রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
দুর্নীতিবাজদের উল্লাসনৃত্য−শেষের শুরু ॥ শাহ্দীন মালিক
June 22, 2008
মশিউল আলম ১৮ জুনের প্রথম আলোয় ‘দুর্নীতিবাজদের উল্লাসনৃত্যের অপেক্ষা!’ শিরোনামে কলাম লিখেছেন। যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা আমার এ লেখায় মশিউল আলমের লেখার কিছু সুর অবশ্যই পাবেন। আমার শিরোনাম স্পষ্টত তাঁর কাছ থেকে ধার করা।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ১২ জুন লিখেছিলেন, “এঁরাই আমাদের ‘জাতীয় নেতা’!” শিরোনামে মন্তব্য প্রতিবেদন। প্রথম আলোর পাঠক শেখ সাদীর ‘পাঠক-প্রতিক্রিয়া’ লেখা ছাপা হয়েছে ১৮ জুন প্রথম আলোয়। মতিউর রহমানের শিরোনাম ধার করেছেন শেখ সাদী। আর সমর্থন করেছেন সম্পাদক সাহেবকে।
গত দু-এক দিনে সংবাদমাধ্যম মারফত জানতে পারছি রাজনীতিবিদেরা কারাবাসে থাকা অথবা দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদন্ডিত তাঁদের সহকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ক্রমেই সোচ্চার হচ্ছেন। অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বা বিচারে দোষী প্রমাণিত হয়ে কারাবাস হলো রাজনৈতিক খেলা। রাজনীতিবিদদের হেয় করা ইত্যাদি অপচেষ্টা, আইন-বিচারের অপপ্রয়োগ।
ধারণা করছি, আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহে এ গোছের বক্তব্যের বন্যায় দেশ প্লাবিত না হলেও পাঠককুল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচুর ও বিস্তারিতভাবে অবগত হবেন।
মশিউল আলমের বোধ হয় শঙ্কা যে আইন-বিচার সবকিছুই ভুল প্রমাণিত করে পুরোনো রাজনীতিবিদেরা সদর্পে নির্বাচিত হয়ে অর্থাৎ জনগণের পূর্ণ সমর্থন, আস্থা আর ভোট সংগ্রহ করে আবার দেশের হর্তাকর্তা বনে যাবেন। যাঁরা আইনের ঝুটঝামেলা পোহাচ্ছেন, তাঁরা জনগণের মন-চিত্ত-হূদয়-বিবেক আবার জয় করবেন। নির্বাচিত হবেন। ব্যারিস্টার নেতাদের অনেকেই এখন নিজেরাই তাঁদের মামলায় লড়ছেন। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা, আইন-বিচারের ভালো-মন্দ বাদ দিয়ে একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যাবে যে গুটি কয়েকজন বাদ দিয়ে সিংহ ভাগ অভিযুক্ত রাজনীতিবিদকে পরিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া−নিম্ন আদালতে দোষী প্রমাণিত হয়ে আপিল দায়ের করে আপিল প্রক্রিয়ার শেষ বা নিষ্কপত্তি ডিসেম্বরের আগে শেষ হবে না। আপিল চলাকালীন বা আপিল অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় আইনগত কোনো বাধা নেই।
জরুরি বিধিমালায় বিধান করা হয়েছে যে নিম্ন আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়া ব্যক্তি আপিল চলাকালীন নির্বাচন করতে পারবেন না। কথা হচ্ছে এ বিধি সংশোধন করার। সংশোধন করা না হলেও এ বিধি বা নিষেধাজ্ঞা হাইকোর্টে টিকবে না। আপিল শেষ না হওয়ার অর্থ আমি দোষী, না নির্দোষ, তা চুড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত হয়নি। নিম্ন আদালতে দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিকে উচ্চ আদালত নির্দোষ রায় দিতে পারেন। আমি দোষী, না নির্দোষ, সেটা চুড়ান্তভাবে নির্ধারিত হওয়ার আগেই আমাকে শাস্তি দেওয়া−অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত করা যাবে না।
অর্থাৎ আইনগতভাবে উল্লাসনৃত্য শুরু করাতে তেমন বিশেষ কোনো কারণ আমি দেখছি না। যেসব নেতা আগেভাগেই অর্থাৎ ২০০৭ সালে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন, তাঁদের অল্প কিছুজনের আপিল প্রক্রিয়া ডিসেম্বরের আগেই শেষ হতে পারে, আর উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের দোষী-রায় বহাল রাখলে অল্প কিছু নেতাকে হয়তো অনেক দিন কারাগারেই থাকতে হবে।
আর লালু-দুলু-ভুলু গোছের অনেক নেতাকে ফেরত পাব। কিছু হাওয়া-পবনও পেতে পারি।
জরুরি আইনে আপিল চলাকালীন নির্বাচন থেকে যে কারণে বারিত করা যাবে না, সে একই ধরনের কারণে টুরুথ (বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কবিতা, যা প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছিল, সেই বানান) কমিশনে শত শত বা হাজারে হাজার স্বপ্রণোদিত দুর্নীতির বয়ান দেওয়া ব্যক্তিরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বারিত হবেন না। পুলিশ-কারাবাস ইত্যাদির ঝামেলা এড়াতে কেউ কেউ হয়তো ‘স্বপ্রণোদিত’ হয়ে আপাতত উদ্বুদ্ধ হবেন। নির্বাচনের আগে থুক্কু-মুক্কু বলে উচ্চ আদালতে গিয়ে কেন নির্বাচন করতে পারব না বলে মামলা ঠুকলে একটা জুতসই আদেশ পাবেন।
পাবেন বলছি এ জন্যই যে বিভিন্ন জাতের অব. অর্থাৎ নামের পর যারা ব্র্যাকেটে (অব.) লেখেন এমন গন্ডায় গন্ডায় লোক দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে গেল আমার (তা আমি যতই দুর্নীতিবাজ হই না কেন) টাকা-পয়সার হিসাব নিতে, আমার কিছু সহায়-সম্পত্তি নিল আর আদেশ দিল যে আমি নির্বাচন করতে পারব না।
টুরুথ কমিশন যদি কাউকে নির্বাচন থেকে বারিত করে, আর নির্বাচনের আগে নির্বাচন করার অধিকার চেয়ে সে যদি মামলা করে, তবে সম্ভবত সে মামলায় প্রথম প্রতিবাদী হবেন সেই অবসরপ্রাপ্ত (অব.) প্রধান বিচারপতি, যিনি টুরুথ (ভাবছি টুরুথ থেকে ফুড়ুতের মতো টুরুথ হলে কেমন হয়) কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন। যেহেতু টুরুথ কমিশনের আয়ু পাঁচ মাস, সেহেতু তত দিন টুরুথ কমিশন আর থাকবে না যে টুরুথ কমিশনের পক্ষ থেকে কমিশনের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা যাবে। কপাল খারাপ হলে আর এখন ডজন ডজন লোক টুরুথ কমিশনে টুরুথ বলে পরে মামলা করলে টুরুথ কমিশনারদের কী দশা হতে পারে সে দুর্ভাবনা অবশ্য আমার না। যাঁর মাথা ব্যথা তাঁরই হবে। আইন-আদালতে হচ্ছে না, অতএব টুরুথ দিয়ে একহাত দেখে নেব−আইন বানানোর এমন আজগুবি যুক্তি আমরাই দাঁড় করাতে পারি।
২. উল্লাসনৃত্যে ফিরে যাই। আমরা যাঁরা কলাম লেখি, মাঝেমধ্যে টক শো করি, সেমিনার-ওয়ার্কশপ করি, তাঁরাই দুর্নীতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। প্লাস লম্বা লম্বা কথা বলি। অবশ্যই সবাই না−অনেকেই।
মুরব্বি যাঁরা যেমন, এবিএম মূসা অথবা অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের লেখায় মশিউল আলমের চেয়ে দুর্নীতি বা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্নতা বা হতাশা অপেক্ষাকৃত কম। বলাবাহুল্য, আমরা প্রায় কেউই রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নই। নিতান্ত জরিপ গোছের লেখালেখির প্রয়োজন ছাড়া গ্রামেগঞ্জে যাই না। আমরা শহুরে মধ্যবিত্ত পেশাজীবী।
দুর্নীতি, নিদেনপক্ষে দুর্নীতির অভিযোগের কথা ভোটাররা জানেন। জানার পরও যদি ভোট দেন সেই লালু-দুলু-ভুলুকে, তাহলে মশিউল আলম বা মতিউর রহমান বা আমি কেন আপত্তি করব, আমার ভোট না হয় আমি নাই বা দিলাম। শেখ হাসিনা-বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। জনগণ চাইলে আর তাঁরা সুস্থ-সবল থাকলে আরও ২৫ বছর কেনই বা নেতৃত্ব দেবেন না এবং জনগণ যেমন পিতার পর কন্যা, স্বামীর পর স্ত্রীকে নেতৃত্ব দিয়েছে, তেমনি শেখ হাসিনা-বেগম খালেদা জিয়ার পর তাঁদের পুত্র, পুত্রবধু, কন্যা বা জামাতা এবং তারপর নাতি-পুতি, তাহলে আমাদের গোস্বা করা ছাড়া কীই বা করার আছে; দুর্নীতি খারাপ, দুর্নীতি খারাপ বলে চেঁচানো ছাড়া। উকিল-ব্যাটা উকিল হয়, ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা মা-বাবার ব্যবসার হাল ধরে−এসব তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর ছেলেমেয়ে, স্বামী-স্ত্রী সেই একই নেতৃত্ব পাচ্ছে, সেটা দেখতে তো আমাদের আশপাশের দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে বা দুরে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। সুদুর যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত গেলেও এখন একই চিত্র। কেনেডি পরিবারের কতজন যে সে দেশের সিনেটর-গভর্নর-কংগ্রেসম্যান হয়েছেন, তার হদিস আমরা কতজন রাখি।
৩. কয়েক সপ্তাহ আগে পুলিশের একজন সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি পুলিশ) গল্প করছিলেন। তিনি যখন আইজি ছিলেন, তখন সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মাঝেমধ্যে তাঁকে ফোন করতেন−‘অমুক জেলা জজ নতুন গাড়ি কিনেছেন, শুনেছি। একটু খোঁজখবর নেন।’ কিছুদিন পর আবার ফোন−‘ওই অতিরিক্ত জেলা জজ নাকি তাঁর বন্দুকের লাইসেন্স নবায়ন করেছেন। জজ সাহেবের এত বন্দুক দরকার কেন। একটু খোঁজ নিয়ে জানান।’ বলাবাহুল্য, আইজি সাহেব আছেন, আর ওই সাবেক প্রধান বিচারপতিও আছেন। অর্থাৎ অল্প কয়েক বছর আগের কথা।
লেখি কারণ ওই গোছের কর্তাব্যক্তি-মুরব্বি চাই। যত দিন দুর্নীতি থাকবে, তত দিন দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, অপরাধ থাকবে। এ রকম দেশ তো আমরা কেউই কখনো চাইনি, কেউ চাইবে না। আর দেশটা বছরের পর বছর ক্ষুধায়-দারিদ্র্যে থাকবে, সেটা কেউ চাইতে পারে না। সেহেতু দুর্নীতি দুর হবেই। উল্লাসনৃত্য করবে দেশ−দুর্নীতিবাজেরা নয়।
পুনশ্চ মশিউল−হতাশ হওয়ার মতো এ দেশে কোনো কিছু ঘটেনি, ঘটতে পারে না, ঘটতে দেব না। হোঁচট না খেয়ে কেউ কখনো হাঁটা শিখতে পারে নাই। মাঝেমধ্যে একটু-আধটু হোঁচট খাচ্ছি আমরা সবাই, দেশ। দৌড়ানো শিখতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
ড. শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট; ডাইরেক্টর, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।
- Forums:
JUST VIEWED
Last viewed:
- আপনার পাচটি পছনদের বাঙলা গান কি কি?
- Cellphone jammers to be installed at jails
- ফুটবল ফুটবল, দুরন্ত ফুটবল, চারদিকে ফুটবল জয়ধ্বনি
- Politics and flip side of a coin
- বাংলা ইউনিকোড
- যুদ্বাপরাধীদের তালিকা
- The Concert for Bangladesh: Images
- Large 'Planet X' May Lurk Beyond Pluto
- নিউইয়র্কে মদিনা মসজিদে চুরির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হলো বাংলাদেশী রাহেল হাকিম
- কামালের ১০২ কোটি, আইএসআই'র ২শ কোটি, এরশাদের টাকার বস্তা
- A Cunning Fox is jumping over the edge...
- ক্রসফায়ার এর আধুনিকি করন
- fellow compatriots around the world!
- লাখপতি স্বামীর কোটিপতি স্ত্রী!
- A New Day with new hope...
Latest Blogs
- আমেরিকার রুক্ষ্ম পশ্চিমের গল্প...
- মৃত্যুর আগাম শোক...
- হাতে রক্ত, আঙ্গিনায় লাশ আর মুখে গণতন্ত্র...পাকিস্তানি ভণ্ডামির আওয়ামী সংস্করণ!
- দ্যা ডে আফটার
- ক্যু আর্কিটেক্টদের মোবারকবাদ
- ছ্যারছ্যার আলীর দিনরাত্রি ও একটি খুনের গল্প
- ডিজিটাল কফিনে দিন বদলের দাফন। তথ্যই কথা বলে...
- Theory of সিম্পল লিভিং এন্ড হাই থিংকিং...
- দেবতা বনাম উর্দিওয়ালা...নতুন পর্ব!
- একজন বিচারক ও এক রাতে ১ কোটি আয়ের কেচ্ছা!
Recent Comments
- মুহূর্তেই ছিন্ন স্নেহের বাঁধন...
3 days 13 hours ago - আমিও
2 weeks 4 days ago - about canada immigration
3 weeks 4 days ago - ঘুষ না পেয়ে মুক্তি দেননি বিচারক
3 weeks 6 days ago - কোটি কোটি রুহুল আমিন কী চায়?
3 weeks 6 days ago - হুম!
4 weeks 2 days ago - ধন্যবাদ...
4 weeks 2 days ago - Its really a great invention.
4 weeks 4 days ago - গুপ্ত হত্যার শেষ শিকার..., একটি রম্য রচনা
5 weeks 2 days ago - Not fair!
5 weeks 4 days ago





Post new comment