ভাবছিলাম মাশরাফি বিন মুর্তজাকে নিয়ে কিছু লিখবনা। ক্রিকেট আমারও পছন্দের খেলা এবং বাংলাদেশ আমার পছন্দের দল। ২০২৪ সালের পর হতে আরকোন হদিস পাওয়া যায়নি মাশরাফির। বাড়ি পুড়িয়ে ফেলেছিল জানতাম তাই বেনিফিট অব ডাউট দিয়ে খেলোয়াড় হিসাবে সে শান্তিতে থাকুক এমনটাই চাইছিলাম। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেকের মত মাশরাফিও গর্ত হতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। খেলোয়াড় মাশরাফি হতে রাজনীতিবিদ মাশারাফিতে ফিরে আসার আওয়াজ দিচ্ছেন। তাই অনেকের মত আমিও স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা এই আওয়ামী লীগারকে ছাড় দেয়ার কোন কারণ দেখিনা।
মারা গেলে মৃত লাশ যেন নিজ জন্মস্থান নড়াইলে কবর না দেয় আকুতি জানিয়ে আবেগঘণ এক ইন্টারভিউ দিয়েছেন। আমার কাছে এসব কথাবার্তা আবেগের চাইতে নেত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বার্তা পাঠানোর নামান্তর মনে হয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমি আছি এবং আপনার বিশ্বস্ত একজন হয়েই বেঁচে আছি।
২৪'শের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন এই মাশারাফির কথা মনে প্রায়ই ভাবতাম। ক্রিকেট খেলোয়াড় হতে আসল রাজনীতিবিদ হয়ে উঠার যে উদাহরণ পাকিস্তানের ইমরান খান রেখে গেছেন সে রাস্তা মাড়ানোর সুযোগ ছিল মাশরাফির হাতে। চাইলেই বিদ্রোহ করতে পারতেন। রাস্তায় নেমে যোগ দিতে পারতেন ছাত্র-জনতার সাথে। বলতে পারতেন 'আই রিভোল্ট'। এমনকি নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠনেরও প্রেক্ষাপট ছিল তার সামনে। কারণ যে ১৪০০ জন নিহত আর হাজার হাজার আহত হয়েছিল আমি নিশ্চিত তাদের সবাই ক্রিকেটার মাশরাফির ভক্ত ছিল।
না, তিনি তা করতে যাননি। ইনস্টেড অপেক্ষা ছিলেন 'দুর্যোগ' কেটে যাওয়ার। অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাসের মতই হয়ত আন্দোলনকারীদের উপর কিছু একটা নিক্ষেপ করে দমনের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সে দিন আর আসেনি। ইতিহাসের অমেঘো পরিণতি হিসাবে অত্যাচারীদের পতন হয়েছে।
নড়াইলবাসীর উপর হ্যাসিনার হায়েনারা যখন প্রকাশ্য দিবালোক অস্ত্র হাতে নিরস্ত্র জনতার উপর হামলে পরেছিল বিশাল ভোটে 'নির্বাচিত' সংসদ সদস্য মাশরাফি মুর্তজা কি তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন? এমন কোন তথ্য বাজারে চালু নেই। উলটো চালু আছে তার বাবা ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের কাতারে যোগ দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন নির্মূল করায় অবদান রেখেছিলেন।
নিজে না খেয়ে নড়াইলবাসীকে খাইয়েছিলেন, নিজে না পরে তাদের পরিয়েছিলেন, নিজে গাড়ি না কিনে তাদের জন্যে এম্বুলেন্স কিনেছিলেন...এসব কাহিনী আউড়ে অনেকেই চোখের পানি নাকের পানি এক করছেন। এসব আবেগ চোখের পানিতে রূপ নেয়ার আগে আমার সামনে এসেছে ছোটকালে পড়া আলিবাবা ৪০ চোরের গল্প। ওরা একদল চোর, বিভিন্ন জায়গায় চুরি করে সম্পদ এক গোপন গুহায় জমা করে এবং দিনশেষ চুরির ভাণ্ডার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।
আওয়ামী উন্নতির ভাণ্ডার হতে একই কায়দায় মাশারাফি নিজেও নিজের ভাগ আদায় করতেন এবং তার কিছু অংশ নড়াইলবাসীর জন্যে খরচ করে ভাবছেন তিনি দয়ার হাজি মোহম্মদ মহসিন হয়ে গেছেন।
আওয়ামী লীগ ছিল অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ ফসল। মাশারাফি বিন মুর্তজা ছিলেন সে অবৈধ ফসলের শস্যকণা। চুরির অর্থে উন্নতি অথবা দয়া-দাক্ষিণ্য সেটাও চুরির মতই অবৈধ। মাশারাফি নড়াইলবাসীর জন্যে নিজের পকেট হতে এক পয়সাও খরচ করেননি, যা করেছেন তা আওয়ামী অবৈধ শাসনের অবৈধ ভাণ্ডার হতে নেয়া। এসব কোন উন্নতি ছিলনা, ছিল অপরাধ। পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় জনগণ মাশারাফিকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়েছে, এর জন্যে আবেগের দরিয়া উথলে উঠার কোন কারণ নেই।
ক্রিকেট মাঠে আম্পায়ার যখন আঙ্গুল উঁচিয়ে কাউকে আউট দেয় যত বড় খেলোয়াড়ই হোক না কেন তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। রাজনীতিবিদ মাশরাফিকে নড়াইলবাসী আঙ্গুল উঁচিয়ে আউট ঘোষণা করেছে, এবার তার ঐ মাঠ হতে প্রস্থানের পালা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সে মাঠ ছাড়তে তিনি নারাজ। বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির মাঠ এখন নিষিদ্ধ, এ মাঠে মাশারাফি কেন পালের গোদা শেখ হাসিনারও খেলার অবকাশ নেই। আবেগ দিয়ে এ মাঠে টিকে থাকার কোন পথ নেই।
অবৈধ নির্বাচনের জারজ ফসল মাশরাফি কেবল নিজের বাড়ি হারিয়েছেন, শরীরের উপর দিয়ে যায়নি। এমনকি জেলে পর্যন্ত যেতে হয়নি। পৃথিবীর দেশে দেশে বিপ্লবোত্তর ঝড়ে অনেক রাগব বোয়াল লণ্ডভণ্ড হওয়ার উদাহরণ আছে, সে তুলনায় মাশরাফি তো অনেক ভাগ্যবান।
কেবল নড়াইলের মাটিতে কেন, এই মাশরাফির লাশ বাংলাদেশের কোন জেলাতেই দাফন করার অধিকার রাখেনা। ওসামা বিন লাদেনের লাশের মত তার লাশও সাগরে ভাসিয়ে দিলে জাতি মুক্তি পাবে আরও এক আওয়ামী পাপ হতে।