Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

রাজনীতির অলি গলি

Bangladeshi Politics
ইটের বদলে পাটকেল যদি রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গত ১৮ মাসের শাসন সে অর্থে শতভাগ সফল। বিএনপি-জামাত জোটের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগনের ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটকে প্রতিপক্ষ উচ্ছেদের ম্যান্ডেট হিসাবে নিয়ে দল হিসাবে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে এমন এক সাংস্কৃতি চালু করতে চাইছে যা বুমেরাং হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসতে বাধ্য । শুরুটা নাম বদল দিয়ে। বাংলাদেশের মাটি হতে জিয়া নাম উচ্ছেদকে এক অর্থে ব্যাক্তিগত ক্রুসেড হিসাবে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোন ভনিতা না করে নিজেই ঘোষনা দিয়েছেন ’খালেদা জিয়া করেছেন, তাই আমিও করছি’। সেনা ছাউনির গর্ভে জন্ম নেয়া অগনতান্ত্রিক দলের কর্মসূচীকে আওয়ামী লীগের মত পরীক্ষিত দলের কর্মসূচীতে পরিনত করে শেখ হাসিনা সাময়িক সন্তুষ্টি লাভ করলেও সব কিছু বদলে যেতে পারে আগামী সাধারণ নির্বাচনের পর। শেখ পরিবারের প্রতি এ দেশের মানুষ বরাবরই দুর্বল। কিন্তু তাই বলে এতটা দুর্বল নয় যা দিয়ে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নাম প্রধানমন্ত্রীর ভ্রাতৃবধূ সুলতানা কামালের নাম দিয়ে পার পাওয়া যাবে। ৩০ লাখ শহীদ আর ৩ লাখ বীরাঙ্গনার দেশ বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা রাখা এতগুলো মানুষের মূল্যায়ন সম্পুর্ণ না করে শেখ পরিবারের গৃহবধূকে মূল্যায়নের তাগাদা কোন মতেই জাতীয় তাগাদা হিসাবে মেনে নেয়া যায় না. এ নেহাতই পারিবারিক দাসত্ব পাকা করার আকাশ কুসুম পরিকল্পনা। এরশাদীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর এই একনায়কের নামে স্থাপনা গুলোর উপর নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল এ দেশের হুজুগে মাতাল জনগণ। সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হতে বিদায় নিলে শেখ নামের প্রতি প্রতিপক্ষ দল কতটা সন্মান দেখাবে তার টোন সেট করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। আগের নির্বাচনে আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের সংখ্যালঘুদের উপর জাতীয়তাবাদীদের অত্যাচার জাতির মেমোরি হতে মুছে যাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগ কর্তৃক ডিম থেরাপি প্রাপ্ত শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনি আর মাহমুদুর রহমানরা ক্ষমতা ফিরে পেয়ে কতটা হিংস্র হবেন তার সামান্যতম ধারণাও বোধহয় প্রধানমন্ত্রীকে দেয় হচ্ছে না।

বাংলায় একটা কথা আছে, এক মাঘে শীত যায় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্যে তা বোধহয় প্রযোজ্য নয়। ক্ষমতার হাওড়ে ভাসতে গিয়ে দলটা ধরে নিয়েছে এটা তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনের বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না। নাম পরিবর্তন আর মুজিব হত্যার রায় কার্যকরকে যদি সাফল্যের মাপকাঠি হিসাবে ধরা হয়, চট্টগ্রামের জনগণ আওয়ামী লীগের এ সাফল্যে সাড়া দেয়নি। যে দেশে অপরাধের শাস্তি নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর, সে দেশে বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ভাবার কোন উপলক্ষ নেই। জামাতী নেতাদের নিয়ে ইদানীংকালের আওয়ামী বিচার নাটকও এর বাইরে নয়। জামাতীরা অপরাধ করেছে ১৯৭১ সালে। এ অপরাধ কোন রহস্য উপন্যাসের অপরাধ ছিল না যা উন্মোচনের জন্যে শার্লক হোমসদের ভাড়া করা দরকার ছিল। ৩৯ বছর ধরে এরা সদম্ভে এ দেশের মাটিতে বাস করেছে, রাজনীতি করেছে, গাড়িতে নিশান উড়িয়ে মন্ত্রিত্ব জাহির করেছে। এ অপরাধী চক্রের সাথে খোদ আওয়ামী লীগও ক্ষমতা নিয়ে দরকষাকষি করেছে। তা হলে আমাদের কি মেনে নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বয়স যত বাড়ছে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আওয়ামী লীগের দেশপ্রেম? না-কি এবস্যালুট মেজরিটি পেয়ে প্রতিপক্ষকে খতম করার পুরানো কৌশলে ফিরে গেছে আওয়ামী লীগ? খবরে প্রকাশ আটককৃত জামাত নেতাদের সন্তানদের গ্রেফতার করা হয়েছে একত্রে গোপন বৈঠক করার জন্যে। দেশে কি পুলিশ রাজত্ব কায়েম হয়েছে যেখানে বাসায় বৈঠক করার অধিকারও হরণ করা হয়েছে? অপরাধ করেছে নিজামী, মুজাহিদ আর কামরুজ্জামানের দল। বাবার অপরাধে সন্তানদের যদি জেলে যেতে হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই মোশারফ হোসেন কি পূণ্য করেছেন যার জন্যে তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করা হল? দেশে আইনের শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না দিয়ে শুধু কজন রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধীকে শাস্তি দেয়া নিছকই তামাশায় পরিণত হবে যখন একই আসামিরা জাতীয়তাবাদী বিচারকদের কলমের খোঁচায় সগৌরবে বেরিয়ে আসবে জেল হতে, খালেদা জিয়ার কলমের খোঁচায় গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে স্ব দম্ভে পদানত করবে দেশের অলি গলি।

সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ ফুটবল দেখে আমরা কিছুটা হলেও পরিচিত হয়েছি আধুনিক ফুটবলের সাথে। স্থানীয় ফুটবলের দুই জায়ান্ট আবাহনী ও মোহামাডানের খেলা কতটা আধুনিক তাও যাচাই বাছাই করার সুযোগ এনে দিয়েছে এই টুর্নামেন্ট। নিকৃষ্ট হলেও স্থানীয় ফুটবল খেলা দেখতে হলে আমাদের এই দুই দলের খেলাই দেখতে হবে। আমাদের রাজনীতির অবস্থাও অনেকটা একই রকম। গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যম হিসাবে মেনে নিলে বিএনপি-জামাত জোটকেও মানতে হবে আওয়ামী লীগের। একই কথা প্রযোজ্য জোটের বেলায়। ফুটবল যেমন এক দলের খেলা নয় গণতন্ত্রেও এক দলের স্বীকৃতি নেই। এমনটাই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। দলন, মথন আর নিপীড়নের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল বানিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আওয়ামী কৌশলের মূল্য যদি কাউকে দিতে হয় তা হবে জাতি হিসাবে আমাদেরকেই।

Comments

বদরুদ্দিন উমরের লেখা -

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীর দল যেভাবে ও যেসব আওয়াজ তুলছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, খাজনার থেকে এদের বাজনা অনেক বেশি। এর থেকে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে এরা সত্যি সত্যিই ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় কি না। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, বিচার প্রক্রিয়ার শ্লথগতি এবং এ বিষয়ে নানা বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা সরকারি লোকজন বলতে থাকায় আওয়ামী ঘরানার কোনো কোনো মহলও এ বিচারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রথমেই বলা দরকার, বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার চক্রান্তের কথা বলে 'ওই গেল ওই গেল' রব তুলে আওয়ামী লীগ মহলের নেতৃস্থানীয় লোকজন কর্তৃক যেসব কথা প্রায় প্রতিদিন বলা হচ্ছে, তাতে এদের এসব বক্তব্য পরিণত হয়েছে এক হাস্যকর ব্যাপারে। বিএনপি ২৭ জুন হরতাল আহ্বান করেছিল। সে হরতালের সমালোচনা তাদের পক্ষ থেকে করা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার জন্যই হরতাল ডাকা হয়েছে বলে তারা যে আওয়াজ তুলেছিল, তার ফাঁকা চরিত্র খুব স্বচ্ছ। কোনো লোকই এ আওয়াজকে পাত্তা দেননি। কারণ, হরতালের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়কে যুক্ত করা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা বলেই তাঁরা মনে করেছেন। শুধু হরতালই নয়, দেখা যাচ্ছে বিএনপির যেকোনো কাজ, সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচির সমালোচনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময়ই তাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভণ্ডুল করার চক্রান্ত বলে অভিহিত করছে। এতে নিজেদের জনগণের কাছে খেলো করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়কে খেলো করে দেওয়া ছাড়া অন্য কিছুই হচ্ছে না। অবস্থা এ রকম দাঁড়াচ্ছে এ কারণে যে আওয়ামী লীগ বিরোধী দল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের কথা যত জোরেশোরে বলছে, এ বিচারকাজ সুষ্ঠুভাবে সংগঠিত ও ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে সরকারিভাবে তেমন কিছুই করছে না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু কোনো নতুন ইস্যু নয়। বাস্তবত ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও তৎকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সম্পন্ন হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তখন প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করলেও তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি। শুধু তাই নয়, এর তালিকা প্রক্রিয়া শুরু করে তারা তালিকাভুক্ত ১৯৫ পাকিস্তানি সামরিক অফিসারের বিচার না করে তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়েছিল। যদিও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল যে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে। সে বিচার হয়নি, তার পরও বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাদের আটক করা হয়েছিল তাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে। এ কাজ শেখ মুজিব তাদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে করেননি। সাংবিধানিকভাবে ক্ষমা ঘোষণা ছিল রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত, তবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই তিনি এ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন নিজে এই কাজের কৃতিত্ব গ্রহণের জন্য। এ ক্ষেত্রে সব থেকে 'চমৎকৃত' হওয়ার মতো ব্যাপার ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব কর্তৃক ১৯৭১ সালের সব থেকে বড় ও ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে শুধু মাফ করে দেওয়া নয়, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে ইসলামী সম্মেলনের সময় তাঁকে পরম বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করে তাঁর গালে চুমু খাওয়া এবং পরে তাঁকে মহাসম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজসিক সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা। এর পর বাস্তবত আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো নৈতিক অথবা আইনগত ভিত্তি থাকেনি। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ও তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শুধু তা-ই নয়, যখনই প্রয়োজন হয়েছে তখনই তারা জামায়াতে ইসলামী এবং অন্য ধর্মীয় সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। এসব কিছুর প্রমাণই সংবাদপত্রের পাতায় ছড়িয়ে আছে, কাজেই কারো কিছু বানিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ না নিলেও এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাপে পড়ে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে। খুব ভালো কথা। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে যেভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার সেটা এদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে এরা নিজেরা ইতিবাচক কাজ করার পরিবর্তে নেতিবাচকভাবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক এই বিচার ভণ্ডুল ও বানচাল করার ষড়যন্ত্রের কথাই বেশি বলছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সততার জন্য বিখ্যাত নন। কাজেই সুযোগ বুঝে তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে অনেক গালভরা কথা বললেও আওয়ামী লীগ সরকারের এই নেতিবাচক কার্যকলাপের বিরোধিতা না করে নিজেরাও এর সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে অনেক ফালতু কথাই তাঁদের বলতে হচ্ছে।

এবার অন্য এক প্রসঙ্গে আসা দরকার। এ প্রসঙ্গে এবং এ বিষয়ে কোনো কথা আওয়ামী মহলে তো শোনাই যায় না, উপরন্তু কেউ সে কথা বললে তাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। প্রসঙ্গটি হলো, ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ শুধু অবাঙালি ও পাকিস্তানপন্থীরাই করেনি। বাঙালিরাও তখন যুদ্ধাপরাধ করেছে। যুদ্ধাপরাধের অর্থ শুধু স্বাধীনতার সক্রিয় বিরোধিতা নয়। যুদ্ধের সময় নিরপরাধ ব্যক্তি এবং আত্দসমর্পণকারী ব্যক্তিদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন করাও অপরাধ। এ কাজ তখন দুই পক্ষেই হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে অনেক অবাঙালি নিরাপরাধ নারী-শিশু-বৃদ্ধ ব্যক্তি বাঙালিদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছে। আমি নিজের চোখে এ হত্যাকাণ্ড দেখেছি মার্চ মাসের শেষদিকে। আমার আত্দজীবনী 'আমার জীবন'-এর তৃতীয় খণ্ডে আমি এর বর্ণনা দিয়েছি (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, পৃষ্ঠা : ১৭২-১৭৩)। এটা এমন ব্যাপার ছিল, যা গোপন বা অস্বীকার করার উপায় নেই।
'মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর' নামে একটি বই ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে 'প্রথমা' প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। গোলাম মুরশিদ লিখিত বইটিতে এ বিষয়ের কিছু উল্লেখ আছে। এর থেকেও মনে হয়, অবাঙালিদেরও যে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার এবং তাদেরও যে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে_এ চিন্তা মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত লোকদের ছিল না। এ জন্য হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে সময় বাঙালিরা এমনভাবে অনেক অবাঙালি নিধন করেছিল, ঠিক যেভাবে বাঙালি নিধন করেছিল অবাঙালি পাকিস্তানিরা। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, "আইন হাতে তুলে নেওয়ার একটি বড় রকমের দৃষ্টান্ত দেখা যায় ১৮ তারিখ মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে। এই সমাবেশে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা দেশ গড়ার ব্যাপারে সবাইকে উৎসাহ দেন।...কিন্তু এই সমাবেশের পরেই হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধারা চারজন 'দালাল'কে পেটাতে আরম্ভ করেন। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন কাদের সিদ্দিকী। তাঁকে নিয়ে গর্ব করতাম আমরা সবাই। সত্যিকার অর্থে তিনি যেভাবে নিজে একটি বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলেন, তা বিস্ময়ের ব্যাপার। যেভাবে যুদ্ধ করে তিনি টাঙ্গাইল অঞ্চল দখল করে রাখেন, তাও অবিশ্বাস্য। বস্তুত তিনি সবারই শ্রদ্ধা অর্জন করেন। কিন্তু ১৮ তারিখে 'দালাল' পেটানোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশি টেলিভিশনের সামনে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে এই দালালদের হত্যা করেন" (মাঈদুল, ১৯৯২)। বলাবাহুল্য, আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ দৃষ্টান্ত শ্রদ্ধার বস্তু ছিল না। বহু দেশেই এই ঘটনার ছবি দেখানো হয়। ফলে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বসমাজের যে শুভেচ্ছা ও সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল, তখন থেকেই তাতে ভাটা পড়তে আরম্ভ করে (পৃষ্ঠা: ১৭৬-'৭৭)। 'কাদের সিদ্দিকী বেয়োনেট দিয়ে এক দালালকে হত্যা করতে যাচ্ছেন'_এই শিরোনামে একটি ছবিও এতে ছাপানো হয়েছে; যাতে দেখা যাচ্ছে কাদের সিদ্দিকী বেয়োনেট দিয়ে একজনকে হত্যা করে আর একজনকে হত্যা করছেন।

এই অবাঙালি নিধনের জন্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাঙালিদের কারো কোনো বিচার হবে এমন চিন্তা বাংলাদেশে দেশদ্রোহিতার শামিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে এর মধ্যে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় অংশের উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে, যে চরিত্র কোনো মতেই প্রশংসাযোগ্য নয়।
(সুত্র, কালের কন্ঠ, ০১/০৭/২০১০)

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla