Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

লেডি কিলার, শিকার ১১ নারী, টার্গেট ছিল ১০১

দৈনিক মানবজমিন হতেঃ
Photobucket
ইমরান হোসেইন সুমন/মোরশেদ আলম/আবু হেনা মোস্তফা কামাল: সিরিয়াল কিলার রসুর টার্গেট ছিল যুবতীরা। তার খুনের নেশার শিকার হয়েছে অন্তত ১১ নারী। জীবনে প্রথম প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিল রসু। তার শোধ তুলতে সে পরিণত হয় ভয়ঙ্কর খুনিতে। নিষ্ঠুর প্রতিজ্ঞা ছিল যন্ত্রণা দিয়ে, নির্যাতন চালিয়ে খুন করবে ১০১ নারীকে। পুলিশ ও মানুষের নজর এড়িয়ে রসু চালিয়ে যায় তার খুনের মিশন। ১১ নারীকে খুন করে শেষে একটি খুনের ঘটনায় ধরা পড়ে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পুলিশের হাতে। রিমান্ডে সে জানায়, প্রেমের প্রলোভন, বিয়ের ফাঁদে ফেলে সে টার্গেট করে একের পর এক নারীকে। হত্যার পর লাশের ওপরও নির্যাতন চালিয়েছে লেডি কিলার রসু। লাশ গুম করেছে বিচিত্র উপায়ে। ফরিদগঞ্জে ৬, চাঁদপুর সদরে ৪ এবং হাইমচর থানায় ১ নারীকে খুন করে ভাসিয়ে দিয়েছে লাশ। কখনও সকলের নজর এড়িয়ে জলাশয়েও ডুবিয়ে দিয়েছে লাশ। সিরিয়াল লেডি কিলার রসু খাঁর বয়স এখন ৪০ বছর। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সে সুস্থ স্বাভাবিক। তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত মনে হয়নি। সামান্য ফেরিওয়ালা হয়ে রসু ভালবেসেছিল ধনাঢ্য ব্যক্তির কন্যাকে। এ ভালবাসাই তাকে কিলারে রূপান্তরিত করে। ধনাঢ্য পিতার কন্যাকে ভালবাসার জের হিসেবে রসুকে পিটিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়। এ ঘটনার পর নারীর প্রতি তার ক্ষোভ জন্মে। আর এ ক্ষোভ থেকে তার নৃশংসতা শুরু। তার খুনের তালিকায় রয়েছে আপন শ্যালকের স্ত্রীও। গাজীপুর, সন্দ্বীপ, হাইমচর এলাকার ১১ নারীকে খুন করেছে রসু খাঁ ওরফে সম্রাট। চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার মদনা গ্রামের আবুল খাঁ’র চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট রসু। কিশোর বয়স থেকেই এলাকায় নারীঘটিত নানা অপকর্মে জড়িয়ে গ্রামছাড়া হয়। তারপর গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকায় গিয়ে কাজ নেয় ফেরিওয়ালার। পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে রসু জানায়, কাউকে পছন্দ হলে কৌশলে প্রথমে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। এরপর তাকে ফুঁসলিয়ে এবং নানা ছলচাতুরি করে গ্রামে নিয়ে যেতো। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুম করা হতো। তবে বেশির ভাগ ঘটনা সে ঘটাতো চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানা এলাকায় গিয়ে। গত ছয় মাসে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ এরকম ছয়টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে।

যে মামলায় গ্রেপ্তার রসু: ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রঞ্জিত কুমার পালিত জানান, মাসখানেক আগে ফরিদগঞ্জে একটি ডাকাতি হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে রসু জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পারে। রঞ্জিত পালিত বলেন, বেশ কিছু দিন মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকার পর তা আবার চালু করা হয়। ফোনের সূত্র ধরে ৩রা আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় জহির (২৬) নামের এক ব্যক্তিকে। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টঙ্গীর নিশাতনগর এলাকা থেকে রসুকে গ্রেপ্তার করে ফরিদগঞ্জ থানার এসআই মীর কাসেম। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর রসু প্রথমে পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সে এই লোমহর্ষক খুনের বর্ণনা দেয়। পুলিশ জানায়, তার হাতে খুন হওয়া নারীদের মধ্যে এ পর্যন্ত যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- রীনা (সন্দ্বীপ), পারভীন (ফরিদগঞ্জ), নাসরিন (গাজীপুর), ফাতেমা (হাইমচর) কোহিনুর (কুমিল্লা), শাহিদা (ফরিদপুর), মেহেদি (রংপুর) ও আঙ্গুর।

১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে রসু বলেছে, খুন করা নারীদের মধ্যে ১১ জনের কথা তার স্মরণ আছে। তবে খুন করা নারীদের কাউকেই সে বিয়ে করেনি। শুধু প্রেম ও ভালবাসার ছলচাতুরি দিয়ে তাদের ভোগ করতো। আর যখন ফেন্সির পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে নির্যাতনের কথা মনে পড়তো তখন তার মাথায় খুন চেপে যেতো। এভাবেই সে ওই নারীদের খুন করতো। খুন করে লাশ ফরিদগঞ্জের কচুরি ভর্তি ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে দিতো। হাইমচরে খুন করা নারীকে তাজখারকান্দি এলাকার মেঘনা নদীতে ফেলে দেয় সে। গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মিনু নামের এক মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখায় রসু। খুন করার আগে সে মদ খেয়ে নিতো। যাতে খুন করতে কোন কষ্ট না হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মীর কাসেম জানান, রসু একজন পেশাদার খুনি। হকারি, রিকশা চালানোসহ নানা কাজের আড়ালে বিভিন্ন অপরাধ করাই তার নেশা। জিজ্ঞাসাবাদে তাকে অবিচল দেখা গেছে। এত খুনের পরও তার মধ্যে কোন ধরনের অনুতাপ কাজ করছে না।

এলাকাবাসীর বক্তব্য: চাঁদপুর সদর উপজেলার ১২ নং চান্দ্রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খান জাহান আলী কালু পাটওয়ারী বলেন, গত সাত-আট বছর ধরে রসুর পরিবারের কেউ এলাকায় থাকে না। রসুর পিতা আবুল খাঁ পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোফাজ্জল হোসেন খান মফু বলেন, চার ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে রসুসহ তার আরেক ভাই আছে। তবে ওই ভাই এলাকায় থাকেন না। গ্রামে রসুদের ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই।

১০১ মেয়েকে হত্যার প্রতিজ্ঞা: ১৫ বছর আগে প্রেমে ব্যর্থ এবং কথিত প্রেমিকার পিতার মাস্তান বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে ১০১ নারীকে হত্যার প্রতিজ্ঞা করে এই রসু খাঁ। নানা কৌশলে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের নিয়ে অভিসারে যাওয়ার কথা বলে মেয়েদের হত্যা করাটা নেশায় পরিণত হয়েছিল তার। চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের আবুল খাঁর ছেলে রসু খাঁ (৪০) পেশায় কখনও হকার, কখনও ডাকাত, কখনও চোর। আবার কখনও কখনও সে রিকশাচালক। ১৬ বছর ধরে সে এলাকাছাড়া। ঢাকার টঙ্গী এলাকায় বসবাস করতো সে। তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শারমীন ওরফে ফেন্সি নামের এক মেয়ের। ফেন্সি ছিল বিত্তশালী পরিবারের। রসুর প্রেমের প্রস্তাব বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিল ফেন্সি। কিন্তু রসু বেপরোয়া হয়ে ওঠায় ফেন্সি’র পরিবার তাকে ধরে নিয়ে বেদম মারধর করে। এরপর থেকে সে মেয়েদের হত্যার নেশায় মেতে ওঠে। শপথ নেয় নিজের স্ত্রী ছাড়া জীবনে ১০১টি খুন করবে। পরে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহঃ) মাজারে গিয়ে বাকি জীবন কাটাবে। ১১ বছর আগে সে তার গ্রামের বাড়ি ফরিদগঞ্জের লাড়–য়া গ্রামে মনু নামের এক মেয়েকে বিয়ে করে। কিন্তু সেই মেয়ের এক চোখ কানা হওয়ায় তাকে সে মেনে নেয়নি। পরে মনুর ছোট বোন রীনাকে বিয়ে করে টঙ্গিতে চলে যায়। বর্তমানে সে তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক।

শ্যালকের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু : রসু হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় তার শ্যালক মান্নানের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে। শ্যালকের স্ত্রী’র বাড়ি হাতিয়ায়। সে তাকে মিথ্যা কথা বলে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে এনে ধর্ষণের পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। এরপর একে একে আরও ১০টি খুন করে। যাদের খুন করা হয় তাদের বয়স ১৭ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। খুনি রসু জানিয়েছে, সে হত্যার আগে সব মেয়েকে ধর্ষণ করতো না। শুধুমাত্র যাকে পছন্দ হতো তাকেই ধর্ষণ করেছে। আর সবাইকেই সে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে। সবশেষে তার ভাগিনা জহিরুলকে নিয়ে গত ২০শে আগস্ট ফরিদগঞ্জের পালতালুক গ্রামের পারভীন আক্তারকে হত্যা করে। পুলিশ জহিরুলকেও গ্রেপ্তার করেছে। জহিরুল শনিবার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

পুলিশের হাতে আটক রসু সাংবাদিকদের অবলীলায় তার অপকর্মের কাহিনীর বর্ণনা দিচ্ছিল। তবে তার দাবিÑ তাকে যেন ক্রসফায়ারে হত্যা না করে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়।

৭ই অক্টোবর রাতে রসুকে টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদকালে সে এক এক করে তার হাতে সংঘটিত খুনের কাহিনী বর্ণনা করে। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রসুকে একনজর দেখতে স্থানীয় এলাকাবাসী আদালত ও থানায় ভিড় করছে।

কে এই রসু: দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম রসু খাঁ’র। পিতা আবুল হোসেন ওরফে মনু খাঁ ছিলেন একজন ক্ষেতমজুর। ফরিদগঞ্জ থানার সীমান্তবর্তী গ্রাম মদনা খাঁ বাড়ি তাদের। এ গ্রামটি চাঁদপুর সদর থানার অন্তর্গত। ১৪-১৫ বছর আগে তার পিতা মারা যায়। এতে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তার পরিবার। কিছুদিন পর পিতার রেখে যাওয়া ৩০-৩৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধও সৃষ্টি হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। সে দাবি করে প্রতিপক্ষরা তাকে কারণে-অকারণে ‘চোর চোট্টা’ বলে গালাগাল দিতো। পিতার মৃত্যুর ২-৩ বছর পর তার মা কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকার টঙ্গীতে বসবাসরত বড় মেয়ে হাফছা বেগমের কাছে চলে যায়। ২ ভাই ও ২ বোন তারা। অপর ভাই বসু খাঁ নিরুদ্দেশ। ছোট বোন জান্নাত বেগম জর্ডান প্রবাসী। তার মা টঙ্গী চলে যাওয়ার পর ভবঘুরে দিন কাটে তার। এক পর্যায়ে ছোটখাটো চুরিচামারিতে জড়িয়ে পড়ে। ১৫-১৬ বছর আগে সে বিয়ে করে পার্শ্ববর্তী লাড়–য়া গ্রামের ব্যাপারী বাড়িতে। বিয়ের আগে ঘটক তাকে বউ দেখতে দেয়নি। রসু খাঁ জানায়, বাসরঘরে ঢুকে দেখি বউয়ের ডান চোখ কানা। দু’বছর পর বউ গর্ভবতী হয়। এরপর ওই বউকে শ্বশুর বাড়ি রেখে শ্যালিকা রীনা বেগমকে নিয়ে পালিয়ে যায় টঙ্গী। দ্বিতীয় বিয়ের পর স্ত্রী রীনাকে নিয়ে বসবাস শুরু করে টঙ্গীর নিশাত নগর। সেখানকার বাবু কমিশনারের এলাকায় জনৈক বাবলু মিয়ার বাড়িতে ৫শ’ টাকা বাসা ভাড়া নেয়। পরে স্ত্রী রীনাকে গার্মেন্টসে চাকরি করতে দেয়। রসু খাঁ জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতের সঙ্গে। টঙ্গীর বিভিন্ন স্থানসহ মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়িতে এসে চুরিচামারি করে আবার টঙ্গী ফিরে যেতো। রসু খাঁ’র বর্ণনা মতে এ সময়ই ওই এলাকার প্রভাবশালীর মেয়ে ফেন্সিকে ভালবেসে ফেলে। রসু জানায়, তারই ভালবাসার পাত্রী তার সঙ্গে প্রতারণা করে এলাকার অন্য এক ছেলের সঙ্গে প্রেমে জড়ায়। এক পর্যায়ে ৫-৬ জন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে বেদম মারধর করে তাকে। সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করে ১০১ জন নারীকে ধর্ষণ শেষে খুন করবে বলে। সে অনুযায়ী রসু নারীদের সঙ্গে প্রেমের ভাব গড়া শুরু করে। তার এসব খুনের নিয়মিত কোন সহযোগী ছিল না বলে জানায় সে। তবে ২-৩টি ঘটনার সঙ্গে ইউনুছ (৩৬) ওরফে হক সাহেব নামের একজন জড়িত ছিল বলে সে জানায়। খুনের আগে সে ধর্ষণ করতো তাদের। পরে সুযোগ দিতো সহযোগীদের। সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে রসু জানায়, খুন ও ধর্ষণের শিকার ১১টি লাশই উদ্ধার করা হয় নদী, খাল বা ডোবার পাশ অথবা পানি থেকে। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের আগে অথবা পরে সে ওই নারীদের হাত ও পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিতো। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সে তাদের পানিতে চেপে ধরে রাখতো। কখনও মুখে কাপড় গুঁজে গলা টিপে হত্যা করতো। ফরিদগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে আসার নাম করে শালার বউকে ফরিদগঞ্জের ৯ নং ইউপি’র ভাটিয়ালপুর গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। তারপর দু’জনে মিলে ফুসলিয়ে নদীর পাড়ে তাকে ধর্ষণ শেষে মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে হাত-পা বেঁধে নদীর পানিতে চুবিয়ে ও গলা টিপে হত্যা করে। হত্যা শেষে দু’জনে ফিরে যায় ঢাকা। অপর এক ঘটনায় এক পতিতাকে টঙ্গী থেকে এনে ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামে একইভাবে ধর্ষণ শেষে দু’ পায়ের সঙ্গে দু’ হাত বেঁধে গলাটিপে হত্যা করে।

গত ৭ই জুলাই তার সর্বশেষ খুনের শিকার তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তার। ৮ নং পাইকপাড়া ইউপি’র পালতালুক গ্রামের খাঁ বাড়ির কাজল খাঁ’র বিবাহিতা কন্যা পারভীন আক্তার (২৫)। তিন ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী পারভীনকে ফেলে নিখোঁজ হয়ে যায় পারভীনের স্বামী আবুল কালাম। এরপর এ বছরের প্রথম দিকে স্থানীয় গাজীপুর বাজারে পারভীনের সঙ্গে পরিচয় হয় রসু খাঁ’র। এতে দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়। রসু খাঁ তাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময় মেলামেশা করে তার সঙ্গে। এক পর্যায়ে গত ৭ই জুলাই রাত ১টায় পারভীনকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১০ নং গোবিন্দপুর ইউপি’র হাসা গ্রামে। পথে দেখা হয় ওই ইউনিয়নের সিংহের গ্রামের আপন ভাগ্নে জহির ও গোবিন্দপুর গ্রামের সঙ্গী ইউনুছের সঙ্গে। তারা রসু খাঁর পিছু নেয়। এরপর একটি নির্জন বিলের পাশে খাল পাড়ে যায় তারা। তারা তিনজনে মিলে পারভীনকে ধর্ষণ করে। পারভীন ওই রাতে তাকে বিয়ে করতে হবে বলে চাপ দেয়। নচেৎ সে পুলিশকে জানিয়ে মামলার হুমকি দেয় এবং চেঁচামেচি শুরু করে। এতে ভাগ্নে জহির ও সঙ্গী ইউনুছ পারভীনের হাত ও পা চেপে ধরে মাটিতে শুইয়ে দেয়। রসু খাঁ পারভীনের মুখে পরনের কাপড় গুঁজে দিয়ে গলাটিপে হত্যা শেষে হাত-পা বেঁধে পার্শ্ববর্তী খালের পানিতে ফেলে দেয়। পরের দিন নিজেকে রিকশাচালক পরিচয় দিয়ে নিজ বাড়িতে বিরোধ আছে এমন দু’জনের নাম বলে পারভীনের খুনের সঙ্গে তারা জড়িত বলে ফরিদগঞ্জ থানার ওসিকে জানায়। পরে মোবাইল থেকে সিম কার্ড খুলে ফেলে। পরে পুলিশ ওই দু’জনকে ধরলেও মামলার কোন ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি। ওই দুই ব্যক্তিকে কোর্টেও চালান করা হয়। তারা ২-৩ মাস হাজতবাস করে জামিনে বেরিয়ে আসে। এদিকে রসু খাঁ গত জুলাই মাসে স্থানীয় গাজীপুর বাজারে রাতের বেলা একটি মসজিদের ১২টি ফ্যান চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার পথে এক আখের ব্যবসায়ীর হাতে ধরা খায়। লোকজন এসে গণধোলাই দিয়ে থানায় সোপর্দ করে। এতে সে চুরির মামলায় হাজত খেটে জামিনে বেরিয়ে আসে। ওদিকে আখের ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে মোবাইল ও ওই সিম কার্ডটি রেখে দেয়। পরে সেটি জনৈক এক যুবক ব্যবহার শুরু করলে পারভীনের মামলার তদন্তকারী এসআই মীর কাশেম ওই সিম নম্বরে কল দিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এরপর সিম কার্ডের সূত্রে শনাক্ত হয় এই খুনের প্রকৃত খুনি রসু খাঁ। পুলিশ সোর্সের মাধ্যমে গত ৮ই অক্টোবর ঢাকার টঙ্গীর বাসা থেকে রসু খাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে ফরিদগঞ্জ থানায়। এরপর কৌতূহলবশত ফরিদগঞ্জের গত প্রায় ২ বছরের অজ্ঞাতনামা অপর ৫টি খুনের সঙ্গে তাকে দায়ী করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। সে-ও অবলীলায় ফরিদগঞ্জের ৬টি, হাইমচরের ৩টি ও চাঁদপুরের ২টি ঘটনা, স্থান ও সময়ের বর্ণনা দেয়। এ বর্ণনার সঙ্গে ৩টি থানার অজ্ঞাতনামা ১০টি লাশের রেকর্ডের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তার বর্ণনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সব ক’টি মেয়ের নাম বলতে না পারলেও গত ২৩শে অক্টোবর ০৮ তারিখে কোহিনুর ও ১৩ই মার্চ ০৯ তারিখে মেহেদী নামের দু’জনের নাম প্রকাশ করেছে। ওদিকে পারভীনের খুনি ধরা পড়েছে একথা শুনে তার ভাই জাফর খাঁ, মা তফুরের নেছা ও পারভীনের অবুঝ ৩টি সন্তান থানায় ছুটে আসে। তারা রসু খাঁকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের দাবি নরপিশাচ এ খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ন্যায় বিচার করা হোক- যাতে আর কোন মা-বোনের এমনি পরিণতি না হয়।দৈনিক মানবজমিন হতেঃ

ইমরান হোসেইন সুমন/মোরশেদ আলম/আবু হেনা মোস্তফা কামাল: সিরিয়াল কিলার রসুর টার্গেট ছিল যুবতীরা। তার খুনের নেশার শিকার হয়েছে অন্তত ১১ নারী। জীবনে প্রথম প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিল রসু। তার শোধ তুলতে সে পরিণত হয় ভয়ঙ্কর খুনিতে। নিষ্ঠুর প্রতিজ্ঞা ছিল যন্ত্রণা দিয়ে, নির্যাতন চালিয়ে খুন করবে ১০১ নারীকে। পুলিশ ও মানুষের নজর এড়িয়ে রসু চালিয়ে যায় তার খুনের মিশন। ১১ নারীকে খুন করে শেষে একটি খুনের ঘটনায় ধরা পড়ে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পুলিশের হাতে। রিমান্ডে সে জানায়, প্রেমের প্রলোভন, বিয়ের ফাঁদে ফেলে সে টার্গেট করে একের পর এক নারীকে। হত্যার পর লাশের ওপরও নির্যাতন চালিয়েছে লেডি কিলার রসু। লাশ গুম করেছে বিচিত্র উপায়ে। ফরিদগঞ্জে ৬, চাঁদপুর সদরে ৪ এবং হাইমচর থানায় ১ নারীকে খুন করে ভাসিয়ে দিয়েছে লাশ। কখনও সকলের নজর এড়িয়ে জলাশয়েও ডুবিয়ে দিয়েছে লাশ। সিরিয়াল লেডি কিলার রসু খাঁর বয়স এখন ৪০ বছর। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সে সুস্থ স্বাভাবিক। তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত মনে হয়নি। সামান্য ফেরিওয়ালা হয়ে রসু ভালবেসেছিল ধনাঢ্য ব্যক্তির কন্যাকে। এ ভালবাসাই তাকে কিলারে রূপান্তরিত করে। ধনাঢ্য পিতার কন্যাকে ভালবাসার জের হিসেবে রসুকে পিটিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়। এ ঘটনার পর নারীর প্রতি তার ক্ষোভ জন্মে। আর এ ক্ষোভ থেকে তার নৃশংসতা শুরু। তার খুনের তালিকায় রয়েছে আপন শ্যালকের স্ত্রীও। গাজীপুর, সন্দ্বীপ, হাইমচর এলাকার ১১ নারীকে খুন করেছে রসু খাঁ ওরফে সম্রাট। চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার মদনা গ্রামের আবুল খাঁ’র চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট রসু। কিশোর বয়স থেকেই এলাকায় নারীঘটিত নানা অপকর্মে জড়িয়ে গ্রামছাড়া হয়। তারপর গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকায় গিয়ে কাজ নেয় ফেরিওয়ালার। পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে রসু জানায়, কাউকে পছন্দ হলে কৌশলে প্রথমে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। এরপর তাকে ফুঁসলিয়ে এবং নানা ছলচাতুরি করে গ্রামে নিয়ে যেতো। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুম করা হতো। তবে বেশির ভাগ ঘটনা সে ঘটাতো চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানা এলাকায় গিয়ে। গত ছয় মাসে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ এরকম ছয়টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে।

যে মামলায় গ্রেপ্তার রসু: ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রঞ্জিত কুমার পালিত জানান, মাসখানেক আগে ফরিদগঞ্জে একটি ডাকাতি হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে রসু জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পারে। রঞ্জিত পালিত বলেন, বেশ কিছু দিন মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকার পর তা আবার চালু করা হয়। ফোনের সূত্র ধরে ৩রা আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় জহির (২৬) নামের এক ব্যক্তিকে। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টঙ্গীর নিশাতনগর এলাকা থেকে রসুকে গ্রেপ্তার করে ফরিদগঞ্জ থানার এসআই মীর কাসেম। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর রসু প্রথমে পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সে এই লোমহর্ষক খুনের বর্ণনা দেয়। পুলিশ জানায়, তার হাতে খুন হওয়া নারীদের মধ্যে এ পর্যন্ত যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- রীনা (সন্দ্বীপ), পারভীন (ফরিদগঞ্জ), নাসরিন (গাজীপুর), ফাতেমা (হাইমচর) কোহিনুর (কুমিল্লা), শাহিদা (ফরিদপুর), মেহেদি (রংপুর) ও আঙ্গুর।

১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে রসু বলেছে, খুন করা নারীদের মধ্যে ১১ জনের কথা তার স্মরণ আছে। তবে খুন করা নারীদের কাউকেই সে বিয়ে করেনি। শুধু প্রেম ও ভালবাসার ছলচাতুরি দিয়ে তাদের ভোগ করতো। আর যখন ফেন্সির পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে নির্যাতনের কথা মনে পড়তো তখন তার মাথায় খুন চেপে যেতো। এভাবেই সে ওই নারীদের খুন করতো। খুন করে লাশ ফরিদগঞ্জের কচুরি ভর্তি ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে দিতো। হাইমচরে খুন করা নারীকে তাজখারকান্দি এলাকার মেঘনা নদীতে ফেলে দেয় সে। গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মিনু নামের এক মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখায় রসু। খুন করার আগে সে মদ খেয়ে নিতো। যাতে খুন করতে কোন কষ্ট না হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মীর কাসেম জানান, রসু একজন পেশাদার খুনি। হকারি, রিকশা চালানোসহ নানা কাজের আড়ালে বিভিন্ন অপরাধ করাই তার নেশা। জিজ্ঞাসাবাদে তাকে অবিচল দেখা গেছে। এত খুনের পরও তার মধ্যে কোন ধরনের অনুতাপ কাজ করছে না।

এলাকাবাসীর বক্তব্য: চাঁদপুর সদর উপজেলার ১২ নং চান্দ্রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খান জাহান আলী কালু পাটওয়ারী বলেন, গত সাত-আট বছর ধরে রসুর পরিবারের কেউ এলাকায় থাকে না। রসুর পিতা আবুল খাঁ পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোফাজ্জল হোসেন খান মফু বলেন, চার ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে রসুসহ তার আরেক ভাই আছে। তবে ওই ভাই এলাকায় থাকেন না। গ্রামে রসুদের ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই।

১০১ মেয়েকে হত্যার প্রতিজ্ঞা: ১৫ বছর আগে প্রেমে ব্যর্থ এবং কথিত প্রেমিকার পিতার মাস্তান বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে ১০১ নারীকে হত্যার প্রতিজ্ঞা করে এই রসু খাঁ। নানা কৌশলে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের নিয়ে অভিসারে যাওয়ার কথা বলে মেয়েদের হত্যা করাটা নেশায় পরিণত হয়েছিল তার। চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের আবুল খাঁর ছেলে রসু খাঁ (৪০) পেশায় কখনও হকার, কখনও ডাকাত, কখনও চোর। আবার কখনও কখনও সে রিকশাচালক। ১৬ বছর ধরে সে এলাকাছাড়া। ঢাকার টঙ্গী এলাকায় বসবাস করতো সে। তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শারমীন ওরফে ফেন্সি নামের এক মেয়ের। ফেন্সি ছিল বিত্তশালী পরিবারের। রসুর প্রেমের প্রস্তাব বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিল ফেন্সি। কিন্তু রসু বেপরোয়া হয়ে ওঠায় ফেন্সি’র পরিবার তাকে ধরে নিয়ে বেদম মারধর করে। এরপর থেকে সে মেয়েদের হত্যার নেশায় মেতে ওঠে। শপথ নেয় নিজের স্ত্রী ছাড়া জীবনে ১০১টি খুন করবে। পরে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহঃ) মাজারে গিয়ে বাকি জীবন কাটাবে। ১১ বছর আগে সে তার গ্রামের বাড়ি ফরিদগঞ্জের লাড়–য়া গ্রামে মনু নামের এক মেয়েকে বিয়ে করে। কিন্তু সেই মেয়ের এক চোখ কানা হওয়ায় তাকে সে মেনে নেয়নি। পরে মনুর ছোট বোন রীনাকে বিয়ে করে টঙ্গিতে চলে যায়। বর্তমানে সে তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক।

শ্যালকের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু : রসু হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় তার শ্যালক মান্নানের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে। শ্যালকের স্ত্রী’র বাড়ি হাতিয়ায়। সে তাকে মিথ্যা কথা বলে ফরিদগঞ্জের ভাটিয়ালপুরে এনে ধর্ষণের পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। এরপর একে একে আরও ১০টি খুন করে। যাদের খুন করা হয় তাদের বয়স ১৭ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। খুনি রসু জানিয়েছে, সে হত্যার আগে সব মেয়েকে ধর্ষণ করতো না। শুধুমাত্র যাকে পছন্দ হতো তাকেই ধর্ষণ করেছে। আর সবাইকেই সে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে। সবশেষে তার ভাগিনা জহিরুলকে নিয়ে গত ২০শে আগস্ট ফরিদগঞ্জের পালতালুক গ্রামের পারভীন আক্তারকে হত্যা করে। পুলিশ জহিরুলকেও গ্রেপ্তার করেছে। জহিরুল শনিবার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

পুলিশের হাতে আটক রসু সাংবাদিকদের অবলীলায় তার অপকর্মের কাহিনীর বর্ণনা দিচ্ছিল। তবে তার দাবিÑ তাকে যেন ক্রসফায়ারে হত্যা না করে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়।

৭ই অক্টোবর রাতে রসুকে টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদকালে সে এক এক করে তার হাতে সংঘটিত খুনের কাহিনী বর্ণনা করে। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রসুকে একনজর দেখতে স্থানীয় এলাকাবাসী আদালত ও থানায় ভিড় করছে।

কে এই রসু: দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম রসু খাঁ’র। পিতা আবুল হোসেন ওরফে মনু খাঁ ছিলেন একজন ক্ষেতমজুর। ফরিদগঞ্জ থানার সীমান্তবর্তী গ্রাম মদনা খাঁ বাড়ি তাদের। এ গ্রামটি চাঁদপুর সদর থানার অন্তর্গত। ১৪-১৫ বছর আগে তার পিতা মারা যায়। এতে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তার পরিবার। কিছুদিন পর পিতার রেখে যাওয়া ৩০-৩৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধও সৃষ্টি হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। সে দাবি করে প্রতিপক্ষরা তাকে কারণে-অকারণে ‘চোর চোট্টা’ বলে গালাগাল দিতো। পিতার মৃত্যুর ২-৩ বছর পর তার মা কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকার টঙ্গীতে বসবাসরত বড় মেয়ে হাফছা বেগমের কাছে চলে যায়। ২ ভাই ও ২ বোন তারা। অপর ভাই বসু খাঁ নিরুদ্দেশ। ছোট বোন জান্নাত বেগম জর্ডান প্রবাসী। তার মা টঙ্গী চলে যাওয়ার পর ভবঘুরে দিন কাটে তার। এক পর্যায়ে ছোটখাটো চুরিচামারিতে জড়িয়ে পড়ে। ১৫-১৬ বছর আগে সে বিয়ে করে পার্শ্ববর্তী লাড়–য়া গ্রামের ব্যাপারী বাড়িতে। বিয়ের আগে ঘটক তাকে বউ দেখতে দেয়নি। রসু খাঁ জানায়, বাসরঘরে ঢুকে দেখি বউয়ের ডান চোখ কানা। দু’বছর পর বউ গর্ভবতী হয়। এরপর ওই বউকে শ্বশুর বাড়ি রেখে শ্যালিকা রীনা বেগমকে নিয়ে পালিয়ে যায় টঙ্গী। দ্বিতীয় বিয়ের পর স্ত্রী রীনাকে নিয়ে বসবাস শুরু করে টঙ্গীর নিশাত নগর। সেখানকার বাবু কমিশনারের এলাকায় জনৈক বাবলু মিয়ার বাড়িতে ৫শ’ টাকা বাসা ভাড়া নেয়। পরে স্ত্রী রীনাকে গার্মেন্টসে চাকরি করতে দেয়। রসু খাঁ জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতের সঙ্গে। টঙ্গীর বিভিন্ন স্থানসহ মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়িতে এসে চুরিচামারি করে আবার টঙ্গী ফিরে যেতো। রসু খাঁ’র বর্ণনা মতে এ সময়ই ওই এলাকার প্রভাবশালীর মেয়ে ফেন্সিকে ভালবেসে ফেলে। রসু জানায়, তারই ভালবাসার পাত্রী তার সঙ্গে প্রতারণা করে এলাকার অন্য এক ছেলের সঙ্গে প্রেমে জড়ায়। এক পর্যায়ে ৫-৬ জন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে বেদম মারধর করে তাকে। সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করে ১০১ জন নারীকে ধর্ষণ শেষে খুন করবে বলে। সে অনুযায়ী রসু নারীদের সঙ্গে প্রেমের ভাব গড়া শুরু করে। তার এসব খুনের নিয়মিত কোন সহযোগী ছিল না বলে জানায় সে। তবে ২-৩টি ঘটনার সঙ্গে ইউনুছ (৩৬) ওরফে হক সাহেব নামের একজন জড়িত ছিল বলে সে জানায়। খুনের আগে সে ধর্ষণ করতো তাদের। পরে সুযোগ দিতো সহযোগীদের। সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে রসু জানায়, খুন ও ধর্ষণের শিকার ১১টি লাশই উদ্ধার করা হয় নদী, খাল বা ডোবার পাশ অথবা পানি থেকে। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের আগে অথবা পরে সে ওই নারীদের হাত ও পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিতো। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সে তাদের পানিতে চেপে ধরে রাখতো। কখনও মুখে কাপড় গুঁজে গলা টিপে হত্যা করতো। ফরিদগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে আসার নাম করে শালার বউকে ফরিদগঞ্জের ৯ নং ইউপি’র ভাটিয়ালপুর গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। তারপর দু’জনে মিলে ফুসলিয়ে নদীর পাড়ে তাকে ধর্ষণ শেষে মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে হাত-পা বেঁধে নদীর পানিতে চুবিয়ে ও গলা টিপে হত্যা করে। হত্যা শেষে দু’জনে ফিরে যায় ঢাকা। অপর এক ঘটনায় এক পতিতাকে টঙ্গী থেকে এনে ফরিদগঞ্জের হাসা গ্রামে একইভাবে ধর্ষণ শেষে দু’ পায়ের সঙ্গে দু’ হাত বেঁধে গলাটিপে হত্যা করে।

গত ৭ই জুলাই তার সর্বশেষ খুনের শিকার তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তার। ৮ নং পাইকপাড়া ইউপি’র পালতালুক গ্রামের খাঁ বাড়ির কাজল খাঁ’র বিবাহিতা কন্যা পারভীন আক্তার (২৫)। তিন ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী পারভীনকে ফেলে নিখোঁজ হয়ে যায় পারভীনের স্বামী আবুল কালাম। এরপর এ বছরের প্রথম দিকে স্থানীয় গাজীপুর বাজারে পারভীনের সঙ্গে পরিচয় হয় রসু খাঁ’র। এতে দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়। রসু খাঁ তাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময় মেলামেশা করে তার সঙ্গে। এক পর্যায়ে গত ৭ই জুলাই রাত ১টায় পারভীনকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১০ নং গোবিন্দপুর ইউপি’র হাসা গ্রামে। পথে দেখা হয় ওই ইউনিয়নের সিংহের গ্রামের আপন ভাগ্নে জহির ও গোবিন্দপুর গ্রামের সঙ্গী ইউনুছের সঙ্গে। তারা রসু খাঁর পিছু নেয়। এরপর একটি নির্জন বিলের পাশে খাল পাড়ে যায় তারা। তারা তিনজনে মিলে পারভীনকে ধর্ষণ করে। পারভীন ওই রাতে তাকে বিয়ে করতে হবে বলে চাপ দেয়। নচেৎ সে পুলিশকে জানিয়ে মামলার হুমকি দেয় এবং চেঁচামেচি শুরু করে। এতে ভাগ্নে জহির ও সঙ্গী ইউনুছ পারভীনের হাত ও পা চেপে ধরে মাটিতে শুইয়ে দেয়। রসু খাঁ পারভীনের মুখে পরনের কাপড় গুঁজে দিয়ে গলাটিপে হত্যা শেষে হাত-পা বেঁধে পার্শ্ববর্তী খালের পানিতে ফেলে দেয়। পরের দিন নিজেকে রিকশাচালক পরিচয় দিয়ে নিজ বাড়িতে বিরোধ আছে এমন দু’জনের নাম বলে পারভীনের খুনের সঙ্গে তারা জড়িত বলে ফরিদগঞ্জ থানার ওসিকে জানায়। পরে মোবাইল থেকে সিম কার্ড খুলে ফেলে। পরে পুলিশ ওই দু’জনকে ধরলেও মামলার কোন ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি। ওই দুই ব্যক্তিকে কোর্টেও চালান করা হয়। তারা ২-৩ মাস হাজতবাস করে জামিনে বেরিয়ে আসে। এদিকে রসু খাঁ গত জুলাই মাসে স্থানীয় গাজীপুর বাজারে রাতের বেলা একটি মসজিদের ১২টি ফ্যান চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার পথে এক আখের ব্যবসায়ীর হাতে ধরা খায়। লোকজন এসে গণধোলাই দিয়ে থানায় সোপর্দ করে। এতে সে চুরির মামলায় হাজত খেটে জামিনে বেরিয়ে আসে। ওদিকে আখের ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে মোবাইল ও ওই সিম কার্ডটি রেখে দেয়। পরে সেটি জনৈক এক যুবক ব্যবহার শুরু করলে পারভীনের মামলার তদন্তকারী এসআই মীর কাশেম ওই সিম নম্বরে কল দিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এরপর সিম কার্ডের সূত্রে শনাক্ত হয় এই খুনের প্রকৃত খুনি রসু খাঁ। পুলিশ সোর্সের মাধ্যমে গত ৮ই অক্টোবর ঢাকার টঙ্গীর বাসা থেকে রসু খাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে ফরিদগঞ্জ থানায়। এরপর কৌতূহলবশত ফরিদগঞ্জের গত প্রায় ২ বছরের অজ্ঞাতনামা অপর ৫টি খুনের সঙ্গে তাকে দায়ী করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। সে-ও অবলীলায় ফরিদগঞ্জের ৬টি, হাইমচরের ৩টি ও চাঁদপুরের ২টি ঘটনা, স্থান ও সময়ের বর্ণনা দেয়। এ বর্ণনার সঙ্গে ৩টি থানার অজ্ঞাতনামা ১০টি লাশের রেকর্ডের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তার বর্ণনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সব ক’টি মেয়ের নাম বলতে না পারলেও গত ২৩শে অক্টোবর ০৮ তারিখে কোহিনুর ও ১৩ই মার্চ ০৯ তারিখে মেহেদী নামের দু’জনের নাম প্রকাশ করেছে। ওদিকে পারভীনের খুনি ধরা পড়েছে একথা শুনে তার ভাই জাফর খাঁ, মা তফুরের নেছা ও পারভীনের অবুঝ ৩টি সন্তান থানায় ছুটে আসে। তারা রসু খাঁকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের দাবি নরপিশাচ এ খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ন্যায় বিচার করা হোক- যাতে আর কোন মা-বোনের এমনি পরিণতি না হয়।

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla