হায় সরকার, হায় আদালত!!!

সংশোধন চলছে ‘দেয়াল’-এর

হুমায়ূনের অনূদিত কুরআন শরিফের পাণ্ডুলিপি কোথায়?

তারেক মোরতাজা

হুমায়ূন আহমেদ তার সর্বশেষ গ্রন্থ দেয়ালের কাজ শেষ করে গেছেন। তার ছোট ভাই আহসান হাবীব এ তথ্য জানিয়ে বলেন, বইটি সংশোধনের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আনোয়ার হোসেনের কাছে রয়েছে। সংশোধন শেষে গ্রন্থটি প্রকাশ করবে অন্য প্রকাশ।

অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ই-মেইল বার্তায় প্রকাশক বিশ্বজিৎ সাহা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ‘আমার যত দূর মনে পড়ে হুমায়ূন ভাই বলেছিলেন তার মৃত্যুর পর তার অনূদিত কুরআন শরিফ প্রকাশিত হবে। সেটি এখন কোথায় এবং কোন অবস্থায় রয়েছে সেটাও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের আগ্রহের বিষয়।’ তবে এ বিষয়ে তার বিস্তারিত কিছু জানা নেই।

হুমায়ূন আহমেদের রাজনৈতিক উপন্যাস দেয়াল প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। বলেছেন, এতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘ভুল’ রয়েছে, যা সংশোধন করে প্রকাশ করতে হবে। উপন্যাসটির দুটো অধ্যায় ১১ মে দৈনিক প্রথম আলো তাদের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশ করেছিল। ১৫ মে আদালত ওই নির্দেশনা দেন। তখন হুমায়ূন আহমেদ ২০ দিনের জন্য দেশে এসেছিলেন।

দেয়াল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস, যাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হাইকোর্ট যে রায়টি দিয়েছেন, এটি স্বতঃপ্রণোদিত। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম আদালতের দৃষ্টিতে আনলে আদালত এ নির্দেশনা দেন। দেয়াল উপন্যাসটি প্রকাশের কথা রয়েছে অন্য প্রকাশের। তবে এ নির্দেশনার ফলে এটি আদালতের ভাষায় ‘ভুল’ সংশোধন ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না।

দেয়ালের দুটো অধ্যায়ে ১৯৭৫-এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। এতে হুমায়ূন আহমেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গপিতা মহামানব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, ‘...শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কাজ করতে পারেনি, সে কাজ তোমরা করবে? এই সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে ছুটে এল মেজর নূর। শেখ মুজিব তার দিকে ফিরে তাকানোর আগেই ব্রাশফায়ার করল। সময় ভোর পাঁচটা চল্লিশ। বঙ্গপিতা মহামানব শেখ মুজিব সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লেন। তখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে তার প্রিয় পাইপ। বত্রিশ নম্বর বাড়িটিতে কিছুক্ষণের জন্য নরকের দরজা খুলে গেল। একের পর এক রক্তভেজা মানুষ মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে লাগল।’

এতে হুমায়ূনের যে বর্ণনা নিয়ে মাহবুবে আলমের আপত্তি, তা হলো শেখ রাসেলের হত্যার বর্ণনা সঠিকভাবে ফুটিয়ে না তোলা। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘... বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ তাদের মাঝখানে রাসেলকে নিয়ে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থর থর করে কাঁপছিল। ঘাতক বাহিনী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। ছোট্ট রাসেল দৌড়ে আশ্রয় নিলো আলনার পেছনে। সেখান থেকে শিশু করুণ গলায় বলল, তোমরা আমাকে গুলি করো না। শিশুটিকে তার লুকানো জায়গা থেকে ধরে এনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হলো। এরপর শেখ জামাল ও শেখ কামালের মাত্র কিছুদিন আগে বিয়ে হওয়া দুই তরুণী বধূকে হত্যার পালা।...’

মাহবুবে আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের ওই উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনার সময় শেখ রাসেলের মৃত্যুর দৃশ্যপটটি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এ হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি বীভৎস ঘটনা। কিন্তু হুমায়ূনের বিবরণে সেটি ফুটে ওঠেনি।’

তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া খন্দকার মোশতাককে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, তিনি এই হত্যার ঘটনা আগে থেকে জানতেন না। প্রকৃতপে তিনি ওই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন।’ অবশ্য হুমায়ূনের এই ‘রাজনৈতিক উপন্যাস’ লেখার সিদ্ধান্তকে একটি ‘মহৎ উদ্যোগ’ বলে মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম।

‘কিন্তু এতে তথ্যগত ভুল থাকলে লাখ লাখ তরুণ সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হবেন’ বলে তিনি মনে করেন।

উপন্যাসটিতে হুমায়ূন আহমেদ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের বিখ্যাত গ্রন্থ লিগেসি অব ব্লাড থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার টুঙ্গীপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে হামলা করেছিল জনগণ। এ তথ্যকে অস্বীকার করে একজন সাংবাদিক অনলাইন নিউজ বাংলানিউজটুয়েন্টিফোরে কলাম লেখেন। তিনি এ তথ্যকে ভুল বলে উল্লেখ করেন।

হুমায়ূন আহমেদ তার স্বভাবসুলভ ঢঙে উপন্যাসটি রচনা করেছেন। তবে এতে তিনি শিশু রাসেল হত্যার বর্ণনা সঠিকভাবে দেননি বলে আদালতের নির্দেশনার কবলে পড়লেও একই গ্রন্থে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে যে মন্তব্য রয়েছে সে সম্পর্কে আদালত কিছুই বলেননি। এতে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘মেজর জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, প্রেসিডেন্ট নিহত, তাতে কী হয়েছে? ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছে। কনস্টিটিউশন যেন ঠিক থাকে।’ সে বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কোনো তথ্য সূত্র উল্লেখ করা হয়নি।

দেয়ালে রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে অত্যাচার এবং তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণার প্রসঙ্গও টানা হয়েছে।

বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেয়া আদেশে বলেন, ‘ভুল সংশোধন না করা পর্যন্ত উপন্যাসটি প্রকাশ করা যাবে না’। এখন সেই ‘ভুল’ সংশোধনের কাজ করছেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন!

http://www.dailynayadiganta.com/details/59405