অখণ্ড ভারত ভাগ হওয়ার পেছনে অনেক কারণ ছিল। এবং তার অন্যতম হচ্ছে ধর্ম। কোন ধর্মের মানুষ বিভক্ত ভারতের কোন অংশে বাস করবে সে ফয়সালা ১৯৪৭ সালেই হয়ে গেছে। বিভক্তি পরবর্তী উপমহাদেশের নাগরিকদের স্বাধীনতা ছিল কে কোথায় বাস করবে। ইতিহাস বলে আমাদের অঞ্চল হতে অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ধর্মীয় আইডেন্টিটিটি ঠিক রাখতে একই ধর্মের সংখ্যাগুরু ল্যান্ডে মাইগ্রেট করেছিল। প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘুদের অনেকে আমাদের অঞ্চলে মাইগ্রেট করেছিল একই কারণে। দুই দেশের দুই ধর্ম বিশ্বাসীরা নিজেদের ভেতর সহায় সম্পত্তি বিনিময় করে পাড়ি জমিয়েছিল নিজেদের নতুন ঠিকানায়। এ সমীকরণ তো অনেক আগেই মেলানো হয়ে গেছে, এত বছর পর নতুন করে এর উত্তর খুঁজে বেড়ানোর কোন বৈধতা আছে বলে মনে হয়না। হ্যাঁ, ভারত ভাগের অন্যতম কারণ ছিল ধর্ম। হিন্দুদের জন্যে হিন্দুস্থান ও মুসলমানদের জন্যে পাকিস্তান। নিজেদের ভেতর ১১০০ মাইল দূরত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। এবং এ যাত্রা শেষ হয়েছিল ১৯৭১'এ।
অধুনা ভারত বিশাল একটা দেশ। ১৪৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশ হিন্দু ধর্মের অভয়ারণ্য। ধর্মের নামে দেশটায় পশু পূজার পাশাপাশি তাদের গো-মূত্র ভক্ষণও ধর্মীয় স্বাধীনতায় নিশ্চিত করা আছে। এ নিয়ে বাইরের কোন দেশের পাঁচালি করার কোন আইনি ভিত্তি নেই। ২০ কোটি মুসলমানও বাস করে ঐ দেশে। এই সংখ্যার বিশাল একটা অংশকে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির ক্রাইটেরিয়া হতে বঞ্চিত করে জোর করে যুক্ত করা হয়েছিল আজকের ভারতের সাথে। অখণ্ড ভারত আমলে ঐ অঞ্চলের মুসলমানদের আলাদা ভূমি ছিল, ছিল ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা। আইন করে সে স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। কয়েক কোটি মুসলমানকে খাঁচায় আটকে রেখে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে বিজাতীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। কাশ্মীরিদের মুক্তির লড়াইকে সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দিয়ে গোটা উপমহাদেশে হিন্দুত্ব-বাদী ভারত চাইছে নতুন এক মানচিত্র আঁকতে।
লং স্টোরি শর্ট, ভারতে মুসলমানরা যেমন সংখ্যালঘু তেমনি আমাদের দেশ হিন্দুরাও সংখ্যালঘু। নাথিং রং উইথ দ্যাট! পৃথিবীর সব দেশে সব কালে সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরু কর্তৃক অবহেলিত, অত্যাচারিত। এ অন্যায় অনেক দেশে দৃশ্যমান, অনেক দেশে চোখে না দেখা গেলেও তা সমাজের সর্বস্তরে অনুভূত হয়। এ বাস্তবতা হতে কোন দেশ ও জাতি মুক্ত না। এ সমীকরণ মেনে নিয়েই মানব সভ্যতা বেড়ে উঠেছে এবং সামনে আরও হাজার বছর বেড়ে উঠবে।
আমি আমেরিকায় থাকি এ আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। আমি এমন একটা দেশে থাকি যে দেশে আমার নিজ ধর্মের নিষিদ্ধ অনেক কিছুই বৈধ। এই যেমন মদ, জুয়া, শুকরের মাংস ইত্যাদি। এসব পছন্দ না হলে আমার সামনে একটাই সমাধান, এ দেশ ত্যাগ করে যে দেশে আমার ধর্মীয় চেতনা লালন পালন করা হয় সেখানে চলে যাওয়া। আমি তা করছিনা এবং করছিনা নিজ পছন্দে। কেউ আমাকে জোর করে এ দেশে ধরে রাখছে না। স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের নামে আমি যদি নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে বিশাল একটা মসজিদ বানিয়ে দিনে পাঁচ বার আজান দেয়ার ব্যবস্থা করি আইনের চোখে তা অবৈধ না হলেও এ দেশের মানুষ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
গাইবান্ধায় ইতিহাসের বিশালতম রাম মূর্তি বানিয়ে তা নিয়ে মার্কেটিং করার ভেতর ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই, আছে ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ড ভারতের গন্ধ। এ গন্ধের 'খুশবো' ছড়িয়েই ভারতের রাষ্ট্রদূত বাবু ত্রিবেদী কিছুদিন আগে এ দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। সীমান্তের ওপারে শুভেন্দু চক্রের ক্ষমতায়ন, ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে হামাসের অবস্থান নিয়ে অনভিপ্রেত মন্তব্য, সবকিছু এক সূতায় গাঁথলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং এ নিয়ে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা যদি এতই নির্যাতিত নিপীড়িত হয়ে থাকে তাহলে চৈতি চৌধুরানীদের উচিৎ হবে এ দেশ ছেড়ে দেয়া। চৌরাস্তার মোড়ে রাম মূর্তি বানানো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সাইনবোর্ড না, বরং এ হচ্ছে সংখ্যালঘু হয়ে দেশটার সংখ্যাগুরুদের সাথে কনফ্রনটেশনের আবহ তৈরি করা। এ আবহে পানি ঘোলা করা গেলে এ পানিতে মাছ শিকারে শিকারি শুভেন্দু বাবুদের আগমন সহজ হবে। সাথে ফিরে আসা সহজ হবে ঐ দেশে পালিয়ে যাওয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বৈরাচার শেখ বংশের সর্বশেষ শেখের।