Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

র্দুনীতির মহাভারত - পর্ব ৪

এরশাদ যখন একনায়ক ছিলেন তখন তিনি অস্ত্রের জোরে সাংবাদিকদের কলম থামিয়ে দিতেন। শফিক রেহমানকে দেশছাড়া করে যায়যায়দিন বন্ধ করেছিলেন। নাঈমুল ইসলাম খানের খবরের কাগজ, শেখ সেলিমের বাংলার বাণী বন্ধ করেছিলেন। সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ-পরবর্তী খালেদা-হাসিনার শাসনামলেও ভয়াবহভাবে হয়েছে। হয়েছে রাজনৈতিক সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড।
কূটনৈতিক দূতিয়ালিতেই হোক আর যে মধ্যসত্দতায় হোক_ এরশাদ যখন ক্ষমতা ছাড়েন তখন তাকে এবং তার দলকে নির্বাচনে সমান সুযোগ দেয়ার কথা ছিল। আর এরশাদের কাছে শেষ মুহূর্তে যারা মার্শাল ল' জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন তা তিনি প্রত্যাখ্যান করে সাংবিধানিক ধারা রক্ষার পথটি গ্রহণ করেন। এমনকি তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট মওদুদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে সেখানে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে শপথ বাক্য পাঠ করান। পরে সাহাবুদ্দীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন।
'৮৭ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশে আন্দোলন জোরদার হলো তখন তার পতন হয়নি। কিন' '৯০ সালে ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার পতন ঘটে যায়। '৮৭-তে এরশাদের সঙ্গে ঘরে-বাইরের সব শক্তি ছিল। '৯০ সালে মধ্যপ্রাচ্য, সাদ্দামসহ অনেক শিবিরে এরশাদের নতুন সম্পর্ক পশ্চিমা ও গণতান্ত্রিক দুনিয়াকে তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করায়। ঘরের শক্তিও তাকে বিমুখ করে। জিনাত হোসেন হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। হাবিবুর রহমান হাবিবকে ডেকে সংগ্রাম পরিষদ ছাড়তে হাসিনা চেষ্টা করেন। মোসত্দফা মহসিন মন্টু তখন ছাত্র সমাজের আন্দোলনকে প্রটেকশন দেন। তাকে ধরতে গিয়ে পুলিশ হিমশিম খায়। কেন তাকে ধরা হলো এ নিয়ে মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে ঝগড়া করেন কাজী ফিরোজ রশীদ।
৪ তারিখ সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা পর্যনত্দ এরশাদ তার কেবিনেট নিয়ে প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে এক ঘণ্টার বৈঠক করেন। এর আগে এরশাদ নির্বাচনের ১৫ দিন আগে পদত্যাগের ফর্মুলা দেন টিভি ভাষণে। এ নিয়ে মিজানুর রহমান চৌধুরীকে ডেকে আনা হলে তিনি জানতে চান এরশাদ কূটনৈতিক না সামরিক মধ্যসত্দতায় কারো সঙ্গে কথা না বলে ওই ভাষণ দিয়েছেন। এরশাদ ছিলেন নিশ্চুপ। ওই কেবিনেট বৈঠকটিতেই ছিল পিন পতন নীরবতা। বৈঠকে সিদ্ধানত্দ হয় এরশাদ পদত্যাগ করবেন না। যদি করেন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েই করবেন। সবাই আত্দবিশ্বাস নিয়ে যার যার বাড়ি যান। কাজী ফিরোজ রশীদের বাসায় কর্নেল জাফর ইমাম, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার, সর্দার আমজাদ হোসেনসহ কয়েক মন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেন পরদিন কীভাবে আন্দোলন মোকাবিলা হবে এ নিয়ে।
পরের দিন ছাত্র আন্দোলন দমে যাবে_ এমন শর্তে কয়েক ছাত্রনেতার সঙ্গে টাকার লেনদেনও হয়। তাই পুলিশ কর্মকর্তাদের বলা হয় যে তেমন শক্ত অ্যাকশনে না যেতে। এদিকে ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে রহস্যজনক নাটকীয়তা ঘটে যায়। এরশাদ কাউকে কিছু না বলে রাত ১০টায় ভয়েস অব আমেরিকায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জানা যায়, ওই সময়ের মধ্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সেনাপ্রধান নুরুদ্দীন খান 'হয় পদত্যাগ নয় মৃতু্য' বিশেষ কোনো জায়গার এমন বার্তা নিয়ে এলে এরশাদ রক্তপাতের বদলে সাংবিধানিক পথ গ্রহণ করে পদত্যাগের সিদ্ধানত্দ নেন।
পদত্যাগের খবর ভয়েস অব আমেরিকা প্রচার করলে রাজপথে নেমে আসে লাখো জনতার ঢল। পুলিশ বৈঠকে এ খবর পেয়ে কর্নেল জাফর ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার সরদার আমজাদকে বিদায় দিয়ে পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে উত্তরায় আত্দগোপনে চলে যান। সরদার আমজাদ পুলিশের পোশাক পরে মই বেয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের ভেতর দিয়ে চলে যান। ওই দিন সকালে জিনাত হোসেন এরশাদকে ফোন করে জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। হাসিনা বলেছেন, তুমি পদত্যাগ করো, তিনি দেখবেন।
এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার আগে তার সেনা সদরের বাসভবনে জরুরি বৈঠক বলে কাজী জাফর আহমেদ, ব্যারিস্টার মওদুদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসেন। রাজপথে লাখো জনতা নেমে আসায় এরা অবরুদ্ধ হন। ভোররাতে পুলিশ তাদের বিভিন্ন স্থানে পেঁৗছে দেয়। ৪ তারিখ সন্ধ্যার কেবিনেট বৈঠক থেকে এরশাদ সেনাপ্রধান নুরুদ্দীন খানকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। নুরুদ্দীন তখন ডিওএইচএসে তার শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। এর ১৫ দিন আগে নুরুদ্দীন এরশাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন।
এরশাদ মেজর জেনারেল (অব.) সালামকে সেনাপ্রধান করতে চেয়েছিলেন। কিন' ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের থিফ অব বাগদাদ খ্যাত মন্ত্রী মাহমুদুল হাসান, রওশন এরশাদ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের দিয়ে এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এরশাদ বাধ্য হন নিরীহ ভভ্র বিনয়ী লে. জেনারেল নুরুদ্দীন খানকে সেনাপ্রধান করতে। এরশাদের জীবনে '৮৬র পার্লামেন্ট ভাঙার চেয়েও এটি ছিল বড় ভুল বলে তিনি মনে করেন।
এরই মধ্যে বিবিসিতে এরশাদ বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আবার তিনি ক্ষমতায় ফিরবেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলো ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পায়। দুই নেত্রী তাকে জেলে নেয়ার দাবি জানান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয়। সূত্র জানায়, নুরুদ্দীন কাঁপতে কাঁপতে তখনকার শেখ হাসিনার ডান হাত আমির হোসেন আমুকে গিয়ে বলেছিলেন, এরশাদকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করতে না পারলে অঘটন ঘটে যেতে পারে।
আমুর কাছ থেকে এই বার্তা পেয়ে দুই নেত্রী সাহাবুদ্দীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পুলিশ দিয়ে সেনাভবনের বাসা থেকে এরশাদকে গুলশানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মেধাবী দক্ষ সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফারুক আহমদ চৌধুরী সহানুভূতি দেখিয়ে এরশাদের সঙ্গে গুলশানের বাড়ি পর্যনত্দ যান। এই অপরাধে তাকে ওয়াশিংটন পাঠিয়ে দেয়া হয়। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এই সম্ভাবনাময় সেনা কর্মকর্তাকে অবসর দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনেন। মুক্তিযুদ্ধে আহত মেজর জেনারেল (অব.) হারুন আহমদ চৌধুরীর ছোট ভাই হচ্ছেন এই ফারুক আহমদ চৌধুরী।
চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে কেবিনেটে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষণার সিদ্ধানত্দ নিতে গিয়ে এরশাদ যেমন চীনাপন্থীদের বাধার মুখে ব্যর্থ হন তেমনি তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে দেশকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারেননি। '৮৬ সালের সংসদেই এরশাদ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, কোরবান আলী, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন বাবলুরা এর পক্ষে ছিলেন। দেশের বাইরে থেকে ফিরে আনোয়ার জাহিদ বিলের খসড়া ড্রাফট দেখে চাউর করে দেন। বিশেষ মহল দ্বারা বাধা সৃষ্টি করা হলে তা আর হয়নি।
এটি হলে এরশাদ আরো দুই টার্ম প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, আর বিএনপি হতো বিলুপ্ত রাজনৈতিক দল। '৮৬ সালে আওয়ামী লীগের কেউ কেউ সংসদ থেকে পদত্যাগের কথা বললেও হাসিনা রাজি হননি। জামায়াত পদত্যাগ করায় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এরশাদকে খবর দেয়া হয় আওয়ামী লীগও পদত্যাগ করবে। তাই তিনি আগাম সংসদ ভেঙে দেন। এরশাদের একনায়কতন্ত্র, প্রণয় কাহিনী ও দুর্নীতি তার পতনের কারণ বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল ইসলামসহ জগদ্বিখ্যাত অনেক মানুষেরই গোপন জীবন থাকে। মাও সেতুং, সুকর্ন, কেনেডি, আইয়ুবের নারী প্রীতি নিয়ে মুখরোচক কথাবার্তা দুনিয়া জুড়ে হয়েছে।
মানুষ তবু চায় তার নেতার চরিত্র হবে তার চেয়ে উন্নত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মতো মুক্ত সমাজে ক্লিনটন নৈতিক প্রশ্নে ঝড়ের মুখে পড়েছিলেন। তবু আমি মনে করি, এরশাদ তার ব্যক্তিগত জীবনকে একানত্দ গোপন রাখলেই পারতেন। এরশাদ দুর্নীতি করেছেন সবাই জানে, যদিও বিএনপি সরকার ফেয়ারফ্যাক্সকে এনে তদনত্দ করে কিছু বের করতে পারেনি। তিনি স্বজনপ্রীতি করেছেন, গলফ ক্লাবে রউফ চৌধুরীর সঙ্গে বোঝাপড়া হয়ে র্যাংগস ভবন ভাঙা হয়নি। তার কিছু মন্ত্রী দুহাতে লুটেছেন। কেউ কেউ চেয়ারে দুই পা তুলে ড্রয়ার খুলে মুদি দোকানির মতো টাকা নিয়েছেন। তারপরও অনেকে রাজনীতিতে মতিয়া চৌধুরীকে সততার মডেল মনে করেন। মতিয়া চৌধুরীই সৎ মন্ত্রী এতে সন্দেহ নেই। কিন' সততার তালিকা দেশে তিনি একা নন। দেশে এখনো হাজার হাজার সৎ রাজনৈতিক কর্মী রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে তাকালে সৎ জনপ্রতিনিধিই দেখা যেত। এখনো সুলতান মনসুরের মতো সাদামাটা জীবনের সৎ রাজনীতিক কর্মী দেখা যায়। মান্না, আখতারের নামও অনায়াসে বলা যায়। ডাকসুতে এরা তিনজনই মতিয়ার উত্তরসূরি। কিন' সসত্দা শাড়ি পরে বিদেশি মেহমানদের সামনে হাজির হয়ে কিংবা রাসত্দায় গড়াগড়ি খেয়ে কর্মীদের বাহবা নেয়া যায়, মন্ত্রীর ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায় না।
এরশাদ সরকারের মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খানের বাসায় মোটা চালের ভাত, ডাল ও শবজি খেয়ে অধ্যাপক ডা. তাহির রসিকতা করে বলেছিলেন, এই যদি হয় অবস্থা তাহলে মন্ত্রী কেন। সুদর্শন, স্মার্ট কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম তিন সরকারের মন্ত্রী থাকাকালে ফ্যাশনে সচেতন হলেও শশুরবাড়ি ছাড়া তার কোনো আশ্রয় নেই। বন্ধুরা রসিকতা করে বলেন, বউ বের করে দিলে কাকরাইল মসজিদে গিয়ে তবলিগ করতে হবে। সুনীলগুপ্তও এরশাদের সৎ মন্ত্রী ছিলেন।

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla