ছুভেন্দু বাবুর কাঁটাতারের বেড়া ও বদলে যাওয়া বাংলাদেশ...

Submitted by WatchDog on Saturday, June 20, 2026

পশ্চিম বঙ্গের নয়া মুখ্যমন্ত্রী বাবু ছুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের তরফ হতে একটা ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন। যে কাজটা অনেক আগেই বাংলাদেশের করা উচিৎ ছিল সে কাজটা করায় হাত দিতে যাচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিস্তৃতি ৪,০৯০ কিলোমিটার। লম্বা এই সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে দিতে যাচ্ছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। বিজেপির নির্বাচনী ওয়াদার অংশ ছিল এই সীমান্ত বন্ধ। মার্কসবাদ হয়ে মমতা দিদির পুতু পুতু কংগ্রেসকে ক্ষমতা হতে হটানোর অন্যতম অস্ত্র ছিল রাজ্যের সাথে বাংলাদেশ সীমান্ত।

বাংলাদেশ নিয়ে ছুভেন্দু বাবু ও তার কট্টর ধর্মীয় দল বিজেপির অভিযোগের শেষ নেই। অভিযোগের শীর্ষে আছে দেশটায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাইকারি হারে নিধন। এবং এহেন নিধনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিবাদ, প্রতিরোধ না নেয়ায় বাংলাদেশ এ নিধন সরকার চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এমনটাই দাবি ছুভেন্দু বাবু ও তার স্যাঙ্গাতদের। হ্যাঁ, ভুল শুনছেন না, ইন্টেরিমের দেড় বছর বাংলাদেশের কথিত রাজাকার সরকার পরিকল্পিতভাবে হিন্দু গণহত্যা চালিয়েছে এ নিয়ে ওপারের দাদাদের ক্ষোভের অভাব নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের ভোটাররা বিজেপির এ দাওয়াই ভালভাবেই গ্রহণ করেছিল যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বাক্সের ফলাফলে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ দেশটার রাজনৈতিক মঞ্চে অতি জনপ্রিয় একটি ন্যারেটিভ। পশ্চিম বঙ্গের মত প্রতিবেশী আসাম রাজ্যেও একই এজেন্ডায় বিজেপি ক্ষমতায় বসেছে। নির্বাচন-কালীন ওয়াদা পূরণ সব দেশে সব রাজনীতির ম্যাণ্ডেটরি কম্পোনেন্ট। বিজেপি সে পথেই হাঁটতে যাচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসাবে বাংলাদেশ কিছু বলার নেই। পকেটের টাকা খরচ করে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষার জন্যে কাঁটা তারের বেড়া লাগাবে তা একান্তই তাদের ঘরোয়া ব্যাপার, এ নিয়ে আমাদের ত্যানা পেঁচানোর সুযোগ খুবই সীমিত।

সীমান্ত স্থায়ীভাবে আটকানো গেলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কোন দেশের লাভ বেশী আসুন সেদিকটা একটু আলোকপাত করি।
১) সীমান্ত হত্যা।
২০০০ সাল হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে ১,৫০০ বাংলাদেশি খুনের রেকর্ড আছে, যাদের সবাই ছিলে বেসামরিক নাগরিক। বিভিন্ন আযুহাতে ভারতীয়রা এসব হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে যার অন্যতম হচ্ছে অবৈধ গরু পাচার ও ঐ অঞ্চলের কৃষকদের 'অবৈধ' সীমান্ত অতিক্রম। অর্থাৎ ভারত একাই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার মত একটা গণহত্যা চালিয়েছে যার বলি হয়েছে ১৫০০ সাধারণ বাংলাদেশি।
এখানে একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি; অবৈধ পথে গরু আনতে যে সব বাংলাদেশি ভারতে প্রবেশ করে তারা কি দেশটায় ঢুকে জোর করে গরু ছিনিয়ে আনে, নাকি বিনিময় মূল্য পরিশোধ করে গরু ব্যবসা করে? বাজারে চালু আছে সীমান্তের ওপারের কয়েক স্তরের মানুষকে খুশি করেই বাংলাদেশিদের গরু আনত হয়। এই খুশির প্রক্রিয়ায় কেউ যদি অখুশি হয় তারাই নাকি বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীদের খুন করে অথবা করায়। এখানে সাধু শয়তান নামের কোন পক্ষ নাই।
ছুভেন্দু বাবুর কাঁটাতার নিশ্চয় বাংলাদেশিদের ভারতীয় গরু প্রেমের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হব। সীমান্তের এই চোরাচালান বন্ধ হলে বাংলাদেশ কি খুব ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
বাংলাদেশে ১৫ লাখ প্রান্তিক ও ৬ লাখ মৌসুমি খামারি আছে যারা গরুর খামারকে নিজেদের জীবন ধারণের মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশের মৎস্য ও পশু মন্ত্রণালয় বলে থাকে মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্তবে এ চিত্রটা নিশ্চয় ভিন্ন। সীমান্তে গরু চোরাচালান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা গেলে প্রান্তিক খামারিদের সংখ্যা দ্বিগুণ তিনগুণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এমনটাই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বিদেশ হতে গরুর মাংস আমদানিও একটা অপশন হতে পারে। একাজে সহযোগিতার আগাম বার্তা দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। প্রতি কেজি ১২০ টাকায় সরবরাহের নিশ্চয়তা দিচ্ছে বিশ্ববাজারে অন্যতম গরুর মাংস সরবরাহকারী এই দেশ।

২) শাড়ি শিল্পঃ
বাংলাদেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার ৮ কোটি ৩৪ লাখই মহিলা। এই জনসংখ্যার সবাইকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের গ্যারান্টি দেয়া রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দারিদ্র সীমার নীচে বাস করা বাংলাদেশি মহিলাদের যেনতেন ভাবে জীবন যাপনের জন্যে বছরে কম করে হলেও ৩/৪টা শাড়ির দরকার হয়। তাদের সংখ্যা ৬ কোটিতে নামিয়ে আনলে বছরে কম করে হলেও বাংলাদেশে শাড়ির প্রয়োজন ২০ কোটি হতে ২৪ কোটি।
বাংলাদেশের ডাইং ফিনিশিং ব্যবসার প্রায় সব কাঁচামাল আসে ভারত হতে। সাথে আসে ভারি মেশিনারীজ। ভারতের গুজরাট ভিত্তিক এসব কোম্পানির দালালদের খুঁজলে বাংলাদেশের হাটে মাঠে ঘাটে পাওয়া যাবে। সমস্যা কাঁচামাল আমদানিতে না, সমস্যা ফিনিশড প্রোডাক্টে। ঐ দেশের কাঁচামাল, মেশিনারীজ ব্যবহার করে আমরা নিজেরা যে প্রোডাক্ট বানাই তা বাজারজাত করতে গিয়ে দেখা যায় ঐ দেশের ফিনিশড প্রোডাক্টে বাজার সয়লাব। এখানেই মার খায় দেশীয় পণ্য ও এর সাথে জড়িত শিল্প প্রতিষ্ঠান।
ছুভেব্দু বাবুর কাঁটাতার হয়ত আশীর্বাদ হয়ে বাঁচাতে পারে আমাদের ডাইং এন্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চিরদিনের সিল গালা করতে পারলে দেশ গড়ে উঠাতে পারে শত শত নতুন ইন্ডাস্ট্রি। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে এই খাত।

৩) নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি
জন্ম হতে শুনে আসছি ভারত তার চাল, ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ পাঠানো বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ দুদিনেই মরুভূমির হাহাকার দেখা দিবে। এই বাস্তবতা যে কতটা মিথ্যা তা প্রমাণ করে গেছে ইন্টেরিম সরকার। তাদের দেড় বছরে ভারত হতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির কোন কিছুই প্রবেশ করেনি বাংলাদেশে। বাংলাদেশ কি তাহলে ঐ দেড় বছর অর্ধাহারে অনাহারে কাটিয়েছিল? দেশের সাধারণ জনগণ কিন্তু তা বলবেনা বরং আগের তুলনায় কতটা ভাল ছিল তাই বলতে যাবে।
বিশ্ব বাজারে চাল-ডাল-তেল-নুন আর পেঁয়াজ বিক্রেতা যে কেবল ভারত নয় তার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে পেয়ে গেছি। করাচী বন্দর হতে অনেক পণ্য এসেছে বাংলাদেশে। তুরস্ক নিশ্চয়তা দিয়েছিল তাদের সরবরাহের। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্যে ছিল মায়ানমার ও থাইল্যান্ড।

সারমর্ম হচ্ছে, শুভেন্দু বাবুর কাঁটাতারের বেড়া অথবা ইট পাথরের দেয়াল আমাদের জন্যে হতে পারে নতুন শুরু। আমাদের ভারী শিল্পের গোঁড়া পত্তনে আনতে পারে যুগান্তরী পরিবর্তন। দেশে গড়ে উঠতে পারে পোলট্রি শিল্প যা বদলে দিতে গ্রামবাংলার সার্বিক চিত্র। একটা বাস্তবতা আমাদের যেমন মনে রাখা দরকার তেমনি শুভেন্দু বাবুদেরও মনে রাখা জরুরি; বাংলাদেশের বার্ষিক গড় আয় প্রতিবেশী ভারতের চাইতে বেশী। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ বছর ধরে ভারতের ওপরে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ক্ষেত্রে টানা চার বছর ধরে ভারতের চেয়ে এগিয়ে। আইএমএফের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৩ সালে এসে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২১ ডলার। আর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৬১২ ডলার।

বাংলাদেশ তার সার্বিক উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইলে প্রতিবেশী ভারতের সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখাটা খুবই জরুরি। তবে এ সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা আর সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশকে গাজার কায়দায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার হুমকি আর ভাতে-পানিতে মারার কর্মকাণ্ড কোন ভাবেই সুসম্পর্কের সহায়ক না। আমরা বাংলাদেশিরা ভারতের সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হতে বেরিয়ে এসেছি। ঐ সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার সব রাস্তা এখন বন্ধ। এ বাস্তবতা উপলদ্বি করতে ব্যর্থ হলে দেশটার সাথে সম্পর্ক উন্নতি করার কোন চাহিদা ও তাগাদা বাংলাদেশের থাকা উচিৎ হবেনা। বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ রাজনীতি এ পথে এগুবে এবং এ হতে ফেরাতে নতুন কোন স্বৈরাচারের জন্ম দিতে গেলে ভারত আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে বাধ্য। কারণ বদলে গেছে অতীতের বাংলাদেশ।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন