কেন আর্জেন্টিনা না...

Submitted by WatchDog on Saturday, June 20, 2026

ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহটা কখন যে মরে গিয়ে কবরে ঠাঁই নিয়েছে তা চাইলেও মনে করতে পারব না। অথচ একটা সময় ছিল যখন দেশের লারেলাপ্পা মার্কা ফুটবল লীগ নিয়েও চরম এডিকশন ছিল। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দূরে থাক, এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্যায়েও কোনদিন খেলবেনা এ নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ নেই। খেলতে পারলে আগ্রহটা হয়ত ধরে রাখতে পারতাম। আমার আরও ২টি দত্তক নেয়া দেশ আছে যারা নিয়মিত বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু এদের অংশগ্রহণ কোন তারতম্য তৈরি করেনা অনেক কারণে। সে প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম।

নিজের আয়-রোজগারে বেশকিছুটা উন্নতির কারণে ইদানীং দোকানে গেলে পছন্দের জিনিস কিনতে দুইবার চিন্তা করিনা। দাম নিয়ে তেমন চিন্তিত হইনা। তবে কেনার আগে কোন দেশে প্রস্তুত সেটার দিকে দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে নেই। ভারতের তৈরি কোন প্রোডাক্ট সাধারণত এড়িয়ে চলি। বিশেষকরে গায়ের জামা-কাপড় কেনার বেলায়।

দেখতে সুন্দর, দামে সহনীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় প্রস্তুত শর্টসটা পছন্দ করতে তাই দ্বিধা করিনি। দাম পে করার আগে ডিজাইনটা ভাল করে দেখার সুযোগ হয়নি সময়ের অভাবে। এদেশে ক্রয় করা যে কোন জিনিস সহজেই ফিরিয়ে দেয়া যায়, কেনার আগে যাচাই বাছাই না করার এটাও একটা কারণ।
বাসায় ফিরে লন্ড্রি মেশিনে দেয়ার আগে দেখি নীচের দিকে চমৎকার ডিজাইনের একটা লগো। ভাল করে চোখ ফেরাতে আবিষ্কার করি ওটা আর্জেন্টিনার লগো। বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে তাই বেনিয়ারা এ নিয়ে বাণিজ্য করছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনার লগো থাকায় মনে হল অনেকেই ধরে নেবে আমি এ দলের সমর্থক।

না, আমি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক না। দূরের দক্ষিণ আমেরিকার এ দেশের সমর্থক হওয়ার কোন উপলক্ষ নেই। শ্বশুরের দেশ পেরু হলে একটা কথা ছিল।
ইসরায়েলের গাজা গণহত্যা আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। খেলাধুলাও এর বাইরে যায়নি। একসময় খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখার প্রবক্তা এই আমি সরে এসেছি সে ভিউ হতে। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে তাই কোন দেশ ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে সেটা নিয়েও কিছুটা সময় ব্যয় করেছি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ তালিকার অন্যতম শীর্ষে আছে আর্জেন্টিনা। পৃথিবীতে আমেরিকার পর আর্জেন্টিনা হচ্ছে দ্বিতীয় দেশ যারে সাথে গণহত্যাকারী ইসরায়েলের গভীর প্রণয়। আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে "বিশ্বের সবচেয়ে জায়নবাদী রাষ্ট্রপতি" বলে অভিহিত করেছেন। ইসরায়েলের প্রতি ধারাবাহিক সমর্থনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব অনার' প্রদান করা হয়েছে। প্রতিবছর একবার হলেও তিনি ইসরায়েল সফর করেন এবং জেরুজালেমের পশ্চিম দেয়ালে মাথা ঠুকে আসেন।

তিনি ইসরায়েলের গাজা গণহত্যার প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে নিজ ধর্ম ছেড়ে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পলাতক অনেক নাৎসি জেনারেল ও যুদ্ধাপরাধী বিচারের হাত থেকে বাঁচতে 'র‍্যাটলাইন' (Ratlines) নামক গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আর্জেন্টিনায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুয়ান পেরনের সহানুভূতি ও ক্যাথলিক চার্চের সহায়তায় তারা এই লাতিন আমেরিকান দেশে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেন। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলও বসে ছিলনা। আর্জেন্টিনার গহীন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা হিটলারের অনেক জেনারেলদের অপহরণ করে নিয়ে এসেছিল নিজ দেশে। এবং দ্রুত বিচার কর্ম শেষে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল।

ফুটবল বিশ্বকাপের সময় এলে বাংলাদেশ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে এক শিবির কোন এক অজানা কারণে আর্জেন্টিনার পক্ষ নেয়। দ্বিতীয় পক্ষ ব্রাজিল। হাজার হাজার মাইল দূরের দুই দেশের সমর্থনে বাংলাদেশের ফুটবল-প্রেমীদের এই আবেগ, উচ্ছ্বাস খোদ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলেও অনেক কৌতূহল ও কৌতুকের জন্ম দেয়। এ নিয়ে অনেক হাসি তামাশার প্রচলন আছে বিশ্ব মিডিয়ায়। আমি নিজে এসব এড়িয়ে গেছি বাংলাদেশে সম্মিলিত আনন্দ উচ্ছ্বাস করার সীমিত সুযোগের কথা ভেবে। তবে ইসরায়েল প্রীতির কারণে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পতন দেখতে উন্মুখ হয়ে থাকবো। মেসির দল যখন মাঠে নামবে আমার সামনে ভেসে উঠবে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া গাজার জনপদ...ভেসে উঠবে ১৭ হাজার শিশু হত্যার নির্মম চিত্র। এ হত্যাকাণ্ডে আর্জেন্টিনা কেবল মৌখিক সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, অর্থ ও অস্ত্র সাপ্লাই দিয়ে সহযোগী হয়েছে সহস্রাব্দের ভয়াবহ নির্মম গণহত্যায়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন