Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

সর্বগ্রাসী ঘুষ

ট্রান্সপারেন্সির রিপোর্ট : সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বাংলাদেশীদের; ঘুষ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে পুলিশ, তারপরই বিচারব্যবস্থা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সরকারি সেবা পেতে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে। আর এখানে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় পুলিশকে। এর ঠিক পরপরই রয়েছে বিচার বিভাগ। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস'া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) গতকাল এক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মোট সাড়ে সাত হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জরিপকাজটি চালানো হয়। এতে অংশগ্রহণকারী প্রতি তিনজনের একজন বলেছেন, সরকারি সেবা পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। গত তিন বছরে এ ক্ষেত্রে পরিসি'তির অনেক অবনতি হয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
‘ডেইলি লাইভস অ্যান্ড করাপশন : পাবলিক ওপিনিয়ন ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশীদের ৬৬ শতাংশ বলেছেন, সরকারি ৯টি সেবা পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। ভারতে এই হার ৫৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫০ শতাংশ, নেপালে ৩২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২৩ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের উত্তরদাতাদের ৭৫ শতাংশ বলেছেন, পুলিশি সেবা পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। ৬৪ শতাংশ বলেছেন, বিচার বিভাগীয় কাজে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এই হার রেজিস্ট্রি ও পারমিট খাতে ৪৯ শতাংশ, ভূমি খাতে ৪৮ শতাংশ, কর রাজস্ব খাতে ৪০ শতাংশ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরি সেবা খাতে ৩৬ শতাংশ, চিকিৎসা খাতে ১৮ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ১৫ শতাংশ।
জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৩৯ শতাংশ বলেছেন, গত ১২ মাসে কোনো না কোনোভাবে এই সেবাগুলো পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ প্রদানকারীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশীরা (৬৬ শতাংশ) ভারতীয় (৫৪ শতাংশ) ও পাকিস্তানি (৪৯ শতাংশ)। ৬২ শতাংশ মনে করেন গত তিন বছরে তাদের দেশে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে এই ধারণা সবচেয়ে বেশি ভারত ও পাকিস্তানিদের মধ্যে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রতি চারজনের তিনজনই বলেছেন গত তিন বছরে দুর্নীতি বেড়েছে।
তবে ছয় দেশেরই উত্তরদাতারা বলেছেন, তাদের সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে পুলিশকে। এর পরপরই যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা তারা উল্লেখ করেছেন পর্যায়ক্রমে সেগুলো হলো- ভূমি, রেজিস্ট্রি অ্যান্ড পারমিট সেবা, কর-রাজস্ব, কাস্টমস, জুডিশিয়ারি (বিচার বিভাগ), নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা (ইউটিলিটি), শিক্ষাব্যবস'া এবং স্বাস'্যসেবা।
কেন মানুষ ঘুষ দেয় : এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের উত্তর বেরিয়ে এসেছে। প্রথম উত্তরটি- সেবাটি পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতেই হবে বলে ঘুষ দিতে হয়েছে; দ্বিতীয় উত্তরটি ছিল, কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলা এড়াতে ঘুষ দেয়া হয়েছে এবং তৃতীয় উত্তরটি ছিল- কাজটি দ্রুত করার জন্যই এটি করা হয়েছে। নেপালের ৭৩ শতাংশই বলেছেন, সেবাটি দ্রুত পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হয়েছে। একই ধরনের কথা বলেছেন ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উত্তরদাতারা। অপর দিকে বাংলাদেশের উত্তরদাতা বলেছেন, সেবাটি পেতে হলে ঘুষ দিতেই হবে বলে ঘুষ দেয়া হয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ করবে কে : জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়, দুর্নীতি কে প্রতিরোধ করতে পারবে- এর জন্য তারা কার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনীতিবিদদের কথাই বলেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর বিশ্বাস রাখা যায় বলেছেন মোট তিনটি দেশের নাগরিকেরা। দেশ তিনটি হলো বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা। দুর্নীতি প্রতিরোধে মিডিয়াকে দায়িত্ব দিতে চান ভারত ও নেপালের লোকজন। অপর দিকে পাকিস্তানের বেশির ভাগ লোক বলেছেন, আসলে কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না।
উত্তরদাতাদের ৪০ শতাংশ বলেছেন, দুর্নীতি দমনে তাদের সরকার যে ব্যবস'া নিচ্ছে তা অকার্যকর। ৩৯ শতাংশ অবশ্য এই ব্যবস'াকে কার্যকরও বলেছেন। অন্য দিকে ২০ শতাংশ কার্যকর বা অকার্যকর কোনোটি বলতেই রাজি হননি। বাংলাদেশের ৬১ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কার ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, দুর্নীতি দমনে তাদের সরকারকে আরো কার্যকর হতে হবে বা সরকার কার্যকর রয়েছে। পাকিস্তানের ৭৩ শতাংশ বলেছেন, দুর্নীতি দমনে তাদের সরকার কার্যকর নয়; ১২ শতাংশ বলেছেন, কার্যকর রয়েছে। ৭৭ শতাংশ বলেছেন, গত তিন বছরে পাকিস্তানে দুর্নীতি বেড়েছে।
দুর্নীতি বাড়ছে : প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপে উত্তরদাতাদের ৬২ শতাংশ বলেছেন, গত এক বছরে দুর্নীতি বেড়েছে। ২০ শতাংশ বলেছেন, দুর্নীতির পরিসি'তি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ১৯ শতাংশ মনে করেন এ সময় দুর্নীতি কমেছে।
ঘুষ দেয় পুরুষেরা বেশি : জরিপে দেখা গেছে, ঘুষদাতাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ পুরুষ ও ৩৬ শতাংশ মহিলা; ৪৫ শতাংশ উচ্চ আয়ের এবং ৩৭ শতাংশ নিম্ন আয়ের লোকজন।
জরিপে বাংলাদেশের মোট এক হাজার ৪৯ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এই কাজটি করেছে টিআইর এদেশীয় সংস'া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জরিপের সময়কাল ছিল জুলাই ২০১০ থেকে চলতি ২০১১ সালের জুন মাস পর্যন্ত।
http://www.dailynayadiganta.com/details/18168

JUST VIEWED

Last viewed: