Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

ডেটলাইন রামুঃ কালো রাতের কালো বন্যার লাল আগুন

Bangladesh
ঘটে যাওয়া যে কোন ঘটনার শেষ ঠিকানা হয় স্মৃতির আর্কাইভ, হোক তা দীর্ঘশ্বাস অথবা ইতিহাস হয়ে। রামুতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী সেদিকেই এগুচ্ছে ধীরে ধীরে। অবশ্য এ ফাঁকে পানি যতটা ঘোলা করা সম্ভব তার সবটাই করে ফেলেছেন দেশের ’মহামান্য’ রাজনীতিবিদগণ। কালো রাতের কালো বন্যার লাল আগুন নিভে যাওয়ার আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করে বসলেন এ কাজ ’সুপ্রিয়’ বিরোধে দলের। অপরাধ, তদন্ত ও রায় ঘোষনার এমন বিদ্যুৎ গতি বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয়টা খুঁজতে গেলে আমাদের হয়ত ’ওয়ান ম্যান শো’ হীরক রাজ্যের ইতিহাস ঘাটতে হবে। কেবল এমন একটা দেশেই সম্ভব বাংলাদেশের মত ঝড়ো গতির অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণ এবং তার বিচার ও রায় ঘোষনা। মন্ত্রীসভায় স্থান পাওয়া ও তার চীর স্থায়ীত্বের জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সন্তূষ্টিটা আমাদের দেশে খুবই জরুরি। সদ্য নিয়োগ প্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তা ভাল করেই জানেন। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আসনে বসে চুরি আর অপশাসনের আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি পেতে সন্ত্রাসবাদের দ্বিতীয় কোন বিকল্প নেই সরকারের হাতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভেবেছিলেন রামুর ঘটনাকে লাল নীল কাগজে মুড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্যে উপঢৌকন হিসাবে নিউ ইয়র্ক পাঠাবেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাতে জঙ্গিবাদের রং লাগিয়ে পরিবেশন করবেন হিলারী ক্লিনটন সহ উন্নত বিশ্বের অনেকের পাতে। আওয়ামী লীগের বাংলাদেশ এ কাজে কতটা সফল হয়েছে সময়ই তা প্রমাণ করবে। তবে এ মুহূর্তের বাস্তবতা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর পরিবার সহ মন্ত্রীসভার অনেকের অপরাধ শনাক্ত করতে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনের তিন বাঘা রাঘব বোয়াল এখন বাংলাদেশে।

সে রাতে রামুর বৌদ্ধ পল্লীতে কি ঘটেছিল বুঝতে আমাদের কি খুবই অসুবিধা হচ্ছে? ছবি যা বলছে এবং এলাকার আন্ত রাজনৈতিক ভারসাম্যের যে চিত্র ফুটে উঠছে তাতে সহজেই অনুমান করা যায়া সে রাতে রাজনীতি নামের দেশীয় কুলাঙ্গার চালকের আসনে বসা ছিলনা। আওয়ামী, বিএনপি, জামাতি, বামপন্থী আর ডানপন্থী সবাই জোট বেধে মেতে উঠেছিল ধ্বংসের উল্লাসে। যদিও উপলক্ষ ছিল ফেইসবুক ষ্ট্যাটাস আর দূরের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ছায়াছবি, কিন্তু আসল কারণ হিসাবে আমরা যদি আরকান রাজ্যের সাম্প্রতিক মুসলমান নিধনকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাই অন্যায় কিছু হবে বলে মনে হয়না। হিংস্রতার যে বিষাক্ত বীজ জাতির শিরা উপশিরায় বোনা হয়েছে তার দায় দায়িত্ব এককভাবে দাড়িওয়ালা স্বদেশিদের উপর চাপালে তা হবে অন্যায় বিচার। আমাদের এত দ্রুত ভুলে গেলে চলবে না রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নামে খোদ প্রধানমন্ত্রীর লগি-বৈঠার নারকীয় তান্ডব। চুরি আর লুটপাটের পাশাপাশি কথায় কথায় শরীর হতে ধর নামিয়ে ফেলা রাজনীতিতে স্থায়ী সংস্কৃতি হিসাবে ঠাঁই করে নিয়েছে। ক্ষমতার সবোর্চ্চ আসনে বসে ’মহামান্য’ রাজনীতিবিদগণই এর ধারক বাহক হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসাবে পাশাপাশি থাকছে তার আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে পিস্তল আর বন্দুক হাতে পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক পেশী শক্তির ন্যাক্কারজনক ছবি কি তাই প্রমাণ করেনা? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রামুর ঘটনায় পুলিশ ছিল বিপরীত ভূমিকায়। তারা আন্ত রাজনৈতিক জোটের সহিংস ঘটনায় লীগ/দল/শিবিরের ভূমিকা পালন করে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে ধ্বংসযজ্ঞে। সোজা বাংলায়, রামুর ঘটনার পেছনে এলাকার জনসমর্থন ছাড়াও সাথে ছিল সরকারী সমর্থন। প্রশাসন যদি সরকারের অংশ হিসাবে বিবেচিত হয় তাহলে মানতে হবে শেখ হাসিনার সরকার প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল এ কাজে। প্রধানমন্ত্রী যতই গলাবাজী করুন না কেন আর্ন্তজাতিক বাজারে ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিকল্প কোন পুঁজি এ মুহূর্তে সরকারের হাতে নেই, তাই ঘটনা নিয়ে তেজারতির দায় দায়িত্ব চাইলেও তিনি এড়াতে পারবেন না।

বাংলায় একটা কথা আছে, ’গু খায় সব মাছে, বদনাম হয় টাকি মাছের‘। মওদুদ আহমেদ বাংলাদেশের স্বীকৃতি টাকি মাছ। ভদ্রলোকের চুরি চামারির শুরু বাংলাদেশের উষালগ্ন হতে। শেখ মুজিব হয়ে জিয়া, জিয়া হয়ে এরশাদ, এরশাদ হয়ে খালেদা জিয়া, এক কথায় কোন আমলেই বাদ যায়নি এই রাজনীতিবিদের অপকর্ম। রামুর ঘটনা নিয়ে বিরোধী দল যে তদন্ত কমিশন বসিয়েছিল তার নেত্রীত্বেও ছিলেন এই ব্যারিষ্টার। কমিশনের ফলাফল কতটা সত্য নির্ভর আর কতটা পক্ষপাতদুষ্ট তা কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে খোদ পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। মওদুদের মুখ হতে তদন্তের ফলাফল বের হওয়া মাত্র প্রধানমন্ত্রী মুখ খুললেন এবং নতুন করে প্রমাণ করলেন অনেকদিন ধরে তিনি মুখ ও দাতের যত্ন নেন না। সমসাময়িক বিশ্বে এমন অশ্রাব্য মুখের সরকার অথবা রাষ্ট্রপ্রধানের বিকল্প খুঁজতে গেলে আমাদের টেনে আনতে হবে উগান্ডার এককালীন প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনকে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ধরণী হতে চীর বিদায়ের জন্যে প্রধানমন্ত্রী নেংটি বেধে মাঠে নেমেছেন তারই অপরাধ ও বিচার পর্বকে আলোকিত করে মওদুদকে ধরাশায়ী করার চেষ্টা অবশ্যই স্ববিরোধী। প্রধানমন্ত্রীর মত যাদের গোল্ডফিশ মেমোরি তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি বিরোধী আদালতের রায় ছিল অপরাধ প্রতি ১৩ বছরের জেল। এ হিসাবে মওদুদের কত বছর প্রাপ্য তার কিছুটা রূপরেখা পাওয়া গেছে প্রধানমন্ত্রীর খিস্তি হতে। একই সরকার খোদ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিল সর্বসাকুল্যে ১৩টি। বছরের হিসাবে রাজনীতিবিদ নামের এই চর্মহীন সাপের প্রাপ্য ১৬৯ বছর। মওদুদ চোর একাই যে গু খান না তা প্রমাণ করতে বিশ্বব্যাংকের মত আর্ন্তজাতিক সংস্থা লোক পাঠাচ্ছে বাংলাদেশে। বলাই বাহুল্য সত্যের গভীরে ঢুকলে চোরের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী সহ শেখ পরিবারের অনেকের নাম সামনে চলে আসতে বাধ্য। তাই মওদুদ চরিত্র নিয়ে মাতামাতির আগে প্রধানমন্ত্রীর উচিৎ ছিল আয়নায় নিজের চেহারা দেখা এবং ক্ষমতার কোন পানশিতে চড়ে ১৬৯ বছরের ভব দরিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন তার ব্যাখ্যা দেয়া।

পর্যবেক্ষণটা কেবল আমার নিজের না অন্য কেউ একই চোখে দেখতে পান বুঝতে পারিনা। ৭১’সালে রাজাকার আল বদরদের মুখের রব ছিল ’ইসলাম গেল‘। কথিত ধর্ম প্রেমী এসব আজরাইলদের হাতেই নিহত আর ধর্ষিত হয়েছিল লাখো মানুষ। অপরাধ মাত্রার সাথে পাল্লা দিয়ে এসব কুলাঙ্গারদের দল ইসলাম দরদের জারী গানে মুখরিত করেছিল এ দেশের জনপদ। ব্লগীয় স্ফেয়ারে সমসাময়িক দেশপ্রেমের সাথে কোথায় যেন ৭১’এর ইসলাম দরদের সমান্তরাল খুজে পাই। হতে পারে এ আমার বিভ্রান্তি, কিন্তু রেলের কালো বিড়াল, সেতু চুরির পারিবারিক সিন্ডিকেট, ডেসটিনির মহামারী আর হলমার্কের লুটপাট মহোৎসব জোৎস্না প্লাবনের মত যতই আমাদের আলোকিত করছে জপমালা হাতে নিয়ে একদল পোষ্য ততই জপছে দেশপ্রেম তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জপ। বলতে গেলে রাষ্ট্রীয় খাঞ্জাজিখানার পশ্চাৎদেশ উন্মুক্ত করে গণধর্ষণের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত করা হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে। ব্যর্থতার ডায়রিয়া হতে জনগণের চোখ, নাক ও কানের নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্যেই হয়ত ইয়া নফসি ইয়া নফসি কায়দায় নিত্য উচ্চারিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভুগোল আর পৌরনীতি। কিন্তু আমরা যারা পারিবারিক দাসত্বের সদস্য হয়ে ডায়রিয়া পরিষ্কারের কাজে নাম লেখায়নি তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চেতনা ব্যবসা নয়, বরং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান আর স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যু সহ আইনী শাসনের নিশ্চয়তা।

পেরু নামে দক্ষিন আমেরিকার একটা দেশ আছে। একটা সময় ছিল যখন সে দেশে রাজত্ব করত ম্যানুয়েল রুবেন আবেমায়েল গুজমান রেইনেসোর নেত্রীত্ত্বাধীন সাইনিং পাথ গেরিলা দল। শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের নামে হত্যা, খুন সহ দেশের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সহ দৈনন্দিন চাহিদার ভীত উপড়ে ফেলেছিল মাটি হতে। কল্পরাজ্যের ভূতের ভয়ের মত সন্ধ্যা নামতে দেশটার জনগণ ঠাঁই নিত নিরাপদ আশ্রয়ে। ঘোর অমানিশা নেমে এসেছিল দেশের ভাগ্যাকাশে। দরিদ্র, ক্ষুধা আর দুর্নীতির কড়াল থাবায় নিমজ্জিত ছিল মানুষের বেচে থাকা। এমন এক দুঃসময়ে জাতির ত্রাণকর্তা বনে দিগন্ত রেখায় উদয় হন আলবার্তো ফুজিমোরে নামের জাপানি বংশোদ্ভুত এক মানুষ। নির্মম ও কঠিন হস্তে দমন করেন বামপন্থীদের হঠকারী বিল্পব। পাশাপাশি জনগণের জন্যে নিশ্চিত করেন গণতন্ত্র তথা বেচে থাকার নূণ্যতম চাহিদা। অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে পেরুর জনগণ নেতাকে বসিয়ে দেয় সরকার প্রধান পদে। এবং এখানেই শুরু হয় ফুজিমোরের নতুন অধ্যায়। প্রেসিডেন্ট পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ ভেবে নেমে পরেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার ষড়যন্ত্রে। ভ্লাদিমোরো মনতেসিনোসদের মত সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরেন দুর্নীতির মহাসমুদ্রে। সময়মত জেগে উঠে পেরুর জনগণ এবং ফুজিমোরেকে দেখিয়ে দেয় প্রয়োজনীয় রাস্তা। শাস্তি হতে বাঁচার জন্যে পালিয়ে যান পিতৃভূমি জাপানে। সেখানেও জায়গা হয়নি, তাই চলে আসেন পেরুর প্রতিবেশী দেশ চিলিতে। জনগণের চাপে চিলি সরকার ফুজিমোরকে তুলে দেয় পেরুর হাতে। এবং শেষ পর্যন্ত বিচারের সন্মুখীন হয়ে স্থায়ীভাবে ঠাই নেন জেলখানায়। সেখানেই পচে মরছেন বৃদ্ধ এই নেতা। জনগণকে গুজমানের সন্ত্রাস হতে উদ্ধার করে ফুজিমোরে নিজেই বনে যান নতুন গুজমান এবং জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেন জাতির বুকে। লেখকের নিজের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে এন্ডিজের নির্জনতায় হুয়াংকা হুয়াসি নামের এক গুহায় এই নেতার বিলাসিতার ভয়াবহ চিত্র। নিজের দুঃসময়ে তিনি তুলে ধরতেন গুজমানের অন্ধকার হতে পেরুকে মুক্ত করার কাহিনী। কিন্তু এক মুক্তি পর্ব দিয়ে ঢাকতে পারেননি নিজের অপরাধ পর্ব। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকেও বোধহয় ফুজিমোরের সিনড্রোমে পেয়েছে এবং পাকিস্তানীদের বিদায় করে নিজেরাই বসে গেছে টিক্কা খান আর নিয়াজীর আসনে। আর চামড়া বাঁচানোর তাগাদা হতে ঘন ঘন উচ্চারণ করছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্ব। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার কাজে এক ভৌগলিক স্বাধীনতাই যে যথেষ্ট হয়না তার প্রমাণ ইতিহাসে বিরল নয়। চাইলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে পড়াশুনা করতে পারেন।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যে আমাদের যুদ্ধ করতে হয়নি। আমাদের উপর কেউ তা চাপিয়েও দেয়নি। মাঝে পাকিস্তানিরা চেষ্টা করেছিল কিন্তু কাজ হয়নি। জাতীয় জীবনে ধর্মীয় প্রভাবকে স্বীকার করলেও মানুষ হিসাবে আমরা কোন দিনই হিন্দু, মুসলমান অথবা বৌদ্ধ হিসাবে আলাদা করতে শিখিনি। এ আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। জাতি হিসাবে এভাবেই আমরা বেড়ে উঠেছি। রাজনৈতিক সমীকরণ ও তার পঙ্কিলতায় ডুবন্ত কজন বিপদগামীর বিচ্ছিন্ন কার্যকলাপ দিয়ে গোটা জাতিতে বিচার করা হবে ঘোরতর অন্যায়। ভুলে গেলে চলবে না আমরা প্রতিবেশী দেশের নরেন্দ্র মোদি অথবা তামিল টাইগার নই যে রাষ্ট্রীয় স্পনসরে সংখ্যালঘু নিধনে অভ্যস্ত। রামুতে যা হয়েছে তা বিচ্ছিন্ন, রুগ্ণ ও অসুস্থ রাজনীতির ফসল। সময়মত এ অপরাজনীতি হতে দেশকে মুক্ত না করা গেলে কেবল রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ই নয় বরং গোটা জাতিকেই গুনতে হবে চড়া মাশুল।

Comments

প্রক্টরের ঘুষি...

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় নিন্দা-প্রতিবাদপ্রক্টরের আগে কর্মচারীর ঘুষি নিয়ামুল কবীর সজল,

ময়মনসিংহশুধু প্রক্টর ড. এম এ সালাম নন, আরেকজন কর্মচারীও গত ৯ অক্টোবর আন্দোলনকারী ওই ছাত্রীকে সজোরে ঘুষি মারেন। কালের কণ্ঠের কাছে এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। সেই কর্মচারীর নাম মো. মাসাদুল হাসান বলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। মাসাদুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখায় কর্মরত।
তবে মাসাদুল হাসান দাবি করেছেন, তিনি ঘটনার সময় তাঁর অফিসে ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলেও নিজের পরিচয় দেন।
গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রীকে প্রক্টর সালামের ঘুষি মারার ছবি ছাপা হয়। একই সঙ্গে মার খাওয়া শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের খবরও প্রকাশিত হয়। প্রক্টরের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছনার এই ছবি দেখে নিন্দা ও প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিভিন্ন মহল। তাদের বক্তব্য- 'বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কিভাবে একজন ছাত্রীকে ঘুষি মারতে পারেন? এঁরা কি শিক্ষক, নাকি অন্য কিছু! এঁদের কাছে আমাদের ছেলেমেয়েরা কী শিখবে!'
শুধু সমালোচনা নয়, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ময়মনসিংহ শহরে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ওই দিন (৯ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। ওই সময় সেখানে নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশ উপস্থিত ছিল। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক ভবনে আসেন। তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রক্টর ড. সালাম এবং আরো কয়েকজন শিক্ষক। এ ছাড়া কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীও ছিলেন সেখানে। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এরই মধ্যে একজন শিক্ষক ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন। এর পরই সেখানে চলে তাণ্ডব।
সেই সময়ের তোলা একটি ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, হইহল্লা ও মারপিটের সময় আন্দোলনকারী এক ছাত্রীকে পেছন থেকে সজোরে ঘুষি মারেন একজন কর্মচারী। ঘুষিটি মেরেই ওই কর্মচারী কেটে পড়েন। তখন ওই ছাত্রীর সামনে ছিলেন প্রক্টর। কর্মচারীর ঘুষির পরপরই সামনে থেকে ওই ছাত্রীকে আবার ঘুষি মারেন প্রক্টর। মেয়েটিকে যে বিনা কারণে প্রক্টর ঘুষ মারছেন, তা ওই ভিডিওচিত্রটি দেখলেই বোঝা যায়।
ওই ঘটনায় মঙ্গলবার প্রক্টর বলেছেন, তিনি ছাত্রীটিকে ঘুষি মারেননি; বরং মারামারি ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছেন।
বিভিন্ন মহলের নিন্দা-প্রতিবাদ: জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনিরা বেগম অনু কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা কি সভ্য আচরণ ভুলে গেছি! আমাদের শিক্ষকদের নৈতিকতার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। একজন ছাত্রীকে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষি মারা কোনোভাবেই মানা যায় না। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই।'
জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, একজন ছাত্রীকে একজন পুরুষ শিক্ষক কোনো যুক্তিতেই এভাবে প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা করতে পারেন না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। শিক্ষকদের সম্মানেরও হানি হয়েছে।
এদিকে পুরো বিষয়টি নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়ে এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে গতকাল বিকেলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ময়মনসিংহ জেলা শাখা কার্যালয়ে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নারী সংগঠন যৌথ মতবিনিময় সভা করে। সভায় বক্তারা বলেন, এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনের কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়।
জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মিল্লাত বলেন, প্রতিবাদ হয় না বলেই এসব শিক্ষক নিজেদের অনেক কিছু মনে করেন। কিন্তু ময়মনসিংহবাসী বিষয়টিকে সহজে ছেমড় দেবে না। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় শহরের প্রধান সড়কের ফিরোজ-জাহাঙ্গীর সড়কে মানববন্ধন করা হবে বলে তিনি জানান।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য শওকত মোমেন শাহজাহান এমপি বলেন, বহিষ্কারের খবর তিনি জানেন। পুরো ঘটনাটির খোঁজখবরই তিনি নিচ্ছেন। এর পরই আসলে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করা যাবে। তবে সিন্ডিকেট সব ঘটনাই খতিয়ে দেখবে বলে তিনি জানান।
উপাচার্য ড. মো. রফিকুল হক বলেন, যেসব বিষয় পত্রিকায় আসছে, তা সত্য নয়। এসব সংবাদ একপেশে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, একদিন সত্য প্রকাশ পাবে।
উপাচার্য বলেন, তিনি কোনো শিক্ষার্থীরই অমঙ্গল চান না। ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বহাল রাখার ব্যাপারে তিনি কতটুকু ভূমিকা রাখছেন, তা সবাই জানে।

গবেষণা প্রতিবেদন ১৪৯ সাংসদের ৯৭ শতাংশ নেতিবাচক কাজে জড়িত!

জাতীয় সংসদের ১৪৯ জন সাংসদের ৯৭ শতাংশ নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত। এই সাংসদেরা নিজস্ব পদকে টাকা আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন।
দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে ওই ১৪৯ জন সাংসদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এই সাংসদের কারও বক্তব্যও প্রতিবেদনের জন্য নেওয়া হয়নি।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল রোববার টিআইবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। নবম জাতীয় সংসদের সদস্যদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভূমিকা পর্যালোচনা শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান ও নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাংসদদের নেতিবাচক কাজের মধ্যে রয়েছে—প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার, হত্যা, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, প্রতারণা, সরকারি কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করা, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্লট বরাদ্দ পাওয়া ইত্যাদি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংসদদের কাজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা, সংসদ এবং সংসদের বাইরে সাংসদদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কাজের পর্যালোচনার জন্য এই গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণার ১৪৯ জন সাংসদকে নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ১৩৬ এবং বিরোধী দলের ১৩ জন। এঁদের নিয়ে সাতটি বিভাগের ৪২টি জেলায় ৪৪টি দল গঠন করে আলোচনা করা হয়। শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও অন্যান্য পেশার মোট ৬০০ জন্য ব্যক্তি আলোচনায় অংশ নেন। তবে কী প্রক্রিয়ায় এই ৬০০ লোক নির্বাচন করা হয়, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
প্রতিবেদন সম্পর্কে ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৬০০ জন পেশাজীবীর প্রত্যক্ষ আলোচনায় ১৪৯ জন সাংসদের নাম এসেছে। যে কারণে এই প্রতিবেদন সবার জন্য প্রযোজ্য হবে না। তাই এটিকে খণ্ডিত চিত্র বলতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, ৩০০ জন সাংসদের ওপর এ গবেষণা করতে পারলে ভালো হতো। সময়ের অভাবে তা করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে ১৪৯ জন সাংসদের নাম উল্লেখ না করা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবির নীতিমালায় অনুমোদন করে না বলে ১৪৯ জন সাংসদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মূলত ৬০০ ব্যক্তির অংশগ্রহণমূলক আলোচনা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে টিআইবি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেছে। তাই প্রতিবেদনটিকে ধারণাভিত্তিক বলা যাবে না।
গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্যের উৎস: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গবেষণা প্রাথমিক ও পরোক্ষ তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। এতে টিআইবির ‘পার্লামেন্টারি ওয়াচ’ গবেষণা থেকে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। পরোক্ষ উৎস হিসেবে সংবিধান, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি, আইন ও বিধি, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রবন্ধ, অনলাইন ও পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।
তথ্যের প্রত্যক্ষ উৎস হিসেবে সাতটি বিভাগের ৪২টি জেলায় দলনিরপেক্ষ সচেতন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে ৪৪টি দল গঠন করে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ৬০০ ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক তথ্য ও মতামত গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নেওয়া হয়।
নেতিবাচক দিক: আলোচিত সাংসদদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ২৭ জন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী, সাতজন নারী সদস্য এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যও আছেন।
অভিযোগের ধরন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচিত সাংসদদের ৮১ দশমিক ৮ শতাংশ প্রশাসনিক কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বদলি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন। এসব সাংসদের বিরুদ্ধে খুব কম ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও সাংসদেরা পাল্টা মামলা করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংসদদের চাপে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে।
উল্লিখিত সাংসদদের ৭৬ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিটি নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের সদস্য নির্বাচন, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ, অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়া, কমিশনের বিনিময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বরাদ্দের অপব্যবহার ইত্যাদি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এসব অনিয়মের ঘটনায় সাংসদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
১৪৯ সাংসদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে স্থানীয় উন্নয়নকাজে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুবিধা নেওয়া, নিজস্ব কর্মীদের সুবিধা দেওয়া, ভুয়া প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ নেওয়া, টিআর ও কাবিখা বিতরণে অনিয়ম ইত্যাদি আছে। এসব সাংসদের মধ্যে ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ অনুমোদন দিতে গিয়ে কমপক্ষে ৫ শতাংশ হারে কমিশন আদায় করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি কমিশনের বিনিময়ে দলীয় কর্মীদের কাজ না দিয়ে অন্য দলের কর্মীদের দেওয়া হয়।
এই সাংসদদের ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ হত্যা, খাসজমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এঁদের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ সাংসদ নিজেরাই বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এসব সাংসদের মধ্যে মাত্র ২৪ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংসদের প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট থানা মামলা গ্রহণ করেনি।
সাংসদদের ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ জেলা পর্যায়ের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এঁদের মধ্যে ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ সাংসদ নিজের, কিংবা আত্মীয়স্বজনের কিংবা অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাঁরা দরপত্র কিনতে বা জমা দিতে বাধা দেওয়া, সমঝোতার মাধ্যমে কাজ বণ্টনের সঙ্গে জড়িত। ৬২ দশমিক ২ শতাংশ সাংসদ নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন এবং ৮ দশমিক ৪ শতাংশ সাংসদ মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার সঙ্গে জড়িত।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সাংসদ আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘টিআইবির এই প্রতিবেদন উদ্দেশ্যমূলক। যে পদ্ধতিতে তারা সাংসদদের অভিযুক্ত করেছে, তা বিজ্ঞানসম্মত কোনো মানদণ্ড হতে পারে না। তারা কেন ৩৪৫ জন সাংসদের ওপর জরিপ করেনি? বাকি সাংসদদের ওপর জরিপ চালালে নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক কাজের পরিমাণ আরও বাড়ত। কেন ৬০০-এর জায়গায় ছয় হাজার লোকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি? টিআইবি নিজেদের ইচ্ছেমতো ধারণাভিত্তিক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সুতরাং এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’
তবে ভিন্নমত পোষণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাংসদ মওদুদ আহমদ বলেন, ‘টিআইবি যেসব অভিযোগ তুলেছে, তা সরকারি দলের জন্য প্রযোজ্য। বিরোধী দলের দু-চারজন থাকলেও তা আমলযোগ্য হবে না। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। কারণ, আমরা ক্ষমতায় নেই। যা বলার সরকারি দল বলবে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, সংসদ ও সংসদ সদস্যদের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করার জন্য টিআইবি এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সাংসদদের কেউ কেউ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। কিন্তু টিআইবি যে অভিযোগ করেছে, তা ঢালাও। এটা কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইতিবাচক দিক: প্রতিবেদনে সাংসদদের ইতিবাচক দিকও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৪৯ জন সাংসদের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না-কোনোভাবে ইতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ১৯ জন, ছয়জন নারী সাংসদ এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যও আছেন। বলা হয়েছে, ৩৫ শতাংশ সাংসদ অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি বরাদ্দ, অনুদান বরাদ্দ, বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণ, চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করার কাজে ভূমিকা রেখেছেন। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ সাংসদ রাস্তা ও সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ সাংসদ উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যু নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা দূর, নদীভাঙন রোধ, পাটকল চালু করা ইত্যাদিতে ভূমিকা রেখেছেন। ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ সাংসদ পরিবেশ রক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছেন। বিরোধী দলের ১৩ জনের মধ্যে আটজনের কোনো ইতিবাচক কাজ দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সাংসদদের বেশির ভাগের কাজে এলাকার মানুষ সন্তুষ্ট নয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিরোধী দলের সদস্যরা পিছিয়ে। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা এলাকায় সময় দেন বেশি।
১০ সুপারিশ: টিআইবির সুপারিশে বলা হয়েছে, সাংসদদের স্থানীয় প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের ভূমিকা থেকে সরিয়ে আনতে হবে, যাতে তাঁরা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সংসদে তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ কমিয়ে ৩০ দিন করতে হবে। বিরোধী দলের কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ করতে হবে। সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসহ অন্তত ৫০ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করতে হবে। সংবিধানের ৭০ ধারা সংশোধন করে অনাস্থা প্রস্তাব, বাজেট এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু বিষয় ছাড়া বাকি বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
সমস্যার কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংসদেরা সদস্যপদকে টাকা আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। দলীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অনুপস্থিতি এবং নেতিবাচক কাজে জড়িত সাংসদদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে ‘শাস্তি না হওয়ার সংস্কৃতি’ বিকশিত হয়েছে। টিআইবি নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে সাংসদদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংসদে ‘আচরণবিধি বিল’ পাসেরও সুপারিশ করেছে।
অনুষ্ঠানে টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হওয়া সাংসদদের কাজ নয়। তাঁদের দায়িত্ব আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা। তাঁদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে নির্বাহী বিভাগ। কিন্তু তাঁরা যদি নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন, তখন আর কারোরই জবাবদিহি থাকে না। সে জন্যই দুর্নীতি হয়।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, বিশ্বের কোথাও সংসদ বর্জনের ইতিহাস নেই। কেবল বাংলাদেশেই এটা সম্ভব। সাংসদেরা সংসদ বর্জন করলে এলাকার মানুষ বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের সুপারিশ হলো, যাঁরা সংসদ বর্জন করবেন, তাঁদের বেতন-ভাতা কেটে নেওয়া উচিত।’
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-10-15/news/298121

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla