Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

এন্ডিস পর্বতমালার বাকে বাকে - ৯ম পর্ব

Andes Mountains - South America
উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ১৮ জন যাত্রী নিয়ে বাসটা নড়তে শুরু করল শেষ পর্য্যন্ত। স্বস্তির পাশাপাশি এক ধরনের নীরবতা গ্রাস করে নিল বাসের পরিবেশ। কারও মুখে কোন কথা নেই, সবাই ক্লান্ত এবং সামনে কি অপেক্ষা করছে এ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। প্রায় ৫ ঘন্টার জার্নি। কথাছিল সকাল ৮টায় পুনো হতে রওয়ানা হয়ে দুপুরের খাবার খাব লা-পাস’এ। হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম, সকাল ১১টা। সবকিছু ঠিক ঠাক চললে বিকাল ৪টার ভেতর লা-পাস পৌছার কথা। মনে মনে হিসাব কসলাম, একটু দেরী হলেও গন্তব্যে পৌছেই লাঞ্চ করব। সাথে ক’টা আপেল, কলা এবং দু’বোতল পানি আছে, চলে যাবে আপাতত। বাসে হীটার চালু আছে, পরনের গরম কাপড় খুলে হল্কা হয়ে বসলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই দৃষ্টি হতে মিলিয়ে গেল সীমান্ত শহরটা। যানবাহন আর মানুষের এলোমেলো চলাফেরা বদলে দিল এন্ডিসের সূশৃংখল চূড়াগুলো। পাহাড় আর পাহাড়! কোল ঘেষে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদী। মাঝে মধ্যে ভূতের মত উদয় হচ্ছে দু’একজন আন্ডিয়ান তরুন-তরুনী, হাতে চাষাবাদের যন্ত্রপাতি। কৃষিকাজ হচ্ছে হয়ত কোথাও। কিন্তূ যতদূর চোখ যায় লোকালয়ের কোন চিন্‌হ দেখা গেলনা।

আকাশটাকে আজ একটু বেশী রকম নীল মন হল। ভার্টিকেল এংগেলে চোখ ঘুরালে শূন্যে উড়ে যাওয়া চীলগুলোকে মনে হবে স্থির হয়ে উড়ছে। দু’একটা চীল মাঝে মধ্যে গোত্তা মেরে নীচে নামছে শিকারের ধান্ধায়। রাস্তার সমান্তরালে বয়ে যাওয়া নদীটার দু’পাশে হঠাৎ করে আবাদী জমির উদয় হল; আলু, পেয়াজ আর ভূট্টার খন্ড খন্ড জমি। গাছের খোল ব্যবহার করে নদী হতে পানি উঠানোর ব্যবস্থা মনে করিয়ে দেয় জীবন এখানে বয়ে যাওয়া নদীর মত অত সহজ নয়। প্রতি খন্ড চাষাবাদের পেছনে নিশ্চয় লুকিয়ে আছে পাহাড়ী মানুষের খেটে খাওয়া জীবনের দীর্ঘশ্বাষ। নেশা ধরে আসে প্রকৃতির এই অন্তহীন ক্যানভাস একাধারে গিলতে গেলে। বাসের একটানা যান্ত্রিক শব্দে তন্দ্রামত এসে গেল। সকালে ঘটে যাওয়া উটকো ঝামেলাগুলো এই ফাকে মাথা হতে নেমে গেল। পাশে বসা বিপদজনক সুন্দরীকেও এন্ডিসের বিশালতার কাছে খুব ছোট মনে হল। গাটের পয়সা খরচ করে এতদূর এসেছি এন্ডিসের সানিন্ধ্য পেতে, স্থানীয় মানুষ এবং তাদের জীবনের সাথে পরিচিত হতে। সে দিকে মনোনিবেশ করে ভূলে গেলাম উটকো এক সুন্দরীর উপস্থিতী।

এন্ডিস! শব্দটার ভেতর লুকিয়ে আছে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা, অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার স্বপ্নীল হাতছানি। পাহাড় পর্বত ঘুরে বেড়ানো যাদের নেশা তাদের ধমনীতে এই নামটা এক ধরনের কম্পন তৈরী করে, যার উৎপত্তি প্রকৃতির প্রতি অকৃপন ভালবাসা হতে। এন্ডিসের উপর শত শত বই, আর্টিকেল এবং ডকুমেন্টারী দেখেছি, ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করেছি এর কাব্যিক কল্পনায়। কিন্তূ চোখে দেখার কাছে এগুলো এ মুহুর্তে অর্থহীন মনে হল। পাহাড়ের কোল ঘেষে বয়ে যাওয়া রাস্তাটার বর্ণনাও মনে হল বই, আর্টিকেল অথবা ডকুমেন্টারীতে জীবন্ত করতে পারেনি। বাইরের স্তব্দতাকে মনে হল অতি যত্নের সাথে কেউ লালন করছে হাজার বছর ধরে। পাহাড়ের চূড়াগুলোকে মনে হবে নীরব স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে কোটি বছর উপর। কোন একটা চূড়ায় উঠে চীৎকার দিলে হয়ত শত শত প্রতিধ্বনী হয়ে ফিরে আসবে সে চীৎকার, ভাঙবে সহস্রাব্দীর ভৌতিক নীরবতা। আমাদের বাসটা উচু নীচু এবং আকাবাকা পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে ছুটে চল্‌ল প্রচন্ড গতিতে।

’তুমি কি একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছ?’ ভিক্টোরিয়ার প্রশ্নে ছুটে গেল তন্দ্রা। নতুন কোন সমস্যার প্রসংগ টানতে যাচ্ছে সে, গন্ধ পেলাম গলার সতর্ক সূরে। ’পাহাড় ছাড়া এ মুহুর্তে অন্যকিছু লক্ষ্য করছিনা আমি’, অনেকটা তিরিক্ষ মেজাজে উত্তর দিলাম। উত্তরে সে যা বল্‌ল তা সত্যি ভাবিয়ে তুল্‌ল আমায়। দু’লেইনের রাস্তা, অথচ যানবাহন চলছে শুধু এক লেনে। অর্থাৎ বিপরীত দিক হতে কোন গাড়ি আসছেনা। ভিক্টোরিয়ার ইংগিতটা বুঝতে অসূবিধা হলনা। বাংলাদেশের মানুষ আমি, কিছুদিন আগে হাসিনার লাগাতার পর্ব ’উপভোগ’ করে এসেছি মাত্র। পূর্বাভিজ্ঞতা হতে বলতে পারি, সামনে সমস্যা। আকাশের পাখীগুলোকেও দেখলাম শুধূ একদিকে উড়ে যাচ্ছে। ভিক্টোরিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। অন্য যাত্রীদেরও দেখলাম নড়েচড়ে বসতে, কৌতুহলী হয়ে উঠ্‌ছে সবাই। দূর হয়ে যাওয়া উৎকন্ঠা গুলো বিদ্যুৎ গতিতে ফিরে এল নতুন করে।

ছোট দু’একটা পাথর দিয়ে শুরু। কিছুদূর যেতেই বাড়তে থাকল পাথরের সংখ্যা এবং এর আকৃতি। নিবিড়ভাবে বিছানো আছে সমস্ত পথজুড়ে। যেন বিশাল আয়তনের শিলাবৃষ্টি হয়ে গেছে কিছুক্ষন আগে। কিন্তূ তাতে বাসের চাকা বিশেষ কোন বাধা পেলনা। এগুতে থাকলাম আমরা। বিশাল একটা বাক পেরুতেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল দিগন্ত রেখায়, হাজার হাজার গাড়ি। যতদূর চোখ যায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি। থেমে আছে লাইন ধরে, মাইলের পর মাইল। ছোটখাট পাথর নয়, বিশাল আকারের বোল্‌ডার দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে পথ। এক কদম এগুবার কোন উপায় নেই। আমাদের যমজ বাসটা আমাদের ঠিক পেছনে এসে হুমড়ি খেয়ে থেমে গেল। সোজা কথায় আটকে গেছি আমরা। এন্ডিসের এই গহীন রাজ্যে জিম্মি হয়ে গেছি গরীব দেশের গরীবিপনার কাছে। আকাশ ভেংগে পড়ল সবার মাথায়। আবারও আমার মাথা জুড়ে পুরানো চিন্তাটা ঘুরপাক খেতে শুরু করল, আজ শনিবার এবং সোমবার মধ্যরাতে লীমা হতে নিউ ইয়র্কের ফিরতি ফ্লাইট ধরতে হবে। ভিক্টোরিয়াকে দেখে মনে হল বেশ উপভোগ করছে সে নতুন বাস্তবতা। ‘আমি জানতাম এমনটা হবে, এ জন্যেই এদিকে আসা’, উৎফুল্ল হয়ে জানাল সে। কথা বলে জানা গেল ওকালতির পাশাপাশি দক্ষিন আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে বই লিখছে সে। এ অঞ্চলে ভেনিজুয়েলান নেতা হুগো সাভেজের প্রভাব তার আগ্রহ। বলিভিয়ায় এবো মরালেস নামের নতুন এক নেতার উত্থান হয়েছে, যে আদর্শ হিসাবে বেছে নিয়েছে হুগো সাভেজের কথিত সমাজতান্ত্রিক পথ। তার উত্থানকে কাছ হতে দেখার জন্যেই এই জার্নি। উদ্ভট পোশাক দেখে মেয়েটা সম্পর্কে আজেবাজে ধারণা করায় নিজকে অপরাধী মনে হল এ মুহুর্তে। ’চল সামনে গিয়ে দেখে আসি’, আহ্বান জানাল মেয়েটা। বাসের ট্যুর গাইড ইতিমধ্যে সাবধান করে দিয়েছে এ ধরনের এডভেঞ্চার হতে দূরে থাকতে।

’চল, ঘুরে আসি’, সায় দিয়ে নেমে পরলাম। সাথে যোগ দিল আরও গোটা তিনেক সহযাত্রী। চারদিক চোখ বুলাতেই কেন জানি ঢাকার কথা মনে হয়ে গেল। রাজনীতির গ্যড়াকলে আটকে একদিন ৫ ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়েছিল কাঁচপুর ব্রীজের উপর। সামনে শেখ হাসিনার সমর্থনে মিছিল, কিছুক্ষন পর শুরু হল ধাওয়া আর পালটা ধাওয়া, সাথে নির্বিচার ভাংচুর। দীর্ঘশ্বাষ বেরিয়ে এল অজান্তেই। এন্ডিসের শো শো বাতাস আর চোখে মুখে শীতের কনকনে ঝাপ্টা ফিরিয়ে আনল কঠিন বাস্তবতায়। হঠাৎ করে কেন জানি গান গাইতে ইচ্ছা করল আমার, প্রিয় সেই গানটা; ’নাই টেলিফোন নাইরে পিওন নাইরে টেলিগ্রাম...। ভিক্টোরিয়া ফিস ফিস করে বলল, ‘মন খারাপ করে লাভ নেই, বরং উপভোগ কর যা দেখছ, এমন অভিজ্ঞতার সূযোগ জীবনে দ্বিতীয়টা নাও আসতে পারে‘।

-চলবে।

Comments

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla