ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ : আরেক ফারাক্কা অভিশাপ

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রবঃ
পূর্বকথা : বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ ও তিস্তা ব্যারেজের পর এবার সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদী ব্যবস্থার মূল উৎসধারা বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে।ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বদ্বীপ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হয়েছে এবং ভারতের ঐ নদী আগ্রাসনের ফলে এককালের প্রমত্তা পদ্মা আজ ধূ-ধূ বালুচরে রূপান্তরিত।এরই প্রভাবে উত্তর বঙ্গের ভূ-গর্ভস্থ জলাধার আরো নিচে নেমে গেছে; ত্বরান্বিত হয়েছে উত্তরবঙ্গের মরুকরণ প্রক্রিয়া বা Prosess of Desertification। ঠিক একই সময় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'-এর মতো ভারতের উত্তরবঙ্গের যুগীগোপা নামক স্থানে তিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে এ মরুকরণ প্রক্রিয়াকে আরো ভয়াবহ সর্বগ্রাসী করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকেও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে আমদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি। এখন তারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীদ্বয়ের উৎসধারা বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ মাল্টিপারপাস বাঁধ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে আনছে। বরাক নদী হচ্ছে সুরমা-কুশিয়ারার নদীদ্বয়ের জন্মদাত্রী মাতা এবং মেঘনা নদী-ব্যবস্থার প্রধান পানি সরবরাহের উৎস। টিপাইমুখ বাঁধ চালু হলে সুরমা-কুশিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সম্পূর্ণ নদী ব্যবস্থা মরে যাবে একই সাথে ঐ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত দেশের পূর্বাঞ্চল, মধ্যঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা নদী-ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সকল উপনদী-শাখানদী এবং মূল মেঘনা নদীও অন্তীম পরিণতির দিকে যাত্রা শুরু করবে। ফারাক্কার সময় আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম; তিস্তা আগ্রাসনের সময় ছিলাম উদাসীন; আর এখন সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনার উৎসধারায় নির্মীয়মান টিপাইমুখ বাঁধের সময় জাতি দ্বিধাগ্রস্ত, অনবহিত এবং বিভক্ত। ভারত আন্তর্জাতিক নদীর উপর কো-রিপারিয়ান দেশের আন্তর্জাতি নদীর পানিবণ্টনের যৌক্তিক নিয়ম-নীতি এবং যৌক্তিক দাবি-দাওয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে তাদের সকল নদী-নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম একতরফাভাবে বাস্তবায়িত করে চলেছে। দুর্বল কূটনৈতিক ম্যানুভারিং, অপরিণত কৌশলগত ও আইনগত জ্ঞান আর বিভাজিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে বাংলাদেশ তার বৃহত্তর নির্মম প্রতিবেশীর স্বার্থপর পদক্ষেপসমূহ থেকে দেশের ও জাতির ন্যায়সঙ্গত স্বার্থকে সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
টিপাইমুখ বাঁধ পরিচিতি :
তুইভাই ও তুইরয়ং নদীদ্বয়ের মিলিত স্রোতধারায় সৃষ্ট নদীটির নাম বরাক নদী। তুইভাই ও তুইরয়ং নদীদ্বয়ের সঙ্গমস্থল হতে প্রায় ৫শ' মিটার পশ্চিমে বরাক নদীর ওপর ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করছে। এটির অবস্থান বাংলাদেশের সিলেট জেলার সীমান্ত হতে প্রায় ১শ' কিলোমিটার পূর্বে বরাক নদীতে এবং তুইভাই-বরাক নদীর সঙ্গমস্থল থেকে মণিপুর রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৫শ' মিটার দূরে সংকীর্ণ গিরিখাতে। মৃত্তিকা ও পাথুরে কাঠামোতে নির্মিত বাঁধটি সমুদ্রপানি সমতল থেকে প্রায় ৫শ' ফুট বা ১শ' ৮০ মিটার উঁচু এবং ১৫শ' ফুট বা ৫শ' মিটার দীর্ঘ। টিপাইমুখ বাঁধের কারণে মণিপুর ও আসামের কাছাড় জেলার প্রায় ৩শ' বর্গ কিলোমিটার ভূমি ডুবে যাবে। এ বাঁধের ফলে সৃষ্ট লেখ-এর গ্রাসে ভারতের পার্বত্য অঞ্চলের ৮টি গ্রামের ১৫শ' মানুষ উদ্বাস্তু হবে এবং ভূমিহারা হবে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। বাঁধের পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা অববাহিকার প্রায় ৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পারিবেশিক ও আর্থনীতিক ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসবে যার বেশিরভাগ প্রভাব টিপাইমুখের নিম্ন অববাহিকা সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা প্লাবন ভূমির মানুষ ও পরিবেশকে দারুণ ঋণাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।
ভারতের এ বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্য :
বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর সিস্টেম প্রায় ৯শ' ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে (প্রায় ৬শ' ৭০ কিলোমিটার) এবং বাকী অংশ ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের আসাম ও মণিপুরে অবস্থিত। সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীব্যবস্থা যদিও বাংলাদেশের নদীজ মোট পানি সরবরাহের একটি ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে থাকে তুবও এ নদী ব্যবস্থার উপর দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নির্ভরশীল। ভারতের মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মনিপুর রাজ্যত্রয়ের সংযোগ তুইভাই ও তুইরয়ং নদীদ্বয়ের সঙ্গমস্থল হতে প্রায় ৫শ' মিটার পশ্চিমে বরাক নদীর উপর ভারত টিপাইমুখ মাল্টিপারপাস বাঁধ নির্মাণ করছে। এর ফলে সৃষ্ট রিজার্ভার (জলাধার) এর ধারণক্ষমতা প্রায় ১৬ বিলিয়ন কিউবি মিটার। এ মাল্টিপারপাস বাঁধটি গড়ে ১৫শ' মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটি ভারতের একটি মাল্টিপারপাস হাইডাল প্রজেক্ট বা বহুমুখী পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত বিপুল পরিমাণ পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর ও মিজোরামে সরবরাহ করবে। এর ফলে যে কৃত্রিম লেক তৈরি হবে তাতে হাজার হাজার টন মৎস্যও উৎপাদিত হবে। শুষ্ক মওসুমে ভারত দক্ষিণ আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরের বহু অঞ্চলে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত করতে পারবে। তাছাড়া এ বাঁধের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে ভারতের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে। একই সাথে বর্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধটি ভারতের ঐসব অঞ্চলে খুবই কাজে আসবে।
বাংলাদেশে টিপাইমুখ বাঁধের বিরূপ প্রভাব :
টিপাইমুখ বাঁধটি দ্বারা ভারত বিপুলভাবে লাভবান হলেও বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীব্যবস্থার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের অববাহিকা-শরিক বাংলাদেশ এর দ্বারা দারুণভাবে হবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিপর্যস্ত। বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জ থানার প্রবেশ করে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পুরো বৃহত্তর সিলেট জেলাকে সিঞ্চিত করে উত্তরের ধারা সুমরা এবং দক্ষিণের ধারা কুশিয়ারা নাম নিয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারকে পানি, পলি, পু-ফসল আর প্রাণ প্রাচুর্যে শ্যামল-কোমল অবয়ব দিয়ে আরো দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে হবিগঞ্জের দক্ষিণাংশে পুনঃএকত্রিত হয়ে ভৈরবের কাছে মেঘনা নদীর জন্ম দিয়েছে। আর এজন্যই ‘মেঘনা-সুরমা-কুশিয়ারা'র মাতৃস্বরূপ ধারা হচ্ছে বরাক নদী। ভারত টিপাইমুখ বাঁধ দিলে শুধু সুমরা কুশিয়ারা মরে যাবে না, বরং এর ফলে বাংলাদেশের পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সুরমা, কুশিয়ারা নদী অববাহিকায় অবস্থিত সারা এলাকার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। এই বাঁধ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য ফারক্কা বাঁধের চেয়েও ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আসবে। এই বাঁধ নির্মাণে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পরিবেশ একশ হিরোশিমা-নাগাসাকি এটম বোমার চেয়েও বেশি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বয়ে আনবে। কারণ এই বাঁধ নির্মাণের ফলে আসামের কাছাড়-করিমগঞ্জের ২০ লাখ মানুষ, বৃহত্তর সিলেটের ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ, বৃহত্তর কুমিল্লার ৬০ লাখ মানুষ, মেঘনা অববাহিকার বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের আরো ৬০ লাখ মানুষ এবং বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের প্রায় ৪০ লাখ মানুষসহ প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হবে। সুরমা কুশিয়ারা মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রমত্তা মেঘনা ধূ-ধূ বালুচরে রূপান্তরিত হবে। বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহের সবক'টি হাওর-বাওড়, বিল-ঝিল সম্পূর্ণরূপে পানি শূন্য খানাখন্দকে পরিণত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঐ অঞ্চলের বিপুল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে হাওড়-বাওড়ে অতিথি পাখ-পাখালী আর ঐসব অঞ্চলে আসা-যাওয়া করবে না। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী নৌ-যোগাযোগ ও জলজসংস্কৃতি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের হাওর-বাওড় সমৃদ্ধ উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মেঘনা অববাহিকার ৭০ ভাগ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহন নদ-নদীর দ্বারা সাধিত হয়। আর ঐ অঞ্চলের হাওরগুলো দেশের মিঠাপানির মাছের অাঁধার ও দেশান্তরী পাখ-পাখালীর জন্য অভয়াশ্রম (Sanctuary) বলে পরিচিত। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর জাতিসংঘ ঘোষিত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' (World Heritage)-এর অন্তর্ভুক্ত। টিপাইমুখ বাঁধ চালু হলে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা শুকিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ঐ নদী ব্যবস্থার দ্বারা সংযুক্ত এতদঞ্চলের সকল নদ-নদী এবং জলাশয়ের নদী শুকিয়ে গিয়ে ঐ অঞ্চলের নৌ যোগাযোগ দারুণভাবে বিঘ্নিত হবে এবং একইসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে ঐ অঞ্চলের মৎসাধার ও জীব-বৈচিত্র্যের কেন্দ্র হাওরগুলোও। এই সাথে এ নদীব্যবস্থার আওতাধীন পুরো প্লাবন ভূমির ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিকের পরিমাণ ভয়াবহরূপে বেড়ে যাবে।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে টিপাইমুখ বাঁধ বাস্তবায়িত হলে মেঘনা অববাহিকার পানি সরবরাহ শুষ্ক-ঋতুতে প্রায় ৮০% এবং মওসুমি ঋতুতে প্রায় ২৫% ভাগ কমে গিয়ে বাংলাদেশের পুরো পূর্ব-অর্ধাংশে এক ভয়াবহ পানি স্বল্পতার পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। অবশ্য ভারত-সুহৃদ কোন কোন সংস্থার অর্থানুকূল্যে পরিচালিত কয়েকটি সংস্থার পরিচালিত কিছু নিয়ন্ত্রিত গবেষণা-পত্রের ফলাফলে আমরা কিছু ভিন্নতর ব্যাখ্যাবিহীন খাপছাড়া মতামত দেখতে পাচ্ছি। পানিতাত্ত্বিক ও নদীতাত্ত্বিক সকল জ্ঞানের আলোকেই যে কেউ এসব অভিমতকে উদ্দেশ্যে প্রণোদিত এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রস্তুত গবেষণা ফল বলে বুঝতে পারবে।
উপরোল্লিখিত ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের নিম্ন অববাহিকায় বর্ষাকালে বন্যার ভয়াবহতা আরো ব্যাপকতা ও প্রকটতা লাভ করবে। শুষ্ক ঋতুতে এসব অঞ্চলে দেখা দেবে পানির অভাব। পানির স্বাভাবিক প্রবাহের অভাবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সকল নদ-নদী ও খালবিলে পলি ভরাট হওয়ার প্রক্রিয়া (Siltation Prosess) আরো দ্রুততর হবে এবং কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা (Water-logging) প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখা দেবে।
টিপাইমুখ বাঁধের বিরূপ ফলাফল হিসেবে সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগটিকে চিহ্নিত করা যায় সেটি হচ্ছে বড়মাত্রার ভূমিকম্পের সংঘটন। আমরা জানি যে সিলেট ও দেশের পূর্ব-উত্তরাঞ্চল ১ম গ্রেডের ভূমিকম্পপ্রবণ জোনে অবস্থিত। এ অঞ্চলে মাত্র ১০০ বছর আগে রিখটারের প্রায় ৮ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে (১৮৯৭ সন)। টিপাইমুখ বাঁধ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক ভূমিকম্পপ্রবণ বলয়ে (Seismic Zone) অবস্থিত। এ স্থানে ভূমির নিচে লুক্কায়িত রয়েছে কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-গাঠনিক চ্যুতি (Geological and Tectonical Faults)। আমরা জানি যে ভূ-তাত্ত্বিক সাব-হিমালয় জোনে অবস্থিত টারশিয়ারী যুগের ঐ পার্বত্য অঞ্চলের ধারে কাছেই ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরোশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেটগুলোর মধ্যে নিরন্তর সাংঘর্ষিক প্রক্রিয়া চলমান। বাঁধ নির্মাণের ফলে কোটি কোটি টন পানির ওজনে এমন নাজুক এবং অস্থির ভূ-গাঠনিক ভূমিকম্পপ্রবণ জোনো রিখটার স্কেলের ৭, ৮ কিংবা তদোর্ধ্ব মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূ-কম্পের কারণ ঘটাতে পারে ঐ টিপাইমুখ বাঁধ। আর এর ফলে বিপুল পানির জলাধার ভেঙ্গে কিংবা ভূমিকম্পের তরঙ্গের আঘাতে ঘনবসতিপূর্ণ সিলেট মহানগরীসহ সংলগ্ন অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাতে পারে; ধ্বংস হয়ে যেতে পারে সমগ্র পূর্বাঞ্চলের জীবনের স্পন্দন। পানিতাত্ত্বিক পরিবর্তন (Hydrological Change) ঐ অঞ্চলে বড় ধরনের জলবায়ুতাত্ত্বিক (Climatogical Disaster) পরিবর্তনকে ডেকে আনবে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ধারণা করতে পারেন। তার সাথে সাথে মেঘনা-প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর থেকে ক্রমে লবণাক্ততা উত্তরদিকের ভূমি ও পানিতে বেশি হারে আগ্রাসন চালাতে থাকবে।
এই বাঁধ নির্মাণের ফলে শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের আসামে কাছাড় অঞ্চলেরও অনেক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঁধটি চালু হলে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জীব-বৈচিত্র্যে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটাবে এবং বাস্তব-ভারসাম্য (Ecological Balance) নষ্ট হবে বিপুলভাবে। তাই বিশ্বের পরিবেশবাদীরা মনে করেন এর ফলে শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয় গোটা এশিয়া তথা বিশ্ব পরিবেশও বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের অনেক মানবতাবাদী পরিবেশ বিজ্ঞানীও এ অভিমত পোষণ করেন। এককথায় টিপাইমুখ বাঁধের পারিবেশিক ভয়াবহতা ফারাক্কার ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে যৌক্তিকভাবে আশঙ্কা করা যায়।
আমাদের করণীয় :
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে সম্ভাব্য উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে যতটুকু ধারণা করা যায়, সে সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা আমাদের আশু কর্তব্য। ভারত যদি এ বাঁধ চালু করে, তবে তার ক্ষতিকর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, একবার চালু হয়ে গেলে বাংলাদেশের মতো দুর্বল কূটনৈতিক যোগ্যতাসম্পন্ন দেশ কিছুই করতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারত সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপক্ষো করে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজ (যোগীগোপা), মুহুরীরচর ক্রস ড্যাম, দক্ষিণ তালপট্টি দখলসহ সকল ধরনের সীমান্ত সংশ্লিষ্ট আধিপত্যবাদী অপতৎপরতা চালিয়ে সব সময়ই পার পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কিছুই করতে পারেনি এবং করতে পারছে না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের উচিত দ্রুত শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। দেশের জনগণকে সচেতন করতে হবে এ বাঁধের ভয়াবহতা সম্পর্কে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সকল মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ভারতের পরিবেশবাদী ব্যক্তি ও গ্রুপসমূহ যারা এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন এবং প্রতিবাদমুখর সহযোগিতা করতে আহবান জানাতে হবে। তাদের সাথেও ফলপ্রসূ যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং তাদেরকে আমাদের উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘সর্বদলীয় জাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা কমিটি' গঠনপূর্বক সিলেট শহরে দু'টি মহাসম্মেলন এবং সেমিনারের আয়োজন করতে হবে- একটি আন্তর্জাতিক এবং একটি আঞ্চলিক। যদিও আন্তর্জাতিক কূটনীতির নিয়মানুযায়ী ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার এ সমস্যায় তৃতীয়পক্ষ আসতে পারে না বলে বলা হয়, তবুও আমরা জানি যে অতীতে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু অববাহিকার পানি সমস্যার (Indus Valley Water Sharing Treaty) সমাধানে বিশ্বব্যাংক কার্যকর সফল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়-- ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (I.C.J) স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরীর মধ্যকার দানিয়ুব নদীর পানি সমস্যার সমাধানে সফল মধ্যস্থতা করতে সক্ষম হয়েছে। যেহেতু বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা একটি আন্তর্জাতিক নদী-ব্যবস্থার অন্তর্গত এবং যেহেতু ঐ বাঁধের নির্মাণ কাজ ভারত (আসাম, মনিপুর, মিজোরাম) এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে সেহেতু জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদীসমূহের কনভেনশনের আওতায় (U N Convention of International Rivers) প্রণীত আন্তর্জাতিক নদী আইনে জাতিসংঘে এ বিষয়ে দ্রুত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করতে পারে।
লন্ডনে বসবাসরত প্রায় অর্ধমিলিয়ন সিলেটবাসী তাদের জন্মভূমির এ সম্ভাব্য প্রলয় প্রতিহত করার লক্ষ্যে সেখানে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। সরকার একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুপ্রতীম দেশসমূহ এবং ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC)-র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নিতে পারে এবং সার্ক ও জাতিসংঘের মাধ্যমে কিছু করা যায় কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে এবং সর্বোপরি বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য খুবই দ্রুত শান্তিপূর্ণ ‘টিপাইমুখ বাঁধ প্রতিরোধ লংমার্চ'-এর আয়োজন করতে হবে।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিতে হবে খরতর আগ্রাসী ভূমিকা। সময় খুবই কম। এসব কিছুই শুরু করতে হবে অনতিবিলম্বে। তা না হলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।
[লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]
- Forums:
JUST VIEWED
Last viewed:
- নববর্ষে ডঃ মোহম্মদ ইউনুসের বানী - ২০১০ সাল হোক দিনবদলের বছর
- সিয়ার্স টাওয়ারের ১০৩ তলায় কাঁচের বারান্দা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
- রাজার দেশে দুই রাজপুত্র...
- ভবিষৎ টেন্ডারবাজীর আগাম প্রস্তূতি
- Google Search Result
- বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে ভারত ইস্যু
- ওয়ারিদ আউট (৭০%), ভার্তী ইন, কিছু প্রশ্ন!
- ২১শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কিছু প্রাসংগিক ভাবনা
- শেষ পর্যন্ত দেখা হল গ্যালিভারের সাথে লিলিপুটের
- Should student politics be banned?
- একজন কণিকা রহমানের কাহিনী...
- কাছ হতে দেখা একজন লেসবিয়ান
- চট্টগ্রামে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশসহ গ্রেপ্তার ৭
- Cellphone jammers to be installed at jails
- আজ ৫ই জুলাই, ২০০৯
Latest Blogs
- রাজার দেশে দুই রাজপুত্র...
- US State Department warned Mujibur about possible assassination
- Hope of a Nation
- Haves and Have-nots
- While Bangladeshis fight, Vietnam gets Billion $ Intel
- ডিজিটাল বিপ্লব না পারিবারিক বনভোজন?
- একজন কণিকা রহমানের কাহিনী...
- পার্বত্য চট্টগ্রাম, যে ছবি কথা বলে...
- জন হিংঙ্কলে, আকতার হামিদ পবন ও দু'টা অসফল নাটকের ইতিকথা
- মার্ডার অন দ্যা ওরিয়েন্ট/বিডিআর এক্সপ্রেস!
Recent Comments
- জয়কে এখনই সক্রিয় রাজনীতিতে দেখতে চান না শেখ হাসিনা
10 hours 11 min ago - Driving force behind Globalization – a Bangladesh case study
3 days 12 hours ago - A sad legacy
3 days 12 hours ago - Fragmented population and Bangladesh
3 days 12 hours ago - Begums' gift to Bangladesh
3 days 12 hours ago - Charting Bangladesh’s economic prosperity
3 days 12 hours ago - My 7 days in NYC
3 days 13 hours ago - Bangladesh will not prosper economically in near future
3 days 13 hours ago - Economic rise of a nation does not happen by accident
3 days 13 hours ago - BD’s barrier to prosperity
3 days 13 hours ago





Post new comment