Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Sonali Bank, Hallmark scam

সোনালী ব্যাংকের কয়েক হাজার নথি হলমার্কের দপ্তরে

সোনালী ব্যাংকের নিরীক্ষা বিভাগ ব্যাংকটির পাঁচ হাজার ৬০০ নথি উদ্ধার করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দপ্তর থেকে। এর মধ্যে বেশির ভাগ নথিই উদ্ধার হয়েছে হলমার্ক গ্রুপের দপ্তর থেকে।

নথিপত্রে দেখা যায়, নয় হাজার ১৭১টি স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন হোটেল) শাখা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ‘ঋণসুবিধা’ দিয়েছে। অথচ এ-সংক্রান্ত অনেক নথিই এখন ব্যাংকে পাওয়া যাচ্ছে না।

সোনালী ব্যাংকের করা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও একটি তথ্য দেওয়া হয়েছে। যেমন, রূপসী বাংলা শাখায় সোনালী ব্যাংকেরই একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ‘আউটসোর্সিং’ জনবল হিসেবে কাজ করেন। এই লোকটির বেতন দেয় ওই শাখা থেকে ঋণসুবিধা নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপও রয়েছে। ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ওই লোকের ওপর শাখার ছিল অতিশয় নির্ভরতা। অথচ তিনি রমনা শাখায় থাকাকালীন বিভিন্ন অনিয়মের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন।

এ রকম অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে সোনালী ব্যাংকে। এসব ঘটনায় খোদ সোনালী ব্যাংকই বিস্মিত। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ধরনের কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘ব্যাংকিং জগতে এসব বিস্ময়কর ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, হলমার্ক নিয়ে সোনালী ব্যাংকে এত সব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল অথচ কেউ জানতে পারল না, এটাও তো বিস্ময়কর ঘটনা।

কাকতালীয় কিছু ঘটনাও আছে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে। রূপসী বাংলা শাখার ওপর তদন্ত করতে গত মে মাসে পরিদর্শক দল পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তদন্ত চলাকালে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। তিনি তদন্ত দলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন, নিজের একটি ভিজিটিং কার্ডও দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গতকাল বুধবার সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার পাঁচজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সে সময় একাধিক কর্মকর্তা হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে বাইরের প্রভাবশালী এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন। সে সময় সাংবাদিকদের কাছে সাইদুর রহমান নামের একজন কর্মকর্তা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর নাম উচ্চারণ করে বলেন, ‘তিনি নিয়মিত রূপসী বাংলা শাখায় যেতেন।’ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নিরীক্ষা চলাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা দলকে হলমার্ক নিয়ে বেশি কিছু না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

সব মিলিয়ে রূপসী বাংলা শাখা থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের মোট পরিমাণ তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ একাই নিয়েছে দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি ব্যাংকে একটি শাখায় এবং একটি প্রতিষ্ঠানের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ব্যাংকিং জগতে বিরল। এ রকম কোনো উদাহরণ কেউ-ই দিতে পারেননি।

মূলত সোনালী ব্যাংকের এই শাখা ছিল হলমার্ক গ্রুপের জন্য অভয়ারণ্য। অর্থ আত্মসাতের সব ধরনের সুযোগই করে দেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যও জড়িত ছিলেন এর সঙ্গে। বর্তমান সরকারদলীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরও সংশ্লিষ্টতা আছে এই ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুরোধে হলমার্ক কেলেঙ্কারি এখন তদন্ত করছে দুদক। বাংলাদেশ ব্যাংক দুদককে লেখা এক চিঠিতে এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের পর্ষদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতেও অনুরোধ করেছে। সোনালী ব্যাংকের অন্যতম পরিচালক, আওয়ামী লীগের নেত্রী জান্নাত আরা হেনরির বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আরও কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের পরিচালক হয়েই কেউ কেউ বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
সোনালী ব্যাংক গতকাল হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা পাঠিয়েছে। ব্যাখ্যায় সবকিছুর জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। ব্যাংকটি ব্যাখ্যায় বলেছে, ‘পরিচালনা পর্ষদ মনে করে, ব্যাংকের কিছু অসাধু ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া ঋণপত্রসহ (এলসি) নানা জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে।’

ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের প্রতিটি শাখা বছরে দুবার নিরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা নিরীক্ষা করা হয়নি। নিরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। নিয়মিত নিরীক্ষা করা হলে অনিয়ম বেরিয়ে আসত। আবার নিয়মানুযায়ী, কোনো কর্মকর্তার এক শাখায় তিন বছরের বেশি থাকার কথা নয়। রূপসী বাংলা শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ কে এম আজিজুর রহমানকে পদোন্নতি দেওয়ার পরও ওই শাখায় রাখা হয়। প্রায় পাঁচ বছর তিনি কর্মরত ছিলেন। তাঁকে বদলির দায়িত্ব ছিল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি)। তৎকালীন এমডি কেন এই কর্মকর্তাকে বদলি করেননি, তা পর্ষদের বোধগম্য নয়। অথচ পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনা ছিল, তিন বছরের মধ্যে যেকোনো কর্মকর্তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এই নির্দেশ পরিপালন করা হয়নি।
আবার এ কে এম আজিজুর রহমানের প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে অনিয়মের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সোনালী ব্যাংকের নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।’

সূত্র জানায়, সাবেক এমডি হুমায়ুন কবিরের মেয়াদ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পর্ষদের একাধিক সদস্য। বাইরের প্রভাবশালীরাও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন। এই সময়ের মধ্যেই নানা ধরনের অনিয়ম আর দুর্নীতি ঘটে হলমার্ক নিয়ে। সোনালী ব্যাংকসংশ্লিষ্ট অনেকেই এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) সংশ্লিষ্টতা বেশি বলে মনে করেন। ওই ডিএমডি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ট্রুথ কমিশনে গিয়ে দুর্নীতির বিবরণ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

সূত্র আরও জানায়, ডিএমডিকে প্রথমে আরেকটি ব্যাংকে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যাংক অতীত ইতিহাসের জন্য তাঁকে রাখতে চায়নি। পরে তাঁকে সোনালী ব্যাংকে বদলি করা হয়।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পর্ষদের সুপারিশে ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি নিয়োগ দেয় সরকার। এখন সেই এমডি বা ডিএমডি যদি ব্যর্থ হন, তাহলে এর দায়দায়িত্ব নিয়োগকর্তার। সুতরাং, নিয়োগপদ্ধতির সংস্কার করাও এখন প্রয়োজন।

পর্ষদ সবকিছুর দায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, ‘সোনালী ব্যাংকের সংঘবিধি অনুযায়ী, যাবতীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড দেখভালসহ ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের। ফলে সোনালী ব্যাংকের সংঘটিত অনিয়মাদির সামগ্রিক দায়দায়িত্ব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপরই বর্তায়।’

সূত্র জানায়, রূপসী বাংলা শাখা থেকে যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তার একটি পর্ষদের একজন সদস্যের আত্মীয়।

হলমার্ক কেলেঙ্কারির দায় এখন একে অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। একটি মহল হলমার্ক গ্রুপকে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। হলমার্ক গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় লোকজনও সরকারের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘ধীরে চলো নীতি’ নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি কেবল অনিয়ম নয়, বরং জালিয়াতির ঘটনা। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও মনে করেন, এই ঘটনার অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত।

তারিখ: ৩০-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

Comments

সোনালী ব্যাংকের ‘জালিয়াত শাখা’!

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার কাছেই ইউরেকা সালেহা প্যালেস। এই ভবনের পাঁচতলার একটি ফ্ল্যাটে বসে তৈরি করা হয়েছে হাজার হাজার ভুয়া নথিপত্র। এর মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার ভুয়া ঋণপত্রসহ জাল-জালিয়াতি করে হল-মার্কসহ পাঁচ প্রতিষ্ঠান আত্মসাৎ করে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি।ওই ফ্ল্যাটের ভাড়ার চুক্তিপত্রে টিএন ব্রাদার্সের মালিক তাসলিম হাসান ও হল-মার্ক গ্রুপের কর্ণধার তানভীর মাহমুদের নাম থাকলেও এখানে যাতায়াত করতেন প্যারাগন গ্রুপের মালিক সাইফুল ইসলাম রাজা ও নকশি নিট কম্পোজিটের মালিক আবদুল মালেক। অর্থ আত্মসাতে এই অপকর্মে সঙ্গ দিয়েছিলেন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার ওই সময়ের ব্যবস্থাপক (বর্তমানে বরখাস্ত) আজিজুর রহমান।প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলা শাখার ঠিক উল্টো দিকেই (শেরাটন মোড়) নয়তলা ‘ইউরেকা সালেহা প্যালেস’-এর পাঁচতলার দক্ষিণ দিকের বি-৪ ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দৃশ্যত সোনালী ব্যাংকের আরেকটি শাখা খোলা হয়েছিল। এই ফ্ল্যাটে কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল সব ছিল। এখানে সোনালী ব্যাংকের প্রচুর নথিপত্র এনে কাজ করা হতো। রাতে ব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান সেখানে গিয়ে নথিপত্রে সই করতেন। তবে এই ‘বিশেষ শাখা’র ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন তানভীরের ভায়রা ভাই ও হল-মার্কের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ।ফ্ল্যাট ও ভবনটির মালিক আবদুর রশীদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ব্যাংক ব্যবস্থাপক নিজেই। অগ্রিম ভাড়া বাবদ দুই লাখ টাকাও দেন তিনি। অফিস হিসেবে ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটটির মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ভাড়ার চুক্তিপত্রে সই করা তাসলিম হাসান ও তানভীর মাহমুদকে কখনোই দেখেননি বাড়ির মালিক আবদুর রশীদ। আবদুর রশীদ ১৮ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেওয়া হয় দুই বছরের জন্য। কিন্তু সেখানে তাঁরা ছিলেন ওই বছরের জুন পর্যন্ত। তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর আগে একটি হিসাব খোলার সুবাদে তিনি প্রায়ই সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় যেতেন। এ কারণে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আজিজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত বছরের শুরুতে আজিজুর রহমান নির্মাণাধীন ইউরেকা সালেহা প্যালেসের একটি ফ্ল্যাট ব্যাংকের শাখা অফিস হিসেবে ভাড়া নিতে চান। তখন পাঁচতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে।

আবদুর রশীদ জানান, এই কার্যালয়ে জনি ও জালাল নামের দুই কর্মচারীকে তিনি কাজ করতে দেখেছেন। আজিজুর রহমান প্রায়ই হল-মার্ক গ্রুপের তুষারকে নিয়ে সেখানে যাওয়া-আসা করতেন। সোনালী ব্যাংকের প্রচুর ফাইলপত্র এখানে আনা হতো। তবে ব্যাংকের কোনো সাইনবোর্ড টাঙানো হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জালাল এখনো সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখাতেই পিওন হিসেবে কাজ করছেন। যোগাযোগ করা হলে জালাল বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপকের নির্দেশেই তিনি ওই বাসায় রাতে থাকতেন। ওই ফ্ল্যাটে নকশির মালেক, প্যারাগনের রাজা, হল-মার্কের তানভীর ও টিএন ব্রাদার্সের তাসলিম আসা-যাওয়া করতেন। সেখানে কী ধরনের কাজ করা হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজ হতো। কাগজপত্র আমি কী বুঝব? আমি আজিজুর স্যারের নির্দেশে এখানে অফিস শেষে ওখানে রাতে থাকতাম।’ ব্যাংক ব্যবস্থাপক ও অন্যরা তিন মাস নিয়মিত ওই ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা করেছেন।

হল-মার্কের তানভীর ও তাঁর স্ত্রী জেসমিনসহ মোট ২৭ জনকে আসামি করে গত বছরের ৪ অক্টোবর ১১টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামিদের মধ্যে হল-মার্কের সাতজন ও সোনালী ব্যাংকের ২০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। রূপসী বাংলা শাখা থেকে হল-মার্ক দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে এসব মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া টিএন ব্রাদার্স ৬৮৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, প্যারাগন ১৪৪ কোটি ৪৪ লাখ, ডিএন গ্রুপ ২৮ কোটি ৫৪ লাখ এবং নকশি নিট গ্রুপ ৬৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদক আরও ২৬টি মামলা করেছে।

এ পর্যন্ত হল-মার্কের তানভীর, তুষার ও জেসমিন এবং সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আতিকুর রহমান, মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মীর মহিদুর রহমান, জিএম শেখ আলতাফ হোসেন ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা এখন কারাবন্দী। অন্যরা পলাতক। আর জেসমিন জামিনে রয়েছেন।

এসব বিষয়ে দুদকের তদন্ত দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইতিমধ্যে ভাড়ার মূল চুক্তিপত্র দুদকে জমা দেওয়ার জন্য ইউরেকা প্যালেসের মালিক আবদুর রশীদ খানকে বলা হয়েছে।

দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগ বলছে, গত বছর হল-মার্কের অনিয়মের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল ব্যাংকের ওই শাখা পরিদর্শন করে দেখতে পায় যে প্রায় আড়াই হাজার নথি গায়েব হয়ে গেছে। এসব নথি ভাড়া করা এই ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়েছিল বলে এখন ধারণা করা হচ্ছে।

তারিখ: আগস্ট ২৩, ২০১৩
সূত্র: প্রথম আলো

বেসিক ব্যাংকে অনিয়ম

রাষ্ট্র খাতের গর্ব করার মতো বেসিক ব্যাংক এখন একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিশেষ আনুকূল্যে’ ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাংকটিকে লাভজনক দেখানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা ২০১২ সালের নভেম্বর সময়ে বেসিক ব্যাংকের তিন শাখাতে অনুসন্ধান চালিয়ে যেসব অনিয়ম পেয়েছেন, সেগুলো বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
বেসিক ব্যাংকের সিংহভাগ আমানত জোগানকারী আবার সরকারের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এই ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো-মন্দ হওয়ার সঙ্গে সরকারের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বেসরকারি খাতকে ঋণ দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এসব ঋণের বড় অংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম। ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাই বেসিক ব্যাংকে আমানত রাখতে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক নির্দেশনাও দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তিনগর, গুলশান ও দিলকুশা শাখার গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য সরাসরি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঋণের অর্থ পরিশোধিত হবে না জেনেও ঋণ প্রদান করা হচ্ছে এবং ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের প্রেক্ষিতে পর্ষদ কর্তৃক আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।’ আবার আরেক ঋণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকের ঋণশৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে মর্মে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের ঋণ পরিশোধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।’
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৬ ও ৪৭ ধারায় যেসব গুরুতর অভিযোগে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ ও সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করার বিধান রাখা হয়েছে, এগুলো সেই ধরনের গুরুতর অনিয়ম। কিন্তু রাজনৈতিক আনুকূল্য বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজটি করছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি ও জনগণের আমানত এখানে খেয়ানত করা হয়েছে। যার এক বিরাট অংশ ফেরত আসবে না। এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, আইন অনুসারে এমডিকে অপসারণ করা এবং পর্ষদ ভেঙে দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা।’
লোকসানি প্রতিষ্ঠান: ২০১২ সালভিত্তিক বেসিক ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বহিঃনিরীক্ষকের (অডিটর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসিক ব্যাংকে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে ২৯৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখা হয়েছে। কিন্তু দুই নিরীক্ষকের (সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোং ও আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরী) পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিতরণ করা ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে আরও ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি থাকতে হবে। আর এটা করা হলে কর পরবর্তী নিট মুনাফা ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা কমে যাবে। ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাংকের কর পরবর্তী নিট মুনাফা দেখানো আছে মাত্র দুই কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফলে ২০১২ সালে কার্যত ব্যাংকের নিট লোকসান ১৩৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার কিছু বেশি।
আবার দুই কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার টাকার যে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে, তা-ও আবার ব্যাংকটির গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদন তথ্য অনুসারে, বেসিক ব্যাংক যে ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার কম নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে, এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা সম্মতি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অতিরিক্ত টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যাংককে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসিক ব্যাংক কোনো নিট মুনাফা দেখাবে না—এ শর্তে ছয় মাসের ছাড় তারা দিয়েছিল।
জালিয়াতির ঋণ সমন্বয়ে আরও লোকসান: বাংলাদেশ দুই ভাবে ব্যাংকগুলোকে নজরদারি করে। ব্যাংকগুলো যে তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠায় সেগুলো থেকে তথ্য উদ্ঘাটন আর সরেজমিন পরিদর্শন। বেসিক ব্যাংকের দুই জায়গাতে সমস্যা পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল বেসিকের পরিচালনা পর্ষদের ১১টি সভা (গত ’১২ সালের এপ্রিল থেকে গত মার্চ) ধরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের তথ্য প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আর তিনটি শাখাতে ২০১১ ও ’১২ সালের বিতরণ ও অনুমোদন করা ঋণ সরেজমিন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬৭টি হিসাবে দুই হাজার ৫৬৪ কোটি টাকার গুরুতর অনিয়ম পায়। এসব অনিয়ম বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সেগুলো ব্যাংক মানেনি। এ ঋণগুলোর বড় অংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম। অধিকাংশ ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল ঋণটি আদায় বা খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা। এগুলো খেলাপি হলে লোকসান অনেক বাড়বে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকাজও পুরোপুরি শেষ করা হয়নি। যেমন, কোনো ঋণের টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে যে হিসাবে জমা হচ্ছে সেই হিসাবটি ঋণ গ্রহণকারীর কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল সরেজমিন করেনি। দেখা গেছে, ভিন্ন কোনো ব্যাংকের হিসাবে টাকাটা জমা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর সুবিধাভোগী অন্য কেউ হতে পারে। কিন্তু, বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে ভিন্ন ব্যাংকের হিসাব খতিয়ে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। উপরন্তু, দু-এক দিন পরই পরিদর্শক দলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আবার এসব ঋণের অনেকগুলোর বাড়তি সময় বা গ্রেস পিরিয়ড আছে। দুই বছর পর কিস্তির অর্থ ফেরত আসার কথা। তখন বোঝা যাবে কী হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে আমানত: বেসিক বাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জুনভিত্তিক ব্যাংকের ১২ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৯৪০ কোটি টাকা সাধারণ গ্রাহকের আমানত। ২৯১ কোটি টাকা আন্তব্যাংক আমানত। প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা হচ্ছে সরাসরি সরকারের আমানত। কিন্তু ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত হচ্ছে সাত হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। বাকি ২৪০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে নেওয়া এফডিআর ও অন্যান্য দায়।
আবার ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অর্থই হচ্ছে সাত হাজার ৩১৪ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের অর্থ মাত্র ১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরাসরি সরকারের আমানতও আছে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার নিজে ও সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৭৬ শতাংশ আমানতে বেসিক ব্যাংক চলছে।
যোগাযোগ করা হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকটির পরিস্থিতি ভালো করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে সর্বতোভাবে সহায়তা করছি। যাতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিছুটা উন্নতিও হয়েছে।’ তিনি বলেন, অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে, এখন সংশোধন করা হচ্ছে।
তবে জানা গেছে, এসব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বেসিক ব্যাংকের পাঠানো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম উদ্ঘাটন পরবর্তী সময়ে ঋণ খেলাপি করার নির্দেশ সমন্বয় করা হলে এ পরিস্থিতি থাকবে না মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), সেতু কর্তৃপক্ষ, বেপজা, ন্যাশনাল হাউজিং, তিতাস গ্যাস, ডেসকো, বেসামরিক বিমান চলাচল, ওয়াসা, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, জীবন বীমা করপোরেশন, রাজউক, বিএডিসি, রাকাব, আরইবি, পিকেএসএফ, যমুনা সার কারখানাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংকে বড় আমানত রেখেছে বা রাখছে।
যোগাযোগ করা হলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, ব্যাংকটিতে তাঁদের আমানত এখন কমিয়ে ৫০০-৬০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকর্তাও জানান, তাঁদের আমানত বেশি ছিল, স্থায়ী আমানতের মেয়াদ পূর্তির পর নতুন করে নবায়ন করা হয়নি। এখন ২০০ কোটি টাকার মতো আমানত আছে।
সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রে একটা অনুপাত আছে। ৭৫ ভাগ আমানত রাখতে হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকে। এত দিন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালীর চেয়ে বেসিক ব্যাংক ভালো ছিল বলে এখানেই বেশি আমানত রাখা হতো। কিন্তু এখন এই ব্যাংকটিই বড় সংকটে।
বক্তব্য নিতে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি ফোনে যোগাযোগ করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

তারিখ: আগস্ট ২১, ২০১৩
সূত্র: প্রথম আলো

সোনালী ব্যাংকে অপকর্ম হয়েছে সন্ধ্যার পর

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক ঢাকা শেরাটন হোটেল) শাখায় সব বড় অপকর্ম হয়েছে সন্ধ্যার পর। গুটি কয়েক কর্মকর্তা রাতে হলমার্ক গ্রুপের অর্থ জালিয়াতির সব পথ বাতলে দেন। সোনালী ব্যাংকের একজন সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এবং রূপসী বাংলা শাখার একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হলমার্ক গ্রুপের হয়ে কাগজপত্র তৈরি করতেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হলমার্ক জালিয়াতির দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার ৭০-৮০ শতাংশ স্বীকৃত বিল তৈরি হয়েছে রাতেই। রূপসী বাংলা শাখা এ সময় খোলা থাকত রাত নয়-দশটা পর্যন্ত। এ সময় ব্যাংকের গুটি কয়েক কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন।
যোগাযোগ করা হলে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রদীপ কুমার দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি গত শনিবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শাখানিয়ন্ত্রকদের বলেছি, অফিসে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে হঠাৎরাতের বেলা একেক শাখাতে আকস্মিক পরিদর্শনে যাবেন। দেখবেন শাখাতে কাজ হচ্ছে না অকাম হচ্ছে।’
কেবল রূপসী বাংলা শাখা নয়, সোনালী ব্যাংকে কয়েক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখা, ঢাকার রমনা শাখা এবং এ দফায় গুলশান শাখাসহ যেসব শাখায় বিভিন্ন সময় বড় অনিয়ম হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই রাতে এসব কর্মকাণ্ড হয়েছে। ঋণপত্র বা স্থানীয় ঋণপত্র দিয়ে পণ্য কেনাবেচা করার নামে স্বীকৃত বিল জালিয়াতির মাধ্যমেই প্রধানত ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এই ঋণ ছিল মূলত অল্প সময়ের অর্থায়ন, অর্থাৎ৯০ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে, যা ব্যাংকে ফেরত আসার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এগুলো পাঁচ বা দশ বছর, এমনকি তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়। যেমন, হলমার্ক তাদের জালিয়াতির অর্থ এখন ৩০ বছরে পরিশোধের জন্য মেয়াদি ঋণে পরিণত করতে আবেদন করেছে।
সাবেক দুই কর্মকর্তা: সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ড্রিলিং রুমে (বৈদেশিক বিনিময়-সংক্রান্ত) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) ছিলেন আবদুল গফুর ভূঁইয়া। পরে তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখার দায়িত্ব এবং পরবর্তী সময়ে খুলনায় থাকাকালে ডিজিএম হন। বৈদেশিক বিনিময়-সংক্রান্ত এবং এলসি খোলার কাজে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি ড্রিলিং রুমে থাকাকালে ৮৪ কোটি টাকার একটি ঘাপলা হয়।
এই কর্মকর্তা হলমার্কের পক্ষে বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে দেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মেলে। যোগাযোগ করা হলে আবদুল গফুর তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ২০১০ সালে অবসর নেওয়ার পর যৌথ উদ্যোগের একটি কোম্পানিতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। আর ড্রিলিং রুমের ঘাপলাটি তাঁর আমলে হয়নি বরং তাঁকে ঘাপলার পর তা উদ্ঘাটনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও রূপসী বাংলা শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াহেদুজ্জামান একই শাখায় নিয়মিত কাজ করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। ডিজিএম এ কে এম আজিজুর রহমান তাঁকে চাকরির সুযোগ করে দেন শাখাতে। সোনালী ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবীর তাঁকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা হারে বেতনের ব্যবস্থা করেন, আবার পরে তা বাড়িয়ে দিনে এক হাজার টাকা করা হয়। জানা যায়, ওয়াহেদুজ্জামান তাতে রাজি হননি। তিনি বরং হলমার্ক ও টিএন ব্রাদার্সের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা আয় করতেন।
যোগাযোগ করা হলে ওয়াহেদুজ্জামান দাবি করেন, ডিজিএম আজিজুর রহমান তাঁকে কোনো মাসে ১৫ হাজার, আবার কোনো মাসে ২০ হাজার টাকা করে দিতেন। তিনি ব্যাংকের বৈদেশিক ঋণপত্রের কাজগুলো দেখতেন। তবে তিনি কোনো কাগজে সই করতেন না।
অর্থ উত্তোলনের তথ্য নেই: হলমার্ক রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে নিলেও কীভাবে অর্থগুলো উত্তোলন হয়, সেই সূত্রগুলো (লিংক) এখনো খুঁজে দেখেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি হলমার্কের নামে-বেনামে কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তা-ও এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক আবিষ্কার করতে পারেনি। এসব কাজে তেমন আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকাজে একদা যুক্ত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা মনে করেন, অর্থ চলাচলের গতিবিধি ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করা হলে কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী, তা বের হতে পারে। কেননা, কোটি কোটি টাকা নগদে তোলা সম্ভব নয়। উপরন্তু অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকলে তারও একটা ইঙ্গিত মিলতে পারে অর্থ চলাচলের গতির মধ্যেই।

তারিখ: ০১-১০-২০১২
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-10-01/news/294144

মাত্র চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি - মুহিত

হলমার্ক নিয়ে অর্থমন্ত্রী, "চার হাজার কোটি টাকা বড় অঙ্কের অর্থ নয়"

হলমার্ক গ্রুপকে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। অথচ মাত্র চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে যা প্রচার হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, পুরো ব্যাংকিং খাতেই ধস নেমেছে। এই প্রচারণা ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান।

আলোচনায় বিশ্বব্যাংকের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সততা বিভাগ জিহাদি মনোভাব নিয়ে কাজ করে। এই জিহাদি মনোভাব নিয়ে কাজ করা যাবে না। বিশ্বব্যাংক যা বলে, তা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিহীন। এটি দুর্নীতি প্রতিরোধের বিরোধী হিসেবে কাজ করে।’

আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘কালোটাকা বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা। কালোটাকা থাকবেই। এটা মেনে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’

তারিখ: ০৪-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

তারিখ: ০৫-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

মুদি দোকানি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক

মুদি দোকানি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক, হলমার্ক কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীরের বিলাসী জীবন

মাত্র এক দশক আগে আগারগাঁও তালতলা বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান ছিল তার। এ দোকান চালাতেন পিতাকে সঙ্গে নিয়ে। এতে সংসার চলতো না তাদের। এক সময় সংসারের অভাব অনটন ঘোচাতে মাত্র ৩০০০ টাকা বেতনে একটি গার্মেন্টে চাকরি নেন। মাত্র এক দশক পরে সেই গার্মেন্ট শ্রমিক এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। রাজকীয়, বিলাসী জীবন তার। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় আলীশান বাড়ি। চোখ ধাঁধানো সেই বাড়ির অন্দরমহল। আর বাড়ির পাশেই গাড়ির গ্যারেজ। তার নিজের ২৭টি পাজেরো, প্যারাডো, ল্যান্ড ক্রুজার ও প্রাইভেট কার। সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার হলমার্ক কেলেঙ্কারির নায়ক হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ তফসিরই হলেন সেই মুদি দোকানি- গার্মেন্ট শ্রমিক। এখন যিনি হাজার কোটি টাকার মালিক।

সোনালী ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর হলমার্ক ও তানভীর এখন দেশব্যাপী আলোচনায়। সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রায় অর্ধেকই নিয়েছেন তিনি। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চোখ ধাঁধানো রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। বাড়ির ভেতরটা যেন স্বর্গপুরী। বিদেশী সব কারুকার্য খচিত ফিটিংস, ঝাড়বাতি। ঝকঝকে তকতকে দামি সব গাড়ি। শেওড়াপাড়ার এ বাড়ির পাশেই বিশাল গাড়ির গ্যারেজ। পাজেরো, প্যারাডো, ল্যান্ড ক্রুজার মিলে বড় গাড়ি ১৫টি। প্রাইভেট কার ১২টি। যখন যেটি পছন্দ হয় সেটি নিয়ে বের হন। তানভীর চলেন, রাজকীয় স্টাইলে। রাজপথে তার গাড়ির আগে পিছে থাকে ১০টি গাড়ি। এসব গাড়িতে থাকে তার সশস্ত্র ক্যাডার। এরা সবাই তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। মানুষকে খাওয়ানোর জন্য কখনও একটি দু’টি গরু কিনেন না, গরু ক্রয় করেন ট্রাক ভরে। এখন গ্রামের বাড়িতে যান ঘন ঘন। সেখানে উৎসব করেন মানুষকে খাওয়ান, সংবর্ধনা নেন। চলাফেরা করেন ক্ষমতাধর বড় বড় লোকদের সঙ্গে। তার ২০৫/৪ রোকেয়া সরণি শেওড়াপাড়ার কার্যালয়ে মাঝেমধ্যে আসেন বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টা, একজন প্রতিমন্ত্রী কয়েকজন এমপি। এখন তার বিলাসী জীবন হলেও মাত্র এক দশক আগেও ছিলেন কপর্দকশূন্য। থাকতেন শেওড়াপাড়ার ভাড়ার বাসায়।

২০০১ সালেও আগারগাঁও তালতলা বাজারে ছোট্ট একটি মুদি দোকান ছিল তানভীরের পিতার। সকালে-বিকালে মুদি দোকানে পিতার সহযোগী ছিলেন তিনি। সংসারের নিদারুণ অভাব অনটন ঘোচাতে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে একটি গার্মেন্টে চাকরি নেন তানভীর। তার উত্থান শুরু তত্ত্বাবধায়ক জমানার শেষ দিকে। গার্মেন্টের চাকরি ছেড়ে নিজে একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি দেন। ওই সময় তার সঙ্গে সম্পর্ক হয় সোনালী ব্যাংক শেরাটন শাখার সে সময়ের ম্যানেজারের সঙ্গে। ওই ম্যানেজারকে ধরে অল্প কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাবসা শুরু করে করেন, সেটা ২০০৬ সাল। ২০০৮ সালে সরকার পরিবর্তন হলে তানভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার সঙ্গে। ওই উপদেষ্টাকে তিনি তার প্রতিষ্ঠান হলমার্কের উপদেষ্টা করেন। ২০০৯ সাল থেকে সোনালী ব্যাংকে তানভীরের ঋণ বর্ধিত হতে শুরু করে অস্বাভাবিকভাবে সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করে।

ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে তানভীর বেশি নজর দেন জমি কেনার দিকে। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায়। একের পর এক জমি কিনতে থাকেন বেশি দামে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তানভীর কম করে হলেও ত্রিশটি দামি গাড়ি উপহার দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের বড় বড় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের। দেড় শ’ জন আনসার পাহারা দেয় রোকেয়া সরণীর হলমার্কের প্রধান কার্যালয় সহ তানভীরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তানভীরের নিজের কাছে থাকে একটি পিস্তল। সব সময় চলেন বিশাল বহর নিয়ে। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকা এবং সাভারের হেমায়েতপুরে আছে তার বিশাল সমর্থক ক্যাডার বাহিনী। শেওড়াপাড়া এলাকার তার এক প্রতিবেশী জানান, তানভীর তার বর্তমানের রাজকীয় বাড়িতে উঠেছেন মাত্র ২ বছর হলো, এর আগে ওই মহল্লারই একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সপরিবারে। নতুন বাড়িতে ওঠার পর গত দুই বছর ধরে ঈদের সময় এক এলাহী কাণ্ড দেখা যায় তার বাড়ির সামনে। পুরো রমজান মাস ধরে গরু, মহিষ, উট আসে ট্রাক বোঝাই করে। ওই সব গরু, মহিষ, উট জবাই করে খাওয়ানো হয় রোজাদারদের। দান খয়রাতও করেন যথেষ্ট।

মিরপুর এলাকার মানুষ জানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সে কারণে এখন ঘন ঘন এলাকায় যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে।

http://www.mzamin.com/details.php?nid=MjAxMjk=&ty=MA==&s=MTg=&c=MQ==

আমার ছেলে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখত - নুরুল ইসলাম

বাবা নুরুল ইসলাম ছিলেন গ্রামের সাধারণ কৃষক। পরে শুরু করেন তৈজসপত্রের ব্যবসা। একসময় ব্যবসায় যুক্ত হন বড় ছেলে। সাফল্য আসে, খুচরা ব্যবসাটি রূপ নেয় পাইকারি ব্যবসায়।

কিছুদিন পর বাবার ব্যবসা থেকে পুঁজি নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান বড় ছেলে। ঢাকায় গিয়ে তৈরি পোশাক কারখানায় কাপড়ের কার্টন সরবরাহের কাজ নেন তিনি। সেটি ১৯৯২ সালের কথা। অল্প সময়ের মধ্যে বড় ব্যবসায়ী বনে যান বড় ছেলে। এই বড় ছেলে হলেন হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ।
Tanveer Mahmood

গত শনিবার আশুগঞ্জ উপজেলার তারোয়া, তালশহর, আড়াইসিধা গ্রাম ঘুরে তানভীর সম্পর্কে এ কথা জানা যায়। তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ছেলে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখত। আল্লাহ ছেলের স্বপ্ন পূরণ করেছে।’ সোনালী ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টি তুললে তিনি বলেন, তাঁর ছেলে কোনো অন্যায় করেননি।

আগে তানভীর মাহমুদের পরিচিতি নিজ গ্রাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের তারোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গণমাধ্যমে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর এখন তিনি দেশ-বিদেশে আলোচিত।

গ্রামে সংবাদপত্রের পাঠক খুব বেশি নেই। কিন্তু ঘটনার পর থেকে অনেকের হাতে সংবাদপত্র স্থান করে নিয়েছে। টিভি সংবাদেরও দর্শক বেড়েছে। তারোয়া লাগোয়া আড়াইসিধা বাজারের আবদুল্লাহ মিয়ার হোটেলে ঢুকে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী কয়েকজন দলগতভাবে দু-এক দিন আগের পত্রিকা পড়ছেন। তানভীর মাহমুদ প্রসঙ্গ তুলতেই সবাই নড়েচড়ে বসেন। গ্রামের মানুষ অবশ্য তাঁকে তফসির নামে চেনে।

আড়াইসিধা গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘তফসিররে দেখতাম মাথা নুওয়াইয়া আটত (হাঁটত)। বাপের ব্যবসায় সাহায্য করত। এই মানুষটা এত কম সময়ে কেমনে অত টেহার মালিক হইল। ব্যাংক ওয়ালারে বেহুপ বানাইয়া কেমনে অত টেহা লইয়া গেল।’ কথা কেড়ে নিয়ে তারোয়া গ্রামের হাবিব মিয়া বলেন, ‘টেহা তো আর জোর কইরা নিছে না। সরকার দিছে বইলাই নিছে।’ কপালে হাত রেখে তালশহর গ্রামের লোকমান মিয়া (৪৫) বলেন, ‘আশ্চার্য ব্যাপার, অত টেহা চাইলইবা কেমনে, দিলইবা কেমনে?’

গ্রামবাসী জানায়, তানভীর মাহমুদকে নিয়ে আগে এত আলোচনা ছিল না। হঠাৎ দেখা গেল, বিশাল চাররঙা পোস্টার। পোস্টার দেখে গ্রামবাসী জানতে পেরেছে, তানভীর বিজিএমইএ আয়োজিত ২২তম বাটেক্সপোতে পোশাকশিল্পের সেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন। এরপর ২০ জানুয়ারি সংবর্ধনার আয়োজন হয়। সংবর্ধনার কার্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে নাম ছাপা হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদ্দাচ্ছের আলী, বিশেষ অতিথি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরীর নাম। অনুষ্ঠানটি নিয়ে উপজেলা ও তারোয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়। কারণ, দল ও সরকারের বড় কয়েকজন নেতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা প্রচার করা হলেও আয়োজক পক্ষ দলের নেতাদের পাত্তা দেয়নি। অবশ্য স্থানীয় ক্ষোভের কথা জেনে প্রতিমন্ত্রী ও সাংসদ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। তারোয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লাল মিয়া মাস্টার বলেন, ‘অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের সঙ্গে কেউ আলোচনা করেননি। দাওয়াত পেলেও দলীয় নেতা-কর্মীরা মূল্যায়ন পাননি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিয়ে গ্রামবাসীর রয়েছে ভিন্ন রকম অনুভূতি।’ মুদি ব্যবসায়ী রোকন উদ্দিন বলেন, ‘হেই দিন গাড়ির মিছিল হইছিল। এত গাড়ির চাপে রাস্তার অবস্থা বারোটা বাইজা গেছিল।’

গত শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা তিনটার দিকে তারোয়ায় তানভীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলে তাঁর বাবাসহ নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে। গত শুক্রবার ছিল তানভীরের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। এ জন্য বিশাল আয়োজন দেখা গেল, খাওয়ানো হয় হাজার হাজার মানুষকে। অনুষ্ঠান শেষে চারটি ছোট ট্রাকে করে বড় বড় ডেকচি তোলা হচ্ছিল।

তানভীরের দোতলা বিলাসবহুল বাড়িটি তৈরি করা হয় পাঁচ বছর আগে। বাড়িতে বাবা ছাড়া আর কেউ থাকেন না। বাবা নুরুল ইসলাম জানান, দুই ছেলের মধ্যে তফসির (তানভীর) বড়। আরেক ছেলে মাহবুবুল আলম হলমার্ক গ্রুপের পরিচালক। তিন মেয়ে শিউলী, পারুল ও নাসরিনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তানভীর তারোয়া উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক ও তালশহর এএআই উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন বলে দাবি করেন তাঁর বাবা। তবে গ্রামের লোকজন জানান, তিনি এসএসসি পাস করেননি।

তারিখ: ০৫-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

ঋণের ২০ গুণ সম্পদ আছে হলমার্কের এমডির

হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ দাবি করেছেন, তিনি যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি সম্পদ তাঁর রয়েছে। আর সোনালী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ তিনি পাই টু পাই ফেরত দেবেন বলেও সাংবাদিকদের জানান। আজ রোববার বিকেলে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের নামে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভীর মাহমুদ দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে আত্মসাত্ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলাম এবং হলমার্কের মহাব্যবস্থাপক তুষার মাহমুদ দুদক কার্যালয়ে আসেন। সেখানে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক মীর মো. জনয়াল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি তাঁদের জিজ্ঞাসবাদ করে।

কমিটিতে আরও আছেন দুদকের উপপরিচালক এস এম আখতার হামিদ ভূঞা, সহকারী পরিচালক নাজমুস সাদাত ও মো মশিউর রহমান, উপসহকারী পরিচালক মো. মজিবুর রহমান ও মো জয়নুল আবেদীন।

এর আগে হলমার্কের পাশাপাশি জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ডিএন স্পোর্টস লিমিটেড ও ইথান এমব্রয়ডারি প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোতাহার উদ্দিন চৌধুরী, ডি এন স্পোর্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান ও পরিচালক ফাহমিদা আক্তার চৌধুরীকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে এই তিনজন দুদক কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।

হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের নামে এর মালিক তানভীর মাহমুদ দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে তা আত্মসাত্ করার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে কমিশন।

এ বিষয়ে গত ১২ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল করপোরেট শাখার আট কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদকের তদন্ত দল। এ ছাড়া হলমার্ক গ্রুপের সঙ্গে ওই ব্যাংকের লেনদেন ও ঋণসংক্রান্ত বেশ কিছু নথিপত্র খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল।

দুদক সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংকের ওই শাখা থেকে অর্থ ওঠানো ও আত্মসাতের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত অনুরোধে খতিয়ে দেখছে কমিশন।

দুদকের কাছে লেখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, শেরাটন শাখার আমানতকারীদের অর্থ থেকে মোট ৩৫৪৭ কোটি টাকা (এ পর্যন্ত উদঘাটিত) আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক/পরিচালক (হলমার্ক গ্রুপের প্রধান ব্যক্তি তানভির মাহমুদ) এবং ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময়কালে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’ এছাড়া, ‘সোনালী ব্যাংকের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (পরিচালনা পর্ষদের ) কোন কোন সদস্যের সহযোগিতা/ইন্ধন/যোগসাজশ আছে কিনা তা-ও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে,’ বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যাংকের পাঠানো ওই চিঠিতে কারসাজির মাধ্যমে ওঠানো টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তা-ও অনুসন্ধান করে দেখতে বলা হয়েছে।

দুদকের কাছে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই চিঠি অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে শুধু তানভীর মাহমুদের মালিকানাধীন হলমার্ক গ্রুপের নামেই দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হয়েছে। একই অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ লুটকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাসলিম হাসানের মালিকানাধীন টি অ্যান্ড ব্রাদার্স তুলেছে ৬০৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা; সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন প্যারাগন গ্রুপ তুলেছে ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা; বেগম ফাহমিদা আকতার চৌধুরীর মালিকানাধীন ডিএন স্পোর্টস তুলেছে ৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, আবদুল খালেকের মালিকানাধীন নকশী নীট তুলেছে ৬৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা; আবদুল জলিল শেখের মালিকানাধীন খান জাহান আলী সোয়েটার নামের প্রতিষ্ঠান তুলেছে চার কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

তারিখ: ০২-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

হলমার্ক কেলেঙ্কারি - মোদাচ্ছের আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ নেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আজ রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দুদক কার্যালয়ে কমিশনার এম বদিউজ্জামান এ কথা জানান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনার এম বদিউজ্জামান জানান, ওই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীর নাম উঠে এসেছে। সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশন মোদাচ্ছের আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
কমিশনার জানান, সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু মোদাচ্ছের আলীর নাম এসেছে। অন্য কারও নাম এলে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
বদিউজ্জামান আরও জানান, সোনালী ব্যাংকসহ অন্যান্য যেসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেসব বিষয়েও তদন্ত করা হবে। হলমার্কসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেই টাকার কত অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে। যদি তথ্য ও প্রমাণ মেলে, তবে সে বিষয়ে পৃথকভাবে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) আইনে অনুসন্ধান করা হবে।
রূপসী বাংলা শাখার ওপর তদন্ত করতে গত মে মাসে পরিদর্শক দল পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তদন্ত চলাকালে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। তিনি তদন্ত দলের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিজের একটি ভিজিটিং কার্ডও তাদের দেন।
দুদক গত বুধবার সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় একাধিক কর্মকর্তা হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত বলে জানান। সে সময় সাংবাদিকদের কাছে সাইদুর রহমান নামের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি একজন জুনিয়র অফিসার; কেরানি হিসেবে এখানে কাজ করি। কোনো বিল-ভাউচার বা কাগজে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি কীভাবে জড়িত থাকব! হলমার্ক ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে ওপরের দিকের লোকেরা জড়িত। যাঁরা বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেছেন, তাঁদের জড়িত থাকার প্রমাণ তো দুদকের কাছেই আছে।’
সাইদুরের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় তাঁর কর্মকালে হলমার্কের ব্যাপারে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেতেন কি না; অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী জড়িত কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী মাঝেমধ্যে শাখায় আসতেন। ডিজিএমের কক্ষে যেতেন। ওই শাখার এক নারী কর্মী তাঁর আত্মীয়। উপদেষ্টা তাঁর কাছে আসতেন।’
সাইদুর রহমানের এই বক্তব্যের ভিডিও কপি ‘প্রথম আলো’র কাছে সংরক্ষিত আছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর এলাকার মানুষ হিসেবে পরিচিত সোনালী ব্যাংকের ওই নারী কর্মীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।

তারিখ: ০২-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

জনতা ও অগ্রণীতেও কেলেঙ্কারি

হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে কেবল সোনালী ব্যাংক নয়, জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন আরও দুই ব্যাংক। জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকও বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়েছে হলমার্ক গ্রুপকে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে দেখেছে, এই দুই ব্যাংকের কর্মকর্তারা সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন হোটেল) শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে হলমার্ক গ্রুপকে নানা ধরনের অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন।

হলমার্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এর বাইরে আরও কয়েকটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠান দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ এই তিন ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের গুলশান ও আগারগাঁও শাখা, জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা ও স্থানীয় কার্যালয় (লোকাল অফিস) এবং অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান (প্রিন্সিপাল) শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ শ্রেণীবিন্যাস করার নির্দেশ দিয়ে তিন ব্যাংককেই চিঠি দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, অথচ ঋণ দেওয়া হয়েছে। যদিও ঋণ নেওয়ার সময় উৎপাদন চলছে বলে ব্যাংক প্রতিবেদন দিয়েছিল। আবার রপ্তানি না করেও অর্থ তুলে নিয়েছে হলমার্কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ক্রেতা-বিক্রেতা একই প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছে উভয়কেই। এভাবে নানা ধরনের অনিয়ম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে ব্যাংকগুলো থেকে।

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় হলমার্কের জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে স্থানীয় ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যার স্বীকৃতি দিয়েছে রূপসী বাংলা শাখা। মোট ৩৯টি ব্যাংক থেকে এ ধরনের কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকের সঠিক পরিচিতি (কেওয়াইসি-নো ইউর কাস্টমার) না জেনেই ঋণসুবিধা দিয়েছে। এ রকম কিছু ব্যাংকের অর্থ এখন আটকে গেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক অন্যতম।

জনতা ব্যাংক: জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখায় আনোয়ারা স্পিনিং মিলস ও ম্যাক্স স্পিনিং মিলের নামে দুটি হিসাব খোলা হয় ২০১১ সালের ৮ জুন। নথি অনুযায়ী, আনোয়ারা স্পিনিং মিলের মালিক জাহাঙ্গীর আলম এবং ম্যাক্সের মালিক মীর জাকারিয়া। এই দুই হিসাবের পরিচয়দানকারী ববি স্পিনিং মিলের মালিক তানভীর মাহমুদ। তিনি আবার হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা ওই দুই প্রতিষ্ঠানের নামে হিসাব খোলার পরপরই তাদের বিল কেনা শুরু করে। বিলে দেখানো হয়েছে, হলমার্ক ফ্যাশনসহ এই গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে সুতা আমদানির জন্য আনোয়ারা ও ম্যাক্স স্পিনিংয়ের অনুকূলে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় স্থানীয় ঋণপত্র স্থাপন করে। জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা এই বিল কিনে নেয় এবং সেই পরিমাণ অর্থ আনোয়ারা ও ম্যাক্স স্পিনিং মিলের হিসাবে জমা দিয়ে দেয়। এভাবে ওই দুই প্রতিষ্ঠান তুলে নেয় ৮৩ কোটি ৬৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে বলেছে, আসলে কোনো সুতাই কেনাবেচা হয়নি। বাস্তবে প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো অস্তিত্বই নেই। কোনো সুতা কেনা হয়নি, ফলে রপ্তানিও হয়নি। অথচ কাগজ-কলমে সবই দেখানো হয়েছে। জনতা ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠান দুটি সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হলে তারা তা দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হলমার্ক গ্রুপ পুরোটা অর্থ সুকৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ আত্মসাতের জন্য জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ শ্রেণীবিন্যাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় প্রায় একইভাবে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছে সোহেল স্পিনিং মিল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ছিল সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা ও হলমার্ক গ্রুপ। হলমার্ক গ্রুপকে পণ্য রপ্তানির নামে অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। জনতা ব্যাংক যাচাই-বাছাই ছাড়াই সোহেল স্পিনিং মিলকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ায় আটকা পড়েছে ২৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা সোহেল স্পিনিং মিল পরিদর্শন করা হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি চালু আছে বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল সেটি বন্ধ দেখে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংককে সম্প্রতি একটি চিঠি দিয়ে বলেছে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনিয়মের জন্য মহাব্যবস্থাপক ও শাখা ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান গতকাল শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থা নিয়ে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অধিকতর নিরীক্ষা করার জন্য উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি পর্ষদকে জানানো হয়েছে বলেও জনতা ব্যাংকের এমডি জানান।

অগ্রণী ব্যাংক: কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার ওপর পরিদর্শন করে সেখানেও ব্যাপকভাবে আর্থিক অনিয়ম পেয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বিল কেনার সীমা লঙ্ঘন করে ব্যাংকটির এই শাখা হলমার্ক গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ ও নকশি নিট নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিল কিনছে। এ ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি দিয়েছে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা। এতে ৪২ কোটি ১৮ লাখ টাকা আটকে আছে। এর বাইরে বিটিএল, মাহিন টেক্সটাইল ও পিনাকল টেক্সটাইলকে একইভাবে ১৫৬ কোটি চার লাখ টাকার বিশেষ সুবিধা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক।

অগ্রণী ব্যাংকের কাছে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল গাজীপুরের একই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানায় গিয়ে দেখেছে, সেখানে তুলা থেকে সুতা উৎপাদনের কোনো যন্ত্র নেই। অথচ কাগজ-কলমে তারা সুতা সরবরাহ করেছে বলে দেখায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্য হচ্ছে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা, অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাহকপ্রতিষ্ঠান পারস্পরিক যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে সুকৌশলে ব্যাংকের তহবিল বের করে নিয়েছে। এ ঘটনার জন্য শাখা ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোনালী ব্যাংক: সোনালী ব্যাংকের আগারগাঁও শাখার বড় ধরনের অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানেও একইভাবে গ্রিন প্রিন্টার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের নিয়ম ও বিধি ভঙ্গ করে ১৪১ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দিয়েছে। আগারগাঁও শাখা প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ২০১১ ও ২০১২ সালে তিন শতাধিক ঋণপত্র খুললেও এর কোনো নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। পরিদর্শন প্রতিবেদনে এগুলোকে ভুয়া ঋণপত্র মন্তব্য করে বলা হয়েছে, গ্রিন প্রিন্টার্সকে এভাবে অবৈধভাবে ও জালিয়াতি করে ১৪১ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে।

এদিকে, সোনালী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকেও একইভাবে জালিয়াতি করে তুলে নেওয়া হয়েছে আরও ২৮১ কোটি টাকা। রোজবার্গ, এলএনএস গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এই সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে সোনালী ব্যাংক সূত্র জানায়।

তারিখ: ০১-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

হলমার্ক কেলেঙ্কারি - সোনালী ব্যাংকের ১৭ কর্মকর্তা বরখাস্ত

হলমার্ক কেলেঙ্কারির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। আজ বৃহস্পতিবার বিভিন্ন পর্যায়ের ১৭ জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ব্যাংকটি। সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হুমায়ন কাশেম প্রথম আলো ডটকমকে এ কথা জানান।

আজ বিকেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৬ আগস্ট সোনালী ব্যাংককে হলমার্ক কেলেঙ্কারির জন্য চিহ্নিত ৩২ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে ৩০ আগস্টের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছে ব্যাংকটি।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন: রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন হোটেল) শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উজ্জ্বল কিশোর ধর, তুষার কান্তি ধর, জেসমিন নাহার, মিহির চন্দ্র মজুমদার, কনিষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াকিলউদ্দিন আহমেদ ও কর্মকর্তা সাইদুর রহমান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক শেখ আলতাফ হোসেন, সহকারী মহাব্যবস্থাপক শাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও এজাজ আহমেদ, ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা মুখলেসুর রহমান ও নির্বাহী কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন, মহাব্যবস্থাপক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক গোলাম নবী মল্লিক ও আশরাফ আলী পাটোয়ারী, ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহেদ উদ্দিন আহমেদ এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক নেসার আহমেদ চৌধুরী, নির্বাহী কর্মকর্তা একরামুল হক মণ্ডল ও শাখা পরিদর্শক কামরুল হোসেন খান।

এদিকে, রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আজ ব্যাংকের আরও পাঁচজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁরা হলেন: আ ন ম হেদায়েত উল্লাহ, সবিতা সিরাজ, গোলাম নবী মল্লিক, আশরাফ আলী পাটোয়ারী ও ওয়াহেদ উদ্দিন আহমেদ। দুদকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক মীর জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের তদন্তকারী দল পৃথকভাবে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রক্ষিতে এই বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

তারিখ: ৩০-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ব্যাংক শাখায় যেতেন

সোনালী ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তাকে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ

সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

কর্মকর্তারা হলেন: সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মীর মহিদুর রহমান ও ননীগোপাল নাথ, রূপসী বাংলা হোটেল শাখার ঋণপত্র (এলসি) বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিহির চন্দ মজুমদার, ওয়াহিদুজ্জামান ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান।

Modasser Ali
গত ১৭ মার্চ সাভারে হলমার্ক গ্রুপের কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন জুনিয়র অফিসার, কেরানি হিসেবে এখানে কাজ করি। কোনো বিল-ভাউচার বা কাগজে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি কীভাবে জড়িত থাকব। হলমার্ক ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে উপরের দিকে লোকেরা জড়িত। যাঁরা বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেছেন, তাঁদের জড়িত থাকার প্রমাণ তো দুদকের কাছেই আছে।’

সাইদুরের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করা অবস্থায় হলমার্কের ব্যাপারে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেতেন কি না। অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী জড়িত কি না—প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী মাঝে মাঝে শাখায় আসতেন। ডিজিএমের কক্ষে যেতেন। ওই শাখার এক নারী কর্মী তাঁর আত্মীয়। উপদেষ্টা তাঁর কাছে আসতেন।’

সাইদুর রহমানের এই বক্তব্যের ভিডিও কপি প্রথম আলোর কাছে সংরক্ষিত আছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর এলাকার মানুষ হিসেবে পরিচিত সোনালী ব্যাংকের ওই নারী কর্মীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। এ ছাড়া দুদক মোদাচ্ছের আলীর সঙ্গেও কথা বলবে বলে জানা গেছে।
দুদকের দেওয়া নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই পাঁচ কর্মকর্তা গতকাল বুধবার হাজির হলে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের উপপরিচালক মীর জয়নুল আবেদিন। আজ বৃহস্পতিবার একই ব্যাংকের আরও পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী একই গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে ২ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানসংশ্ল্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে ওই কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ঋণ বিতরণের সময় তাঁদের ভূমিকা ও কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল। তবে পাঁচ কর্মকর্তাই এই ঋণ জালিয়াতিতে তাঁদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জিএম মীর মহিদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে।

জানা গেছে, দুদকের কর্মকর্তারা এ পর্যন্ত রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, উপমহাব্যবস্থাপক সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার ধর, কর্মকর্তা উকিল উদ্দিন আহমেদ, কর্মকর্তা তুষার কান্তি দাস, মেহেরুননেসা ও তসলিমা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এ ছাড়া হলমার্ক গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত চার প্রতিষ্ঠান—আনোয়ারা স্পিনিং মিলের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, ম্যাক স্পিনিং মিলের মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরী ইন্টারন্যাশনালের জিয়াউর রহমান ও স্টার স্পিনিং মিলের আবদুল বাছিরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।

তারিখ: ৩০-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

এলাকার লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে ব্যাংকে যাই - মোদাচ্ছের

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী হলমার্ক গ্রুপের কেলেঙ্কারির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদের দাওয়াতে দুবার ওখানে যাওয়া ছাড়া তাদের সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নাই।’

২৬ আগস্ট রাতে প্রথম আলোর সঙ্গে মুঠোফোনে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী এসব কথা বলেন। তিনি এ সময় জানান, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্কের তানভীরের আড়াই হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করার ব্যাপারে তিনি কোনো প্রভাব খাটাননি। তবে তানভীর মাহমুদের গ্রামের বাড়িতে দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে হলমার্ক গ্রুপ আয়োজিত অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলেন তিনি।

গত মে মাসে আড়াই হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় যায়। তদন্ত দলের পরিদর্শনের সময় সেখানে কেন উপস্থিত হয়েছিলেন—জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘রূপসী বাংলা শাখায় আমার এলাকার একটি মেয়েসহ কয়েকজন চাকরি করে। আমি তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দলের সদস্যরা আমার কাছে এলে আমি তাদের বলি, তোমাদের যদি কোনো ব্যাপারে সহযোগিতা দরকার হয় তাহলে আমার অফিসে এসো।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিজের ভিজিটিং কার্ড দেওয়ার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা জানান, ‘ঋণ জালিয়াতির ব্যাপারে কোনো প্রভাব তৈরি করা বা এ-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি।’

রূপসী বাংলা শাখায় কর্মরত এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে সৈয়দ মোদাচ্ছের প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই মেয়ের বাড়ি আমার এলাকায়। আমি কোনো প্রভাব তৈরি করলে তার নাম তদন্তে আসত। কিন্তু খুঁজে দেখেন তার নাম তদন্তে নেই। সে এখন ধানমন্ডিতে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখায় কর্মরত আছে।’

হলমার্ক গ্রুপের তিনটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে দাওয়াত পাওয়া ও দুটিতে যোগ দেওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সৈয়দ মোদাচ্ছের বলেন, ‘হলমার্কের তানভীরের সঙ্গে কথা বলে অনেক ভালো মানুষ মনে হয়েছে। হাজার হাজার লোক তার ওখানে চাকরি করে। সে যে চোর তা তখন আমি কী করে বলব। এই ধরেন, আমি আপনার সঙ্গে হেসে কথা বলছি, কিন্তু পরে যদি শুনি আপনি অন্য রকম, তখন আমি কী করব বলেন।’

হলমার্কের তানভীর মাহমুদ ও আপনি রোজার মাসে সরকারের এক মন্ত্রীর বাসায় গিয়েছিলেন। কথা উঠেছে হলমার্ক গ্রুপকে রক্ষা করতে আপনি চেষ্টা করছেন। এই প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন কত কিছু নিয়ে কত কথা উঠছে। একবার একটা কথা প্রচার হয়ে গেলে কত ভাবে দেখা হয়।’

প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় রপ্তানি পদক পাওয়ার পর তানভীরের গ্রামের বাড়ি আশুগঞ্জে এক সংবর্ধনার আয়োজন করে আমাকে অতিথি করা হয়। আমি তার অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ আসনের সাংসদ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলি। তানভীর সম্পর্কে জানতে চাই। তারা বলেছিল তানভীর ভালো মানুষ। আমাদের দলের অনেককে চাকরি দিয়েছে। হেমায়েতপুরের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে স্থানীয় সাংসদ এবং আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কাছে হলমার্ক গ্রুপের তানভীর সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। সে-ও ভালোই রিপোর্ট দিয়েছিল। এসব জেনেই আমি হলমার্কের অনুষ্ঠানে যাই। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছি, সে জামায়াত বা অন্য কোনো লাইনের কিনা। ওই লাইনের হলে তো বিপদ।’
হলমার্ক গ্রুপ যে ব্যাংক থেকে এত টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করেছে তা প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছেন বলে জানান এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে যারাই যুক্ত থাকুক না কেন, তাদের শাস্তি হতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সোনালী ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে আপনার দলের কয়েকজন নেতা রয়েছেন। তাঁদের কোনো প্রভাব এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে কি না, জানতে চাইলে সৈয়দ মোদাচ্ছের বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের পরিচালক শুধু নন, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে অনেকের সঙ্গেই আমার ভালো পরিচয় আছে। তাঁদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি কোনো প্রভাব খাটিয়েছি কিনা।’

ধলেশ্বর নদ দখল ও ভরাটের অপরাধে হলমার্ক গ্রুপকে পরিবেশ অধিদপ্তর ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। পরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আপিল আদালত জরিমানার ৩৬ লাখ টাকা মাফ করে দেন। এ ক্ষেত্রে আপনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের টেলিফোন করে জরিমানার টাকা মাফ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন বলে শোনা যায়। এই প্রশ্নে সৈয়দ মোদাচ্ছের বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর বা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কাউকে আমি এই ব্যপারে টেলিফোন করেছি তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।’

সোনালী ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারি ও সাভারের জমি দখল নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে, সরকারের প্রভাবশালী মহলের মদদপুষ্ট হওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এই প্রসঙ্গ তোলা হলে সবশেষে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘কারও সঙ্গে চললে সে যদি তা অন্যত্র ব্যবহার করে, তাহলে আমার কী করার আছে।’

তারিখ: ৩০-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

উৎসাহ পেল হলমার্ক

অর্থমন্ত্রী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা এতে বিস্মিত হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক কী করতে পারবে আর কী পারবে না, তা সুস্পষ্টভাবে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-তে উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ওই আইন অনুযায়ী গত সোমবার সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের অনুরোধ করে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। হলমার্ক কেলেঙ্কারির দায় পর্ষদের ওপর বর্তায় উল্লেখ করে সেই প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ওই পর্ষদ পুনর্গঠন করার কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি পাঠানোর পরপরই একটি মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে। সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলাম উপস্থিত হন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। বৈঠক হয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারীও এ সময় সেখানে ছিলেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরাও বাইরে থেকে যোগাযোগ করা শুরু করে। অর্থমন্ত্রীকে নানা মহল থেকে বোঝানো হয় যে, এভাবে চিঠি লেখার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই।

অথচ, বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবারের চিঠিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে যে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬(৬) ধারা অনুযায়ী প্রতিবেদনটি বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই ধারায় বলা আছে, ‘সরকার কর্তৃক মনোনীত বা নিযুক্ত কোনো চেয়ারম্যান, পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর আচরণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নিকট কোন প্রতিবেদন পেশ করিলে সরকার উহা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করিবে।’

অথচ চিঠি পাঠানোর এক দিন পর খোদ অর্থমন্ত্রীই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্ব কমিয়ে দিলেন। গতকাল মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এটা তাদের দায়িত্ব নয়।’ এই বক্তব্যের ফলে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা যেমন কমল, তেমনি উৎসাহ পেল হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা। এর ফলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করার একধরনের বার্তা পেয়ে গেল।

সোনালী ব্যাংকের মাত্র একটি শাখা থেকেই অখ্যাত হলমার্ক গ্রুপসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। বেসরকারি ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে সেই ব্যাংক চালানো কঠিন হয়ে পড়ত। এর চেয়ে অনেক কম অর্থ আত্মসাতের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। কিন্তু বড় মূলধন ভিত্তি এবং আমানতের পরিমাণ অনেক বেশি বলে সোনালী ব্যাংকের ওপর বড় ধরনের সংকট পড়বে না। তবে এ ঘটনা সমগ্র ব্যাংকিং খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি জানান।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। তিনিও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক গ্রুপ যা করেছে, তাতে এর কোনো ক্ষমা নেই। এর সবচেয়ে বড় দায় সোনালী ব্যাংকের। তবে দেরিতে হলেও তাদের সম্ভবত বোধোদয় হয়েছে। তারাও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বাংলাদেশ ব্যাংকেরও আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতেও কমতি আছে। তা না থাকলে হলমার্ক বা ডেসটিনির মতো ঘটনা ঘটত না। সুতরাং তারাও দায় এড়াতে পারে না।

ড. ফরাসউদ্দিন আরও বলেন, কথা উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি নিয়ে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। সেই ক্ষমতা তার আছে। তবে চিরাচরিতভাবে যেটি চলে আসছে সেটি হলো, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক সরকার, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে কর্তৃত্ব করে না। সুতরাং আইনে থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না।

ড. ফরাসউদ্দিন সবশেষে বলেন, চিঠি দেওয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আছে। তবে সরকার এ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সব দায়িত্ব এখন সরকারের ওপর চলে এল। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এখন সরকারকেই নিতে হবে। ব্যবস্থা না নেওয়াটা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গতকাল প্রথম আলোকে এ নিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন মেনেই প্রতিবেদন দিয়েছে। আইনের বাইরে কিছু হয়নি, বরং বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এ ধরনের পদক্ষেপ না নিত, তাহলে উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলা হতো।

এদিকে, ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে কেবল ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পর্ষদ অবশ্যই এর দায় এড়াতে পারে না। এখানে উল্লেখ করা যায়, ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক-পরিস্থিতি ও পর্ষদের ভূমিকা নিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে পর্ষদ পরিবর্তনের সুপারিশ করে গভর্নর লিখেছিলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, বদলি ও পদোন্নতি ইত্যাদিতে পর্ষদ সদস্যরা সরাসরি হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করছে।’ সে সময়েও এই চিঠি আমলে নেওয়া হয়নি, বরং পর্ষদ সদস্যদের ডেকে এনে বৈঠক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সেই বৈঠকে একাধিক পর্ষদ সদস্য অর্থমন্ত্রীর সামনে গভর্নরের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। এভাবে সে সময়ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ সে সময়ে গভর্নরের চিঠি আমলে নেওয়া হলে হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা এড়ানো যেত বলে ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। দুবার তিনি ব্যাংক সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই আমি মনে করি। সোনালী ব্যাংকে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি সত্য হলে টাকার বিচারে তা নজিরবিহীন এবং অকল্পনীয় মাত্রার দুর্নীতি ঘটেছে। বিষয়টিকে নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। আবার সোনালী ব্যাংকের পর্ষদের থেকেও অন্তত নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আছে।’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আইনে যা-ই থাকুক, ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ নীতিনিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরদারির দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর বর্তায়। এটা ঠিক, বেসরকারি খাতের ব্যাংকের পর্ষদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা আছে।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা নেই। এ খাতের বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে এটাই বড় ধরনের অসংগতি। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই অসংগতি দূর করার সুপারিশ একাধিকবার করা হয়েছে, যাতে বেসরকারি ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক একইভাবে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। ব্যাংকিং খাতে অনেক সংস্কারের বাস্তবায়ন হলেও এই সুপারিশটি কোনো সরকারই গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি।
অধ্যাপক মাহমুদ আরও বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে এটা একটি বাধা হিসেবে থেকে গেছে। তবে বিদ্যমান আইনি কাঠামোতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নজরদারি করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকেরই। এত বড় অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করে মতামত দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাভাবিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আইন যা-ই থাকুক, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, রাষ্ট্রমালিকানাধীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে পুরো ব্যাংক খাত বিপদগ্রস্ত হতে পারে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে।’

সরকার কেন এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারের প্রশ্ন তুলে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে, তাঁর কাছে বোধগম্য নয় বলে জানান সাবেক গভর্নর। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ মেনে নিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অন্ততপক্ষে কালক্ষেপণ না করা। কালক্ষেপণ বা দীর্ঘসূত্রতা অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা বলেও তিনি মনে করেন।

তারিখ: ২৯-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব নয়: মুহিত

Abul Mal Muhit

সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সুপারিশ বাংলাদেশ ব্যাংক করতে পারে না বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে গতকাল মঙ্গলবার ‘উচ্চশিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি)’ শীর্ষক এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। গতকাল দুপুরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কার্যালয়ে আরেকটি অনুষ্ঠান শেষে অর্থমন্ত্রী আবার সাংবাদিকদের বলেন, হলমার্ক ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকও তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে ২০১০-১২ সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান একাই আত্মসাৎ করেছে দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ জন্য ব্যাংকের সাবেক ৩২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত রোববার সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরের দিন এত বড় জালিয়াতির ঘটনার দায়দায়িত্ব সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এড়াতে পারে না বলে অর্থমন্ত্রীকে প্রতিবেদনসংবলিত একটি চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান।

তারিখ: ২৯-০৮-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

Adviser's shadow in Hallmark scam

Modasser Ali denies allegation; anti-graft body quizzes 5 Sonali Bank officials
Modasser Ali

The Anti-Corruption Commission (ACC) has information that Syed Modasser Ali, an adviser to the prime minister, allegedly influenced Sonali Bank authorities into granting a huge amount of loan to the controversial Hallmark Group illegally, said ACC sources.

“The information came from different sources and we are examining it. However, we do not yet have any documentary evidence about the alleged role of the adviser in allocating to Hallmark and five other companies the loan,” said an ACC official wishing anonymity.

ACC sources said a few of the five Sonali Bank officials, who went to the commission office yesterday and were quizzed by a six-member ACC investigation team, also gave the investigators hints about the advisor's involvement in the scam.

During the daylong (from 9:30am to 4:00pm) grilling, a few of the Sonali Bank officials told the investigators that they had seen Modasser Ali visiting the Ruposhi Bangla Hotel branch of the bank frequently, said the sources.

The bank officials said they thought the adviser might have played a role in influencing the bank authorities into granting loans to Hallmark and five other business organisations as he used to enquire about the development of the loan process.

Contacted last night, Modasser Ali, health and social welfare adviser to PM, denied the allegation. He said, “There is no question of requesting anyone to sanction the loan as I had no idea about the scam until reports were published in the newspapers about it.”

He said, “I go there (Ruposhi Bangla Hotel branch of Sonali Bank) as my pension account is with this branch.”

He also said one of his relatives worked there and the branch manager was from his home district Gopalganj. “I happen to know the owner of Hallmark Group and attended some programmes of the organisation but I had no idea about the loan,” he added.

Previously, a Bangladesh Bank investigation found that the Ruposhi Bangla Hotel branch of Sonali Bank had lent Hallmark Group and five other companies Tk 3,547 crore between 2010 and May this year on forged documents.

Of the Tk 3,547 crore loan, Hallmark Group alone took Tk 2,686.14 crore while T and Brothers Tk 609.69 crore, Paragon Group Tk 146.60 crore, Nakshi Knit Tk 66.36 crore, DN Sports Tk 33.25 crore and Khanjahan Ali Tk 4.96 crore.

The ACC sources said they had also received information that Modasser Ali tried to prevent the Bangladesh Bank audit team when it went to the Ruposhi Bangla Hotel branch a few months ago from conducting an audit on the loan scam.

They said when the adviser came to know that a BB audit team had gone to Sonali Bank, he initially stopped them by using his power. But later, high ups of the central bank took measures to ensure the investigation by their audit team at Sonali Bank regarding the loan scam.

A Bangladesh Bank official also confirmed this incident. He did not wish to be named.

Asked about this allegation, the PM's adviser said he was at the bank one day and it was almost lunch hour. He stayed there for a while as he was asked to have his meal there.

At that time, he came to know that a Bangladesh Bank audit team was working there as there had been a problem. But he was not aware of the problem, said Modasser.

The adviser said a member of the audit team talked to him about a problem and that he had given the Bangladesh Bank official his visiting card so that the official could visit him if he faced any difficulties.

Three of the five Sonali Bank officials quizzed by the ACC yesterday are from the Ruposhi Bangla Hotel branch that gave the controversial loan. They are senior officers Mihir Chandra Mojumder and Md Wahiduzzaman and junior officer Md Saidur Rahman.

The other two officials were Dhaka office general managers Mir Mohidur Rahman and Nani Gopal Nath.

The six-member ACC investigation team, led by one of its deputy directors Mir Md Zainul Abedin Shebly, yesterday quizzed the five bank officials as part of the investigation into the much-talked-about loan scam of the age-old state-owned bank.

The other five investigators of the team are Deputy Director Akhter Hamid, assistant directors Nazmus Sadat, Moshiur Rahman and deputy assistant directors Mohammad Mojibur Rahman and Zainal Abedin.

ACC sources said the aim of questioning the officials was to find out their involvement in sanctioning the loan and what they knew about the loan scam.

The sources said the ACC team would quiz all the 32 Sonali Bank officials who had been identified as responsible for the loan scam in the Bangladesh Bank probe.

Earlier, the ACC questioned eight other officials of the Ruposhi Bangla Hotel branch of the bank, including its Manager AKM Azizur Rahman, who is from the same district as the PM's adviser, said the sources.

An ACC official said according to Bangladesh Bank rules, an official cannot serve as a branch manager of the bank for more than three years, but Azizur was serving for five years as the Ruposhi Bangla Hotel branch manager.

“We also have information from different sources that the adviser might have used his influence to keep Azizur Rahman as the branch manager for more than the stipulated period,” said the official seeking anonymity.

ACC sources said the bank officials denied their involvement in the loan scam but gave their statements to the investigators.

Earlier, the investigators quizzed the owner of the four spinning mills that were set up on paper by Hallmark in its own interest.

ACC officials said they would gradually quiz more officials from the GM Office of Sonali Bank Ltd and other top-level officials of the bank.

By: Julfikar Ali Manik, The Daily Star

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla