দুই মেরুর দুটি ভিন্ন কাহিনী। সময় ও স্থান প্রায় এক। বাবা দিবসে বাবার প্রতি মেয়ের ভালবাসা, পাশাপাশি আটক হওয়া জনৈক জেনারেলের আদালতে হাজিরা দেয়া। মেগা শহর ঢাকার দুই কোনায় দুই নাটকের এই সাইমাল্টেনিয়াস মঞ্চায়ন। ক্ষমতা থাকলে কাহিনী দুটো সেলুলয়েডের ফিতায় আটকে একই পর্দায় পাশাপাশি একই সাথে উপস্থাপন করতাম। কি-বোর্ডের লেখা ও তার ভিজুয়াল ডিসপ্লে হয়ত সহজ করে দিত আমার বুঝানোর অক্ষমতাকে।
বাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা চিরন্তন। এ ভালবাসা কেবল বাবা দিবসের সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায়না; এর ব্যাপ্তি জলে, স্থলে অন্তরীক্ষে, বিশেষকরে এ দেশের মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। বাবাকে ভালবাসার কথা যারা মুখ খুলে কোন দিন বলতে পারেনি তাদের জন্যে দিনটা বিশেষ একটা সুযোগ। সে সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিলেন দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দী এক কালের জনপ্রিয় বাকের ভাইয়ের কন্যা সুপ্রভা।
বাকের ভাইয়েরও একটা নাম আছে। একটা সময় ছিল হুমায়ুন আহমদের কলমের কালিতে প্রায় কবর হয়েছিল আসাদুজ্জামান নূর নামটা। কখনও আনিস, কখনও বাকের , কখনও আবার রফিক নামে টিভি পর্দার মাধ্যমে তিনি প্রবেশ করেছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। যে নামেই হোক না কেন এ দেশের মানুষ ভালবেসেছিল আসাদুজ্জামান নূরকে। মুখে দাঁড়ি, পরনে পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল, মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন খেটে খাওয়া একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি এই মানুষটাকে ভালবাসতে আমাদের খুব একটা ভাবতে হয়নি।
কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে আসাদুজ্জামান নূর হয়ত ভেবেছিলেন যথেষ্ট করা হয়নি এ দেশের মানুষের জন্যে। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের লিগ্যাসি রেখে যাবেন জনসেবার মাধ্যমে। নাম লেখালেন রাজনীতিতে।
নিজের অভিনয় প্রতিভার প্রতিদান হিসাবে পেয়েছিলেন সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। সুযোগ পেয়েছিলেন পর্দার সজ্জন আনিস সাহেবকে বাস্তব আনিস সাহেবে রূপ দিতে।
তিনি যেদিন আওয়ামী লীগার বনে ক্ষমতার রাজনীতিতে নাম লেখালেন জানতেন কি পর্দার অন্তরালে কি ঘটছে? অবৈধ নির্বাচনের সাংসদ প্লাস মন্ত্রী হওয়াও যে অবৈধ তা জানার জন্যে নাটকের মত স্ক্রিপ্ট লেখার প্রয়োজন ছিল কি?
এবার চলুন সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছেড়ে আদালত পাড়ায় ঘুরে আসি।
ওখানে মঞ্চস্থ হয়েছে আরও এক নাটক যে নাটকের নায়ক ছিলেন এক কালের পাহাড় সমান ক্ষমতাধারী এক জেনারেল।
জেনারেল জিয়াউল আহসান। বাংলাদেশের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হলে এই জেনারেলের নাম লেখা থাকবে হিটলারের গেষ্টাপো বাহিনীর কাতারে। আদালতে সাক্ষী দিতে এসে এই জেনারেলের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েস যে সব তথ্য দিয়েছেন তা কেবল হরর মুভির নৃশংসতম কোন চরিত্রের সাথেই তুলনা করা চলে। ২০১০-২০১৩ সালে কেবল বরগুনাতেই ৫০ জনকে হত্যা করার সাক্ষী হওয়ার তথ্য দিয়েছেন দেহরক্ষী ইমরুল কায়েস। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের মাথায় যম টুপি পরিয়ে গাড়িতে ঘোরাতেন। এবং নির্জন স্থান পেলে গাড়ি থামিয়ে নিজেই মাথায় গুলি করতেন। কখনও বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে সাঙ্গ করতেন ভবলীলা। এভাবে প্রায় ২০০ জনকে খুন করেছেন এই জেনারেল। এসব খুন খুব কাছ হতে প্রত্যক্ষ করার দাবি জানিয়েছেন দেহরক্ষী কায়েস।
আসাদুজ্জামান নূরের কন্যা সুপ্রভা তাসনিন বাবা দিবস উপলক্ষে এক আবেগঘন পোষ্ট দিয়েছেন। গেল দেড় বছর ধরে বাবাকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট অনেকটা হুমায়ুন কায়দায় তুলে ধরেছেন জাতির সামনে। এই পোষ্ট পড়ে অনেকেই কাঁদছেন। এ যেন এইসব দিনরাত্রির লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত ছোট মেয়ে টুনির মারা যাওয়ার কান্নারই পুনরাবৃত্তি। সোশ্যাল মিডিয়াতে হরেক রকম কাহিনী সাজিয়ে সুপ্রভার কান্নার সাথে গলা মিলিয়ে কেঁদেছেন তারা। একজন প্রতিভাবান শিল্পীকে 'বিনা কারণে' জেল-হাজতে আটকে রাখার জন্যে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রতিশোধেরও ডাক দিয়েছেন অনেকে।
জিয়াউল আহসানের ২০০ মানুষ হত্যার সাথে আসাদুজ্জামান নূরের সংশ্লিষ্টতা খুঁজতে গেলে অনেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন আমাকে। করেন অসুবিধা নাই। নিজের সাফাই গাইতে গিয়ে প্রথমেই আমি প্রশ্ন করবো, কেন ও কার জন্যে জিয়াউল আহসান ঘটিয়েছিল এসব হত্যাকাণ্ড?
নূরদের ক্ষমতার ভিত্তি শক্ত ও মসৃণ করার জন্যেই কি নিজ হাতে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এসব খুন করেননি এ জেনারেল? সুপ্রভাদের জীবন ফুলে ফলে ভরিয়ে দেয়ার জন্যেই কি জিয়াউলদের ব্যবহার করেননি শেখ হাসিনা? জিয়াউল আহসানের বস ও শেখ রেহানার ভাশুর জেনারেল তারেক ছিলেন খুনি হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা। অত্যন্ত অর্গেনাইজড এই নেটওয়ার্ক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে একে একে মাটির পৃথিবী হতে বিদায় করেছিল শত শত স্বদেশীকে। আসাদুজ্জামান নূর কি এসব জানতেন না? বাবা যখন মন্ত্রী কন্যা সুপ্রভা কি ভোগ করেননি মন্ত্রিত্বের স্বাদ? প্রিয় বাবাকে কোনদিন কি জিজ্ঞেস করেছিলেন কোত্থেকে আসছে এ আয়েশি জীবন?
জানিনা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কত বয়স ছিল নূর কন্যা সুপ্রভার। বাবার জন্যে আজকের যে আবেগ তার ছিটেফোঁটা থেকে থাকলে হয়ত মনে করতে পারবেন সেদিন বাবার গাড়িতে ঢিল ছুড়েছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির কিছু কর্মী। সে রাতেই নীলফামারী শহরের নির্জন এক ধানক্ষেতে পাওয়া যায় দুইজনের লাশ। ২০১৪ সালের শুরুতে আরও দুইজনকে একই কায়দায় হত্যা করা হয় কেবল গাড়িতে ঢিল মারার অপরাধে। খুন হওয়া এই চারজনও ছিল কোন না কোন মায়ের সন্তান, বোনের ভাই, স্ত্রীর স্বামী, সন্তানের পিতা। ওদের জন্যেও আসে বাবা দিবস। হাজার চাইলেও সন্তান তার বাবাদের দেখতে পায়না। চামড়ার নীচের কুৎসিত মানুষ আসাদুজ্জামান নূর অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খুন করিয়েছিলেন এই চারজনকে।
দেশের শত শত সন্তান আজও বাবার অপেক্ষায় আছে। এমন অনেকে আছে যারা তাদের বাবাকে বুঝ হওয়ার পর কোনদিন দেখেনি। বাবা বলে ডাকতে পারেনি। কারণ শেখ হাসিনা ও জিয়াউল আহসান সিন্ডিকেট তাদের তুলে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে শরীরে পাথর বেধে তলিয়ে দিয়েছিল পদ্মা, মেঘনা যমুনার কোন এক বাঁকে। এসব বাঁকের সন্ধান কেউ কোনদিন পায়নি।
সুপ্রভা তার বাবার জন্যে কাঁদবে তাতে অন্যায় কিছু নেই, কিন্তু তার সাথে দেশের কথিত শিক্ষিতদের কেউ সুর মেলাবে এটা মানতে আমার অসুবিধা। বাস্তবতা হচ্ছে, কন্যা সুপ্রভা চাইলেই বাবাকে দেখতে পারে। তার জন্যে প্রয়োজন কষ্ট করে তাকে জেলখানা পর্যন্ত যাওয়া। নূর গংরা যে সব বাবাদের গুম খুন করেছে তাদের সন্তানরা চাইলেই কি পারবে কাছ হতে বাবাকে দেখতে?
দেশকে হয়ত ক্ষমতার ভাগাড় মনে করেছিলেন অনেকে। ভেবেছিলেন এ ভাগাড় হতে আগামী দশ প্রজন্মের আহার নিশ্চিত করার এটাই শুভ সময়। তাই কেউ ক্রিকেটের মাঠ ফেলে, কেউ গানের মঞ্চ ছেড়ে, কেউ সিনে জগতের লাল নীল বাতি ফেলে রাতারাতি পাড়ি জমিয়েছিল নিজ নিজ লুটের অংশ নিশ্চিত করতে। ভেবেছিল কুকুর হয়ে কামড়ে খাবে, শকুন হয়ে ছোবল মারবে দেশকে।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি এসব উচ্ছিষ্ট খেকো নেড়ি কুকুরদের। জনগণ তাদের সম্পদ রক্ষা করতে রাস্তায় নেমেছিল সময় মত। কুকুরের দল পালিয়েছিল তাড়া খেয়ে। কিছু কুকুর ধরা পরেছিল। আসাদুজ্জামান নূর তেমনি এক কুকুর। সন্তানের আবেগি পোষ্ট দিয়ে বাবা নামের এসব কুলাঙ্গারদের পাপ ঢাকার রাস্তা এখনও মসৃণ হয়নি। যতদিন মসৃণ না হবে সুপ্রভাবের অনুরোধ করবো বাউল আবদুল করিমের এই গানটা শুনতেঃ
... এত স্বাদের পিরিতরে (ক্ষমতা) বন্ধু
নাই রে যার তুলনা...
দারুন বিচ্ছেদের (জেলখানা) জ্বালা
আগেতো জানি নাইরে বন্ধু ...