Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Political Reality & Bangladesh

দুই নেত্রী ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
June 18, 2008 - 3:28pm BDT
 June 18, 2008

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুধু জটিল নয়, অস্পষ্টও। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়েছে। বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্যে সাময়িক মুক্তি দেবার প্রক্রিয়া চলছে। এই দুটো ঘটনা রাজনৈতিক জটিলতা নিরসনে একটা বড় পদক্ষেপ, সন্দেহ নেই।

কিন্তু তা সত্ত্বেও একথা বলা যাচ্ছে না যে, ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংলাপে দুই দল ও নেত্রীর অংশগ্রহণ ও সংলাপে সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতার ব্যাপারে আর কোনো বাধা নেই। শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কতোটা ছাড় দেবে বা সরকারই বা দুই বড় দলকে কতোটা ছাড় দেবে তা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

মিডিয়ার সামনে সরকারের উপদেষ্টা বা দলের প্রতিনিধি যা বলছেন তার বাইরেও যে কিছু কথা আছে তা অনেকে অনুমান করছেন। কিন্তু সেই কথাটা কী তা নির্দিষ্ট করে বলা কারো পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। সেই “কথাটা” না জানা পর্যন্ত বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বিশ্লেষণই সম্পূর্ণ হবে না।

যেহেতু নেপথ্যে কী কী কথা হচ্ছে তা আমরা জানি না, কাজেই প্রকাশ্যে যা কথা হচ্ছে বা মিডিয়ায় যা আসছে তার ভিত্তিতেই পর্যালোচনা করা ছাড়া উপায় নেই। যদিও জানি এটা অসম্পূর্ণ পর্যালোচনা হবে। আপাত: দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার ব্যাপারে মানবিক ও নমনীয় আচরণ করছে।

খালেদা জিয়ার দুই ছেলের ব্যাপারেও সরকার মানবিক ও নমনীয় হতে আগ্রহী। এপর্যন্ত জনগণ হয়তো সহজভাবে মেনে নেবে। কিন্তু জরুরী বিধিমালা সংশোধন করে দুর্নীতির মামলায় দন্ডিত ও বিচারাধীন নেতাদের ব্যাপারে সরকার ছাড় দিতে চাইলে জনগণ তাকে স্বাগত জানাবে বলে মনে হয় না। দুই দল এতে খুশি হবে হয়তো। কিন্তু সাধারণ মানুষ এটা সহজভাবে নেবে বলে ভরসা হয় না।

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকার দুর্নীতির যেসব মামলা করেছে তার আইনী নিষ্পত্তি না করে রাজনীতির মারপ্যাঁচে তাদের মুক্তি দিলে বর্তমান সরকার একটা খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আইনী বিচারে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হতেই পারে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তারা দোষী কি নির্দোষ তা নিয়ে আমার মতো সাধারণ মানুষ মন্তব্য করতে পারে না।

যেহেতু সরকার তাদের নামে মামলা দিয়েছে কাজেই একমাত্র আইনী প্রক্রিয়াতেই তাদের মুক্তি আসতে হবে। আমি মনে করি বর্তমান সরকার কোনো দল বা নেতার প্রতিপক্ষ নয়। তারা নিরপেক্ষ। শুধু তারা দুর্নীতি ও কুশাসনের বিপক্ষে। তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল।

তাদের কোনো রাজনীতি নেই। কাজেই দুর্নীতির অভিযোগে দুই নেত্রীসহ অন্য বিচারাধীন রাজনৈতিক নেতাদের ভাগ্য আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। সংলাপ বা নির্বাচন সফল করার সঙ্গে আইনী প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কে নির্বাচন করবে আর কে সংলাপে যাবে তা দেখা আদালতের দায়িত্ব নয়। আদালত দেখবে অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী না নির্দোষ। এর বাইরে মামলা নিয়ে সরকার রাজনীতি করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

আদালতের রায়ে শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া কিংবা প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা যদি নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলেও বর্তমান সরকারকে জনগণের কাছে জবাব দিতে হবে। কারণ দেশের দুজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয় নেত্রীকে এবং অন্যান্য প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিকে “মিথ্যা অভিযোগে” মাসের পর মাস কারাগারে বন্দী করে অসম্মান ও নির্যাতন করার জন্যে বর্তমান সরকারকে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার অভিযুক্ত করতে পারে। কাজেই সরকার খুব সহজে পার পাবে বলে মনে হয় না।

দুই নেত্রীর প্রতি সদয় হলেই সবকিছু সরকারের পক্ষে চলে আসবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। যে আইনী প্রক্রিয়া সরকার শুরু করেছে তার শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। এবং বিচার কাজও এমন স্বচ্ছ হতে হবে যাতে দেশি-বিদেশী কোনো দায়িত্বশীল সংস্থা বা ব্যক্তি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। যেনতেন একটা বিচার করে দুই নেত্রীর মুক্তি বা সাজা দিয়ে দিলাম তা মেনে নেয়া যাবে না। তা নিয়ে সরকারকে দেশে-বিদেশে বহু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা সম্পর্কে কারো মনে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু একথা সত্য যে, রাজনীতি মোকাবেলা করার মতো দক্ষ উপদেষ্টা বা ব্যক্তি বর্তমান সরকারের সঙ্গে যুক্ত নেই। তাই সরকারকে নানা ভুল পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।

বর্তমান সরকারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হল: উপদেষ্টা পরিষদের বাইরেও নানা ক্ষমতা কেন্দ্রের পরামর্শ তাদের শুনতে হয়। যেসব ক্ষমতা কেন্দ্রও যে রাজনীতি মোকাবেলায় দক্ষ তা ভাবার কোনো কারণ নেই। রাজনীতি দূরে থাক, সাধারণ মানুষ (আমজনতা) মোকাবেলা করার মতো অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা কোনটাই তাদের নেই।

কাজেই দুই অনভিজ্ঞ শক্তির সমন্বয়ে সরকার নানা ভুল পদক্ষেপ নিতে নিতে অগ্রসর হচ্ছে। এখন এর সমাপ্তি কেমন হয় সেটাই প্রশ্ন। একটা ভুল থেকে সরকার শিক্ষ নিতে পারে। এটা একান্ত আমার ধারণা। আমার ধারণাও ভুল হতে পারে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সব রাজনৈতিক নেতা ও আমলাকে এক পাল্লায় আর দুই নেত্রীকে আরেক পাল্লায় রাখা উচিত ছিল।

অন্য সব নেতা ও আমলার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হলেও তাদের দল বা জনগণ তেমন হট্টগোল করবে না। তাদের ব্যাপারে দলের মধ্যেও তেমন সহানুভূতি নেই। ব্যতিক্রম কয়েকজন ছাড়া। কিন্তু দুই নেত্রীর ব্যাপারে দল, সমর্থক বা সাধারণ মানুষের অনুভূতি ও আবেগ ভিন্ন। এই দুই নেত্রীর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে সরকারকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গত সতের মাসে সরকার কিন্তু দুই নেত্রীর ব্যাপারে কোনো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যেমনঃ জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানো ও দেশে ফেরা ঠেকিয়ে দেয়া। সরকার কিন্তু পারেনি। যখন পারেনি তখন সরকার কিন্তু এখনকার তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিল। তবু পারেনি। ঐ ঘটনা থেকে সরকারের শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। দুই নেত্রী সম্পর্কে অনেক ভেবেচিন্তে কৌশল ঠিক করা উচিত।

যাই হোক, পরবর্তীকালে সরকার দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগগুলো প্রমাণের মতো প্রমাণ বা নথি সরকারের কাছে নিশ্চয় আছে। না থাকলে মামলা দেবে কেন? যদি পর্যাপ্ত প্রমাণ সরকারের হাতে থাকে তাহলে দুই নেত্রীকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়ে বিচার কার্য পরিচালনা করা উচিত ছিল।
কারাগারে রেখে দুই নেত্রীকে আরো জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। “কারা নির্যাতিত নেতা” অভিধা নিয়ে তারা আগামীতে ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হতে পারে। বিচারে যদি তারা দোষী প্রমাণিত হয় ও শাস্তি পায় তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। কিন্ত যদি দোষী প্রমাণিত না হয় ?
তাহলে তাদের শক্তি, একনায়কত্ব, একগুয়ে মনোভাব ও “জনপ্রিয়তা” আরো বহুগুণে বেড়ে যাবে। তখন প্রধান দুই দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে ও পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পথে কোনো বাধা আর থাকবে না।

সরকার দুই নেত্রীর প্রতি যে নমনীয় আচরণ শুরু করেছে তাতে তাদের মামলার পরিণতি কী হবে তা নিয়ে মানুষ সংশয় প্রকাশ করতেই পারে। সরকার দুই নেত্রীর ব্যাপারে কোনো মামলা না দিয়ে দুই দলের অন্যান্য দুর্নীতিবাজ নেতা ও আমলাদের বিচার করে শাস্তি দিলে একটা বড় কাজ হতে পারতো।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধনের সূত্র ধরে বড় দুই দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা নিশ্চিত করা যায় কিনা তা দেখা যেতো। নির্বাচনী আইন সংস্কারের সূত্র ধরে নির্বাচনকে কালো টাকা ও পেশী শক্তির কবল থেকে মুক্ত করা যায় কিনা তা দেখা যেতো। অঙ্গ সংগঠন বাদ দেয়া ও সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে অভিন্ন আইন চালু করা যেতো।
এরকম কতগুলো বড় মাপের কাজ করা গেলে দুই নেত্রী রাজনীতিতে থাকলেও বড় কোনো সমস্যা হয়তো হতো না। কিন্তু দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, জেল, বিচার, শাস্তি ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে দুই বড় দল মিলে দেশে তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে ফেলতে পারে। তার সঙ্গে ছাত্র সমাজের এক অংশ তো আছেই।

যারা বহুদিন টেন্ডারের বখরা পাচ্ছে না তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস অচল করে রাখতে পারে। দেশে এই ইস্যুতে একটা গণআন্দোলন দানা বেঁধে ওঠা বিচিত্র কিছু নয়। ৬৮, ৬৯ ও ৯০-এর উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। দুই নেত্রীর মুক্তির অছিলায় দুই বড় দল ও ছাত্র সমাজের একাংশ দেশে লঙ্কাকান্ড বাধিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। গত বছরের আগষ্ট মাসের ঘটনা একটু স্মরণ করুন।

সরকার কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষক ছাত্রদের কাছে নতি স্বীকার করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দুই নেত্রী তো বটেই, অন্যান্য দন্ডিত রাজনৈতিক নেতা এবং আমলারাও একই আন্দোলনে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। তখন খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে পারে সরকারের দুর্নীতি দমন অভিযান।

আশংকা করা হচ্ছে দুই নেত্রীকে অন্যান্য অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজের মতো সাজাপ্রাপ্ত হলে পুরো ব্যাপারটা লেজে-গোবরে হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেও পারে। এরকম আশংকা করা হতো না যদি দেশে সামরিক শাসন থাকতো। নির্বাচন ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত হতো।

সেনা সমর্থিত সরকার আর সামরিক সরকার এক নয়। তাছাড়া বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগামী ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছে। সরকার চায় দুই প্রধান দলসহ সব দল নির্বাচনে অংশ নিক। অর্থাৎ দুই দল ও তাদের নেত্রীকে সরকার ভালো মেজাজেও দেখতে চায়। আবার দুই নেত্রীর বিচারও করতে চায়, জেলেও রাখতে চায়। বিচারে দুই নেত্রীর শাস্তি হওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। আমার ধারণা, সবকিছু এক সঙ্গে পাওয়া সম্ভব হবে না।
প্রশ্ন হল, এখন কী করা যাবে? যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আমার কাছে এর সহজ কোনো সমাধান নেই। কয়েকটা বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

১) দুই নেত্রীকে স্থায়ী জামিন দেয়া যেতে পারে। যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে বিচারের মুখোমুখি হবেন,
২) দুই নেত্রীর বিচার প্রক্রিয়া যতোটা স্বচ্ছভাবে করা যায় ততোটা স্বচ্ছ করতে হবে। প্রয়োজন হলে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক দল বিচার প্রক্রিয়া দেখবে।
৩) যত দ্রুত সম্ভব বিচারের রায় ঘোষণার ব্যবস্থা করা। বিচারে যদি দুই নেত্রী নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে তো সমস্যা মিটে গেল। কিন্তু যদি দোষী প্রমাণিত হয় ও বিচারে তাদের কারাদণ্ড হয় তাহলে সমস্যা নতুন রূপ নিতে পারে। যত আশংকা সেখানেই। দুই নেত্রীর শাস্তি বাতিলের অজুহাতে বাকি সব দুর্নীতির মামলা, কারাদন্ড, জরিমানা সব ভেস্তে যেতে পারে বলে শংকিত অনেকে।

কেউ এখন নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। কারণ বিচারের রায় কী হবে তা কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। যদি দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা না হতো তাহলে পরিস্থিতি হতো এরকম। এখন মামলা হওয়াতে তার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী তা নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া দরকার।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
[লেখক: উন্নয়ন কর্মী]

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla