Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

শিল্পখাতের নৈরাজ্য এবং এর ডাল-ভাতীয় বিশ্লেষন

Tongi Clash
দেশের গার্মেন্টস্‌ শিল্প আবারও অস্থির হয়ে উঠছে। জ্বালাও পোড়াও মিছিলে শামিল হচ্ছে নতুন নতুন কারখানা, ধ্বংসের তান্ডবে যোগ দিচ্ছে নতুন নতুন শ্রমিক। সরকার বলছে বিরোধী দলীয় ষড়যন্ত্রের কথা, মালিক পক্ষ বলছে বিদেশী চক্রান্তের কথা, বামপন্থীরা শোনাচ্ছে শ্রম শোষনের মার্ক্সীয় তত্ত্ব। সরকার হটাতে বিরোধী দল আন্দোলনের পথ খুঁজবে এমনটা বুঝতে শার্লক হোমস্‌ হওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রতিদন্ধিতার বাজারে বিদেশীরা চক্রান্ত করবে এটা বাজার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, আর বামপন্থীরা ধ্বংস যজ্ঞে শোষনের মিনার আঁকবে এ চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। এ ফ্যাক্টরগুলোর সাথে পরিচিত না হয়ে উদ্যোক্তরা যদি রপ্তানীমূখী শিল্পে বিনিয়োগ করে থাকেন তা হবে ভূল বিনিয়োগ এবং এখনই ভাল সময় তা গুটিয়ে ফেলার। রপ্তানীমূখী না হোক স্থানীয় বাজার ভিত্তিক শিল্প বিনিয়োগে আমার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে, এ অভিজ্ঞতার আলোকে সমসাময়িক গার্মেন্টস্‌ ক্রাইসিসের একটা ডাল-ভাতীয় বিশ্লেষন করতে চাই। সময় থাকলে আমার সাথে থাকুন।

একটা দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে এর ভারী শিল্পের বিকাশ এবং এই ভারী শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠে অর্থনীতির বাকি ইন্‌ফষ্ট্রাকচার। পোশাক শিল্পের জন্যে প্রয়োজনীয় ভারী শিল্পের অবস্থান আমাদের দেশে এখনও আতুর ঘরের অবস্থানের মত। কাঁচামাল সহ এ শিল্পের সবটাই বিদেশ নির্ভর। এ নির্ভরতা আমাদের পিছনে ঠেলে দেয় প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায়। একটা জিনিষ আমাদের পরিস্কার হওয়া উচিৎ, আমাদের পোশাক শিল্প প্রতিযোগীতার বাজারে টিকে আছে কিসের উপর ভিত্তি করে। বিদেশ হতে মেশিনারীজ এনে সেই মেশিনে আমদানী করা কাঁচামাল এঞ্জিনীয়ারিং করে আমাদের রফতানী করতে হয় আবারও সেই বিদেশে। রহস্যটা কোথায়? যাদের ভারী শিল্প বিকশিত, যাদের কাঁচামালের জন্যে বাইরে চোখ ফেরাতে হয়না তারা কেন পারছেনা আমাদের সাথে? এটা রহস্য নয়, এ প্রশ্নের জবাব খুব সোজা, আমাদের সস্তা শ্রম বাজার। উদ্যোক্তরা এতদিন এই সস্তা শ্রমকে পূঁজি করেই লাভের মুখ দেখছিলেন, বিনিয়োগ নিয়ে টিকে ছিলেন আর্ন্তজাতিক বাজারে। সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে যেন তেন ভাবে বেঁচে থাকার জন্যে মানুষের চাহিদা বাড়ছে, হু হু করে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের মূল্য। স্বভাবতই সন্তূষ্ট রাখা যাচ্ছেনা মাসিক ১০০০-১২০০ টাকার গার্মেন্টস্‌ শ্রমিকদের। মালিকদেরও হাত পা বাধা শ্রমের মূল্য বাড়াতে, কারণ এ ধরনের বৃদ্বি তাদের ছিটকে ফেলবে প্রতিযোগীতা হতে।

আমাদের বিনিয়োগের ভিত্তিতেই থাকে হাজার রকম গলদ। আসুন এই কালো অধ্যায়ের দিকে একটু চোখ ফেরাই। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বাংলাদেশে শিল্প উদ্যোক্তার জন্ম হয়না। আমাদের রাজনীতি itself একটা নষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং এই নষ্টামীর জড়ায়ুতেই জন্ম নেয় বেক্সিমকো গুষ্টির মত শিল্প গুষ্টি। লাখ টাকার জমিকে কোটি টাকা মূল্য দেখিয়ে ব্যাংক হতে ঋণ নেয়া হয় ১০০ কোটি টাকা, এবং এই ঋণ আবেদন এপ্রুভ করার জন্যে থাকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্য্যায়ের রিকমেন্ডেশন। কারণ রাজনৈতিক দল চালাতে সরকারের চাই কোটিপতি কন্ট্রিবিউটর (বিশেষ করে যখন ক্ষমতা হারাবে), দলীয় সরকারের স্বার্থেই গড়ে তোলা হয় সালমান এফ রহমানদের মত শিল্পপতিদের। অসৎ রাজনীতি হতে উঠে আসা ততোধিক অসৎ রাজনীতিবিদ শিল্পখাতে এসে রাতারাতি সৎ বনে যাবে এমনটা আশাকরা হবে চরম বোকামী। বাস্তবেই তারা শিল্পের নামে গড়ে তোলে অসততার সাম্রাজ্য। শুরুটা হয় শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি আমদানী দিয়ে। যাদের ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসের সাথে পরিচয় নেই তাদের একটু নড়ে চড়ে বসার জন্যে অনুরোধ করব! রাজনীতিবিদ কাম শিল্পপতি বিনিয়োগে যাওয়ার আগেই ঠিক করে নেয় নিজ উদ্দেশ্য, সরকার হতে কোটি কোটি ঋণ নিয়ে একটা বিরাট অংশ পাচার করতে হবে বিদেশে, কারণ দেশীয় বিনিয়োগের কোন নিশ্চয়তা নেই। কিভাবে পাচার হবে এত টাকা? বাংলায় একটা কথা আছে, ’চোরে চোরে মাসতুত ভাই’!! বাস্তবেও তাই, আমাদের দেশের মত সব দেশেই রয়ে গেছে অসৎ ব্যবসায়ী। এ ক্ষেত্রে বিদেশী রফাতানীকারকরা এগিয়ে আসে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে। এক হাজার টাকার যন্ত্রপাতির দাম দেখানো হয় এক লাখ টাকা এবং দেশীয় অসততার নেটওয়ার্কে এ ধরনের দাম দেখিয়ে পাঠানো হয় লেটার অব ক্রেডিট (এল/সি)। এই এল/সির মাধ্যমে বৈধভাবে দেশ হতে পাচার হয়ে যায় কয়েক কোটি টাকা যা শেষ পর্য্যন্ত ঠাই নেয় বিদেশী কোন ব্যাংকে। এই অর্থ পাচারে বিদেশী রফাতানীকারকদের স্বার্থ নিয়ে অনেক প্রশ্ন করতে পারেন। উত্তর খুব সোজা, তারা তাদের অবিক্রীত যন্ত্রপাতি রফতানী করতে পারছে নিজ সরকারের বহুবিধ সূবিধা আদায়ের মাধ্যমে। পূঁজির অনেকটাই পাচার হয়ে গেল বিদেশে, বাকি পূঁজি বিনিয়োগ করে শিল্প চালু করতে বাংলাদেশে পেরিয়ে যায় আরও অনেক বছর। এ ফাঁকে নতুন শিল্পপতির রাজনৈতিক দল ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী দলে নাম লেখায়। শুরু হয় নতুন রাজনীতি! নতুন সরকার ঘাপলা খুজতে থাকে প্রতিপক্ষের শিল্প বিনিয়োগে। আইন আদলতে গড়ায় শিল্পের ভাগ্য, পকেট হতে খসতে থাকে নারায়ন বাবাজি। ওদিকে বিরোধী দলে বসা নিজ দলের নেতা-নেত্রীদেরও পেট ভরতে হয় সময় অসময়। হরতাল আর বয়কটের চাকায় চড়ে নিজ দল ক্ষমতায় ফিরে এলে নতুন লোন নিয়ে চালু হয় স্বপ্নের শিল্প। কিন্তূ ততদিনে রুগ্ন হয়ে গেছে শিল্পের গোড়া। লোন ফেরৎ দেয়ার ঘন্টা বাজাতে শুরু করে দেয় ব্যাংক, রফতানী বাজার সংকোচিত হয়ে আসে, দলীয় নেতা এবং ক্যাডারদের চাহিদাও বেড়ে যায় পাল্লা দিয়ে। সাথে যোগ হয় থানা পুলিশ সহ প্রশাষনের দস্যু দল, গ্যাস বিদ্যুৎ এবং পানি লুটেরা দল।

এভাবেই টিকে আছে আমাদের শিল্পখাত। ধুক ধুক করছে মরার আগে। কাকে দায়ী করব এ জন্যে? শিল্প মালিকদের? নষ্ট রাজনীতিকে? শ্রমিকদের? এই দায়ীর জন্যেও ব্যবহার করা হয় নিজ নিজ স্বার্থ; সরকার দায়ী করে বিরোধী দলকে, বিরোধী দল সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে, মালিক গন্ধ পায় বিদেশী ষড়যন্ত্রের, আর লাল ঝান্ডাওয়ালারা দেখে শ্রমের সাথে শ্রমজীবির দ্বন্ধ! এ সবই আসলে ধান্ধাবাজী, স্বার্থ নিয়ে কুকুরে কুকুরে কামড়া কামড়ি। স্বার্থের এই কুটিল বানিজ্যে বলি হচ্ছে কিছু খেটে খাওয়া মানুষ, ধিক!

Comments

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla