Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

বিডিআরে হত্যাকান্ড: বিদ্রোহের প্রস্তুতি অনেক দিনের; শেষ বৈঠক ঘটনার দিন সকালে

কামরুল হাসান, প্রথমআলো: পিলখানা হত্যাকান্ডের দুই দিন আগে বিডিআর সদর দপ্তরের ভেতরে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য প্রচারপত্র বিতরণ করেছিলেন বিডিআর জওয়ানেরা। পরিকল্পনামতো আগের দিন পাঁচ নম্বর ফটকের বাইরে একটি বাড়িতে তাঁরা বৈঠকও করেন। সেই বৈঠকে দাবি আদায়ের জন্য মহাপরিচালকসহ কর্মকর্তাদের জিম্মি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু দরবার হলে মহাপরিচালকের ওপর গুলি চালানোর পর আর কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ও আটক করা বিডিআর জওয়ানেরা টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানায়, ঘটনার আগের দিনের বৈঠকে উপস্িথত ২৪ জওয়ানের মধ্যে ১৭ জন ও হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া আরও ৪০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এঁদের কয়েকজনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা বলেছেন, ক্ষোভ ও দাবি-দাওয়ার বিষয়টি তাঁরা সরকারি দলের দুই সাংসদকে জানিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও জানানোর চেষ্টা করেছিলেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বার্ষিক দরবার চলার সময় বিডিআর জওয়ানদের একাংশের হামলায় ৫৬ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭২ জন নিহত হন। এ ঘটনায় লালবাগ থানায় একটি মামলা হয়।

সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করছেন। এ নিয়ে এই মামলায় ৪৮২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে ৮২ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। এদের ২২ জনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকিদের টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সিআইডির পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাব এই টিএফআই সেলের সদস্য।

এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আনিস-উজ-জামানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি ও লে. জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল এ ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করছে।

বিডিআর বিদ্রোহ মামলার তদন্তকারী আবদুল কাহার আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ওই ঘটনার শিকার সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের লোকদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেনা কর্মকর্তারা লিখিতভাবে ঘটনার বিবরণ সিআইডিকে দিয়েছেন। তবে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেরাই গ্রহণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ৭৫০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে প্রথম দিনে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়া ২৫০ রয়েছেন।

বিডিআর সুত্র জানায়, সদর দপ্তরে বিডিআরের চারটি ব্যাটালিয়ন আছে। ১৩, ২৪, ৩৬ ও ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ন। এ ছাড়া সদর দপ্তরের নিরাপত্তার জন্য রেজিমেন্টাল পুলিশ (আরপি) ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য আরএসইউ বা রাইফেলস নিরাপত্তা শাখা আছে। পিলখানার ভেতরে সদর দপ্তর ও ঢাকা সেক্টরের একটি করে কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগার (কোথ) ও গোলাবারুদের গুদাম রয়েছে। এর বাইরে ব্যাটালিয়নগুলোর ছোট ছোট অস্ত্রাগারও রয়েছে। অস্ত্রাগার ও বিডিআর সদস্যদের সাজা দেওয়ার বিশেষ সেল নিয়ে সংরক্ষিত এলাকাকে কোয়ার্টার গার্ড বলা হয়। পিলখানায় দুটি কোয়ার্টার গার্ড রয়েছে। মেজর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এর দায়িত্বে থাকেন।

প্রচারপত্র বিতরণ: বিডিআর সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, বিডিআরে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তাঁদের ক্ষোভ ছিল। এ নিয়ে আলোচনা চলছিল অনেক দিন থেকেই। একপর্যায়ে কিছু উৎসাহী সদস্য সদর দপ্তর ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে প্রচারপত্র বিতরণ শুরু করেন। তাঁরা এ নিয়ে টেলিফোনে কথাবার্তাও বলতে থাকেন। ভেতরে ভেতরে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার করা এমন দুটি প্রচারপত্রে দেখা গেছে, বিডিআর সদস্যরা ডাল-ভাত কর্মসুচির কারণেই বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁরা মনে করেছিলেন, সেনাবাহিনী থেকে আসা কর্মকর্তাদের কারণেই তাঁরা বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। সর্বশেষ প্রচারপত্র বিতরণ হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে। এ প্রচারপত্রের বিষয়টি বিডিআরের মহাপরিচালকসহ কর্মকর্তারা জানতে পেরে বিভিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদামে পাহারা বসানোর নির্দেশ দেন।

দুই সাংসদের সঙ্গে সাক্ষাৎ: আটক হওয়া জওয়ানেরা জানান, সেনা কর্মকর্তাদের সরানো ও ডাল-ভাত কর্মসুচির অনিয়ম নিয়ে কতিপয় বিডিআর সদস্য সরকারি দলের দুই সাংসদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের কাছে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানান। এর মধ্যে একজন সাংসদ লিখিতভাবে তাঁদের বক্তব্য জানাতে বললে বিডিআর সদস্যরা ৫১ দফাসংবলিত একটি অভিযোগপত্র সাংসদের কাছে দেন। এতে সই করেন সুবেদার ইসমাইল, আলাউদ্দিন, নায়েক সুবেদার আলতাফ, হাবিলদার কাজল মিয়া, মইজ উদ্দিন, ল্যান্স নায়েক খয়বর, রুবেল মিয়াসহ অনেকে। র‌্যাব সদস্যরা পরে বিডিআর জওয়ানদের বাসস্থান থেকে এ আবেদনের কপিও আটক করেন। জওয়ানেরা জানান, তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা যেদিন দেখা করতে চেয়েছিলেন সেই দিন গাজীপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে এক জঙ্গি বোমা বিস্কোরণ ঘটায়। ফলে তাঁরা আর দেখা করতে পারেননি।

পরিকল্পনা: বিডিআর সদস্যরা টিএফআই সেলকে জানান, দরবারে কর্মকর্তাদের "কিছু একটা" করা হবে, এমন চিন্তাভাবনা থেকে তাঁরা সংগঠিত হতে থাকেন। এ জন্য সদর দপ্তরের চারটি ব্যাটালিয়ন থেকে সাহসী ও নেতাগোছের লোক নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে এ দলের সদস্যরা হাজারীবাগে বিডিআর সদর দপ্তরের পাঁচ নম্বর গেটের কাছে এক বাড়িতে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে মূল ভুমিকা পালন করেন ৪৪ ব্যাটালিয়নের সেলিম, ২৪ ব্যাটালিয়নের একরামুল ও ৩৬ ব্যাটালিয়নের মইন উদ্দিন। এতে সিদ্ধান্ত হয়, দাবি আদায়ের জন্য দরবারে মহাপরিচালকসহ লাল ফিতাওয়ালা (কর্নেলের ওপরে) কর্মকর্তাদের জিম্মি করা হবে। দাবি মেনে নেওয়ার পরই তাঁরা জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পাবেন।

জওয়ানেরা জানান, ওই বৈঠকে একজন সদস্য ভিন্নমত পোষণ করেন। বাকিরা হাতে হাত রেখে শপথ করেন। তাঁদের এ সিদ্ধান্ত কয়েকজন ডিএডিকে জানানো হয়।

দরবার এক ঘণ্টা পেছানো: জওয়ানেরা জিজ্ঞাসাবাদ সেলকে জানান, তাঁদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে দেরি হতে পারে ভেবে তাঁরা দরবার এক ঘণ্টা পেছানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দরবারের সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে সকাল আটটার বদলে নয়টায় দরবার শুরু হয়। এর আগে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে একদল জওয়ান ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের মাঠে সমবেত হন। এ সময় দুজন পূর্বনির্ধারিত জওয়ানদের সময়মতো উপস্িথত হতে না দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, "এত অল্প লোক দিয়ে কীভাবে কাজ হবে।" পরে পরিকল্পনামতো ২৪-২৫ জওয়ান দুই ভাগে ভাগ হয়ে অস্ত্রাগার ও গোলাবারুদের গুদামের দিকে যান।

অস্ত্র লুট: টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে জওয়ানেরা জানান, দরবার শুরুর পরপরই পরিকল্পনামতো দুই জওয়ানের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল অস্ত্রাগার লুট করতে যায়। তাঁরা প্রথমে সদর দপ্তরের অস্ত্রাগারের সামনে গিয়ে গার্ড কমান্ডারের পেছনে দাঁড়ান। সেখানে দায়িত্বে থাকা মেজর রিয়াজ তাঁদের চ্যালেঞ্জ করলে সবাই মিলে মেজর রিয়াজের হাত-পা বেঁধে তাঁকে জেসিওর কক্ষে তালা দিয়ে রাখেন। এরপর চাবি নিয়ে অস্ত্রাগার খুলে পর্যায়ক্রমে সবাই অস্ত্র হাতে নেন। একইভাবে আরেকটি দল গোলাবারুদের গুদামের নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে সেখান থেকে গোলাবারুদ ও গ্রেনেড লুট করে। দুটি দলই অস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে একটি গাড়িতে করে দরবার হলের দিকে আসে।

দরবার হল: যৌথ সেলের সুত্র জানায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টার দরবার শুরু হলে মহাপরিচালক তাঁর বক্তৃতার একপর্যায়ে ডাল-ভাত কর্মসুচির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি জানান, "ডাল-ভাত কর্মসুচিতে জনগণের উপকার হয়েছে। এ কর্মসুচির ১০ দিনের ডিএ পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যাটালিয়নকে দেওয়া হয়েছে। কিছু টাকা অবশিষ্ট আছে, যা সৈনিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়া হবে। এ টাকা কারও পকেটে যাবে না," এ কথা শেষ হতে না হতেই দরবার হলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের দরজা (কুক হাউসের পেন্টির দিক) দিয়ে টুপি ও বেল্ট ছাড়া দুই জওয়ান ভেতরে প্রবেশ করেন। এঁদের মধ্যে মাইনউদ্দিন নামের এক জওয়ান মহাপরিচালকের মাথায় অস্ত্র তাক করে নিজেই কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যান। কর্নেল আনিস তাঁর অস্ত্রটি কেড়ে নেন। আরেকজন তাঁর অস্ত্র নিয়ে একটি জানালা ভেঙে বাইরে চলে যান। এ সময় উত্তর দিক থেকে গুলির শব্দ হলে দরবার হলে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মহাপরিচালক একটি মাইক নিয়ে সবাইকে শান্ত থাকতে বললেও জওয়ানেরা দরবার হল থেকে হুড়মুড় করে বের হয়ে যান।
আটক জওয়ানেরা জানান, দরবার হলের বাইরে একদল জওয়ান গোলাগুলি শুরু করে। একপর্যায়ে চার বিডিআর জওয়ান অস্ত্র নিয়ে দরবার হলের ভেতরে ঢুকে গুলি চালাতে শুরু করেন। এ সময় এক কর্মকর্তার মাথায় গুলি লাগলে তিনি হলের ভেতরে পড়ে যান। একজন জওয়ান হ্যান্ডমাইক দিয়ে ভেতরে আটকে থাকা নারী কর্মকর্তা ও ঢাকার বাইরের কর্মকর্তাদের বের হয়ে আসতে বলেন। এ সময় মহাপরিচালক জওয়ানদের কাছে তাঁদের দাবির বিষয়টি জানতে চান।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে চার নম্বর গেট থেকে জানানো হয়, বাইরে র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর গাড়ি এসেছে। এতে তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে গোলাগুলি শুরু করেন। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে একজন জওয়ান কর্মকর্তাদের একজন একজন করে বের হয়ে আসার জন্য হুমকি দিলে সবাই বের হয়ে আসতে থাকেন। দরবার হলের পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে প্রথমে মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ ও পরে অন্যরা একে একে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। মহাপরিচালক বেরুতেই দরবার হলের বাইরে পিকআপের কাছে দাঁড়ানো মুখোশ পরা এক জওয়ান গুলি চালান। তাঁর দেখাদেখি আরও কয়েকজন গুলি চালান। এরপর একদল বিডিআর জওয়ান এসে দরবার হলের সব স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। তারা যেখানে যাকে পায় তাকে গুলি করে মারতে শুরু করে।

জওয়ানেরা জানান, একপর্যায়ে তাঁরা দেখতে পান, তাঁদের পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন অনেক জওয়ান ফেস্টুনের কাপড় ছিঁড়ে মুখে বেঁধে গুলি চালাতে শুরু করেছে। তারা যেখানে যাকে পাচ্ছে ধরে ধরে গুলি করছে। একই সময় মহাপরিচালকের বাসভবনে হামলা হয়। বেলা সাড়ে ১২টার মধ্যে হত্যাকান্ড শেষ হয়ে যায়।

বেলা ১১টার দিকে ১০-১২ জনের একটি দল মহাপরিচালকের বাসায় হামলা চালায়। মহাপরিচালকের স্ত্রী নাজনিন শাকিলের ওপর প্রথম গুলি চালান ৪৪ রাইফেলের জওয়ান ওবায়েদ। তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ওবায়েদ গুলি চালানোর কথা স্বীকার করে জানান, মহাপরিচালকের বাড়িতে হামলা চালাতেই তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা পালিয়ে যান। হামলা করে বের হয়ে আসার পথে জওয়ানেরা উল্টো দিকে অফিসার্স মেসের সামনে দুটি গাড়িতে আগুন দেন।

হামলা-লুটপাট: জওয়ানেরা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সাড়ে ১২টার পর জওয়ানেরা অস্ত্র হাতে চারদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। তাঁরা ইচ্ছেমতো ফাঁকা গুলি ছুড়তে শুরু করেন। দুপুরের দিকে একজন জানান কর্মকর্তাদের বাড়িতে টাকা-পয়সা আছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় লুটপাট। বিডিআর জওয়ানেরা কর্মকর্তাদের ৭২টি কোয়ার্টারে গিয়ে দলে দলে হামলা চালায় ও লুটপাট করে।
লাশ গুম: বিডিআর জওয়ানেরা জানতে পারেন দুপুর ১২টার দিকে প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির ও হুইপ মির্জা আজম দরবার হলে আসতে পারেন। তখন লাশ নিয়ে কী হবে, তার আলোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে তাঁরা কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এক জওয়ান জানান, কয়েকজন ডিএডি দরবার হল থেকে সন্ধ্যার পর লাশ সরানোর নির্দেশ দেওয়ার পর জওয়ানেরা লাশ সরান। পরে দরবার হল পানি দিয়ে ধোয়া হয়। কিন্তু রক্তের গন্ধ দুর না হওয়ায় সেখানে কার্পেট বিছানো হয়। তবে সব স্থানের লাশ তিনটি গাড়িতে তুলে প্রথমে একটি গ্যারেজের ভেতরে রাখা হয়। তিনটি লাশ ড্রেনে ফেলে দিলে সেগুলো কামরাঙ্গীরচরে ভেসে উঠে। এরপর এভাবে লাশ ফেলা বন্ধ করা হয়। তিনটি কবরে মহাপরিচালকের স্ত্রীসহ ১০টি লাশ পুঁতে ফেলা হয় ব্যাটালিয়নের মাঠের পাশের তাঁবুর পেছনে। পরে হাসপাতালের পাশে একটি ফাঁকা স্থানে গর্ত খুঁড়ে ভোর সাড়ে চারটার দিকে সব লাশ পুঁতে ফেলা হয়। আটক জওয়ানেরা বলেন, লাশ গুমের খবর সব জওয়ান জানতেন না।

পলায়ন ও অস্ত্র লুট: গ্রেপ্তার করা জওয়ানেরা স্বীকার করেন, ২৫ তারিখ সন্ধ্যার পর থেকে অনেক জওয়ান পালাতে শুরু করেন। তাঁদের পালানোর সুবিধার জন্য ভেতরের সব বাতি বন্ধ করা হয়। যারা লুটপাট ও হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল, তারাই বেশি পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় এঁরা নিজেদের পোশাক খুলে সাধারণ পোশাক পরেন। তাঁরা হাজারীবাগ এলাকার চারটি ঘাট ব্যবহার করেন। ভেতরে জওয়ানদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাঁদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এ কারণে তাঁরা দ্রুত সমঝোতা করতে রাজি হয়ে যান।

যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি: জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, এ বিদ্রোহের পেছনে আর কেউ আছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তা ছাড়া প্রথম গুলি কার নির্দেশে ছোড়া হয়েছিল, কে লাশ গুম করতে নির্দেশ দিয়েছিল, কে বিডিআর সদস্যদের পালাতে বলেছিল−এসব প্রশ্নের কোনো জবাব মেলেনি। আরও জিজ্ঞাসাবাদের পর এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে বলে তাঁরা জানান।

কারা দায়ী তা আঙুল দিয়ে দেখানোর দরকার নাই।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী তা আঙুল দিয়ে দেখানোর দরকার নাই। এসবের শুরু হয়েছিল প্রশাসনে বিদ্রোহ সৃস্টিকারী জনতার মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে অথবা আরও পুর্বেই ("আমরা বি, এন, পিকে এক মুহুর্তও, শান্তিতে থাকতে দিব না") যাদেরকে পরে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। চেইন অব কমান্ড ভাঙ্গার জন্য তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি তুলে নেয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ক্ষমতা দখলকারী এরশাদকে কারা সাহস যুগিয়েছে সেটি অজানা নয়। চেইন অব কমান্ড ভাঙ্গার জন্য জেনারেল নাছিমকে কারা সাহস যুগিয়েছে সেটিও অজানা নয়। জেনারেল মইনের বিদ্রোহে তারা প্রকাশ্য সাহস যুগিয়েছে। তারাই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অচল করার পায়তারা করেছে। তারা সেনাবাহীনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিষেদাগার করেছে। তারা এলিট ফোর্স RAB এর কার্যকলাপকে সর্বদাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারা বিগত দুই মাস RAB কে অকাযর্কর করে রেখেছিল। এটি করেছিল বি, ডি, আর বিদ্রোহে বাহিরের ইব্দনের সুবিধার্থেই। এই কারণে ঢাকা শহরে সোনার ছেলেদের ছিনতাই কর্মকান্ড বেড়ে গিয়েছে। তারা রাষ্ট্রের সংবিধানকেও অস্বীকার করেছে (সংবিধান বড় না জনগণের অধীকার বড়)| তারা অধীকার আদায়ের নামে সবসময়ই ধংসাত্নক কাজ করেছে। তার বড় উদাহরণ হলো আঠাশে অক্টোবর 2006| পচিঁশে ফেব্রুয়ারী শহীদ সেনা অফিসারদের লাশের সাথে যে পাশবিকতা করা হয়েছে সেটি সেই আঠাশে অক্টোবর 2006 এ শিখানো হয়েছিল (লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মেরে মৃত মানুষের লাশের উপর নৃত্য করা)| এ সকল বর্বরতার অন্যতম নেতৃত্ব দানকরী হলো জাহাঙ্গীর নানক ও মির্যা আযম। নানক শেরাটন হোটেলের সামনে দ্বিতল বাসে গান পাউডার দিয়ে এগারো জন নীরিহ বাসযাত্রী হত্যার সাথে জড়িত। মির্যা আযম তার দুলাভাই শায়ক আব্দুর রহমানের মাধ্যমে সরাসরি জংগীবাদ আমদানী করেছিলেন। তাদের সাথে বি, ডি, আর বিদ্রোহদের যোগসজগ থাকাটা অমুলক নয়। তাদের সাথে বিদ্রোহীদের সম্পর্ক থাকার কারণেই হয়তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সেখানে না পাঠিয়ে তাদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল। এই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আব্দুল কাহারকে যিনি সরাসরি BAL রাজনীতির সাথে জড়িত। পুলিশের চাকরী করার সময় BAL এর পক্ষে এম, পি নির্বাচনের উদ্দেশ্য মিছিল-মিটিং করার দায়ে তার চাকুরী গিয়েছিল। তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তাকে দিয়ে তদন্ত কি হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা এসব ঘটিয়েছে তাদেরকে নিরাপদেই পালাতে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের এত বড় একটা ক্ষতি হয়ে গেল, তারা একবারও বললেন না যে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে, সেনাবাহিনীর ক্ষতি হয়েছে?

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla

JUST VIEWED

Last viewed: