Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

নির্বাচন চাই তবে ১/১১ আগের অবস্থায় ফিরতে চাই না।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক-সংলাপ শেষ হয়েছে। এখন আমরা সবাই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আনুষ্ঠানিক আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও তাঁর সহযোগীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় সংলাপের জন্য। তিনি এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন। তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে তিনি দু-এক দিনের মধ্যে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নির্বাচন-উত্তর ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাব্য একটি পরিকল্পনার কথা বলবেন বলে জানা গেছে।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন হবে বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর সুত্রগুলো নিশ্চিত করছে। সুত্রগুলোর মতে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ বা অনিশ্চয়তা নেই। আমরা শুরু থেকেই এ কথা বলে আসছি যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ গঠন এবং জনগণের নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে ভালো অন্য কোনো শাসনব্যবস্থাও নেই।

তবে আগামী সাধারণ নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সে জন্য শুধু সরকার বা সশস্ত্র বাহিনীই নয়; রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজসহ সবাইকেই গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। সবাইকে এই দায়িত্ব নিতে হবে যে, আগামী নির্বাচনের পর যেন অতীতের মতো নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান, শুরু থেকে সংসদ বর্জন, দেশকে আবার হরতাল-অবরোধ-সহিংসতার পথে নিয়ে যাওয়া না হয়। এ ক্ষেত্রে দেশের সর্বস্তরের মানুষের বিরাট ভুমিকা রয়েছে।কোথায় যাচ্ছিল দেশ

দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর বিগত তিনটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে দেশের সমগ্র পরিস্িথতি ক্রমশ এক ধ্বংসের পথে চলেছিল। পরপর বড় দুই দলের দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর দলীয়করণের মধ্য দিয়ে দেশের শাসনব্যবস্থাকে অকেজো করে তুলেছিল। এভাবেই বাংলাদেশ প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা থেকে বেগম খালেদা জিয়া−এই দুই আমলে বিশ্বে দুর্নীতিতে পাঁচবার শীর্ষস্থান অর্জনের কুখ্যাতি পেয়েছিল বাংলাদেশ।

বিগত দেড় বছরে অতীতের দুর্নীতির যে চিত্র আমরা জানলাম, তা অবিশ্বাস্য, ভয়ঙ্কর! ইতিমধ্যে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আইনকে যাঁরা এত দিন নিজেদের খেয়ালখুশিতে পদদলিত করেছেন, তাঁদের শাস্তি হচ্ছে। যদিও অনেকে এখনো এর বাইরেও আছেন। তবে সব বিচার, সব শাস্তি দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। তার পরও সেই ধারণা অনেকটা পাল্টে গেছে যে, আমাদের রাজনৈতিক নেতা, উচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বড় ব্যবসায়ীরা সব আইনের ঊর্ধ্বে।

সর্বশেষ বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং প্রশাসনসহ সর্বত্র দলীয়করণের মাধ্যমে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে দেশের দুর্গতি চরমে পৌঁছেছিল। এ সময়েই হরকাতুল জিহাদ ও জেএমবির মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যাপক সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। দীর্ঘ সময় জোট সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে দেশি-বিদেশিদের চাপে শক্ত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

বিএনপির এসব মহা দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের সহযোগী ছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের মতো ধর্মের নামে পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো। এসব দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে মামলা চলছে, বিচারও হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সাবেক সাংসদ জেলে আছেন। আরও দুজনের বিরুদ্ধে মামলা আছে। সর্বশেষ দলের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে বড়পুকুরিয়া ও গ্যাটকো মামলায় আসামি করা হয়েছে। সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

বাংলাদেশকে প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার মোটামুটি পাকা ব্যবস্থা করে ফেলেছিল চারদলীয় জোট সরকার। যেটুকু বাকি ছিল, তা-ও প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিল রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পুতুল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তায় পরিচালিত ড. ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সব কর্মকান্ডের লক্ষ্য ছিল যেকোনো প্রক্রিয়ায় বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকারকে আবার ক্ষমতায় আনা। সে জন্য সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনকে ব্যবহারের চেষ্টাও করা হয়েছিল। দেশবাসী, রাজনৈতিক শক্তি আর নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ও বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে। সেসব দিনের ভয়ঙ্কর সব কথা এখন আমরা অনেকেই ভুলে যাচ্ছি। রাজনীতিবিদদের অনেকে এখন উল্টো সুরে কথা বলছেন, যেন দেশে ১১ জানুয়ারির পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন ছিল না, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো ভুল বা বাড়াবাড়ি ছিল না, কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। ভাবখানা এমন যে, দ্রুত একটা নির্বাচন দিয়ে অতীতের ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

১১ জানুয়ারি, ২০০৭: ভুলে যাওয়া চলবে নাআমরা জানি, ১১ জানুয়ারি (২০০৭) বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশকে ভয়ঙ্কর সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। এটা ছিল তাদের ‘মন্দের ভালো’ বা ‘শেষ আশ্রয়’-এর মতো একটি পদক্ষেপ।

নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বিরাট স্বস্তি ফিরে এসেছিল এবং ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের পথ পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে বিপুল আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্রুত কিছু বড় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। অত্যন্ত দ্রুত প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থাকে পৃথক করা, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পুনর্গঠন, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রভৃতি পদক্ষেপ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। একই সঙ্গে আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস বিকৃতিকে সংশোধন এবং পাঠ্যপুস্তকে তা পুনঃস্থাপন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ করেছিল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন দেশব্যাপী একটি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ দ্রুত শুরু করে। এখন পর্যন্ত তা সফলভাবে করে চলেছে। এ কাজে সেনাবাহিনীর বিশেষ ভুমিকা প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করে। এই কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনে পরিবর্তন আনা হয়। তারা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কমিশন কাজ শুরু করে। উপেক্ষিত পুলিশ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। মানবাধিকার কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। তথ্য অধিকার আইন নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু হয়। আসলে এ ধরনের প্রতিটি কাজ ও উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকের সমালোচনা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের এত কিছুতে হাত দেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু এসব বিষয়ে অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলোর চুড়ান্ত নেতিবাচক ভুমিকা মনে করলে এটা বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, এ সময়ে এসব উদ্যোগ না নিলে তা ভবিষ্যতেও হতো না।বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করলেও শুরুতে উপদেষ্টাদের মধ্যেই সমস্যা ছিল। তখনই আমরা বলেছিলাম, উপদেষ্টাদের তালিকা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। উপদেষ্টাদের কার্যক্রম ও বক্তব্য নিয়ে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই এটা দেখা যায় যে, নানাভাবে সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলোও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা দেখি, জনপ্রশাসন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে একই সুরে কাজ করছে না।

সরকার যখন প্রশ্নের মুখেনতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম, শুরুতেই দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দুরে সরিয়ে রাখার বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসতে বাধা সৃষ্টি করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে (সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত) পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সফল হয়নি, যদিও বেগম জিয়া তাঁর ছোট ছেলে আরাফাতকে নিয়ে বিদেশে যেতে সম্মত হয়েছিলেন। প্রায় একই সঙ্গে আমরা লক্ষ করলাম, সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী একটি মহল নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হয় এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিবর্তন আনতে নানামুখী চেষ্টা নেয়। তবে একশ্রেণীর সুবিধাবাদীকে নিয়ে দল গঠিত হলেও তা অগ্রসর হতে পারেনি। এখন তাদের প্রতি সে সমর্থনও নাকি আর নেই। একসময় সরকারের ভেতর গণভোট ও জাতীয় সরকার নিয়েও নানা আলোচনা ছিল। অন্যদিকে, প্রধান দুই দলের নেতারা দলের ভেতর পরিবর্তন আনতে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বললেও সেগুলো আর এগোয়নি। বিএনপি বিভক্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিএনপির একাংশকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানালে তা আরেক রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার খালেদাপন্থী বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করেছে। এখন সাধারণভাবে সরকারের ভেতর ও বাইরের অনেকেই মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ ধরনের উদ্যোগগুলো সঠিক ছিল না। এসব কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে প্রধান দুই দলের নেতা-কর্মীদের মনে সন্দেহ-অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। দেশের সচেতন মহলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তাদের সমর্থক মহলের ভুমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

দুই নেত্রীর বিচার দ্রুত শেষ হোকপ্রধান দুটি দলই বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে। দলের কর্মী-সমর্থকেরাও তাঁদের মুক্তির দাবিতে কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন। দুই দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐক্য বা সমঝোতার একটা চেষ্টা আছে। বিএনপি প্রথম থেকেই দুই নেত্রীর মুক্তি দাবি করছে। আওয়ামী লীগ সে রকম এখনো করেনি।

এদিকে শেখ হাসিনার দুর্নীতি মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত শুরু করা হয়, খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা হয়নি। গত অক্টোবরে গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার প্রথম অভিযোগপত্র মাত্র সেদিন দাখিল করা হলো। এখনো বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। এ নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা বলব, নির্বাচনের আগেই দুই নেত্রীর বিচার শেষ করতে হবে। বিচারে যদি নিরপরাধ প্রমাণিত হন, তাহলে তাঁরা যেন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান; আর শাস্তি হলে সেটাও তাঁদের দলকে মানতে হবে।

দেশের সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দুই নেত্রীর অবস্থান নিয়ে শুধু দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা আলোচনা আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের আলোচনায়ও বিষয়টি উঠেছে। এ ক্ষেত্রে আমরা বলব, দুই নেত্রীর বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে, কোনো প্রভাব সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য হবে না। একই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান কী হবে, সেটা নিয়ে দলীয় নেতৃত্ব ও তাঁদের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে কি না, সেটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিবেচনা করতে পারে। দুই নেত্রী সিকি-শতাব্দী ধরে দলীয় নেতৃত্বে আছেন। তাঁরা কি আগের মতোই চলবেন? তাঁরা কি অতীতের দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসবেন?

নির্বাচন, তারপর কী?নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, নির্বাচন কমিশন, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সবাই মিলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রাক-সংলাপের পর আনুষ্ঠানিক সংলাপের মধ্য দিয়ে আমরা আশা করতে পারি যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আবার সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারব।

তবে এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সামনে চলে আসে, তা হলো শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকার হলেই কি আমরা কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে পাব? এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ সবাই এত দিন বলে আসছিলেন যে, আমরা ১১ জানুয়ারির (২০০৭ সাল) আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। অর্থাৎ সেই নৈরাজ্য, সেই ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক অতীতে ফিরে যেতে চান না তাঁরা। এখন সে কথাও আর বলেন না। সে জন্য আমরা মনে করি, নির্বাচিত সরকারের অধীনে দেশে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক (নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রভৃতি) সংস্কারগুলোকে রক্ষা এবং এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে। কারণ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো দুর্বল, পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। নির্বাচনের পর নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে এসব কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে যেসব করণীয় রয়েছে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর যে অবস্থান লক্ষ করছি, তাতে আমরা এখনো আশাবাদী হতে পারছি না। আমরা মনে করি, গণতন্ত্রকে সংহত করতে, অতীতের ভুলগুলো থেকে বের হয়ে আসতে এবং গত প্রায় দেড় বছরের বড় বড় সংস্কার বা পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদের আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে হবে। এই বিষয়ে একমত হতে হবে যে, নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিবর্তনীয় ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয়েছে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে তা সংসদের মাধ্যমে অনুমোদন দিতে হবে। অতীতেও এমন নজির আছে। এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক দলসহ সব পক্ষের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হতে হবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার পরিকল্পনাও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। উপজেলা নির্বাচনও তারা করতে চায়। অতীতে কখনোই এ নির্বাচন হতে পারেনি। ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক সরকার এ কাজটি করবে, এমন ভরসা পাওয়া যায় না। সে জন্যই বর্তমান সরকারের সময়ে এ নির্বাচন হলে ভালো হয়। উপজেলা নির্বাচন প্রয়োজনে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেও হতে পারে একই দিনে।

আমরা আশা করব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সংলাপে এসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যুগপৎ সংলাপ বা মতবিনিময় হতে পারে। দেশের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিতে দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এখন খুব প্রয়োজন। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের মসৃণ পথে উত্তরণের জন্য সব পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হতে হবে।

এগিয়ে যেতে সাহায্য করুনবাংলাদেশ এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্িথতি এখনো জটিল অবস্থায় রয়েছে। বিগত বছরে উপর্যুপরি বন্যা আর সিডরে মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, বিশেষ করে খাদ্য ও দ্রব্যমূল্য পরিস্িথতি সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ মানুষ যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। ইতিমধ্যে আলু ও বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশের কৃষকসমাজসহ সব মানুষ উঠে দাঁড়াচ্ছে। আজকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আমাদের দাবি হলো, দেশ ও দেশবাসীকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন।

শুরু হোক নবযাত্রাডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হোক, সে জন্য নির্বাচনের সব বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আসতেই হবে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণকেও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। তবে কেউ যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায় তা হলে তা কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। দেশ আবার সহিংস রাজনীতির পথে ফিরে যেতে পারে। সে জন্য আমরা বারবার বলি, আমরা ১১ জানুয়ারির আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চাই না।

মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো।

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla