Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

গোলাম মাওলা রনী, পদ্মাসেতুর আবুল হোসেন ও একদল কুন্তা কিন্তে

Chattro League

ঘটনা দুটো নিয়ে আগেও হয়ত লেখালেখি করেছি। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না কোথায় এবং কবে। যেহেতু লেখার পরিসর ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ তাই ধরে নিচ্ছি হবে হয়ত কোন এক ব্লগে। নিয়মিত পাঠকদের মনে থাকার কথা। সে যাই হোক, অনিচ্ছা সত্ত্বে আবারও টানতে হচ্ছে প্রসঙ্গ দুটো। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং অত্যন্ত সময়যোগী। আওয়ামী লীগের এমপি গোলাম মাওলা রনির জন্য আমার বিশেষ কোন অনুভূতি নেই। কারণ তিনিও আওয়ামী লীগার এবং দেশজুড়ে আওয়ামী তান্ডবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস একটা সময় আসবে যখন বহুল ব্যবহত ’তুই রাজাকার’ বাক্য আওয়ামী লীগকেও ধাওয়া করবে এবং রাজাকার শব্দকে প্রতিস্থাপন করবে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ ’তুই আওয়ামী লীগ’ বাক্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে একজন লীগারের পরিচয়। এ পরিচয় হতে জনাব রনি রেহাই পাবেন এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। কথায় বলে আম বাগানে একটা দুইটা কাঁঠাল গাছ বাগানটার পরিচয় বদলে দেয় না। আমবাগান আমবাগান-ই থেকে যায়। এখানে প্রশ্ন উঠবে জনাব রনি কি তাহলে আওয়ামী বাগানে অন্য কোন ফুল? গোবরে পদ্মফুল? এসব বিচারের সময় এখনো আসেনি। এই সাংসদকে নিয়ে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নতুন একটা সিরিয়াল নাটক ইন্ট্রোডিউস করা হয়েছে। আমার মত আমজনতার কাছে এ নাটকের গ্রহণযোগ্যতা শ্রেফ আওয়ামী নাটক হিসাবেই। গেল সাড়ে চার বছরে এসব দেখতে দেখতে আমার মত অনেকেই এখন an expert headmaster বনে গেছে। রনি উপাখ্যান নিয়ে আলোচনা মানে আবারো আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া এবং দলের এক নাম্বার হতে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের বঙ্গবন্ধু ’চেতনা’ বাস্তবায়নের ফিরিস্তি দেয়া। পদ্মাসেতুর খলনায়ক আবুল হোসেনের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার অধ্যায় দিয়ে রনি অধ্যায়ের শুরু। প্রধানমন্ত্রী উনার কোন এক বিদেশ সফরে সঙ্গী বানিয়ে ছিলেন সাংসদ আবুল হোসেনকে। সাথে ছিল উজির নাজির কোতয়ালের বিশাল এক বহর। জনাব রনিকে প্রধানমন্ত্রী কোন দুঃখে সাথে নিয়েছিলেন তা কেবল তিনিই বলতে পারবেন। তবে এ বদান্যতা যে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

পাঠকদের কি মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক আলেক্স হেইলির ’রুটস’ উপন্যাসের কথা মনে আছে? যাদের উপন্যাসটা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি অনুরোধ করবো এর উপর নির্মিত টিভি সিরিজটা দেখে নিতে। সাদা আমেরিকায় কালো আফ্রিকানদের আগমন এবং তাদের কৃতদাস জীবন নিয়ে এর চাইতে ভাল কোন বই অথবা টেলে নভেলা নির্মিত হয়েছে কিনা বলতে পারবো না। চীন দেশ হতে কৃতদাস ধরে আনার সফর ছিলনা সেটা। চীন দেশ আফ্রিকার গাম্বিয়া অথবা মোজাম্বিক নয় যেখান হতে ভাগ্যহতদের ধরে আনা যাবে। রুটস উপন্যাসের কুন্তা কিন্তে চরিত্রের মতই ছিল আবুল, রনিদের চরিত্র। অধিকন্তু অনেকটা গোপাল ভাড় বানিয়ে এদের নিয়ে চীন দেশে গিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। দিনান্তে ক্লান্তি মুছে ফেলার অংশ হিসাবে ভাঁড়দের নিয়ে আসর জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই মাথায় আসে বুদ্ধিটা। আবুল সহ কয়েকজন ভাঁড়কে ডেকে বললেন, তোমরা দৌড়াও। এবং এ দৌড়ে যে জয়ী হবে তাকেই মন্ত্রী বানানো হবে। গোলাম মাওলা রনীর মতে সে দৌড়ে জয়ী হয়েই কালকিনীর আবুল হোসেন মন্ত্রিত্ব লাভ করেছিল। রনির এহেন বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরকার প্রধানের দপ্তর হতে জোড়ালো কোন প্রতিবাদ জানানো হয়নি। স্বভাবতই ধরে নিতে পারি ঘটনা সত্য। তবে আবুল হোসেনের মন্ত্রিত্ব এবং পরবর্তীতে দেশপ্রেমিক খেতাব পাওয়ার আরও একটা কারণ বাজারে ভেসে বেড়ায়। কথিত আছে সময়টা তখন শেখ পরিবারের জন্য ভাল সময় নয়। মুজিব সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে কেবল। দৈবক্রমে বেচে যাওয়া দুই বোনের অবস্থা তথৈবচঃ। বিশেষ করে আর্থিক দিক হতে। এমন দুঃসময়ে মরার উপর খাড়ার গায়ের মত দেখা দেয় রেহানার স্বামী জনাব সিদ্দিকের ব্রেন টিউমার। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। অনেকের দুয়ারে ধর্না দিয়েও কাজ হয়নি। ঠিক এমন একটা অনিশ্চিত সময় এগিয়ে আসেন মাদারীপুরের সৈয়দ আবুল হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী। অর্থকড়ি দিয়ে ব্রুনাইয়ের রাজধানী বন্দর সেরি বেগওয়ানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এবং সেখানেই সরানো হয় টিউমার। এর পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি সৈয়দ সাহেবেকে। বলা হয় জনাব আবুল হোসেন এ যাত্রায় নগদ ৬০ কোটি টাকা দিয়ে ক্রয় করেছিলেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বড় বোনের মন্ত্রীসভায় ছোট বোনের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। হতে পারে সবটাই গসিপ, ভূয়া। কিন্তু পদ্মাসেতু নিয়ে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে যা ঘটে গেল তার প্রেক্ষাপটে আবুল হোসেনের ’দেশপ্রেমিক’ খেতাব প্রাপ্তি কিছুটা হলেও গসিপের পক্ষে সাফাই গায়। পারিবারিক দুধকলা কেবল এক বোন ভোগ করবে আর বাকি জন আঙ্গুল চুষবে, এর নাম সুবিচার নয়। ক্ষমতা ভাগবাটোয়ারার সমীকরণ মেলাতেই নাকি আবুল হোসেনকে মন্ত্রীসভায় অর্ন্তভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন সরকার প্রধান। একই কারণে বিদায়ও করতে পারেন নি যখন প্রয়োজন ছিল।

যাই হোক, ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে। সরকারী দলের সাংসদ জনাব রনি আবুল প্রসঙ্গে টকশো’তে খোলামেলা কথা বলার কারণেই সরকার প্রধানের রোষানলে পরেন। ব্লগ, ফেইস-বুক এবং টকশো’তে অতিকথনের কিছু দিনের ভেতর জনাব রনি বুঝে যান দ্বিতীয় যাত্রায় সাংসদ বনার সম্ভাবনা একেবারেই উবে গেছে। হয়ত তা বুঝেই বাড়িয়ে দেন আওয়ামী অন্তর্বাস ও এর নোংরা লন্ড্রি নিয়ে কথা বলার মাত্রা।

আমার সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনের ফাঁকে কটা বছর দেশে কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। এ সময়টা দেশে অতিবাহিত না করলে হয়ত দেশকে ভাল করে চেনা হতনা। হয়ত অনেকের মত প্রবাসে আমিও দেশপ্রেমের সস্তা কীর্তন গেয়ে কাটিয়ে দিতাম বাকি জীবন। তো শীতের চমৎকার এক সকালে হাতে দৈনিক একটা পত্রিকা নিয়ে আঙ্গিনায় বসে রোদ পোহাচ্ছি। এমন সময় আমার ছোট ভাই এসে জানালো স্থানীয় সাংবাদিক সমিতির মাননীয় সভাপতি আমার সাথে দেখা করবেন। স্যারের দেখা মেলতে একটু অবাক হয়ে গেলাম। একই স্কুলের ছাত্র আমরা। আমার এক ক্লাশ সিনিয়র। ও প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই তুলে ধরলেন ’সমস্যা’টা। কদিন আগে আমরা যে সম্পত্তিটা ক্রয় করে দলিল করেছি তাতে দেখানো ক্রয় মূল্যটা নাকি সত্য নয়। সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দিতেই নাকি আমরা অসততার আশ্রয় নিয়েছি। একজন সাংবাদিক হিসাবে এতবড় একটা জালিয়াতির খবর জনসন্মুখে তুলে ধরা নাকি সাংবাদিকদের ধর্ম। ঘটনা সত্য। কর ফাঁকি দেয়ার জন্য এমনটা করা হয়েছিল। এবং তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন খোদ সাব-রেজিষ্ট্রার সাহেবের দালাল। কথা বেশিদূর গড়ালো না। নগদ পনের হাজার টাকায় ফয়সালা হোল। দাবি ছিল এক লাখের। তারও কিছুদিন আগের ঘটনা। আমাদের প্রতিবেশী হক সাহেব। বয়স প্রায় সত্তুর। কাজকর্ম বলতে বিশেষ কিছু করেন না। দিনরাত ছেলের নার্সারিতে পরে থাকেন। খুব সুন্দর একটা নার্সারি। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি। এক সকালের ঘটনা। প্রতিদিনের মত আজও শুয়ে আছেন নার্সারির ছোট ঘরটায়। অতি সন্তর্পণে ঘরে প্রবেশ করলো বাড়ির যুবতি কাজের বুয়া। অর্ধনগ্ন হয়ে শুয়ে পরলো হক সাহেবের পাশে। ক্যামেরার ফ্লাশ লাইটের আলোতে ঝলসে গেল হক সাহেবের চোখ। চোখ মেলতেই দেখেন এলাহি কারবার। অর্ধনগ্ন যুবতী মহিলা ও ক্যামেরা হাতে একজন সাংবাদিক। এভাবেই শুরু ব্ল্যাক মেইলিং পর্ব। দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করায় বহুল প্রচারিত একটা সাপ্তাহিকীতে রসালো ভাবে তুলে ধরা হয় হক সাহেবের কথিত অন্ধকার জীবন।

মফস্বলে যারা সাংবাদিকতা করেন তাদের মাসিক আয়-রোজগার কত? ব্যাপারটার উপর একটু হাল্কা গবেষণা চালাতে হয়েছিল অন্য কারণে। যৎসামান্য বেতনের একজন সাংবাদিক কি করে আলিশান জীবন যাপন করেন তা ঘাটতে গিয়ে বের হয়ে আসে সাংবাদিকতার কালো অধ্যায়। থানা-পুলিশ, রেজিস্ট্রি অফিস, এসপি, ডিসি, হাসপাতালের ডাক্তার, পৌরসভায় চেয়ারম্যান, কমিশনার, এমপি সহ প্রশাসনের সবাই রসুনের কোয়ার মত এক পশ্চাৎদেশে জড়িত। ওরা ভাগাভাগি করে জীবন কাটায়। শিকার থানায় ধরা পরলে স্বার্থ উদ্ধারের পর তা তুলে দেয় সাংবাদিকদের হাতে। তারপর পর্যায়ক্রমে বাকি সবার টেবিলে। এ যেন পালাক্রমে গণধর্ষণ। সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলার জন্য দলীয় সাংসদকে আওয়ামী লীগ গ্রেফতার করেছে। এ নিয়ে দলকানা জলদাসদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। সাংবাদিকতা নাকি পবিত্র পেশা। তাই এ পেশার ফেরেশতাদের গায়ে হাত দেওয়া মানে ন্যায় বিচারের আরশ কাঁপিয়ে দেয়া। আসলেই কি তাই? জনাব রনি নিজ নেত্রীর রোষানলে পরেছেন, তাই জেল খাটছেন। বাকি সব ভূয়া। সাংবাদিকরা এ দেশেরই সন্তান, এবং রাজনৈতিক মাফিয়া চক্রের সক্রিয় সদস্য। উপরের দুটো উদাহরণ কেবল আমার নিজ শহরের নয়। খবরের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা খবর বের করে দেখুন। কেবল তখনই দেখতে পাবেন সাংবাদিকতার মুখোশধারী সাংবাদিকদের বহুমুখী জীবন। এবং এ জীবন তারেক, মিল্কি ও কালা জাহাঙ্গীরদের জীবন হতে খুব একটা আলাদা নয়।

Comments

উইং কমান্ডার (অব.) সালাউদ্দিনের বর্ণনায় ১/১১ ও বিডিআর বিদ্রোহ

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সালাউদ্দিন চৌধুরী নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত ‘ঠিকানা’কে দেয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাত্কারে ১/১১ ও বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে নানা অজানা তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তত্কালীন সেনাপ্রধান জে. মইন ইউ আহমেদ পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জে. পারভেজ মোশাররফের মতো বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। সাক্ষাত্কারে বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজমের সহকারী একান্ত সচিব অবসরপ্রাপ্ত এই উইং কমান্ডার আরও বলেছেন, ‘আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সম্প্রতি ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আমেরিকায় এসেছি। আমি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছি। পিলখানার ঘটনার পর আমি ২০০৯ সালের জুনে আবেদন করেছিলাম। পিলখানায় আমাদের এতগুলো অফিসারকে অসহায়ের মতো মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি, কেউ তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। আমি তো ঘটনাটা দেখেছি, মনিটর করেছি কীভাবে তিলে তিলে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। চাকরিতে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল ছিলাম এবং আবেদনের আড়াই বছর পর আমি অবসরে যেতে পেরেছি।’ নিউইয়র্কে বসবাসরত উইং কমান্ডার সালাউদ্দিন চৌধুরীর সাক্ষাত্কারটির উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো :
ঠিকানা : সাভারের রানা প্লাজার ঘটনায় রেশমার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
সালাউদ্দিন চৌধুরী : রেশমার ঘটনাটি পুরোটাই ধোঁকাবাজি। লন্ডনের মিরর এবং দেশের কিছু পত্রিকা রেশমার ঘটনাটিকে যে সাজানো নাটক বলেছে, এটা সত্য। সাভারের রানা প্লাজায় যেদিন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, সেদিনই রেশমাকে উদ্ধার করা হয়। তাকে নিয়ে তো নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ১৭ দিন পর তার উদ্ধার, তার পোশাক এবং অন্যান্য বিষয় সন্দেহমুক্ত নয়। এখন আরও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে সরকার। আর সেগুলো হচ্ছে, রেশমাকে কেন চারটি সিকিউরিটি দেয়া হয়েছে? সাংবাদিকদের সঙ্গে কেন কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না? তাকে কেন ওয়েস্টিন হোটেলে জব দেয়া হয়েছে?
ঠিকানা : ১/১১ ঘটনার কারণটা কী ছিল?
সালাউদ্দিন : বিগত বিএনপি সরকারের কিছু ভুলভ্রান্তি হয়তো ছিল। সেই ভুলভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে তত্কালীন সেনাপ্রধান তার উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন চরিতার্থ করার চেষ্টা করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করল, তার আগে থেকেই আমাদের দেশের সুশীল সমাজের কিছু সদস্য এবং কিছু বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে একটি শব্দ বার বার উচ্চারণ করল, আর সেটি হলো তৃতীয় শক্তি। একজন সামরিক অফিসার হিসেবে আমি ব্যথিত হতাম এজন্য যে, তৃতীয় শক্তি বলতে উনারা জেনেশুনে বোঝাতে চাচ্ছেন আসলে তৃতীয় শক্তিটা কী? বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বাইরে রাতারাতি কোনো তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে পারে না। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে যা-ই হোক, আমি তখন বিমান বাহিনীর প্রধানের এপিএস হিসেবে কর্মরত ছিলাম। কাছে থেকে অনেক কিছু ফিসফাস শুনতাম। সন্দেহ হতো, যেহেতু সেনাপ্রধানের উচ্চাভিলাষী একটা স্বপ্ন ছিল, যেটা তার কলিগদের মধ্যে অনেকেই জানতেন। আপনারা হয়তো জানেন যে, সেনাবাহিনী যদি কোনো অভ্যুত্থান ঘটাতে যায় বা কিছু করতে যায়, তাহলে তার মূল সাপোর্ট আসতে হবে নবম পদাতিক ডিভিশন থেকে, যেটা সাভারে অবস্থিত। সাভারের জিওসি ছিলেন তত্কালীন মেজর জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরী। উনি বেগম খালেদা জিয়ার নিকটআত্মীয়। উনার দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের সন্দেহগুলোকে খুব একটা আমলে নিতাম না। কারণ উনি তো বেগম জিয়ার নিকটআত্মীয়। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু ৮ জানুয়ারি ২০০৭ সালে বিমান বাহিনী প্রধানের বাসভবনের স্টাডি রুমের টেবিলে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের লেখা ‘ইন দ্যা লাইন অব ফায়ার’ বইটি দেখে আমি এয়ার চিফকে জিজ্ঞেস করি—স্যার বইটি পড়েছেন? কেমন লেখা? উনি বললেন, কিছুটা পড়েছি। আর্মি চিফ জেনারেল মইন পাঠিয়েছেন এবং অনুরোধ করেছেন পড়ার জন্য। বাইরে নানান গুজব শোনা যাচ্ছে, তাহলে কি উনি জেনারেল পারভেজ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন স্যার? আমার প্রশ্ন ছিল। তিনি প্রতিউত্তরে বললেন, ‘এমন স্বপ্ন দেখা তার জন্য (জেনারেল মইন) মারাত্মক ভুল হবে। কারণ এটা বাংলাদেশ। তাছাড়া এমন পরিকল্পনা থাকলেও সেটা আমার সামনে কখনো প্রকাশ করবেন না। এছাড়া নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর সাপোর্ট তিনি পাবেন না এবং আমার তো নয়ই। তবে এসব চিন্তা করা বা আলোচনা করা ঠিক নয়।’ তবু আমার ভেতর একটা শঙ্কা কেন জানি উঁকিঝুঁকি মারতো প্রায়ই।
ঠিকানা : বিমান বাহিনীর প্রধান তখন কে ছিলেন?
সালাউদ্দিন : বিমান বাহিনী প্রধান ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম। আমি ভাবতে লাগলাম, দেয়ার মাস্ট বি সামথিং রং। সামরিক অফিসার হিসেবে আমি চিন্তা করলাম, বাংলাদেশের গণতন্ত্র খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটলেও একটা গণতন্ত্র আছে। সেটা যেন বাধাগ্রস্ত না হয় কোনো সামরিক অফিসারের উচ্চাভিলাষী অভিলাষের জন্য। আমি আমার মাথা থেকে এই দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছি বার বার মেজর জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর কথা স্মরণ করে। কেননা তার প্রতি অবিচল আস্থা ছিল বিএনপি সরকারের। ঘটনাটি যখন ঘটল, তখন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, এটা আমাদের আন্দোলনের ফসল। আমি নিশ্চিত হলাম, ১/১১-র পেছনে আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থন ছিল। আমরা যদি বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করি, দেখব যতবারই সেনা অভ্যুত্থান বা সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ হয়েছে, ততবারই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল। রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়া সেনা অভ্যুত্থান করা সম্ভব নয়। আমার চোখে দেখা ১/১১ ঘটার পরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বলা হলো তিনি যেন কিছুদিন দেশের বাইরে থাকেন। বিএনপির যেসব কার্যক্রমে মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার পরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে একটি নির্বাচন দেয়া। এই বক্তব্যটি আমি কীভাবে জানলাম—বিমান বাহিনী প্রধান আমাকে বললেন, সেনাপ্রধান উনাকে বলেছেন, তারা ভোটার আইডি কার্ড করবেন, পরিবেশ তৈরি করে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। যেটা প্রথমে বিশ্বাসযোগ্য ছিল কিন্তু পরে সেনাপ্রধানের কর্মকাণ্ডে তার কথার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে বিমান বাহিনী প্রধান এভিএম ফখরুল আজম অবসরে গেলে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কেননা উনি সেনাপ্রধানের অনেক পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেন।
সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের কর্মকাণ্ডে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল, পাকিস্তানের সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের মতো তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে চাচ্ছেন। পারভেজ মোশাররফ কিন্তু সেই দেশের বিরোধী দলের নেতা নওয়াজ শরীফকে প্রথমে আটক ও পরে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সেনাসমর্থিত সরকারের কথামত দেশ ছাড়লেন। তখন কথা উঠল বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও দেশ ছাড়তে হবে। বেগম জিয়া কোনোভাবেই বিদেশে যেতে চাইলেন না। তিনি দেশত্যাগে রাজি হননি। এখানে একটি কথা বলে রাখি, সেনাপ্রধানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যারা সহযোগী হিসেবে ছিলেন, তাদের দু-একজন বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে একটা আপসহীনতা কাজ করে, তাই উনাকে কি দেশত্যাগে বাধ্য করানো সম্ভব হবে? ওখানে যারা ছিলেন—জেনারেল আমিন, ব্রিগেডিয়ার বারীসহ অনেকেই বলেছিলেন, বিএনপি এখন মনোবলের দিক থেকে দুর্বল তাদের বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের কারণে। সুতরাং তাকে দেশত্যাগ করানো অসম্ভব কিছু নয়। তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে। আলটিমেটলি হয়নি। এভাবে রাজি করাতে না পেরে তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং বেগম জিয়াকে নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। এর পরেও বেগম খালেদা জিয়া তার সিদ্ধান্তে অটল। মাঝে-মধ্যে নিমরাজি ছিলেন, আবার মনের দিক থেকে তিনি মোটেও রাজি ছিলেন না। সোজা কথা, তিনি দেশত্যাগ করবেন না। তিনি বার বার বলতেন, বিদেশে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই, ঠিকানা নেই, বাংলাদেশই আমার ঠিকানা। বেগম খালেদা জিয়ার এই দৃঢ় মনোভাব উচ্চাভিলাষী সেনাপ্রধানের সমর্থনকারীদের জন্য বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১/১১ যেদিন হলো, সেদিন সন্ধ্যায় আমাকে আমার বিমান বাহিনীর প্রধান তার বাসায় ডেকে পাঠালেন। তার বাসায় যে অফিস, সেখানে বসে আমরা কথা বলছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—স্যার, এটা কি ঠিক হলো? উনি প্রতিউত্তরে আমাকে বলেছিলেন, জাস্ট প্রে ফর দ্যা নেশন। তার একটু পরেই দেখলাম তার বাসার রেড টেলিফোন বাজলো। তিনি ফোন ধরলেন, সেনাবাহিনীর প্রধান ফোন করেছেন। সেনাপ্রধান উনাকে বলছেন, স্যার আপনি একটু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেন। উনাকে বলেন, উনি যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। বিমান বাহিনীর প্রধান সেনাপ্রধানকে বললেন, ঠিক আছে আমি ফোন করব। উনি ফোন রেখেই বললেন, ড. ইউনূসের ফোন নম্বর তার জানা নেই। আমি তখন উনার বাসার যে রিসিপশনিস্ট, তাকে বললাম ড. ইউনূসের ফোন নম্বর জোগাড় করে দেয়ার জন্য। আমি নম্বর নিয়ে ড. ইউনূসকে কল করলাম। উনি সরাসরি ফোন ধরলেন। আমি ফোনটি বিমান বাহিনীর প্রধানকে দিলাম। বিমান বাহিনীর প্রধান পরিস্থিতির কথা জানিয়ে তাকে দায়িত্ব নেয়ার কথা বললেন। আমি তখন কায়মনোবাক্যে চাচ্ছিলাম যে ড. ইউনূস যেন রাজি হন। কারণ উনার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন, তাহলে সেনাপ্রধানের স্বেচ্ছাচারিতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ড. ইউনূস বিমান বাহিনীর প্রধানকে বললেন—এয়ার চিফ, এভাবে তো দায়িত্ব নিয়ে কিছুই করা যাবে না। দেশকে যদি সুন্দর বাংলাদেশ করতে হয়, তাহলে সময়ের প্রয়োজন। আমি এই অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব নিতে চাই না, কিছু করা যাবে না। সুতরাং দায়িত্ব নেয়া আমার জন্য ঠিক হবে না। উনি সেনাপ্রধানকে বিষয়টি জানালেন। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে আমি যথারীতি সকাল বেলায় অফিসে গেলাম। বিমান বাহিনীর প্রধান আমাকে বললেন, আর্মি চিফ আমাকে কফি খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, সেনাপ্রধানের অফিসে একজন মেহমান এসেছেন, তাই তিনি আমাকে কিছুক্ষণ পরে যেতে বলেছেন। এরপর তিনি ১০ থেকে ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে সেনাপ্রধানের অফিসে কফির দাওয়াত রক্ষার জন্য গেলেন। উনি যাওয়ার পরে সেনাপ্রধান বললেন, বিদেশি মেহমান এসেছেন। সেনাপ্রধান বেশ উত্তেজিত। এয়ার চিফ বললেন, কী হয়েছে? তখন সেনাপ্রধান বললেন, স্যার এভাবে দেশ চলতে পারে না, এভাবে সম্ভব নয়। এই দেখুন জাতিসংঘের চিঠি। এয়ার চিফ জিজ্ঞেস করলেন—কে দিয়ে গেছেন। সেনাপ্রধান বললেন, বাংলাদেশে ইউএনডিপির স্থায়ী প্রতিনিধি মিস রেনেটা। ওই চিঠির কপি আমি নিজ চোখে দেখেছি। দেখে আমার কাছে মনে হলো, চিঠিটা অথেনটিক নয়। আমি রংও হতে পারি। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে জাতিসংঘ থেকে এ ধরনের ভাষার চিঠি প্রেরণ করা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ঠিকানা : চিঠির বিষয়বস্তু কী ছিল?
সালাউদ্দিন : চিঠির বিষয়বস্তু ছিল, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তোমরা যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নাও, তাহলে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সব সৈনিককে ফেরত পাঠানো হবে। আমার কাছে মনে হলো, এটা জাতিসংঘের সদর দফতরের ল্যাঙ্গুয়েজ হতে পারে না। সেনাপ্রধান যখন রেগেমেগে কথা বলছিলেন, তখন বিমান বাহিনীর প্রধান জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি কী করতে চাচ্ছেন? সঙ্গে সঙ্গেই জেনারেল মইন বললেন—স্যার, আপনাকে বঙ্গভবন যেতে হবে। বিমান বাাহনীর প্রধান বললেন, আমরা তো এভাবে বঙ্গভবনে যেতে পারি না, রাষ্ট্রপতি কল করলে আমরা যেতে পারি। একথার পরপরই সেনাপ্রধান বললেন, স্যার আপনাকে কল করবেন। কফি পর্ব শেষে এয়ার চিফ বিমান বাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলা পরিদর্শনে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তত্কালীন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিম বিমান বাহিনী প্রধানকে ফোন করলেন। তিনি বললেন, ‘স্যার, আপনাকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আসতে বলেছেন।’ বিমান বাহিনীর প্রধান নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল হাসান আলীকে তখন ফোন করলেন এবং বঙ্গভবনে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু জানেন কি-না তা জিজ্ঞেস করলেন। জনাব হাসান জানালেন—স্যার, আমিও এইমাত্র খবর পেয়েছি, আমিও যাচ্ছি বঙ্গভবনে। বিমান এবং নৌবাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে রওনা দিলেন। তারা গিয়ে দেখেন, এরই মধ্যে বঙ্গভবন অকোপাইড। ওখানে ডিজিএফআইর ডিজি জেনারেল রুমির পরিবর্তে (তিনি তখন ইংল্যান্ডে), ব্রিগেডিয়ার বারী, সেনাপ্রধান লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (পিএসও এফডি)। সেখানে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিকে উদ্দেশ করে সেনাপ্রধান উত্তেজিতভাবে বললেন—স্যার, এসব কী হচ্ছে? এভাবে হবে না, আপনি জরুরি অবস্থা জারি করুন। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো, জরুরি অবস্থা জারি করার জন্য যে বক্তব্য দেয়ার কথা, সেই বক্তব্য লিখে নিয়ে যাওয়া হলো, তাও তিন কপি রেডি করে নিয়ে যাওয়া হয় তিন ধরনের। এর থেকে বোঝা যায় সেনাপ্রধানের এমন পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। তার এমন চিন্তা-চেতনা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে অনেকদিন ধরেই কানাঘুষা ছিল অনেকের মাঝেই কিন্তু কেউ তা আমলে নেননি। তার মূল কারণ ছিল মেজর জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা। রাষ্ট্রপতি প্রথমে বিমান বাহিনী প্রধানকে বললেন, আপনি কী বলেন? বিমান বাহিনীর প্রধান বললেন, আপনি দুই নেত্রীকে ডেকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সমস্যার সমাধান করুন। রাষ্ট্রপতি বললেন, উনারা তো আমার কথা শোনেন না, একজন আমাকে বলেন (শেখ হাসিনা) ইয়েস উদ্দিন। তখন ব্রিগেডিয়ার বারী উত্তেজিত অবস্থায় বলতে থাকলেন—স্যার, এভাবে চলতে পারে না।
ঠিকানা : সেনাপ্রধান মইন এবং বারী কেন উত্তেজিত ছিলেন?
সালাউদ্দিন : এটা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত নাটক। সেনাপ্রধান ওই সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারীকে ধমক দিয়ে বলেন, বারী বসো। বারী সরি বললেন। ডিজিএফআই’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে বারী কথাবার্তা বলছিলেন। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সবার উদ্দেশে বললেন, আমাকে একটু সময় দিন, আমি ভেতর থেকে একটু আসি। সেনাপ্রধান এর জবাবে বললেন, স্যার আপনি কোথাও যেতে পারবেন না, যা সিদ্ধান্ত নেবেন আপনাকে এখানে বসেই নিতে হবে। তাহলে আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে একটু কথা বলে আসি? সেনাপ্রধান আবারও বললেন, যা সিদ্ধান্ত নেয়ার আপনাকে এখনই নিতে হবে। ম্যাডামের সঙ্গে আপনি পরে কথা বলতে পারবেন। তিন বাহিনীর প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইয়াজউদ্দিনকে কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া হলো না, কেন দেয়া হলো না? রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের আগে আরেকটি ঘটনা ঘটল, যেটি ছিল হাস্যকর। জেনারেল মাসুদ অনেকটাই বঙ্গভবনের কাছে চলে এসেছিলেন। জেনারেল মইন জানতেন উনি এখনও বঙ্গভবনের পাশেই আছেন। তিনি জেনারেল মাসুদকে ফোন করে বললেন—মাসুদ, তুমি সবকিছু রেডি কর। এয়ার চিফ তখন বললেন, মইন রিলাক্সড, এভাবে থ্রেট দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। রাষ্ট্রপতিকে ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে জেনারেল মইনের অভিনয়।
ঠিকানা : আপনি কি ওই সময় চিফের সঙ্গে ছিলেন?
সালাউদ্দিন : না, ওই সময় আমি চিফের সঙ্গে ছিলাম না, আমি উনাকে সিঅফ এবং রিসিভ করেছিলাম এয়ার হাউজে। চিফ নিজেই আমাকে এ কথাগুলো বলেছেন। এ ঘটনায় এয়ার চিফ নিজেও একটু দুঃখ পেয়েছেন। কারণ তিনি ছিলেন বিএনপি সরকার কর্তৃক মনোনীত চিফ। অবশ্য সব চিফই ছিলেন বিএনপি মনোনীত।
ঠিকানা : জেনারেল মইনও ছিলেন বিএনপি মনোনীত?
সালাউদ্দিন : জেনারেল মইনের ছিল ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। জেনারেল মইন বাংলাদেশে পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফ হতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানে পারভেজ মোশাররফ যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, জেনারেল মইনও বাংলাদেশে সেইভাবে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিলেন। তিনি কিং অব বাংলাদেশ হতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে জেনারেল মাসুদের ওপর আমাদের একটা আস্থা ছিল, অন্য কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে অনেকেই জেনারেল মাসুদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জানতেন। তিনি রক্ষীবাহিনীর লোক ছিলেন।
ঠিকানা : কীভাবে বুঝলেন?
সালাউদ্দিন : ভুয়া চিঠি দিয়ে পরিবেশ তৈরি করা, রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা জারিতে বাধ্য করা এবং ক্ষমতায় এসে কিংস পার্টি গঠনের অপারেশন, বিভিন্ন পার্টি থেকে জোর করে নেতাদের চোখ বেঁধে এনে হুমকি দেয়া এবং বিভিন্ন পার্টি ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করা। এগুলোর ভিডিও তো এখন সর্বত্রই রয়েছে। আমরা দেখেছি। ২০০৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঢাকার একটি জায়গায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বৈঠকে বসেন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন দলের নেতাদের একত্র করে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা। সেই মিটিংয়ে বগুড়ার বিএনপিদলীয় এমপি ড. জিয়াসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার বারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সেখানে কিংস পার্টি করার কথা বলতেন। বলতেন কিংস পার্টিই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। ড. জিয়া ব্রিগেডিয়ার বারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই পার্টির প্রধান কে হবেন। এর জবাবে ব্রিগেডিয়ার বারী বলেছিলেন, সেনাপ্রধান হলে কোনো অসুবিধা আছে? তিনি ড. কোরেশীসহ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মিটিং করতেন নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার লক্ষ্যে।
ঠিকানা : আপনি বলেছিলেন, সেনাপ্রধান এয়ার চিফকে একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। এর কারণ কী?
সালাউদ্দিন : বইটি এয়ার চিফকে পড়ার জন্য দেয়া হয়েছিল। বইটি পড়ার দু’দিন পর এয়ার চিফ আমাকে বললেন, সেনাপ্রধান আমাকে এটা কেন দিলেন? আমি জবাব দিলাম, স্যার আমি তো বুঝতে পারছি না। এরপর এয়ার চিফ আমাকে বললেন, এটা পড়ে কি এর ওপর তিনি কিছু করবেন কি-না? আমি বললাম, স্যার এটা সন্দেহজনক।
ঠিকানা : সেনাপ্রধান মইন যেদিন বঙ্গভবনে গেলেন, সেদিন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে ক্ষমতা দখল করবেন—সেটা কি বিমান এবং নৌবাহিনীর প্রধানরা জানতেন না বলে আপনি মনে করেন?
সালাউদ্দিন : না, কেউ জানতেন না। শুধু জানতেন সেনাপ্রধান ও তার কিছু সহযোগী।
ঠিকানা : রাষ্ট্রপতি যখন বাইরে যেতে চাইলেন কিন্তু সেনাপ্রধান যেতে দিলেন না, তাকে কি গুলি করার হুমকি দেয়া হয়েছিল?
সালাউদ্দিন : রাষ্ট্রপতিকে গুলি করার হুমকি দেয়া হয়নি।
ঠিকানা : তাহলে রাষ্ট্রপতিকে কীভাবে বসিয়ে রাখা হলো?
সালাউদ্দিন : রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি বলা হলো—স্যার, আপনি কোথায়ও যেতে পারবেন না। আপনাকে এখানেই ডিসিশন নিতে হবে। শুধু ফাও হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন—মাসুদ তুমি কোথায়, ট্যাংক-টুং সব ঠিক আছে কি-না? এটা ছিল সেনাপ্রধান মইনের নাটক। আমি শুনেছি, তিনটি পরিকল্পনা নিয়ে সেনাপ্রধান বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। এ ব্যর্থ হলে বি, বি ব্যর্থ হলে সি।
ঠিকানা : এ, বি, সি’টা কী কী?
সালাউদ্দিন : প্রথম পরিকল্পনা ছিল জরুরি অবস্থা দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে বলা। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করতে রাজি না হলে প্রেসার দিয়ে রাজি করানো, তাও কাজ না করলে এক্সট্রিমওয়েতে যাওয়া।
ঠিকানা : জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারী—এদের নিয়ে সেনাপ্রধান এই কাজ করলেন কিন্তু এক সময় দেখা গেল, তাদেরকেই সরিয়ে দেয়া হলো? কারণ কী?
সালাউদ্দিন : এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো আর সেটি হলো, এই পরিকল্পনার মাস্টার মাইন্ড হচ্ছেন মেজর জেনারেল এ কে এম আমিন। তিনিই ছিলেন একাডেমিক্যালি জিনিয়াস আফিসার। ব্রিগেডিয়ার বারী ছিলেন ট্রিপিক্যাল ট্রু সোলজার। এত ব্রেনওয়ার্ক ছিল না। মূল প্লানটা ছিল মেজর জেনারেল এ টি এম আমিনের। জেনারেল মইন সরিয়েছিলেন জেনারেল মাসুদকে। মইন সাহেব সরে যাওয়ার পর মেজর জেনারেল আমিন এবং বারীরা নিজেরাই সরে গেলেন। জেনারেল মাসুদকে সরানোর কারণ হলো, পরে জেনারেল মইন মেজর জেনারেল মাসুদকে নিজের জন্য হুমকি মনে করতেন।
ঠিকানা : তারেক রহমানের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের কথা আমরা শুনি। আসলে তার ওপর কী ধরনের নির্যাতন হয়েছিল এবং যারা নির্যাতন করেছিল, তাদের কি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে?
সালাউদ্দিন : তারেক রহমানকে নিয়ে যাওয়ার পর নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং সেই নির্যাতনে যেসব সদস্য জড়িত ছিলেন, তাদের সম্পর্কে অনেকেই এখন জানেন। বিষয়টি প্রায় সবার কাছে খোলাসা হয়ে গেছে। তারেক সাহেবের ওপর নির্যাতন এতটা নেমে আসতো না, যদি বেগম খালেদা জিয়া বিদেশে চলে যেতেন শেখ হাসিনার মতো। এখানে আমি একটি কথা বলে রাখতে চাই, জরুরি সরকারের পরে যে গণতন্ত্র (যেনতেন হলেও) এসেছে, সেটা এসেছে একটি নীলনকশার নির্বাচনের মাধ্যমে। এটা ছিল একটি সাজানো নির্বাচন। বেগম খালেদা জিয়াকে তার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল নির্বাচনে না যাওয়ার জন্য। তিনি তাদের কথা শোনেননি। তিনি জানতেন নির্বাচন হলে তার দল পরাজিত হবে। তারপরেও তিনি নির্বাচনে গেলেন যে কোনো ধরনের একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য। তার মূল লক্ষ্য ছিল মইন-ফখরুদ্দীনের অগণতান্ত্রিক সরকারের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সরকার এবং গণতন্ত্র ফিরে আসুক। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই সার্ভে রিপোর্ট আসে। সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় বিএনপি নির্বাচনে হারবে। ৯৫ থেকে ১০০টি আসন পেতে পারে। ওই সময় আওয়ামী লীগ এবং বিদেশি কূটনীতিকদের অংশগ্রহণে একটি সমঝোতা হয়। সেই সমঝোতা বৈঠকে আওয়ামী লীগ পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, বিএনপিকে ৩০টির বেশি সিট দেয়া যাবে না। যারা ওই মিটিংয়ে ছিলেন, তারা এখনো আছেন—প্রমাণ করার জন্য তাদের ডেকে আনা হোক, জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, সব বেরিয়ে আসবে। ১/১১-র কুশীলবরা এই সুযোগটি কাজে লাগান, তারা সুযোগ বুঝে আওয়ামী লীগ নেতাদের শর্ত জুড়ে দেন। আর তা হলো, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করলে তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান সুনিশ্চিত করতে হবে। এই সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু বিদেশি কূটনীতিকের অংশগ্রহণ ছিল। বিএনপিকে এত কমসংখ্যক আসনে বিজয়ী দেখানোর ইচ্ছে জাগ্রত হয় রাজনৈতিক আক্রোশ থেকে। ১/১১-র কুশীলবরা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে সেইফ এক্সিটের যখন নিশ্চয়তা পেল একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে, তখন তারা দুই বছরের দীর্ঘ অবৈধ শাসনের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করল। বেগম জিয়ার সেক্রিফাইসের কারণেই আজ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার এবং তারেক রহমানের ওপর এত নির্যাতন হতো না, যদি বেগম জিয়া তাদের কথামত শেখ হাসিনার মতো বিদেশে চলে যেতেন। দেশে তাহলে হয়তো আজ অন্যরকম পরিস্থিতি বিরাজ করতো, যদি মাইনাস টু ফর্মুলা জেনারেল মইন বাস্তবায়ন করতে পারতেন।
ঠিকানা : ফখরুদ্দীন এবং মইনউদ্দিন ছিলেন বেগম জিয়ার পছন্দের লোক। ফখরুদ্দীনকে ওয়াশিংটন থেকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করলেন, মইনকে কয়েকজনকে ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান করলেন। তারা কেন এই কাজ করলেন?
সালাউদ্দিন : সেনাপ্রধান মইনের ছিল ক্ষমতার লোভ। সেনাপ্রধানের উচ্চাভিলাষকে পরিপূর্ণ করার জন্য অনেক এলিমেন্টস দাঁড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে সেনাপ্রধানের ভাই ভারতের অশোক লিল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছেন, তারও একটা প্রভাব আছে। দুর্ভাগ্য হলো, সেনাপ্রধান ধরেই নিয়েছেন, তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন। উনার চিন্তাধারার বাইরেও যে কিছু পরিকল্পনামাফিক কার্যক্রম হয়েছিল, সেটা বোঝার মতো মানসিক অবস্থানে তিনি ছিলেন না। উনার পরিকল্পনা ছিল ক্ষমতায় এসেই দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন, উনিই হবেন বাংলাদেশের কিং—এ পর্যায় পর্যন্ত এসে উনার চিন্তাধারা থেমে গেছে। শুধু বেগম জিয়ার আপসহীনতার কারণে, কঠিন ব্যক্তিত্বের কারণে জেনারেল মইনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া যে যোগ্যতায় এসব কাজে এগুনো দরকার, সেই কাজ করার মতো যোগ্যতা এবং পরিকল্পনা কোনোটাই জেনারেল মইনের ছিল না।
ঠিকানা : অশোক লিল্যান্ডের সঙ্গে উনার বড় ভাই ব্যবসা করতেই পারেন, এটার সঙ্গে ওটার সম্পর্ক কী?
সালাউদ্দিন : প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আরেকটি প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু ওই সময়ে আমরা বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জনের সঙ্গে যে ধরনের মাখামাখি এবং যোগাযোগ দেখেছি, তা ছিল সন্দেহজনক। আরও অনেক কূটনীতিক ছিলেন। যেমন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, ইউএসএ, কানাডাসহ আরও অনেক দেশের কূটনীতিকরা ছিলেন। প্রতিবেশী দেশের হাইকমিশনারের সঙ্গে উনার যে যোগাযোগ ছিল এবং ইন্টারঅ্যাকশন হতো, তা ছিল দৃষ্টিকটু।
ঠিকানা : ১/১১-র আগে না পরে?
সালাউদ্দিন : আগে এবং পরেও।
ঠিকানা : ১/১১-র আগে হলে গোয়েন্দা সংস্থা তা জানতো না? সেনাপ্রধানের সঙ্গে অন্যান্য দেশের হাইকমিশনারদের এই মাখামাখি তারা রিপোর্ট করেনি?
সালাউদ্দিন : তখন বিএনপি অলরেডি ক্ষমতা হস্তান্তর করে ফেলেছে। বিএনপির ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই এটা চালু হয়েছে। এসব সাক্ষাত্কার সৌজন্য সাক্ষাত্কার ডিজিএফআই’র ক্লিয়ারেন্সে হতো, যা প্রচলিত রীতিনীতির মাধ্যমেই করা যেতো। ওই সময় পিনাক রঞ্জনের মুভমেন্ট এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ছিল আই ক্যাচিং।
ঠিকানা : আমাদের দেশে আমরা দেখছি গোয়েন্দা সংস্থা বার বার ব্যর্থ হচ্ছে এবং গরিব মানুষের অর্থে জীবিকা নির্বাহ করে জনগণের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করছে, এর কারণ কী?
সালাউদ্দিন : একথার জবাবে বলা যায়, এগুলো অনৈতিক কাজ। একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আমি এটা বলতে পারি। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনৈতিক কাজগুলোই নৈতিক হয়ে যায়। বাংলাদেশে ডিজিএফআই বলেন, আর্মি, নেভি, বিমান বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ বলেন—সবাই যোগ্য এবং অত্যন্ত পারদর্শী স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে। যে কোনো ঘটনা ঘটলে তারা ইচ্ছে করলে বের করতে পারেন। কিন্তু তাদের কাজ করতে দেয়া হয় না—এটাই হলো আমাদের দুর্ভাগ্য।
ঠিকানা : বাংলাদেশে কি আবারও সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা আছে?
সালাউদ্দিন : বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—যে সরকারই আসুক বাংলাদেশে, বিএনপি যেন না আসে। বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা প্রমাণিত সত্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল না হলে আন্দোলন হবে, মারামারি হবে, জ্বালাও-পোড়াও হবে, খুনোখুনি হবে—বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। এতে করে কী কিছু হলো? আওয়ামী লীগ চাচ্ছে অন্য কোনো শক্তি এসে আবার ইন্টারভেন করুক?
ঠিকানা : আওয়ামী লীগ সেইফ এক্সিট খুঁজছে?
সালাউদ্দিন : আওয়ামী লীগের সেইফ এক্সিট হবে কি-না, সে ব্যাপারে তারাও নিশ্চিত নয়। তারা মনে করছে, এটাই সেফ এক্সিট। এটা আমাদের জন্য আরেকটি দুর্ভাগ্য। বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, বিএনপির জন্ম দিয়েছে সামরিক বাহিনীর লোকজন। কিন্তু এটাও সত্য যে, ১৯৯১ সালের পর দেশে যখন গণতন্ত্র এলো, তখন বাংলাদেশের মানুষই বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। তার মানে কী? তার মানে হচ্ছে, বিএনপি জনগণের পার্টি এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল।
ঠিকানা : ১/১১-র সময় অনেক লোককে নির্যাতন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন কি?
সালাউদ্দিন : এক সময় না জানলেও এখন তো প্রায় সবকিছুই বেরিয়ে গেছে। এগুলোর অডিও-ভিডিও রয়েছে। সে সময় মানুষের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন তো অবশ্যই হয়েছে।
ঠিকানা : এটা কি ফেয়ার হয়েছে?
সালাউদ্দিন : না, ফেয়ার হয়নি। আইন অনুযায়ী কেউ করতে পারে না। ১/১১-র গোটা দুই বছর সেনাসদস্যদের যে বাইরে রাখা হয়েছে, এটার একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়েছে। বিশেষ করে, ১৯৯০-এর পর থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রম দিয়ে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঈর্ষণীয় প্রশংসা অর্জন করেছে। ১/১১ সেই সুনাম, প্রশংসা ও ভাবমূর্তি বেশ ক্ষুণ্ন করেছে, যা সত্যিই দুঃখজনক। কিছু কিছু সদস্য নিজেদের বহুলভাবে বিতর্কিত করেছেন।
ঠিকানা : রাজনীতিবিদরা অন্যায় করেছেন, অসত্ কাজ করেছেন, দুর্নীতি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ১/১১ সেনা সরকার এলো—তারা কীভাবে দুর্নীতি করেন, অসত্ কাজ করেন?
সালাউদ্দিন : রাজনীতিবিদদের মধ্যে সত্-অসত্, ভালো-মন্দ থাকতে পারে। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন, অনেক সময় দেশের চেয়ে দল এবং ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখেন; কিন্তু যা কিছুই পরিবর্তন হবে দেশে, তা রাজনীতিবিদদের মাধ্যমেই হতে হবে। এতদিন বাংলাদেশে একটি সংস্থা বিতর্কিত ছিল না, ১/১১-র পরে সেই সংস্থা বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। যৌক্তিক কারণেই বিতর্কিত হয়ে গেছে।
ঠিকানা : জেনারেল মইন যখন ক্ষমতা দখলসহ অন্যায় কাজ করছিলেন, অন্য দুজন নেভি এবং এয়ার চিফ তাকে সহযোগিতা করলেন কেন?
সালাউদ্দিন : বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই হচ্ছেন সর্বাধিনায়ক, কমান্ডার ইন চিফ। তিনিই সবাইকে ডেকেছিলেন। জরুরি অবস্থা জারি করতে উনাকে যে বাধ্য করা হয়েছে, সেটা তো বাংলাদেশের জনগণ তখন জানতো না। বাধ্য হয়েই তিনি বলেছিলেন, আমি জরুরি অবস্থা জারি করলাম। উনি যদি বলেন, আমি জরুরি অবস্থা জারি করলাম তখন অন্যান্য চিফ তা মানতে বাধ্য। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতি কি তাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে ডেকেছিলেন? জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? এর জবাব হচ্ছে—নো। উনাকে বাধ্য করা হয়েছে। এরপর প্রতি সপ্তাহেই সেনাসদরে পরিস্থিতির ওপর বৈঠক হতো, সেসব মিটিংয়ে আমার যাওয়ার সুযোগ হতো এয়ার চিফের সঙ্গে। দু-তিনটি মিটিংয়ে যাওয়ার পরে এয়ার চিফ সেনাপ্রধানকে ফোন করে বললেন, আপনি যা করছেন আমার তো এসবে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তখন সেনাপ্রধান এয়ার চিফকে বললেন, ঠিক আছে স্যার, আপনার আসার দরকার নেই। ওইসব মিটিংয়ে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো তা আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য মনে হতো। শুধু একটি কথাই মনে হতো, যার কাজ তাকেই মানায়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের, আর কারও নয়। প্রথমত তার উদ্দেশ্য ছিল অসত্, দ্বিতীয়ত তার সেই যোগ্যতা, ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তি ছিল না।
১/১১-র ঘটনার তিন মাস পরে তিনি অবসরে যান। এয়ার চিফ সেনাপ্রধান জেনারেল মইনকে বার বার বলেছিলেন—একটি ভোটার আইডি তৈরি করে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নিজ দায়িত্বে ফিরে যেতে। একটা সময় এয়ার চিফ বুঝলেন জেনারেল মইন তার উপদেশ আর নিতে ইচ্ছুক নন। একদিন সেনাপ্রধান বলেই ফেললেন—স্যার, আপনি এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না, আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। এয়ার চিফ তো চেষ্টা করেছেন। তিনি আর কী করতে পারেন? যুদ্ধ ঘোষণা করবেন?
ঠিকানা : জেনারেল মইন ফেল করলেন কেন?
সালাউদ্দিন : ফেল করার কারণ হলো, উনি যদি মেইন একটি বা দুটি সমস্যার ওপর ফোকাস করতেন, তাহলে ভালো করতেন। উনি একসঙ্গে এত দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন যা তার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়নি। দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের ধরা, ট্রুথ কমিশন করে তার সামনে গিয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের দিয়ে স্বীকার করানো আপনি চুরি করেছেন, সেটা আবার টিভিতে দেখানো হচ্ছে। এটা কি সভ্য সমাজে চলতে পারে? একটি বিশেষ সংস্থার লোকদের দিয়ে দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করে একটি সত্ ও সভ্য জাতি গড়া রাতারাতি সম্ভব নয়। জেনারেল মইন তার অনুগত সদস্যদের দ্বারা বাংলাদেশে সত্ ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করার প্রকল্প গ্রহণ করেন, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। একদিন বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা পরিচালক আমাকে বললেন, সালাউদ্দিন তোমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন যারা সত্ ব্যবসায়ী, তারা চাইলে একটি বিশেষ সংস্থা তাদের বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে দেশে সত্ ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়াবে। আমি তাকে বললাম, স্যার পরিকল্পনাটি খুবই সুন্দর কিন্তু দ্রুত বাস্তবায়ন একেবারেই অসম্ভব।
ঠিকানা : পিলখানার ঘটনাটা কি পরিকল্পিত ঘটনা?
সালাউদ্দিন : পিলখানার ঘটনায় সৈনিকদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তার দায়-দায়িত্ব মইন- ফখরুদ্দীন সরকারকে নিতে হবে। মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের হটকারী সিদ্ধান্তের কারণেই সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম। আর এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যেভাবে সৈনিকরা ঘটালো, তা দমনে সব ব্যর্থতা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের।
ঠিকানা : মইন-ফখরুদ্দীনের হটকারী সিদ্ধান্তটা কী?
সালাউদ্দিন : একজন বিডিআর সৈনিকের দায়িত্ব কী? বিডিআরের সৈনিকদের দিয়ে যখন মইন-ফখরুদ্দীন সরকার জনপ্রিয়তা অর্জন করার জন্য জনগণকে সেবা দেয়ার নামে বিভিন্ন জায়গায় চাল-ডালের দোকান শুরু করল (অপারেশন ডাল-ভাত), তখন বিডিআর সৈনিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে তাদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে এ কাজগুলো করেছে। এ কাজগুলো করতে গিয়ে দেখলেন এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদেরই কিছু কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিছু কিছু কাজ করছেন, যেগুলো বিতর্কিত। যারা দিনরাত কষ্ট শিকার করে কাজ করছেন, তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। তাছাড়া বিডিআর সৈনিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা, জাতিসংঘ মিশনে নিয়োগ, নিজস্ব বাহিনীর কর্মকর্তা নিয়োগসহ কিছু দাবি- দাওয়া ছিল যা ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন এবং পরে আওয়ামী সরকার মোটেও আমলে নেয়নি। সেই ক্ষোভের যে নিষ্ঠুর-নির্মম বহিঃপ্রকাশ, সেটা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং তার সব দায়-দায়িত্ব বর্তমান সরকারের।
ঠিকানা : আপনার কি মনে হয়, যদি মিলিটারি অ্যাকশনে যেত তাহলে এত ম্যাসাকার হতো না?
সালাউদ্দিন : আমি নিজে একজন অফিসার হিসেবে বলছি, যদি মিলিটারি অ্যাকশনে যাওয়া যেত, তাহলে এত ম্যাসাকার হতো না। আমি তখন সিলেটের শমসের নগরে ছিলাম কমান্ডিং অফিসার হিসেবে। সেখানে এয়ারফোর্সের নতুন ইউনিট গড়ার কাজ চলছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে ঢাকার তেজগাঁও ফেলকন হলে একটি মিটিং ছিল। মিটিংটি ছিল কমান্ড অ্যান্ড ফ্লাইট সেইফটি মিটিং। ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে চিঠি পেয়ে আমি চলে এলাম ঢাকায় মিটিংয়ে যোগ দেয়ার জন্য। আমি ২২ তারিখে আসার পরে আমার স্ত্রীকে তার এক বান্ধবী ফোন করল। ফোন করে বলল, দোস্ত লবি এসেছে। লবি মানে শহীদ কর্নেল এলাহীর স্ত্রী। তোর সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় না। তুই চলে আয়। আমার স্ত্রী বলল, আমার স্বামীও এসেছে। আমি তাকে নিয়ে চলে আসব। আমরা গুলশানে আমার স্ত্রীর বান্ধবীর বাসায় যাই। সেখানে আমরা সবাই আড্ডা মারলাম। আড্ডায় কর্নেল এলাহীর স্ত্রী বলছিল, ২৮ তারিখ শেষ দিনে আমরা সবাই বইমেলায় যাব। ২৫ ফেব্রুয়ারি আমরা সবাই ফেলকন হলে বসে আছি। অনুষ্ঠান শুরু হলো সকাল সাড়ে আটটায়। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এলেন। তিনি স্টেজে গিয়ে এয়ার চিফের কানে কানে কিছু বললেন। এয়ার চিফের অবস্থা দেখে আমি বুঝতে পারলাম কোনো সমস্যা হয়েছে। আমি ছিলাম কুর্মিটোলা বেইজের আন্ডারে। বেইজ কমান্ডার ছিলেন এয়ার কমডোর মশিউজ্জামান সেরনিয়াবাত। উনি আমাকে বললেন, সালাউদ্দিন তুমি আমার সঙ্গে আসো। আমরা গাড়িতে যাচ্ছি। এর মধ্যে আমাদের হেলিকপ্টার পিলখানার উপর উড়ে চক্কর দিতে লাগল বিডিআর সৈনিকদের আত্মসমর্পণের জন্য। বিডিআর সৈনিকরা হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে গুলি চালালো। হেলিকপ্টার ব্যাক করল। হেলিকপ্টার নরমাল চক্কর দিচ্ছিল, কোনো বোমা বা অস্ত্র নিয়ে যায়নি। আমরা কুর্মিটোলা যাওয়ার পথে সেরনিয়াবাত স্যার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কী কী করণীয়, সে বিষয়ে দুজন আলোচনা করছিলাম এবং ওই ঘাঁটির সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে আমি আমার আগের অভিজ্ঞতার আলোকে তার সঙ্গে আলোচনা করছিলাম। আমরা সোজা চলে গেলাম রানওয়েতে। গিয়ে দেখি এরই মধ্যে আমাদের এফ-৭ ফাইটার বিমানে রকেটগুলো লাগানো হলো, আরেকটি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টারেও রকেট লাগানো হলো। আমরা প্রস্তুত। আমি যখন আমার কমান্ডারকে বললাম, স্যার ১৯৯৫ সালে যখন আনসার-বিডিআরের ঘটনা ঘটলো, আমি তখন বেইজের সিকিউরিটি অফিসার। জেনারেল নাসিম ওয়াজ আর্মি চিফ। আলতাফ চৌধুরী এয়ার চিফ। তখন আমাদের পাইলটরা দুটি এয়ার এ- ফাইভ জঙ্গিবিমান নিয়ে সফিপুর আনসার একাডেমির উপর কিছুক্ষণ উড়েছিল এবং নবম পদাতিক ডিভিশন গ্রাউন্ড সাপোর্ট দিয়েছিল। যার ফলে অল্প সময় পরেই খবর এলো আনসার-ভিডিপি বাহিনীর বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে। আমি এবং এয়ার কমডোর জামান তখন গোলাবারুদে সজ্জিত ফাইটার এয়ারক্রাফটের ডানার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ওইদিকে ওই বিমানের পাইলটরাও রেডি। সবাই অপেক্ষারত, কেবল একটি নির্দেশের অপেক্ষায়। চোখের সামনে অতিচেনা মুখগুলো ভাসছে আর শঙ্কা এবং উত্তেজনায় ভেতরটা কাঁপছিল। আমি কমান্ডারকে বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, আর কতক্ষণ? উনি বললেন, আমরা প্রস্তুত, কেবল নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। কিন্তু হায়, সেই নির্দেশ আর এলো না। যে নির্দেশ বাঁচাতে পারতো অনেকগুলো সূর্যসন্তান। এমন সময় মেজর এমরান তার ২০ থেকে ২২ জন কমান্ডো নিয়ে কুর্মিটোলার মেইন গেটে চলে এলো। গেট থেকে কমান্ডারকে জানানো হলো, ওরা যে আসবে আমরা তো জানি না। আমি আমার কমান্ডারকে বললাম, স্যার নির্দেশ আসতে যদি পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেয়, তারা এটা মেনে নেবে না। কমান্ডারের নির্দেশে আমি তাদের শান্ত করে পাশে নিয়ে এলাম। এর মধ্যে এয়ার চিফ জিয়াউর রহমান সাহেব এলেন। তিনি বেইজ কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলেন, রেডি কি-না। বেইজ কমান্ডার বললেন, স্যার আমরা পুরোপুরি রেডি। উনি বললেন, নির্দেশের জন্য অপেক্ষা কর। নির্দেশ তো আর আসে না। আমরা অপেক্ষা করছি। যত বড় নিরাপত্তা বিশ্লেষক হোক বা সামরিক বিশারদ হোক, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বলে, আমার সহকর্মীদের ধরে ধরে হত্যা করছে আর আমরা ওয়েট অ্যান্ড সি পলিসিতে যাব, এটা হতে পারে না।
ঠিকানা : ওই সময় তো প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলছিলেন?
সালাউদ্দিন : প্রধানমন্ত্রী আর্মি চিফ এবং এয়ার চিফের সঙ্গে কথা বলেছেন, বৈঠক করেছেন, মোস্টলি আর্মি চিফ। এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল আক্রান্ত সেনা অফিসার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষার জন্য পিলখানার অতিকাছে চলে গিয়েছিল। তাদের সেখানে থামানো হলো। কথিত আছে, এ ঘটনার পর আর্মির অনেক ইয়ং অফিসারের চাকরি চলে যায়। তারা আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন, এটা সেনাবাহিনীর ওপর প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ। এরকম ভাবলে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড রোধ করা যেত। প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নিলেন বলে আমাদের মনে সন্দেহ। এমনকি সেনাকুঞ্জের মিটিংয়ে চেয়ার ভাঙার ঘটনাও ঘটে। অফিসাররা প্রচণ্ড আপসেট ছিলেন। নিহত কর্মকর্তাদের জানাজায় অংশগ্রহণ করতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও কিছু আওয়ামী নেতা সেনানিবাস মসজিদে এলে সেনা অফিসাররা ‘ভারতীয় দালাল’ বলে তাদের দিকে তেড়ে এলে সিনিয়র অফিসারদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। এ ঘটনা ঘটার আগে গোয়েন্দা তথ্য ছিল, সৈনিকদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ক্ষোভটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, সৈনিকরা কমান্ড ভেঙে তাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের সঙ্গে গিয়ে গোপনে দেখা করেছিলেন। তারা লোকাল এমপি ব্যারিস্টার তাপসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, শেখ সেলিম এমপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের ক্ষোভের কথা বলেছেন। এটা তো কমনসেন্সের ব্যাপার যে, একদল সিপাহী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গেছে চেইন অব কমান্ড ভেঙে, সেটাকে অ্যাডড্রেস করা হলো না, গুরুত্ব দেয়া হলো না। এই গুরুত্ব না দেয়া হলো প্রথম ব্যর্থতা। দ্বিতীয় ব্যর্থতা হলো, যেসব কর্মকর্তাকে গুলি করা হলো, আমি নিশ্চিত হয়তো তারা সবাই মারা যাবেন, অনেকেই কালভার্টের নিচে ছিলেন, কেউ কেউ অন্য জায়গায় ছিলেন, ২৬ তারিখ পর্যন্ত অনেকে বেঁচে ছিলেন লুকিয়ে। কেউ পায়ে গুলি খেয়েছেন, কেউ শরীরের অন্য কোথাও গুলি খেয়েছেন। তারা ব্লিডিংয়ে মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর এত কর্মকর্তা এবং কর্মকর্তার পরিবারকে রক্ষায় যদি আমাদের সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে এ কৌশলকে আমি বলব অবাস্তব, অপরিপকস্ফ এবং হটকারী কৌশল। এমন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড যিনি বা যারা হতে দিয়েছেন, তাদের স্ব স্ব পদে থাকার কোনো অধিকার নেই। আর যদি বুঝে থেকেও কিছু না করে থাকেন, তাহলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য তারা দায়ী।
ঠিকানা : পিলখানার হত্যাকাণ্ড কি সাজানো?
সালাউদ্দিন : আমি আগেই বলেছি, ক্ষোভ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে মইন-ফখরুদ্দীন সরকার। আর ক্ষোভটার যেভাবে বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে তা প্রতিরোধে ব্যর্থতা হচ্ছে বর্তমান সরকারের। কারণ তারা জানতেন কী হচ্ছে। আপনাদের নিশ্চয়ই বড়াইবাড়ি সীমান্তের কথা মনে আছে। সীমান্তে বাংলাদেশী বিডিআর কতজন বিএসএফকে মেরে ফেলেছিল? তখন ডিজি জেনারেল ফজলুর রহমান। এটা আওয়ামী লীগের গতবারের ক্ষমতায় থাকার সময় হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের বিডিআর যদি দুর্বল হয়, তাহলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য বিরাট অ্যাডভান্টেজ এবং তাদের জন্য বিজয়। পিলখানার ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। ইয়ং সামরিক সদস্যদের মধ্যে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের অভিযোগ—এটা হতে দেয়া হয়েছে। এটাকে রোধ করা যেত, রোধ করা হয়নি—যখন সেনা অফিসাররা মারা যাচ্ছেন আর প্রধানমন্ত্রী সমঝোতা বৈঠক করছেন এবং মন্ত্রীরা বলছেন, এর সঙ্গে জঙ্গি কানেকশন আছে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে আমাদের জন্য!
ঠিকানা : আমাদের রাজধানীতে সেনাবাহিনীর এতগুলো অফিসারকে মেরে চলে গেল, গোয়েন্দা সংস্থা কী করেছে?
সালাউদ্দিন : এটা তো গোয়েন্দা সংস্থার চরম ব্যর্থতা। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা এ খবরটা উদঘাটন করেছিল। বিডিআর সদস্যরা পিলখানার ভেতরে লিফলেট ছেড়েছিল বিডিআর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বিলি করার আগেই তারা সেটা সংগ্রহ করেছিল এবং কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল।
ঠিকানা : এ ঘটনার কি তদন্ত রিপোর্ট বেরিয়েছে?
সালাউদ্দিন : দুটি তদন্ত পর্ষদ গঠিত হয়েছে। লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে সামরিক পর্ষদ দ্বারা এই নির্মম ঘটনার তদন্ত হয়েছিল। সেই তদন্তে যে তথ্য এবং সুপারিশ এসেছিল, তা এখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমি সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে শুনেছি—এই তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাওয়া হয়, উনি দেখে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘তাহলে দোষীদের মধ্যে আমার নামটাও লিখে দেন।’
ঠিকানা : তাহলে এ রিপোর্ট আর প্রকাশ পাবে না?
সালাউদ্দিন : এখন পর্যন্ত প্রকাশ পায়নি।
ঠিকানা : এতগুলো সামরিক অফিসারকে মারা হলো। ইতোমধ্যে বিচার করা হয়েছে। কারও দুই বছরের জেল, কারও পাঁচ বছরের জেল, আবার কারও সাত বছরের জেল— এটাই কি সুবিচার?
সালাউদ্দিন : এ বিচার যখন চলছিল, তখন অনেক আসামিই বন্দি থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এই মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। তাছাড়া আমার পরিচিত যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না।
ঠিকানা : এটা কারা করেছেন এবং কেন করেছেন?
সালাউদ্দিন : অনেকেই

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla