Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

জেএমবির শীর্ষ নেতা সাইদুর তৃতীয় স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার

জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষ নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান ওরফে জাফর (৫১) ধরা পড়েছেন। তিন সহযোগী ও তৃতীয় স্ত্রীসহ গত সোমবার রাতে রাজধানীর পূর্ব দনিয়া থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাইদুরের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জেএমবির আরেকটি অধ্যায়ের শেষ হলো বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। এর আগে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে নিষিদ্ধ এ সংগঠনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। শায়খ আবদুর রহমানের পর হবিগঞ্জের জামায়াতের সাবেক নেতা মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে জেএমবি আবার পুনর্গঠিত ও সক্রিয় হয়।
পুলিশ জানায়, জঙ্গিদের কাছ থেকে পিস্তল, তাজা বোমা, বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম, আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহারযোগ্য বিস্ফোরক বহনের কোমরবন্ধনী ও সাংগঠনিক পুস্তিকা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, জেএমবি এখন শেষের পথে। তাদের পক্ষে বড় কোনো ঘটনা ঘটানোর সামর্থ্য এখন আর নেই। তিনি বলেন, জেএমবি দেশ ও জাতির শত্রু। এরা ধর্মের নামে জঘন্য কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছিল।
সাইদুরের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন তাঁর তৃতীয় স্ত্রী নাইমা আক্তার, জেএমবির কথিত সামরিক শাখার সমন্বয়ক আমির হোসেন ওরফে শরীফ, এহসার সদস্য (সার্বক্ষণিক সদস্য) নূর হোসেন ওরফে সবুজ ও আবদুল্লাহ হেল কাফী। এঁদের সবাইকে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইজি নূর মোহাম্মদ বলেন, সাইদুরকে ধরার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর, বিশেষ শাখা (এসবি), সিআইডি ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বাছাই করা সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ গোয়েন্দা দল গঠন করা হয়। দলটি কয়েক মাস নিরলস চেষ্টা করে সাইদুরের বিশ্বস্ত কিছু সহচরের অবস্থান শনাক্ত করে। সাইদুর এসব সহচরের অস্থায়ী আস্তানায় ঘুরেফিরে অবস্থান করতেন।
আইজি বলেন, গত রোববার রাতে দক্ষিণ দনিয়ায় জেএমবির আস্তানায় পুলিশের বিশেষ দলটি অভিযান চালায়। তখন জঙ্গিদের বোমা হামলায় পুলিশের আট সদস্য আহত হন। কয়েকজন জঙ্গি পালিয়ে গেলেও জেএমবির কথিত সামরিক শাখার কমান্ডার শিবলু আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সাইদুরের সন্ধান পাওয়া যায়।
এক প্রশ্নের জবাবে আইজি বলেন, জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক যে প্রবণতা, তাতে জেএমবির বিদেশি যোগাযোগ থাকতেই পারে। তিনি বলেন, জেএমবিতে আত্মঘাতী নারী শাখা বলে কিছু নেই। এখন পর্যন্ত এ জাতীয় কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।
গত সোমবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের হরতাল ডাকার সঙ্গে জঙ্গিদের হঠাৎ তত্পর হওয়া ও পুলিশের ওপর বোমা হামলার যোগসূত্র রয়েছে। এ দাবির কোনো ভিত্তি আছে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীরা যখন কথা বলেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে অনেক ওয়াইড, উদার। আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে সম্পূর্ণ তদন্তকেন্দ্রিক। তাই মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে আমাদের বক্তব্য মেলানো ঠিক হবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর নাইম আহমেদ, মহানগর পুলিশ কমিশনার এ কে এম শহীদুল হক, অতিরিক্ত আইজিপি (বিশেষ শাখা) জাবেদ পাটোয়ারী, উপমহাপরিদর্শক (প্রশাসন) বেনজির আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার: অভিযান সম্পর্কে পুলিশের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাইদুরের সন্ধানে পুলিশ রোববার রাতে দনিয়ায় জঙ্গি শিবলী ওরফে আবু বকর ওরফে নজরুলের বাসায় অভিযান চালায়। সেখানে তাঁকে না পেয়ে এই বিশেষ গোয়েন্দা দলটি সোমবার রাতে নারায়ণগঞ্জের পাইনাদী এলাকায় অভিযান চালায়। সেখানে একটি বাসা থেকে জঙ্গি শরীফ ও সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বাসাটি ছিল শরীফের আস্তানা। সেখান থেকে আত্মঘাতী হামলার জন্য ব্যবহারযোগ্য বিস্ফোরকভর্তি কয়েকটি কোমরবন্ধনী (বেল্ট), একটি বিদেশি পিস্তল, গুলিভর্তি দুটি ম্যাগাজিন, জঙ্গিদের নিজেদের তৈরি বেশ কিছু গুলি ও গুলি তৈরির সরঞ্জাম, লেদ মেশিন, বেল্ট তৈরির উপকরণসহ বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এরপর পুলিশ পূর্ব দনিয়ার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর, তাঁর তৃতীয় স্ত্রী নাইমা আক্তার ও এহসার সদস্য আবদুল্লাহ হেল কাফীকে গ্রেপ্তার করে। ওই বাসাটি ছিল কাফীর ভাড়া করা। সেখান থেকে জেএমবির বিপুল পরিমাণ সাংগঠনিক বইপুস্তক ও প্রচারপত্র উদ্ধার করা হয়।
একটি সূত্র জানায়, সাইদুরকে ধরার পর রোববার রাতে দক্ষিণ দনিয়ার ওই আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। তবে এ তথ্য সঠিক নয় বলে আইজিপি দাবি করেন।
শিবির-জামায়াত থেকে জেএমবির নেতা সাইদুর: গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, সাইদুর রহমান ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। তিনি ১৯৭৮-৮০ সাল পর্যন্ত শিবিরের মৌলভীবাজার সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ছিলেন। ১৯৮০ সালে মৌলভীবাজার দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে তাফসির পাস করেন তিনি। ১৯৮১ সালে সিলেটের হজরত শাহজালালের (র.) মাজারে অবস্থিত দরগা মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করেন। ১৯৮১ সালে শিবিরের হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সাংগঠনিক জেলার সেক্রেটারি হন। ১৯৮৬ সালে তিনি জামায়াতের হবিগঞ্জ জেলার আমির হন। একই সঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যও হন। সাইদুর ২০০৬ সালের অক্টোবরে জেএমবির আমির হন।
প্রথম আলোর হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সাইদুর রহমান ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতের জেলা আমির ছিলেন। তবে জামায়াতের বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা মুখলেছুর রহমান দাবি করেন, সাইদুরকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে ১৯৮৯ সালে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে এ বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি সংগঠনের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
স্থানীয় লোকজন জানান, ১৯৮৯ সালের পর সাইদুর রহমান হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির হবিগঞ্জ জেলা অফিসের ইনচার্জ পদে চাকরি করেন। একই সঙ্গে ছোটখাটো ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইদুর রহমানের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৪ আগস্ট হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার খুঁজারগাঁও মিরপুর বাজারের পৈতৃক বাড়িতে। ১৯৮০ সালে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। তাঁর চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে শামীম এখন কারাগারে। শামীম জেএমবির আইটি শাখার প্রধান ছিলেন। শামীমের স্ত্রী আলেয়াও জেএমবির সঙ্গে যুক্ত। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে বোমা হামলার কিছুদিন পর শামীম সস্ত্রীক গ্রেপ্তার হন ঢাকার মাদারটেক জেএমবির কার্যালয় থেকে। তখনই সাইদুরের নামটি প্রথম আলোচনায় আসে। এর আগ পর্যন্ত সাইদুর হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুরের বাসায় থাকতেন।
সাইদুরের একমাত্র মেয়ে শিরিনের (২৫) বিয়ে হয়েছে জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান ওরফে সানীর (পরে সানীর ফাঁসি হয়) সঙ্গে। মেজো ছেলে নাসিম ওরফে সুমন (২০), ছোট ছেলে নাঈম (১০) ও সাইদুরের প্রথম স্ত্রীর সন্ধান পায়নি পুলিশ। তৃতীয় ছেলে ফাহিম ওরফে বাশার জেএমবির আর্থিক বিষয়াদি দেখাশোনা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাশারকে কয়েক মাস আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থা আটক করলেও এখনো গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি বলে সাইদুর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
সাইদুরের দ্বিতীয় স্ত্রী নুরুন্নাহারকে (দিনাজপুরে বাড়ি) গত বছরের ৩১ অক্টোবর ঢাকার খিলগাঁও থেকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে। আর তৃতীয় স্ত্রী নাইমা সাইদুরের সঙ্গে ধরা পড়েন।
জঙ্গিনেতার শাস্তি চান মা: প্রথম আলোর বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সাইদুরের গ্রেপ্তারের খবর তাঁর মা রজব চাঁন (৭০) গতকাল দুপুরে সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারেন। গতকাল দুপুরে হবিগঞ্জের খুঁজারগাঁও গ্রামের বাড়িতে গেলে রজব চাঁন বলেন, ‘সাইদুর যদি দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে আমিও চাই তার শাস্তি হোক।’ তিনি বলেন, তাঁর অন্য সন্তানদের কেউ জেএমবি করেন না। তাঁদের যেন হয়রানি না করা হয়।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-05-26/news/66072

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla