আমার আপন ভাতিজা। সুদর্শন ও সুঠাম দেহের একজন। ভাল গান গায় এবং কিশোরীদের হৃদয় ভাঙ্গায় সিদ্ধহস্ত। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর সিদ্ধান্ত নিল সেনাবাহিনীতে নাম লেখাবে। অনেক দরজা ঘুরে ঠেকলো গিয়ে নৌবাহিনীর দরজায়। ইন্টারভিউ দিল। আরও অনেক কিছু পার হয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেল। আমরা সবাই নিশ্চিত ছিলাম নৌসেনা হওয়া তার জন্যে এখন সময়ে ব্যাপার।
কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবে গেল কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারল সে সাতার জানে না। পত্রপাঠ বিদায় করে দিল। আশাহত হয়ে জীবন-যুদ্ধে নতুন ঠিকানা সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পরল।
আমি নিজেই একদিন ফোন করে জানতে চাইলাম তার নৌ যাত্রার সাফল্য ও ব্যর্থতার কাহিনী।
চরম ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করল তার প্রতি সুবিচার করেনি তারা। এভাবে বিদায় করার কোন অধিকার ছিলনা কর্তৃপক্ষের। আমার কেবল একটাই প্রশ্ন ছিল, সাতার না জেনে নৌবাহিনীতে নাম লেখানোর বুদ্ধি কে দিয়েছিল।
ছাত্রলীগের অসংখ্য কর্মীকে হত্যা করে টঙ্গির তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে এমন অভিযোগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নদীকে আঁকা হয়েছে রক্তের তুলিতে। হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্টুডেন্ট উইং ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে নাম এসেছে সরকার দলীয় জনৈক সংসদ সদস্যদের।
সব হিসাবে তুরাগ নদীর উপাখ্যান হৃদয়বিদারক ও করুণ। এ ধরণের ঘটনা আওয়ামী আমলের ১৭ বছর হরহামেশা ঘটেছ। এ নিয়ে প্রতিবাদ ও সমালোচনা করে অসংখ্য লেখা লিখেছি। আলোচনা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছি।
রাজনৈতিক ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে অন্যায়কে অন্যায় বলায় কোনদিন ছাড় দিইনি। তুরাগ নদীতে ভাসমান লাশ নিয়ে কীবোর্ডে হাত দেয়ার আগে ভাবলাম ঘটনার ভেতরে ঢুঁ মেরে আসি।
ঘটনা হাতড়াতে গিয়ে যে সব তথ্য পেলাম তা নিজের মগজ ও বিবেকের ফিল্টারকে কাজ লাগিয়ে যে সিদ্ধান্তে আসলাম তাতে তুরাগ নদীর লাশের কাহিনী আওয়ামী কাহিনীর সাথে মিল খুঁজে পেলাম না।
প্রথমত, তুরাগ নদীতে রক্তের দাগ পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে তিনটা অর্ধগলিত লাশ। লাশের শরীর আঘাতের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। স্বভাবতই দ্বিতীয় কারও হাতে অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যুর দাবি এখানে ধোপে টেকেনা। তাহলে প্রশ্ন উঠবে এসব লাশ এলো কোত্থেকে?
মৃতদের সবাই আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সরাসরি না হলেও তাদের মৃত্যুতে রাজনীতির যে হাত ছিল তা অবিশ্বাস করা কারণ নেই।
পুলিশের দাবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও মৃত একজনের পিতামাতার দাবি এক করলে যে চিত্র দাঁড়াবে তার সারমর্ম হবে:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে উজ্জীবিত হয়ে ঐ এলাকার আওয়ামী লীগাররাও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে। হয়ত আশা ছিল তাদের মিছিলের খবর নিশ্চয় অনেক হাত ঘুরে পৌঁছে যাবে কাঙ্ক্ষিত বন্দরে। এ মিছিলের ছবি/ভিডিও অংশগ্রহণকারীদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে ক্যাটালিস্ট হিসাবে কাজ করবে। স্থানীয় নেতাদের সিদ্ধান্তে মিছিলকারীরা নৌকা/ট্রলারে করে রওয়ানা দেয় নিজেদের গন্তব্য-স্থলে।
কিন্তু সব কাজের মত এ কাজেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় যতই মারো বেতন তোমার ২১২ বেতনের পুলিশ। খবর পেয়ে ওরাও রওয়ানা দেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের মিছিল ঠেকাতে।
অচমকা পুলিশ উপস্থিতি দেখে ভড়কে যায় নৌকা যাত্রী আওয়ামী সেনারা। ধরা পরলে শারীরিক অত্যাচার সহ অর্থ লেনদেনের ভয়ে নৌকা হতে ঝাপ দেয় সবাই। সমস্যা হচ্ছে নদীতে লাফিয়ে পরা অনেকেই সাঁতার জানত না। ফলে যা হবার তাই হলো, তলিয়ে গেল তুরাগ নদীর গভীরতায়।
লাশ ভেসে উঠল দুদিন পর।
এসব অপমৃত্যুর কোন অজুহাত নেই। মৃত্যু মৃত্যুই। যাদের সন্তান অথবা পিতা মারা গেছে তাদের শোক অন্য যে কোন শোকের চাইতে কম না। রাজনীতির মাঠে এসব অপ্রয়োজনীয় ও অকাল মৃত্যু অবশ্যই নিন্দনীয়। এখানে দলীয় পরিচয় ফ্যাক্টর হওয়ার কথা না।
কিন্তু তাই হলো আমার বেলায়। প্রতিবাদ ও সমবেদনা জানিয়ে একটা লেখা শেষমুহুর্তে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হলাম তুরাগ নদীর মৃত্যু মিছিল নিয়ে আওয়ামী নেতা-কর্মীদের প্রতিক্রিয়া দেখে।
সোশ্যাল মিডিয়ার অলিগলিতে আওয়ামী নেতা-কর্মীরা হামলে পরে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এবং তার সবটা জুড়ে থাকতে প্রতিশোধের অগ্নিশপথ। এবং এসব শপথের সবটাই থাকছে কথিত হত্যাকারীদের কিভাবে হত্যা করা হবে তার গ্রাফিক ডিটেইলস। একজন বিস্তারিত লিখতে লিখেছেন প্রথমে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে পরিবার বাকি সবাইকে জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে ফেলা হবে। আর আসল 'কালপ্রিট'কে প্রকাশ্য দিবালোকে টুকরা টুকরা করে কেটে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হবে।
দুঃখিত আওয়ামী চেতনায় মগজ ধোলাই হওয়া ভাইবোনেরা, আমি আপনাদের সহযোদ্ধাদের অপমৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে পারছিনা আপনাদের এসব হুংকারের কথা ভেবে। অতীতে আপনারা নিজেরা এ ধরণের হত্যাকাণ্ড একাধিক বার ঘটিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার সেভেন মার্ডার ছিল আপনাদের অপরাজনীতির ঘৃণ্য কৌশল। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের গ্রাফিক্যাল ডিটেলস আজও ভেসে বেড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সুতরাং সব বিবেচনায় বলা যায় ক্ষমতার পালাবদলে আপনারা ক্ষমতাসীন হলে তুরাগ নদীর সাদা পানিতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে কার্পণ্য করবেন না। তাই দুদিন আগের তুরাগ নদীতে আপনাদের কর্মীদের অপমৃত্যুকে মহিমান্বিত করতে পারছিনা।
তবে একটা উপদেশ চাইলে কিন্তু আপনার কাজে লাগাতে পারেন। নৌকায় চড়ে প্রতিবাদ মিছিলে রওয়ানা দেয়ার আগে নিশ্চিত করবেন যাত্রীদের সবাই সাঁতার জানে।
আমার বাড়িতে দাওয়াত রইলঃ
https://www.amibangladeshi.org/