উন্নয়ন! উন্নয়ন!!

Submitted by WatchDog on Thursday, October 8, 2026

আমার পরিচিত এক ছোট ভাই বিলাতে পিএইচডি করে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংক্রান্ত কি একটা জটিল বিষয়ের উপর থিসিস লিখছে। ছোটবেলা হতে চিনি তাকে। তুখোর মেধাবী একজন ছাত্র। জ্ঞানে গুনে একেবারে টসটসে পাঁকা টমেটো।
মাঝে মধ্যে ম্যাসেঞ্জারে বাক্য বিনিময় হয়। অবশ্য ইদানিং যোগাযোগটা আর আগের মত নেই। ফোন করলে এড়িয়ে চলি। কারণ তার আলাপের বিষয় এখন এক গলিতে এসে থমকে গেছে। তার সবকিছুর এখন একটাই গন্তব্য...শেখ হাসিনার অবিস্মরণীয় উন্নয়ন!
নদীতে পদ্মা সেতু... আসমানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট... পানির নীচে টানেল...ঢাকার মধ্যাকাশে মেট্রোরেল... গন্ডায় গন্ডায় উড়াল সড়ক...ছোট ভাইকে না থামালে তালিকা অনেকটা জাপানি বুলেট ট্রেনের মত এগুতে থাকে। শুনতে শুনতে কান ঝালপালা হয়ে যায়। খেই হারিয়ে ফেলি...অনেক সময় ঘুম পায়। তাই ইদানিং আর আগ্রহ দেখাইনা তার যোগাযোগে।
মূলত লন্ডন প্রবাসী থিসিসে ব্যস্ত ছোট ভাইয়ের মত যারা থিসিস লেখেন এবং শেখ হাসিনার দুনিয়া কাঁপানো উন্নয়নে মগজ অবশ করে দিয়েছেন তাদের জন্যে এ লেখাঃ

সময়টা শেখ হাসিনার ভরা যৌবনের। চারদিকে হাতি ঘোড়ার দাপট। পরী মনির পুরুষ ভক্ষণের তালিকাটা লম্বা হতে লম্বা হচ্ছে। টাকলা মুরাদ কোন এক নায়িকা নিয়ে থাইল্যান্ডে মাস্তি করছে। গায়িকা মমতাজ সংসদে বসে গান গাওয়ার পাশাপাশি সাইড বিজনেস হিসাবে বিদ্যুৎ ফেরি করার কথা বলছে...আরও কত কিছু। তেমনি এক সময়ের কথা...

জাহেদ মালেক স্বপন তখন আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মানিকগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য। পিতা কর্নেল মালেক ছিলেন ঢাকা শহরের মেয়র। করতেন এরশাদের জাতীয় পার্টি। সর্বশেষ ২টি জাতীয় নির্বাচনে জনাব স্বপন আসল নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হয়েছেন কিনা তার কোন রেকর্ড নেই। ভুত প্রেতের ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা। দেশ যখন একদল, এক পরিবার তথা একজনের সম্পত্তি হয়ে যায় তখন ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি না। তবে কিছু বিষয় আছে যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রতিটা সচেতন নাগরিকের নাগরিক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে আরও কিছু জানতে চলুন জনাব স্বপনের নির্বাচনী এলাকায় ঢু মেরে আসি।

একই এলাকায় একটি সরকারী ঔষধ কারখানা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এমন একটা কারখানা করবেন তাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কারখানার নির্মাণ কবে নাগাদ শুরু হবে অথবা আদৌ হবে কিনা তার উপর এলাকার জনগণের কোন ধারণা ছিলনা। তবে ধারণাটা মন্ত্রী আগবাড়ায়ে কিছু মানুষকে যে জানিয়ে দেননি তা নয়।
স্টক মার্কেটের পরিভাষায় যাকে বলে ইনসাইডার ট্রেডিং তেমনি একটা কাজ করলেন জনাব স্বপন।

কারখানার জন্যে প্রায় ৩২ একর জায়গা প্রয়োজন।কারখানা কোথায় হবে এ তথ্য মন্ত্রী ছাড়া এলাকার বাকি কারও জানা নেই। মন্ত্রীর মেয়ে সিনথিয়া মালেক এমন এক জায়গার ১২ একর জায়গা ক্রয় করেন যা নিয়ে কোন কন্ট্রোভার্সি তৈরির কোন অবকাশ ছিলনা। তিনি নিজের পকেট হতে খর্চা করে মাটি ভরাট করেন। এবং জমির স্ট্যটাস ভিটি শ্রেণিতে পরিবর্তন করাতে সক্ষম হন। জমি ক্রয়ের ৭ মাস পর প্রকল্প পাস হয়। তার ঠিক ২০ দিন আগে মন্ত্রী তনয়া একই জমি দ্বিগুণ দাম দেখিয়ে স্বামী আলতাফ আকমলকে দান করে দেন।

প্রস্তাবিত ওই স্থানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিডি সান লিমিটেডের নামে কেনা হয় প্রায় ৭ একর জমি। মন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেকের মালিকানাধীন রাহাত রিয়েল এস্টেটের নামে কেনা হয় ৩ একর। অর্থাৎ ৩১ একর জমির মধ্যে ২১ একর জমি মন্ত্রী, তাঁর ছেলে ও মেয়ে কিনে ফেলেন। মন্ত্রীর ফুফাতো মামাত ভাইরা কম যায় কিসে! ফুফাতো ভাই শামিম মিয়ার ভাগ্য দফারফা হয় ৫ একরের কিছু উপরে। জমির উপর মাটি ভরাট, আধা-ভরাট করে শ্রেণি পরিবর্তন করে ৫ গুন দাম দেখিয়ে মেয়ের মত বাকি সবাই ঘনিষ্ঠজনদের দান করে দেন। এসব দান হাজি মোহম্মদ মহসিনের দান-খয়রাত ছিলনা। বরং নিজের নাম পরিষ্কার রেখে মন্ত্রিত্ব চালিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে এসব ছিল আই-ওয়াশ।

এবার আসুন নগদ নারায়ণের দিকটা নিয়ে একটু সময় ব্যায় করি। মন্ত্রী কন্যা সিনথিয়া যে জমি ৭ কোটি টাকায় ক্রয় করেছেন সে জমি সরকার অধিগ্রহণ করতে গেলে ৪০ কোটি টাকা দিতে হবে উনাকে। একই হিসাবে মন্ত্রী পরিবারের বাকি সবাই কামাবে কোটি কোটি টাকা।

প্ল্যান মাফিক এগুচ্ছিল সবকিছু। জমি অধিগ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির পর্যালোচনায় উঠে আসে ভূমি নিয়ে মন্ত্রী পরিবারের জালিয়াতির কথা। কমটির হিসাবে এসব জমি অধিগ্রহণ করলে সরকারের ১০০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে। তাদের প্রস্তাব ছিল, জমির জায়গা পূণঃনির্ধারন করা হোক। প্রস্তাবের মূল উপস্থাপক মানিকগঞ্জের ডিসি।

এবং এখানেই শুরু হয় উন্নতির জাতীয় সংগীত। উন্নয়নের পাশাপাশি চলে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, চলে আসে প্রতিপক্ষের বিএনপি-জামাত কানেকশন। শামিম মিয়ার বড় ভাই মো ইসরাফিল হোসেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান। তিনি মুখে চেতনার খৈ ফুটিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পেশী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডিসির ঘুম হারাম করে ফেলেন।

এবং শেষমেষ মানিকগঞ্জের সেই ডিসি সাহেবকে বদলি করা হয়। ১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকার এই প্রকল্প বিপুল বিক্রমে এগিয়ে চলছছিল। যার ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল জমি অধিগ্রহণের জন্যে। বাকি সমীকরণ আপনারা নিজেরাই মিলিয়ে নিন।

ক্ষমতার মধু অনেকটা গাঞ্জার মত। একবার যে স্বাদ নেয় আজীবন তার দাস হয়ে যায়। সরকার কেন বৈধ একটা নির্বাচনে যেতে ভয় পায় তার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই গাঞ্জার স্বাদ হারানোর ভয়। একজন মন্ত্রীর মেয়ে ৭ কোটি টাকার জমি ক্রয় করার ক্ষমতা রাখে এবং একই জমি ৪০ কোটি টাকায় বিক্রি করে ৩৩ কোটি টাকা পকেটস্থ করার এমন ঐশ্বরিক শক্তির নবুয়ত পৃথিবীর অন্য কোথাও কেউ লাভ করেছে কিনা সন্দেহ আছে!

উন্নয়ন উন্নয়ন উন্নয়ন!!! ১০১ টাকার প্রকল্প ১০০০ টাকা বানিয়ে, ৮৯৯ টাকা গায়েব করার নাম যদি অবিস্মরণীয় উন্নয়ন হয় তাহলে বলতে বাধা নেই পিএইচডি থিসিসের নামে সময় নষ্ট করছে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের ছোট ভাইরা। তাদের উচিত হবে নেংটা বাবার দরবারে নাম লিখিয়ে ওখানে নেংটা হয়ে ক্ষেমটা নাচা!
ওয়াক থু!

ভালো লাগলে শেয়ার করুন