সময় গেলে সাধন হবেনা...

Submitted by WatchDog on Thursday, October 15, 2026

যা যার প্রাপ্য তা সময় মত বুঝিয়ে না দিলে তা বেহাত হওয়ার আশংকা থাকে। ছিদ্র অন্বেষার নেশায় নেশাগ্রস্ত একটা জাতির জন্যে এই বুঝিয়ে দেয়াটা আরও জরুরি। পছন্দ করি আর না করি, আমরা প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশিরা সবাই কিছু একটার সন্ধানে থাকি। এই সন্ধানকে আমি ছিদ্র হিসাবে আখ্যা দেই। দেশের রাজনীতিবিদ হতে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কিছু একটার পিছু ছুটছে। অহর্নিশি খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই সোনার চাবি যা দিয়ে খোলা যাবে জীবন যুদ্ধের গুপ্তধন।

৭১ সালে ফ্রন্ট ফেরত আসল যোদ্ধাদের পাওনা ফিরিয়ে না দেয়ার কারণে সে পাওনা উড়ে এসে জুড়ে বসার মত অনেকে ভাগ বসিয়েছে। এই যেমন জাতির পিতার তকমা। একজন যুদ্ধের প্রথম প্রহরে গাট্টি-বোস্কা গুছিয়ে শত্রু পক্ষের মেহমান হয়ে কাটিয়ে দেয় ৯ মাস। রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার পর এই তিনি উড়ে আসলেন। আমাদের বোঝালেন শত্রু শিবিরে বসেও যুদ্ধের সেনাপতি হওয়া যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া যায়। সাপোর্টিং আইটেম হিসাবে জাতিকে গেলালেন ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার অলীক ও অবাস্তব গল্প। পাশাপাশি যারা জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছিল তাদের আখ্যা দেয়া হল বিশ্বাসঘাতক, রাজাকার।
এই জন্যই হয়ত সাধক ও গায়ক লালন শাহ বলেছিলেন...সময় গেলে সাধন হবেনা!

২০২৪ সালে আমাদের দেশে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছিল। অনেকে অনেক দৃষ্টিতে বিচার করবে এ পরিবর্তন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবর্তন ঘটেছিল। দেশ কারও পারিবারিক সম্পত্তি না এবং জাতি কোন বিশেষ পরিবারের দাসত্ব করার জন্যে স্বাধীন ভৌগোলিক অবস্থান সৃষ্টি করেনা তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল ২০২৪ সালের পরিবর্তন।

'২৪ পরিবর্তনের বয়স দুই বছরের কিছু উপর। এরই মাঝে এই পরিবর্তনের নতুন নতুন নায়ক আবির্ভূত হচ্ছে মঞ্চে। দাবি করছে একক কৃতিত্ব। নুরুল হক নুরুর জন্ম না হলে জাতি ২০২৪ সাল দেখতো না, এমন বক্তব্যও যখন বাজারে আসতে শুরু হয়েছে আমার মতে সময় হয়েছে কিছু পাওনা স্ব স্ব পাওনাদারদের বুঝিয়ে দেয়া।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট পরিবর্তন তথা রাজপথের আন্দোলন, সাধারণ ছাত্র-জনতাকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা, বুক চিতিয়ে বন্দুকের সামনে যাওয়া... কোন কিছুতে ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের কোন ভূমিকা ছিলনা। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তিনি ছিলেন ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সেখানে।

খোদ ডক্টর মোহম্মদ ইউনুস কোনদিন দাবি করেননি ২৪'এর আন্দোলনে নিজের কৃতিত্ব, এবং সামনে কোনদিন করবেন বলেও মনে হয়না। সমস্যা হচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত ও অনাদিকালের জন্যে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ ও তার হ্যামিলন রাজ্যের ইঁদুরের দল ২৪'এর সব কৃতিত্ব এককভাবে ইউনুস স্যারকে দেয়ার চেষ্টা করছে। এমনটা করার মাধ্যমে তারা আসলে ঐ আন্দোলনের আসল নায়ক সারজিস, মাহফুজ, হাসনাতদেরই কেবল অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করছে। যেমনটা তারা করেছিল ৭১ সালে জেনারেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর জলিল সহ আরও অনেকের সাথে।
৭১ সালের বয়স ৫৫ বছর। অনেকেই বেঁচে নেই ঐ সময়ের। তাই ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ ধর্ষিতার কল্প কাহিনী সাজিয়ে জাতির সাথে প্রতারণা সম্ভব হলেও ২৪'এর সাথে এমনটা করা সম্ভাবনা কম। কারণ সময় এখন অন্যরকম।

ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসকে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের হিরো না বানিয়ে আসুন তার প্রাপ্তি গুলোকে চিহ্নিত করে ইতিহাস লেখার চেষ্টা করি।

১) ক্ষমতার চেয়ারে এমন বিশ্ববরেণ্য এক ব্যক্তির অবস্থানের কারণে পৃথিবীর কোন দেশই জুলাই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস দেখায়নি, ইনক্লুডিং আওয়ামী লীগের ধারক, বাহক ও প্রতিপালক ভারত।

২) বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে জাতিসংঘকে ডেকে এনেছিলেন ২৪'এর ঘটনাবহুল দিনগুলোতে আওয়ামী বর্বরতার অনুসন্ধান করতে। এবং এই বিশ্ব সংস্থাই রিপোর্টে দিয়েছিল ১৪০০ জন হত্যা ও কয়েক হাজার আহত হওয়ার। এই রিপোর্টকে পৃথিবীর কোন দেশ অবিশ্বাস করতে পারেনি। রাজনীতির পরিত্যক্ত পরিত্যাজ্য আওয়ামী লীগ নিজেই যোগাযোগ করে এই সংখ্যা পুণঃমূল্যায়নের অনুরোধ করেছিল। জাতিসংঘের জবাব ছিল স্ট্রেইট ও ব্লান্ট। তারা সরে আসেনি সংখ্যা হতে।

৩) শেখ পরিবারের কতিপয় দু'মুখো সাপের আসল মুখ খুলে দিয়েছিলেন তিনি। যার অন্যতম ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হাসিনা সাম্রাজ্যের লুটের ক্যাশিয়ার শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিকির প্রতিনিধিত্ব।
বাংলাদেশে একাধিক মামলা, শাস্তি, লন্ডনে ফ্লাট জালিয়াতি সহ হরেক রকম দুর্নীতির জালে আটকে এই সিদ্দিকিকে আকাশ হতে মাটিয়ে আনেন ইউনুস সরকার। হয়ত রাজনৈতিক জীবনের কবর রচিত হয়ে গেছে টিউলিপ সিদ্দিকির যা দৃশ্যমান হবে দেশটার সামনের নির্বাচনে।

৪) শেখ পরিবারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশে লুটপাটের যে প্লাবন বয়ে গিয়েছিল তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। দরবেশ বাবা খ্যাত সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাতিজার ৯০ মিলিয়ন ও সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তিও ফ্রিজ করেছে ব্রিটিশ ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি।

৫) শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভুল তথ্য ও বাটপারির মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় চাকরি নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মত এই চাকরিও ছিল শেখ পরিবারের জন্যে বিশ্বজয়। এই চাকরি হতে পুতুলকে অনেকটা নেংটা করে বের করতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

৬) প্রতিবেশী বেনিয়া দেশ ভারতকে চোখ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ওদের খুদ-কুড়া না খেয়েও আমরা বাঁচতে পারি। ময়ূখ রঞ্জনদের সোগায় লাথি মেরে বুঝতে দিয়েছিলেন আমরা তাদের কেনা গোলাম না।

ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের প্রতি শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের রাগের কারণ কেবল অসময়ে ক্ষমতা হারানোর কষ্ট না, বরং ঘৃণ্য ও বর্বর শেখ পরিবারের মুখোশ খুলে তাদের কুৎসিত চেহারা বিশ্বের সামনে তুল ধরাই ছিল গোস্বার আসল কারণ।
ক্ষমতা আজ চলে গেছে হয়ত কাল আবার ফিরে আসবে। কিন্তু ফিরে আসবেনা টিউলিপ সিদ্দিকির মন্ত্রিত্ব, ফিরবেনা পুতুলের বিশ্বব্যাংকের চাকরি, ফিরবেনা লুটপাটের আলী-বাবা চল্লিশ চোরের সাম্রাজ্য।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন