঁধায়। তার লাশের হদিস কেউ কোনদিন পায়নি।

হোয়াংকা হোয়াসি নামে এন্ডিসের একটা চূড়া আছে। ওখানে পৌঁছাতে অন্যরকম সাহসের দরকার হয়। জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রহর গুনতে হয় শেষ গন্তব্যের। জানালা দিয়ে নীচে তাকালে মগজ গুলিয়ে যায়। রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে আসে। এলোমেলো হয়ে যায় চিন্তাভাবনা। মৃত্যু ভয় চেপে বসে।
অবশ্য সবকিছু জয় করে চূড়ায় একবার পা রাখতে পারলে জীবন ধন্য মনে হবে। সবকিছু অন্যরকম লাগবে। মনে হবে কোন শিল্পী হয়ত অনাদিকাল ধরে এখানে ছবি আঁকছে। একদিকে পাহাড়ের হিম শীতল মিছিল। দিগন্তরেখায় নীলাভ আকাশ, আর মাটিতে ইনকাদের এলোমেলো জীবন। এসব চোখ বুলালে ভুলে যেতে হয় ভার্টিকেল জার্নির ভয়াবহতা।

পাহাড়ের এমন উচ্চতায় একই চেহারার দুটো ছোটখাটো প্রাসাদ দেখে থমকে গেলাম। অবাক হলাম প্রাসাদের শৈল্পিক সৌন্দর্য দেখে। প্রথম দেখায় মনে হবে রুশ দেশের জারদের কেউ হয়ত সম্পদের পাহাড় নিয়ে পালিয়ে এসে আস্তানা গেড়েছিল এখানে। গিন্নি ভুল ভাঙ্গিয়ে দিল। জারদের কেউ না, প্রাসাদ দুটোর মালিক একজন, দেশটার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরে।

ঐ সময় ফুজিমোরে নিজের আসল দেশ জাপানে ছিলেন। এক কাপড়ে দেশ হতে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে হেরে গেলেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচনের ফলাফল উলটে দিয়েছিলেন। ক্ষোভে ফেটে পরেছিল গোটা দেশ। এক কালের সবার প্রিয় প্রেসিডেন্ট ততদিনে নিকৃষ্টের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। দুর্নীতিতে আপাদমস্তক ডুবে ছিলেন। দুর্নীতির অর্থে হোয়াংকা হোয়াসির চূড়ার প্রাসাদ বানিয়েছিলেন অবসর সময় কাটাবেন বলে। তাও আবার একটা না, দুইটা। দ্বিতীয়টা বানিয়েছিলেন একমাত্র কন্যা কেইকোর জন্যে।

কন্যা কেইকো নিয়েই আমার এ লেখা। এবার চলুন এন্ডিসের চূড়া হতে নীচের দিকে নামি। নীচে প্রশান্ত মহাসাগর যার কোল-জুরে দাঁড়িয়ে আছে রাজধানী লিমা ওখানটায় ফিরে যাই।

কেইকো ফুজিমোরে ১৯৯৪ হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত পেরুর ফার্স্ট লেডি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পিতা ফুজিমোরে মা হিগিউচিকে তালাক দিলে শূন্যস্থান পূরণ করতে আসেন কেইকো।

দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হলেও পিতা ফুজিমোরে জাপানে পালিয়ে থাকার কারণে তাকে ধরা যায়নি। তবে এক সময় পরিস্থিতি থিতু হয়ে আসলে তিনি প্রতিবেশী দেশ চিলিতে আসেন নিজ দেশের কাছাকাছি থাকবেন বলে। মাঝে মধ্যে তিনিও আমাদের শেখ হাসিনার মত বয়ান দিতেন আর বলতেন হুট করে ঢুকে পরার। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উলটো। চিলি সরকার ফুজিমোরেকে তুলে দেয় পেরু সরকার হাতে। এবং ওখানেই সাজা পেয়ে জীবনের বাকি সময়টা কাঁটিয়ে দেন এক কালের এই লৌহমানব। ক্যান্সারে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে তাকে মানবিক কারণে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তি পেয়ে জীবন আর লম্বা করতে পারেননি।

ক্ষমতা হতে বাবার প্রস্থানের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন কন্যা কেইকো ফুজিমোরে। ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে অল্প ভোটে হেরে যান। ভেনিজুয়েলার হুগো চাভেস ও প্রতিবেশী বলিভিয়ার বামপন্থী নেতা এবো মরালেসের দাপট তখন গোটা দক্ষিণ আমেরিকায়। পেরুও বাদ যায়নি। বলাহয় কেইকোর একাধিকবার পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল এই বামপন্থী উত্থান। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল ফুজিমোরের কন্যার। সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে জুলাই মাসের ২৮ তারিখ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পা রাখবেন। যে প্রাসাদে কৈশোর হতে যৌবনে পা রেখেছিলেন, ফার্স্ট লেডির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেখানে আবাসিক হবেন প্রেসিডেন্ট হিসাবে।

তিন বার পরাজিত হয়ে একবারও অভিযোগ করেননি ষড়যন্ত্রের। বলেননি ভোট জালিয়াতির বাংলাদেশি কাহিনী। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন। জনগণের সাথে আরও গভীরভাবে মেশার চেষ্টা করে গেছেন। এবং পুরস্কার হিসাবে পেয়েছেন হাড্ডাহাড্ডির নির্বাচনে সফলতা। তিন বাঃর হেরে চতুর্থবার কেন জিতল এ প্রশ্নের জবাবে আমার গিন্নির ভাষ্য হচ্ছে, জনগণ তাকে আগে প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেখতে চায়নি কারণ তার কনভিক্টেড পিতা তখনও বেঁচে ছিলেন। ভোটারদের ভয় ছিল হয়ত প্রেসিডেন্ট হয়ে কেইকো নিজ পিতাকে ক্ষমা করে দেবেন। আলবার্তো ফুজিমোরেকে জেলের বাইরে দেখতে চায়নি দেশটার জনগণ। অথচ এই তাকেই একসময় বলা হতো আধুনিক পেরুর জন্মদাতা।

আজ থাক, অন্য একটা লেখার জন্যে আলবার্তো ফুজিমোরেকে উঠিয়ে রাখলাম।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন