৩-ডি বাংলাদেশের ইতিবৃত্ত...

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। খন্ড খন্ড কতগুলো খবর। প্রতিদিন ঘটছে এবং প্রচার মাধ্যমে ঠাঁই পাচ্ছে বানিজ্যিক ও রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে। বিদেশে বসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের উপর কেউ যদি থিসিস লিখতে চায় অনলাইনে প্রকাশিত দৈনিকগুলোর উপর চোখ বুলালেই বোধহয় যথেষ্ট হবে। প্রকাশিত খবরে ধারাবাহিকতা থাকে, থাকে প্রকাশনার মুন্সিয়ানা। একটা সফল দেশের খুব কাছাকাছি দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে দেখতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলের পত্র-পত্রিকা পড়লেই যথেষ্ট। আবার ব্যর্থতার ষোলকলায় পূর্ণ একটা দেশের সাথে পরিচিত হতে চাইলে যেতে হবে প্রতিপক্ষের দুয়ারে। বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে এক মেরুতে দুধের সাগর বইলে অন্য মেরুতে বিষের মহাসমুদ্র বইতে বাধ্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেসিক তত্ত্বের সাথে যাদের পরিচয় আছে তাদের জানা থাকার কথা উত্তর ও দক্ষিন মেরুর বিকর্ষণের মাঝে ম্যাগনেটিক ফিল্ড কি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। একইভাবে বিপরীত মেরুর রাজনীতিও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ তৈরী করে। তবে সে বিদ্যুৎ সেবাখাতের বিদ্যুৎ নয়, মিলিয়ন ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বজ্রপাতের বিদ্যুৎ। যার আঘাতে ছারখার হয়ে যায় সবকিছু।
ফেব্রুয়ারী মাসকে বলা হয় শোকের মাস। এ নিয়ে উত্তর এবং দক্ষিন মেরুতে কোন দ্বন্ধ নেই। আগস্ট মাসকে যদিও শোকের মাস বলা হয় তবে তা এক মেরুর শোক। মে মাসকে আনুষ্ঠানিক ভাবে শোকের ট্যাগ না দিলেও এ মাসে দুই মেরুর এক মেরুতে বইতে থাকে শোকের আবহ। একটা জাতি সবকিছুতে শোক খুঁজলে তা নিশ্চয় সুস্থ জাতির লক্ষণ হতে পারে না। শোকের অন্য পিঠেই সুখপায়রাদের বাস, আমাদের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদেরও ঈদ আছে, আছে বিজয় দিবসের আনন্দ, আছে ১লা বৈশাখের উচ্ছাস। দুই মেরুর শোক আর সুখের মাঝে কোটি কোটি মানুষকে বাস করতে হয় নীরবে নিভৃতে, অনেকটা ম্যাগনেটিক ফিল্ড হয়ে। এবং এখানেই লুকিয়ে থাকে দেশের তৃতীয় মেরু। থ্রি ডাইমেনশনাল দেশের এই তৃতীয় মেরু নিয়ে আমার এ লেখা। আসুন কিছুক্ষণের জন্যে হলেও উপেক্ষিত সে মেরু হতে ঘুরে আসি।
বাংলায় একটা কথা আছে এক মাঘে শীত যায় না। কথাটা বোধহয় সবটা সত্য নয়। মেরুতে ঋতুর পরিবর্তন বাধ্যতামূলক হলেও বিষুব রেখায় তা বোধহয় প্রযোজ্য নয়। একই কথা বাংলাদেশের তৃতীয় মেরুর বেলায়ও প্রযোজ্য। মেরুর আনন্দ বেদনায় খুব একটা প্রভাবিত হয়না সে জীবন। সেখানে বছর জুড়ে রাজত্ব করে কিছু বিষধর সাপের অবাধ চলাফেরা। ১৫ই আগস্টের শোক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর জনৈক ব্লগারের লেখা খোলা চিঠিটা পড়ে দেশে ফোন করতে বাধ্য হলাম। মাসের ১ তারিখ হতে ১৪ তারিখ পর্যন্ত আমাদের শতাব্দি পুরানো শিল্পকারখানায় কোন ধরনের শোক বিরাজ করে তার সাথে সম্যক পরিচয় আছে, তাই শোকের অংশিদার না হয়ে উপায় ছিলনা। শত হলেও আপন ভাই বোন। ৯ বারের মাথায় অফিসের দারোয়ান ফোন ধরল। জানাল কারখানা বাইরে হতে বন্ধ করে মালিক পক্ষের সবাই অর্থাৎ আমার বাকি ভাইরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। চাঁদার হুমকি নাকি সয্য করা যাচ্ছে না। ওরা স্রোতের মত আসছে; আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, তাতী লীগ, শ্রমিক লীগ। সবাই পিতা হারানোর শোক মুহ্যমান, অবমুক্তি জন্যে অর্থের প্রয়োজন। তৃতীয় মেরুতেও আগস্ট মাস শোকের মাস। তবে তা পিতা হারানোর শোক নয়, হুমকির মুখে চাঁদা দেয়ার শোক। টাকা দিয়ে যদি মানুষের জীবন কেনা যেত এক শেখ মুজিবকে কেনার জন্যে সৃষ্টিকর্তাকে কাড়ি কাড়ি টাকা দিতে প্রস্তুত আছে ৩-ডি মেরুর অনেক বাসিন্দা। শোকার্ত বুকে কতদিন বেচে থাকা যায়!
শুরুটা মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। সামনে ঈদ। দুই মেরুর বাসিন্দাদের ঈদ করানোর পবিত্র দায়িত্ব নিতে হয় তৃতীয় মেরুর বাসিন্দাদের। ঘটনাটা ফোন করে নয়, নিজের অভিজ্ঞতা হতে নেয়া। গ্যাস ওয়ালা, বিদ্যুৎ ওয়ালা, পানি ওয়ালা, ডিসি অফিস, এসপি অফিস, ভূমি অফিস, লীগ, দল, পার্টি, মসজিদ, মাদ্রাসা, ইমাম, মুয়াজ্জিন, ইয়াতিমখানা, শ্রমিক, কর্মচারী, গরীব আত্মীয়স্বজন সবার ঈদ পালন নিশ্চিত করার পরের ঘটনা। ঈদের দিন সকাল বেলা। নামাজ মুখী হই না অনেক বছর। অফিসে বসে শীতের সুন্দর সকালটা উপভোগ করছিলাম মনের আনন্দে। শরীর ও মনের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে রোজার মাসটায়। কড়া ব্রেক কষে থামল জীপটা। পুলিশের জীপ। ডানহাতের কর্মটা সপ্তাহখানেক আগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে তাদের সাথে। ঈদের সকালে পুলিশ! দমে গেলাম ভেতরে ভেতরে। লম্বা একটা সালাম দিয়ে ওসির সহকারী আমলনামাটা পৌছে দিল। ওসি সাহেব জাকাত দেবেন, ৫০০ পিস শাড়ি দিতে হবে। হিসাব মেলাতে পারলাম না। ওসি জাকাত দেবে তার জন্যে শাড়ি দিতে হবে আমাদের! খুব ঠান্ডা মাথায় জবাবটা দিলাম, ’ঈদের সকালে আমরা জাকাত দেই না, দেই ফেতরা।’ অপমানটা বোধহয় বুঝতে পারেনি মোটা মাথার সেকেন্ড অফিসার। ধর্ম-কর্ম না করলেও ঈদের সকালে এত বড় একটা পাপ করার জন্যে তৈরী ছিলাম না। মুখের উপর না করে দিলাম। অনন্যোপায় হয়ে হাতে পায়ে ধরা শুরু করল। ঘটনার ভেতরও যে অন্য ঘটনা আছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ রইলো না। চমকপ্রদ ঘটনা। সপ্তাহখানেক আগে ৫০ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি উদ্ধার করা হয়েছিল নদী পথ আটকে। থানার এসপি, ওসি, সিপাই, আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান আর বিএনপির সাংসদ মিলে ভাগ করে নেয় আটক মালামাল। ভেবেছিল ব্যাপারটা বেশিদূর গড়াবে না। কিন্তু বাধ সাথে স্থানীয় প্রেস ক্লাব। সাংবাদিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে এ চালান হতে। খবর পুলিশের আইজি পর্যন্ত চলে গেছে। সবাই বখরা চাইছে এবং বখরা আজকের মধ্যে পৌছানো না গেলে অনেকের চাকরী নিয়ে টান দেবে। দুই মেরুর জন্যে ঈদ আনন্দের দিন হলেও ৩-ডি মেরুতে এটা শোকের দিন।
একই পথে আসে শহীদ দিবস, আসে বিজয় দিবস, আসে নেতা নেত্রীর জন্ম দিন। মেরুতে মেরুতে আনন্দ হয়, ফুর্তি হয়, দুঃখ হয়। সময়ের প্রবাহে আবার তা ভেসে যায়। কিন্তু তৃতীয় মেরুতে সবকিছু কেমন স্টেশনারি। এখানে ১৫ই আগস্টের মত এক মাসের শোক হয়না, শোক হয় ১২ মাসের, ৩৬৫ দিনের, ২৪ ঘন্টার। আজকের পত্রিকায় দেখলাম ৯ই আগস্টকে জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তা দিবস হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। উপলক্ষ এ খাতে মরহুম শেখ মুজিবের অবদান। ক্ষমতার মেরুতে এ নিয়ে হয়ত আনন্দ হবে, বিপরীত মেরুতে বইবে প্রতিবাদের ধূলিঝড়। সে আনন্দ আর ঝড়ের জোয়াল টানতে হবে সেই তৃতীয় মেরুর 'গরু ছাগলদেরই'। নতুন দিবস মানে নতুন চাঁদা, শোকের চাঁদা, আনন্দের চাঁদা, বাংলাদেশে জন্ম নেয়ার চাঁদা।
- Tag this post:
- WatchDog's blog
- 731 reads
-
JUST VIEWED
Last viewed:
- The Face of Digital Bangladesh
- ৯/১১ এবং ফ্লোরিডার গেইনসভিল চার্চ
- ব্লগীয় দামামা...প্রসঙ্গ পাকিস্তান ও রাজাকার।
- সত্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকুক আমাদের ইতিহাস
- Black Hawk Down - প্রসঙ্গ চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচন
- আমার খোয়াবনামা...
- ষড়যন্ত্রের নাও পাহাড় বাইয়্যা যায়...
- একটি রাস্তার ইতিকথা
- একজন শেখ মুজিব এবং আমাদের স্বাধীনতা...
- হরতাল - ক্ষমতার final frontier!
- একজন ইরাক ফেরত মার্কিন সৈনিকের গল্প।
- ওয়াচডগের আত্মকথা...
- যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদশী ভাই বোনদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি
- মার্ডার অন দ্যা বার্লিন এক্সপ্রেস। শনিবারের গল্প...
- শেখ হেলালের জেল...একটি অনুমান নির্ভর পোষ্ট!
Latest Blogs
- লুটের টাকায় বেশ্যা নাচে...
- আমেরিকার রুক্ষ্ম পশ্চিমের গল্প...
- মৃত্যুর আগাম শোক...
- হাতে রক্ত, আঙ্গিনায় লাশ আর মুখে গণতন্ত্র...পাকিস্তানি ভণ্ডামির আওয়ামী সংস্করণ!
- দ্যা ডে আফটার
- ক্যু আর্কিটেক্টদের মোবারকবাদ
- ছ্যারছ্যার আলীর দিনরাত্রি ও একটি খুনের গল্প
- ডিজিটাল কফিনে দিন বদলের দাফন। তথ্যই কথা বলে...
- Theory of সিম্পল লিভিং এন্ড হাই থিংকিং...
- দেবতা বনাম উর্দিওয়ালা...নতুন পর্ব!
Recent Comments
- মুহূর্তেই ছিন্ন স্নেহের বাঁধন...
1 week 2 days ago - আমিও
3 weeks 3 days ago - about canada immigration
4 weeks 3 days ago - ঘুষ না পেয়ে মুক্তি দেননি বিচারক
4 weeks 5 days ago - কোটি কোটি রুহুল আমিন কী চায়?
4 weeks 5 days ago - হুম!
5 weeks 1 day ago - ধন্যবাদ...
5 weeks 1 day ago - Its really a great invention.
5 weeks 3 days ago - গুপ্ত হত্যার শেষ শিকার..., একটি রম্য রচনা
6 weeks 1 day ago - Not fair!
6 weeks 3 days ago





Comments
Post new comment