Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

সন্দেহের বীজ হতে বিশ্বাসের অংকুর...প্রসঙ্গ প্রজন্ম চত্বর।

Rajakar in Bangladesh
সময় কেন জানি ৭৩-৭৪ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঢাকা কলেজের পড়ি তখন। স্কলারশিপের সামান্য টাকার জন্য মাসের পর মাস স্বপ্ন দেখি। হরেক রকম বাজেট করে অপেক্ষায় থাকি। মেট্রিক পরীক্ষায় ভাল ফল করার কারণে সরকার মহাশয় মাসিক একটা অংক দিচ্ছেন। পরিমানে যৎসামান্য। পরিবারের উপর নির্ভরশীল কৈশোর উত্তীর্ণ একজন যুবকের কাছে এ অংক ছিল স্বপ্নের মত। ছয় মাসের পাওনা ব্যাংক হতে উঠিয়ে কলেজের দিকে রওয়ানা হয়েছি মাত্র। তলোয়ারের মত চকচক করা কিছু একটা নিয়ে সামনে দাঁড়ালো। ভেবেছিলাম হয়ত একজন। কিন্তু ভুল ভাঙ্গতেই দেখলাম ওরা বেশ কজন। কেবল ছুড়ি নয়, চাদর সরিয়ে একজন সাব-মেশিনগান দেখাল এবং হুমকি দিল খুলি উড়িয়ে দেয়ার। দিতে হল টাকা গুলো। এতদিনের লালিত স্বপ্ন মুহূর্তে মাটিতে মিশে গেল। চোখের পানি গোপন করে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেলাম কলেজে। শোকের উপর ভর করে শরীরের উপর আছর করল ভয়। সে রাতেই গা কাঁপিয়ে জ্বর এল। মায়ের কোলে ফিরে যেতে বাধ্য হলাম। প্রায় এক মাস শরীর ও মনের সাথে যুদ্ধ করে ফিরে এলাম ঢাকা শহরে। কেবল ঢাকা শহর নয়, গোটা দেশের জন্যই সময়টা ছিল ভয়াবহ। চারদিকে হরেক রকম বাহিনীর রাজত্ব। লাল বাহিনী, নীল বাহিনী, রক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে আমাদের শহরে ষ্টীম রোলার চালাচ্ছিল গুরু পার্টি নামের একদল হিংস্র হায়েনা। বলাই বাহুল্য ওরা ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতে অস্ত্র, মগজে মন্ত্র আর ডানে বায়ে বিগ ড্যাডিদের নিশ্চিদ্র ডানা, এভাবেই রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছিল নতুন এক প্রজন্ম, রাজনীতির নষ্ট সন্তান।

৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ তথা মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিতভাবে বদলে দিয়েছিল জাতি হিসাবে আমাদের যাত্রা। আমার মত যারা রাস্তার সামান্য দুর্ঘটনায় মুষড়ে যেত তারা অবাক হয়ে দেখতে শুরু করল নতুন এক অভ্যুদয়, হত্যা। একটার পর একটা লাশ নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিত স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর প্রতি মানুষের আস্থায়। হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মত ওরা আসতো। গভীর রাতে খুব হাল্কা ভাবে দরজায় নক করতো। পালানোর রাস্তা নিশ্চিদ্র করেই নিজদের উপস্থিতি জানান দিত। এর পরের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত, নতুন একটা লাশের জন্য জায়গা করে দিত জননী জন্মভূমি। এভাবেই শুরু আমাদের। অর্চনার অঞ্জলি সরিয়ে রক্ত-মাংসের কাউকে সামনে দাঁড় করানো আজ প্রায় অসম্ভব। কারণ ওরা দেবতা, আর আমরা পুজারী। অথচ এই দেবতারাই আজরাইল পাঠাতেন। ক্ষমতার মসনদ পোক্ত রাখার বলি হিসাবে বেছে নিতেন অবাধ্য পূজারিদের। এবং হাটে, মাঠে, ঘাটে তাদের বলি হত। ৪২ বছর বয়স আমাদের, অথচ জাতি হিসাবে কোনোদিনই মুখ খুলতে পারিনি। খাচায় বন্দী তোতা পাখির বুলি কপচাতে গিয়ে আমরা বোধহয় ভুলে গেছি স্বাধীনতার অর্থ কেবল দেবতার বেদিতে অঞ্জলী নিবেদন নয়, বরং স্বাধীন ভাবে বেচে থাকা, অন্ন-বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সহ স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর নিশ্চয়তা পাওয়া।

ভেবেছিলাম হয়ত শাহবাগ চত্ব্বর দিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে আমাদের নতুন অধ্যায়। ইদানিং কালের আরব স্প্রীং’এর শুরুটাও ছিল একই রকম। ভার্চুয়াল দুনিয়ার কিছু সমমনা মানুষ চিন্তা ভাবনার মিলন মেলা হিসাবে বেছে নিয়েছিল একটা নির্দিষ্ট জায়গা। ডাক দিয়েছিল পুরোনোকে ছুড়ে ফেলে নতুন কিছু গ্রহন করার। সে ডাক শহর বন্দর পেরিয়ে ছড়িয়ে পরেছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভে তুসের আগুন জ্বালিয়েছিল ভার্চুয়াল স্ফুলিঙ্গ। আগুনে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছিল তিউনেসিয়া আর মিশরের একনায়কেরা। তখত তাউস কেঁপে উঠেছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী রাজা বাদশাহদের। মুহূর্তের জন্য হলেও স্বপ্ন দেখেছিলাম ৭১’এর কসাইদের বিচার দাবি হয়ত উপলক্ষ মাত্র। তার পেছনেই হয়ত ধেয়ে আসছে আসল সুনামী। আশা করেছিলাম ৪২ বছর ধরে সাড়ে সাত কোটি হয়ে পনের কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে যারা জুয়া খেলেছে তাদের দিন ফুরাতে যাচ্ছে। কিন্তু হায়, বিচারে আমার বোধহয় কিছুটা ভুল ছিল। ভুলেই গিয়েছিলাম এ বাংলাদেশ। এখানে বসন্ত কেবল হলুদ শাড়ি, কোকিলের কুহুতান আর কবিতার মেলা।

কাদের মোল্লার শাস্তি পর্বের গভীরে ঢুকলে কেন জানি সন্দেহ জাগে। গন্ধ পাওয়া যায় পাতানো খেলার। মনে হয় প্রতিভাবান কিছু লোকের নিপুন স্ক্রীপ্টে অভিনয়ের জন্য মাঠে নেমেছিল ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কজন দলীয় ক্যাডার। ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধ নিয়ে নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ অনেকদিনের। নাটকের কারিগরদেরও তা জানা ছিল। অজগর নিয়ে খেলতে গেলে দংশনের ভয় থাকে। জামাতিরাও অজগর। ৪২ বছর ধরে ওদের নিয়ে অনেক ওঝা খেলে গেছে। বিচারকের আসনে বসা আওয়ামী লীগও খেলেছে। চরিত্রহীন রাজনীতির ধারক, বাহক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে এ পথ হতে সরে গেছে বিশ্বাস করতে কেন জানি কষ্ট হয়। পদ্মাসেতু, হলমার্ক, সোনালী ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট, কুইক রেন্টাল ও ছাত্রলীগ নামের প্লেগ ও মহামারিতে আক্রান্ত একটা রাজনৈতিক দলের পতন ঠেকাতে প্রয়োজন ছিল কিসিঞ্জারি কৌশল। কাদের মোল্লার রায় সে কৌশলেরই অংশ কিনা তা হয়ত পরিষ্কার হবে। মোল্লাই একমাত্র আসামী নয়, রায়ের সিঁড়িতে দলবেঁধে অপেক্ষা করছে সাইদী, নিজামী, গোলাম আজমের মত ’বাঘ-ভল্লুকের’ দল। বাংলাদেশের কনটেক্সটে এদের মৃত্যুদণ্ড আমাদের অস্তিত্বকে শক্ত করবে কেবল। পাশাপাশি জাতিও মুক্তি পাব ঝুলে থাকা কলংক হতে । প্রশ্ন উঠবে, বিচারের হিসাব নিকাশ হতে আওয়ামী লীগের প্রাপ্তি কি হবে? - শূন্য! শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তাদের নিয়ে নতুন কোন রাজনীতি হালে পানি পাওয়ার কথা নয়। গোলাম আজমকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার অপরাধ নিয়ে রাজনীতি করারও অবকাশ থাকবেনা। তাহলে কোন পথে হাঁটবে আওয়ামী রাজনীতি? নতুন প্রজন্মকে কাছে টানায় কি হবে তাদের কৌশল? ‘আমরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছি’ - এ দাবির প্রতিধ্বনি বেশিদূর গড়াবে বলে মনে হয়না। কাদের মোল্লার রায় নিয়ে সন্দেহটা এখানেই। রাজনীতির হিসাব মতে ক্ষমতাসীন দলের ইশারায় আদালত রায়কে নির্বাচন পর্যন্ত প্রলম্বিত করবে এবং মোল্লার কায়দায় দু একটা রায় দিয়ে তরুন প্রজন্মকে আবারও মাঠে নামাবে। উদ্দেশ্য? - বিরোধী দলকে ঘরকুনো করা। ফলাফল? - নির্বাচনে জেতা।

প্রজন্ম চত্ত্বরে জনগণের অংশগ্রহন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এ নিয়ে তেনা পেঁচানোর কিছু নেই। আস্তিক-নাস্তিক তর্কের অবতারণা ঘটিয়ে জনগণের ইচ্ছাকে ধরাশায়ী করার অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাস্তবতা হচ্ছে ক্রাইসিস জনগণকে রাস্তায় নামায়। আমাদের ইতিহাসও এ পথে আবর্তিত হয়েছে। এ যাত্রায় খুব কৌশলে জাতিকে গেলানো হয়েছে কাদের মোল্লার রায়ও ছিল ক্রাইসিস। প্রশ্ন উঠবে, কিসের ক্রাইসিস? আর্ন্তজাতিক আদালত সরকারের সৃষ্টি, আদালতের বিচারকও সরকার কর্তৃক নির্বাচিত। এমন একটা আদালতের রায়ের বিরোধীতা মানে সরকারের বিরোধীতা। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে রায়ের প্রতি আস্থা রাখাটাও ছিল জরুরি। কিন্তু এ নিয়ে আদালতের যেমন মাথা ব্যথা নেই, তেমনি আন্দোলনকারীদের মুখেও উচ্চারিত হয়নি সরকারের নাম। উলটো সরকার প্রধান সংহতি প্রকাশ করছেন আন্দোলনের সাথে। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে গোটা ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হবে। সন্দেহের বীজ হতে অংকুর গজায় এখানেই।

Comments

গোবিন্দল ও জৈল্যার বাতাসে এখনও বারুদের গন্ধ

মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

নূরুজ্জামান, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে ফিরে: সিংগাইরের গোবিন্দল ও জৈল্যা গ্রামের বাতাসে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে বারুদ ও রক্তের গন্ধ। চলছে শোকের মাতম। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন দুই গ্রামের চার জন। গুলিবিদ্ধ হেলেনার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন কুড়া-ভুসির দোকানদার নাসির উদ্দিন (২৬)। জমি থেকে শরিষা আনতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কৃষক আলমগীর (৩০)। ইউপি চেয়ারম্যানের দিকে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় ঘটনাস্থলেই মারা যান মসজিদের ইমাম শাহ আলম (২৪)। মিছিল থেকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দুবাই প্রবাসী নাজিম উদ্দিন (২৫)-কে। গতকাল সরজমিন এলাকায় গেলে গ্রামবাসী জানান এসব তথ্য। তাদের তথ্যমতে, নিখোঁজ রয়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ আরও ক’জন। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামের প্রায় ৭ হাজার পুরুষ। প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী জানান, নবীজীর অবমাননা তারা সইতে পারেননি। একারণে মিছিল করেছেন। সকাল থেকেই রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই শ’ শ মিছিলকারীদের নিরাপত্তা দিয়েছে সিঙ্গাইর থানা পুলিশ। তাদের হেফাজতেই তারা রাস্তায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সিঙ্গাইর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান মাহবুবুর রহমান মিঠু ও কয়েকজন কমিশনারের হস্তক্ষেপে কর্মসূচি শেষ করে বাড়ি ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সিঙ্গাইর থানা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আবদুল মাজেদ খানের নির্দেশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় মিছিলকারীদের ওপর। এ খবরে জনতা উত্তেজিত হয়ে তাকে লাঠি দিয়ে পিটায়। তখন তিনি শীর্ষ পর্যায়ে ফোন করে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠাতে বলেন। এর ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই কয়েক শ’ দাঙ্গা পুলিশ হামলে পড়ে গ্রামবাসীর ওপর। শ’ শ’ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। গ্রামবাসী ও তাদের বসত ঘর লক্ষ্য করে মুহুমুহু গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এসময় ঘটনাস্থলেই মারা যান শাহ আলম। তিনি ছিলেন গোবিন্দল মুসলিমনগর রাশেদিয়া মাদরাসার দাখিল শেষ বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি ডোবাইল জামে মসজিদের ইমামতি করে সংসার চালাতেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান তিনি। তার একমাত্র বোন মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে হারিয়ে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। নিহতের চাচা আবুল কাশেম বলেন, আমার ভাইপো কোন দলের রাজনীতি করতো না। তারে বিনা কারণে পুলিশ গুলি করে মেরেছে। এলাকাবাসী জানান, সকাল ৮টার দিকে গোবিন্দল নতুন বাজারের কাছে শরিষা আনতে গিয়েছিল কৃষক আলমগীর। এর পর আর ফিরে আসেনি। কে বা কারা গুলি করে তাকে রাস্তায় ফেলে রেখেছিল। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে। বুকের বাম পাঁজরে একটি গুলি লেগেছিল তার।
নাজিমের হাতে হাতকড়া: নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী জানান, দুবাই প্রবাসী নাজিম উদ্দিনকে মিছিল থেকে জাপটে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে হাতকড়া পরিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হাতকড়া খুলে রাস্তার পাশে খাদে ফেলে দেয় তাকে। নিহত নাজিম সমপ্রতি দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন। মাস দুয়েক আগে চারিগ্রামে বিয়ে করেছেন। কয়েকদিন পরই ফের দুবাই যাওয়ার কথা ছিল তার। তিনি কোন দলের রাজনীতি করতেন না। তার অপরাধ ছিল মুসল্লিদের ডাকে সাড়া দিয়ে মহনবীর বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের বিচার দাবি। পুলিশ ও যুবলীগ সূত্র জানায়, গোবিন্দল গ্রামে প্রায় ১৮টি মাদরাসা এবং ৩৫টির বেশি মসজিদ রয়েছে। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ বিএনপির সমর্থক। অনেকে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অনুসারী। তবে জামায়াত-শিবিরের উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মী সেখানে নেই। আগের রাতে এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা থেকে হরতাল পালনের আহবান জানানো হয়। মহানবীর অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে শরিক হতে বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতা মিছিল বের করে। এক পর্যায়ে কাশিমপুর বাসস্ট্যান্ডে হামলা চালায়। ভাঙচুর করে দোকানপাট। মারধর করে সিঙ্গাইর থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আবদুল মাজেদ খানকে। এছাড়া ফারুক ও সাঈদসহ ছাত্রলীগের তিনজনকে চালিয়ে করে আহত করে। এর আগে পুলিশের কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে ১২-১৩ জন পুলিশ সদস্যকে জখম করে। এলাকার সকল মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীকে জড়ো করা হয়। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, পুলিশ বেষ্টনীতে থেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গুলি চালিয়েছে। লোকজনকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। নিহত মাওলানা নাসির উদ্দিন তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী হেলেনার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে দৌড়ে গিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে গিয়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজনের রোষানলে পড়েন। তারা নাসির উদ্দিনের দাড়ি ধরে টেনেহিচঁড়ে নিয়ে যায়। পরে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে। গতকাল দুপুরে নিহত নাসিরের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বারান্দা ও আঙিনা জুড়ে অর্ধ শতাধিক মহিলা বিলাপ করছিলেন। দু’জন পুরুষ সদস্য চেয়ার পেতে বসেছিলেন রাস্তার দিকে তাকিয়ে। র‌্যাব-পুলিশ আসে কিনা নজরদারি করছিলেন। তখন লাশের ময়না তদন্ত চলছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। বিকালের দিকে লাশ আসে গ্রামে। পরে জানাযা শেষে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে। নিহত নাসিরের তিন বছর বয়সী একমাত্র ছেলে তামীম। পিতার কথা জিজ্ঞেস করতেই ধানক্ষেতের দিকে ইশারা করে জানায়, ওইদিকে গেছে। তার মাতা রুমানা বলেন, মোবাইল ফোনে গুলিবিদ্ধ হেলেনার খবর শুনে তার স্বামী বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে ধানক্ষেত দিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সের কাছে যাওয়ার পরপরই আওয়ামীলীগ ও পুলিশের লোকজন তাকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। এলাকাবাসী জানান, নাসির ছিলেন অতিশয় নম্র। কারও বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যেতেন। কোন দলের রাজনীতি করতেন না। যেখানে তাকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে তার কুড়া-ভুসির দোকান রয়েছে। নাসিরের বোন ফিরোজা বলেন, আমার ভাইরে থাবা মাইর‌্যা ধইরা নিয়্যা গুলি কইরা মারছে। আর মিছা কথা প্রচার করছে টিভি-পত্রিকা। আল্লাহ ওগো বিচার করবো। তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন পরেই তার বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই লোকজন হত্যা করলো। ছেলেকে এতিম করলো। হেলেনার মা রেহানা বেগম বলেন, আমাগো পুলিশে মারে নাই। আওয়ামীলীগের লোকজন ধইরা গুলি কইরা মাইরা দিছে। বাড়িতে কোন ব্যাটা ছিল না। ওরা ৩০ জনের মতো ঢুইকা গুলি চালাইছে। হেলেনার স্বজনরা জানান, গত ২১শে ফেব্রুয়ারি নিহত নাসিরের ভাই শাহীনূরের সঙ্গে হেলেনার কাবিননামা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি স্থানীয় একটি মহিলা মাদরাসায় পড়তেন। মাদরাসায় যাতায়াত ছাড়া কখনও ঘরের বাইরে বের হতো না। ঘটনার দিন ঘরের খাটের ওপর দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখছিল। তখনই আওয়ামীলীগ ও পুলিশের লোকজন গুলি চালায়। কি যেন ছুড়ে মারে এতে বাড়ি ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। তখনই মেয়ের চিৎকার শুনতে পাই। দেখি রক্তাক্ত হয়ে দাপাদাপি করছে। মেয়েকে নিয়ে যারা হাসপাতালে গিয়েছিল তাদেরকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এরা হচ্ছে রেহানার চাচাতো ভাই শফিকুল (৩০) ও নিহত নাসিরের ভাগ্নে হান্নান। এলাকাবাসী জানান, গোবিন্দল গ্রামে আওয়ামীলীগের কোন ভোট নেই। একারণে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের সঙ্গে একজোট হয়ে নির্বিচারে গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। ঘরে ঘরে ঢুকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে লুটপাট করেছে। এদিকে ঘটনার পর থেকেই এসএসসি পরীক্ষার্থী জামালসহ বেশ কয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
রোযা-নামাজ মুখে আসে না: ছেলে খোরশেদের খোঁজ না পাওয়ায় নিহত নাসিরের আঙিনায় বসে বিলাপ করছিলেন মাতা বিমলা। বুক চাপড়িয়ে বলছিলেন, টিভি-পেপার দিয়া কি অইবো? হাছা-মিছা দেহাইবার নইছে, আমরা কই হেইডা দেহায় না। সন্তানের জন্য বুকটা খাঁ খাঁ করছে। রোযা-নামাজও মুখে আসে না।
মানিকগঞ্জে হরতাল: রিপন আনসারী/আতাউর রহমান, মানিকগঞ্জ থেকে জানান, রোববার হরতাল চলাকালে পুলিশের গুলিতে সিঙ্গাইরে চারজন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে মানিকগঞ্জে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সকাল থেকে কোন ধরনের যানবাহন চলাচল করেনি। মানিকগঞ্জ শহরের সমস্ত দোকান-পাট ছিল বন্ধ। সিঙ্গাইর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবকিছুই বন্ধ ছিল। সহিংসতার ঘটনায় ২২ জনের নাম উল্লেখ করে প্রায় ৪ হাজার গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশের গুলিতে নিহত ৪ জনের মধ্যে রোববার রাতে ৩ জনের দাফন সম্পন্ন হলেও গতকাল বিকাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল থেকে অপরজনের লাশ গ্রামে আনা হয়নি ।
হরতালে সিঙ্গাইরে বিপুল সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছিল র‌্যাব। এছাড়া মানিকগঞ্জ শহরসহ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ছিল। হরতাল চলাকালে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সবখানেই শুনশান নিরবতা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ছিল একেবারেই ফাঁকা। সকাল থেকে দূরপাল্লার কোন যানবাহন রোডে চলাচল করতে দেখা যায়নি। শুধু তাই নয় মহাসড়কে ছোট যানবানগুলো রাস্তায় বের হয়নি। দূর পাল্লার যানবাহন চলাচল না করায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল কার্যত বন্ধ ছিল। সকাল থেকেই মানিকগঞ্জ শহরে কোন দোকান-পাট খোলা ছিল না।
শহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, এ হরতালে ব্যবসায়ীরা সমর্থন জানিয়েছে মানবিক বিবেচনায়। কারণ সিঙ্গাইরে পুলিশ যেভাবে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে হতাহত করেছে তা টেলিভিশন ও পত্রিকায় দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছে। অন্যান্য হরতালে দোকানপাট খোলা রাখলেও সোমবারের হরতালে ব্যাবসায়ীরা তা বন্ধ রাখেন।
পান দোকানদার কাশেম আলী জানান, দিন আনি দিন খাই। তারপরও আজ দোকান খুলিনি। পুলিশ যেভাবে নিরীহ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরেছে এতে একদিন কেন আরও বেশি দিন হরতালের ডাক দিলেও তা মেনে নেবো।
রিকশাচালক কিসমত জানান, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে টেলিভিশনে খবর দেখছিলাম। কি যে ভয়ংকর দৃশ্য তা দেখে চোখে পানি এসে যায়। তাই আজ হরতাল বুঝি না, তাই প্রতিবাদের জন্য রাস্তায় রিকশা নামাইনি।
হরতালে পক্ষে সকালে জেলা বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মানিকগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে সরকার ও পুলিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এছাড়া তারা শহরে পিকেটিং করে। জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা এ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান বলেন, সিঙ্গাইরে নিরীহ মানুষের ওপর পুলিশ যেভাবে গুলি করেছে তা এদেশে নজিরবিহীন। তাই ইসলামী সমমনা দলগুলোর ডাকা হরতালে আমরা সমর্থন জানিয়েছি।
হরতালের বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে আওয়ামীলীগসহ ১৪ দলের নেতা-কর্মীরা। খণ্ড খণ্ডভাবে রাস্তায় মহড়া দিয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। উল্লেখ্য, রোববার ১২টি সমমনা ইসলামী দলের ডাকা সকাল সন্ধ্যা হরতালে সিঙ্গাইরের গোবিন্দল এলাকায় পুলিশ প্রথমে পিকেটারদের এবং পরে এলাকার নিরীহ মানুষের ওপর গুলি চালায়। এঘটনায় চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরই প্রতিবাদে গতকাল মানিকগঞ্জে হরতালের ডাক দেয় ওলামা মাশায়েখ পরিষদসহ কয়েকটি ইসলামী সমমনা দল। এ হরতালে সমর্থন জানায় জেলা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
এদিকে, সিঙ্গাইরে সহিংসতায় রোববার রাতে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে প্রায় ৪ হাজার গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে সিঙ্গাইর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। এরমধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে দু’টি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগে আরও ৪ ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করেছে।
http://www.mzamin.com/details.php?nid=NDQyMDg=&ty=MA==&s=MTg=&c=MQ==

Publish on my account

Dear sir we have made an blog site. we have read your writing.its really nice.so if it is possible to publish your blog on our site then we will be grateful to you.

Thank you sir.

Mehedi Hasan

like to have the

like to have the link....thanks and good luck

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla