Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

পঞ্চম একজন, একটি ফোন কল ও পদ্মা সেতুর করুণ পরিণতি

Padma Bridge and Abul Hossain
৩৮০ কোটি টাকার ১০%, ৩৮ কোটি টাকা। ’যৎ সামান্য’ এই অংকের জন্যেই ফেঁসে গেছে পদ্মাসেতু। এসএনসি-লাভালিন নামের যৌথ কোম্পানী কাজ পাওয়ার জন্যে এমন একটা অংকই ’উপহার’ দিতে চেয়েছিলেন সেতু মালিকদের। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে অন্য কথা, ৩৮ কোটি টাকার বিনিময়ে মন্ত্রী আবুল হোসেনের ’গ্যাং অব সিক্স’ নিজেরাই নাকি বিক্রি করতে চেয়েছিল সেতুর উপদেষ্টা কাজ। চুক্তির দেনদরবার ও লেনাদেনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল দেশপ্রেমিক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত মন্ত্রীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সাকো (Shah Abul Hussain Company) ইন্টারন্যাশনালকে। আমাদের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও সাংসদদের আয় রোজগারের পরিধি সম্পর্কে যাদের সামান্যতম ধারণা আছে তাদের কাছে এই লেনা দেনাটা একটু অন্যরকম মনে হতে বাধ্য। এতগুলো রাঘব বোয়াল জড়িত, অথচ টাকার অংক মাত্র ৩৮ কোটি! ভাগ বাটোয়ারার অনুপাত মেলাতে গেলে সমীকরণে গোলমাল দেখা দিতে বাধ্য। ’সামান্য’ এই অংকের কাছে দেশের ১নং পরিবারের ২নং ব্যক্তি জনাবা শেখ রেহানার নিজস্ব মন্ত্রী আবুল হোসেন সাহেব ধরা দেবেন বাংলাদেশের কনটেক্সটে ব্যাপারটা একেবারেই অভাবনীয়। লুটপাটের জন্যে বিশ্বব্যাংকের মত আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে ঝামেলা না পাকিয়ে সোনালী, রূপালী আর জনতার মত দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে চোখ ফেরালেই ভাগ্যের চাকা আকাশে উঠানো যায় তার প্রমাণ হলমার্ক গ্রুপ। ওরা চার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে হেসে খেলে। এক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছেরের কাধে সওয়ার হয়ে সোনালী ব্যাংক হতে বের করে নিয়েছে ট্রাক ভর্তি টাকা। কোথাও কেউ সন্দেহ করেনি, প্রশ্ন তুলেনি। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জানা আছে কোটি কোটি টাকা ব্যায় করে মন্ত্রী এমপি হওয়ার উদ্দেশ্যটা কি। যদিও মিডিয়ার চাপে কয়েকজনকে কদিনের জন্যে জেলখানার মেহমান বানানো হয়েছে, তবে সন্দেহ নেই ওরা বেরিয়ে আসবে। এবং তা হবে মহাসমারোহে। টাকাই যদি মুখ্য হয়ে থাকে চাইলে আবুল গং’রা সোনালী, রূপালী অথবা জনতার যে কোন একটাকে গণধর্ষণ করতে পারতেন। এহেন কাজে বমাল ধরা পরলে জেল হাজত দুরে থাক মন্ত্রিত্ব খোয়া যাওয়ার আশংকাও অবান্তর। সুরঞ্জিত বাবুর ইদানীংকালের কুৎসিত ও নির্লজ্জ হাসি, সাথে বৈধতা অবৈধতার উপর ’বিদায়ী হজের’ শাণিত বাণী আবুল হাবুলদের মত ভবিষৎ শিকারিদের জন্যে শিক্ষা হয়ে থাকবে।

ঢাকায় যখন সেতুর মালিক ও বিনিয়োগকারীরা বৈঠক করছিলেন দূরের দেশে কানাডার টরেন্টোতে মঞ্চস্থ হচ্ছিল অন্য এক নাটক। দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার খবরে প্রকাশ কেবল ষড়যন্ত্র নয়, সেতু বিক্রির লেনাদেনায় বিশাল অংকও হাতবদল হয়েছে। দেশীয় ’গ্যাং অব সিক্সে’র বিপরীতে এসএনসি-লাভালিনের ’গ্যাং অব ফোর’ এ পথেই এগোচ্ছিল দুর্নীতির অ্যানাকোন্ডা। কিন্তু পত্রিকার রিপোর্টে বিদেশিদের সাথে জড়িত পঞ্চম একটা নাম সামনে চলে আসায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও চাঞ্চল্য। সবার একটাই প্রশ্ন, কে এই পঞ্চম ব্যক্তি যার একাউন্টে জমা হয়েছিল সেতু বিক্রির বিশাল অংক? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশি এই ব্যক্তির নাম উচ্চারণে অনেকেরই অনীহা। অনেকটা লজ্জাবতী বধুর কায়দায় আমাদের মিডিয়াও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরাক্রমশালী এই ব্যক্তির চেহারা হতে। ব্যাপারটা খোলাসা করতে টরেন্টোস্থ এক বন্ধুর দ্বারস্থ হলাম। বন্ধু ঠাট্টাচ্ছলে জানাল বৌ হয়ে ভাশুরের নাম মুখে আনতে নেই। নিজ দেশে ভ্রাতৃবধূ! শুনতে খারাপ শোনায় না!!

তদন্ত শেষে বিশ্বব্যাংকের পুলিশরা ফিরে গেছেন নিজ দেশে। কে চোর আর কে সাধু তার সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। তবে যাবার আগে ঝড়ো গতির বেশ কটা শাটল মিটিং করে গেছেন দুর্নীতি তদন্ত কমিটি ও অর্থমন্ত্রীর সাথে। পদ্মা সেতুর ভাগ্য কিভাবে ঝুলে গেল এর উপর চমকপ্রদ সব তথ্য বেরিয়ে আসছে এ ফাঁকে। বলা হচ্ছে দুর্নীতির বিস্তারিত জানিয়ে বাংলাদেশ হতে কেউ একজন প্রথম বিশ্বব্যাংককে অবহিত করেছিল। পরামর্শক কাজের যোগ্যতা বাছাইয়ে এগিয়ে ছিল হালাকো গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এসএনসি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটি অনড় থাকতে পারেনি তাদের সিদ্ধান্তে। এখানেও কাজ করেছে পর্দার অন্তরালে থাকা শক্তিশালী একজন। ঐ ব্যক্তির একটা ফোন কলই নাকি বদলে দেয় পরামর্শক নিয়োগের হাওয়া। অসহায় হয়ে পরেন মন্ত্রি, মন্ত্রনালয় এবং মূল্যায়ন কমিটির বাকি সবাই। বিশ্বব্যাংকের তদন্ত কমিটি দাবি করছে কে এই ব্যক্তি তা তাদের ভাল করে জানা আছে। দুদকের সঙ্গে বৈঠকে হাসতে হাসতে এমনটাই আভাস দিলেন তদন্ত কমিটির সদস্য ওকাম্পো।

বিশ্বব্যাংকের তদন্ত কমিটি ও দুদকের আলাপ আলোচনা হতে একটা সত্য অনুমান করা যায়, ক্ষমতার সাথে লড়াই চলছে পদ্মা সেতুর ভাগ্যের। দুদক আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মশিউর রহমানকে আসামী না করার ব্যাপারে অনড়। তাদের যুক্তি আবুল হোসেনকে আসামী করা হলে রাজনৈতিক হাঙ্গামা হবে, বিরোধীরা ইস্যু পেয়ে যাবে, তাদের হাতে আন্দোলনের হাতিয়ার তুলে দেয়া হবে। দুদক কর্মকর্তাদের ওই যুক্তির সঙ্গে একমত হতে পারেনি বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দল। তাদের সাফ জবাব, ’এসব আপনাদের ঝামেলা, আপনাদের ব্যাপার, এখানে বিশ্বব্যাংকের করার কিছু নেই’। দুদুককে যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের ভাল করে জানা আছে ক্ষমতার পালাবাদল কোন গলিতে নিয়ে যাবে তাদের ভাগ্য। দেশীয় বিচার ও শাস্তি ব্যবস্থার এই নোংরা চামড়ার মোটা পশুকে বিদেশিদের কাছে লুকাতে পারেনি গোলাম হোসেনের দল। বিদেশিরা হেসেছে এবং টিটকারি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে সমসাময়িক বিশ্বে এসব যুক্তি খোড়া, অচল, অসাড়। সেতু প্রকল্প হতে বিশ্বব্যাংক যে সরে যাচ্ছে এটা প্রায় নিশ্চিত।

যুগ যুগ ধরে স্টিমারে করে যারা পদ্মা পাড়ি দিচ্ছিলেন তাদের জন্যে সেতু বোধহয় স্বপ্নই থেকে যাবে। একদল প্রফেশনাল চোরের দল ৪০টা বছর ধরে দেশকে লুটছ। কেউ পিতার নামে, কেউ ঘোষকের নামে কেউবা আবার ধর্মের নামে। রাষ্ট্রকে ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে এখানে সৃষ্টি করা হচ্ছে রাজা, রানী, শাহজাদা আর শাহজাদির দল। বছরের পর বছর ধরে আমরা বাধ্য প্রজার মত রাজতন্ত্রের বেদিতে পূজা দিচ্ছি, জোকার বনে রানী মাতা আর শাহজাদাদের মনোরঞ্জন করছি। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব আজ মেরুকরণে ব্যস্ত। আগামী সহাস্রাব্দে সমাজ, সভ্যতা আর মানবতা কোন দিকে এগুবে তার নক্সা আঁকছে তারা। পাশাপাশি আমরা আঁকছি চুরির নক্সা, লুটের পরিকল্পনা, রুটি হালুয়ার ভাগ নিয়ে বন্য বর্বরতার নির্মম চিত্র। সময় কি কোনোদিনই আমাদের পাশে দাঁড়াবে না?

http://www.mzamin.com/details.php?nid=MzM0NjY=&ty=MA==&s=MTg=&c=MQ==
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-07/news/311255

Comments

মিথ্যা হল মায়া ক্যালেন্ডার, টিকে রইল পৃথিবী

দৈনিক ইত্তেফাক : ২২/১২/২০১২

মহাকালের পরিক্রমায় ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর পেরিয়ে আজ ২২ ডিসেম্বর। যথানিয়মেই আপন কক্ষপথে পরিক্রমণ করছে আমাদের সকলের আবাসভূমি, সৌর জগতের সবচেয়ে আদর্শ গ্রহ এই পৃথিবী। মহাপ্রলয় বা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার মতো কোনো আকস্মিক মহা দুর্যোগ হানা দেয়নি। সূর্যোদয়, বায়ু প্রবাহের নিয়মেও ঘটেনি কোনো ব্যত্যয়। প্রাণী তথা জীবজগতেও লাগেনি আকস্মিক বৃহৎ পরিবর্তনের ছোঁয়া। আর এ সবই জোরালোভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো বহুল আলোচিত মায়া ক্যালেন্ডারের তথাকথিত ভবিষ্যত্বাণী।

এ বিষয়ে কথিত ও সর্বাধিক আলোচিত ব্যাখ্যাটি ছিল, মায়া পঞ্জিকার শেষ মানে পৃথিবীর চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা সংঘটিত হওয়ার সময় চলে এসেছে। মায়া ক্যালেন্ডারের সময়সীমা শেষ হয়েছে গতকাল (২১ ডিসেম্বর, ২০১২) মধ্যরাতে।

এ নিয়ে গতকাল শুক্রবার বিশ্বের অন্তত কিছু মানুষ ছিলেন দোলাচলের মধ্যে। এ নিয়ে রীতিমতো ব্যবসাও শুরু করেছিল কেউ কেউ।

তবে মায়া সভ্যতার বর্তমান ধারকরা জানিয়েছেন, চিরকাল মায়া পঞ্জিকার অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে কোথায় ‘ডুমস ডে’র বা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দিনের কথা বলা হয়নি। ২১ ডিসেম্বর ২০১২ মায়া পঞ্জিকার শেষ দিন। তবে এটি মহাবিশ্ব ধ্বংসের কোন ইংগিতবাহী নয়। বরং এটি ছিল একটি নতুন যুগ, নতুন সময়ের সূচনার ইংগিতবাহী।

মেক্সিকোর দক্ষিণে ছোট্ট গ্রাম ইয়াক্সুনা। সবাই একে মায়া গ্রাম হিসেবে জানে। শুক্রবার সারা দিন এই গ্রামে ছিল উৎসবের আমেজ। চারিদিকে ছিল সাজ সাজ রব। মায়া সভ্যতার কিছু ধারক আজও বাস করেন সেখানে। পৃথিবীর কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়া আতংকের চিহ্নমাত্র দেখা যায়নি সেখানে। বরং সবাই ছিলেন উৎসবে মাতোয়ারা। এই উৎসব ধ্বংসের আগের শেষ আনন্দ উৎসব ছিল না। ছিল নতুন যুগকে আহবানের উৎসব।

২৫০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিকাশ লাভ করেছিল এই মায়া সভ্যতা। এর বেশকিছু নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরে চলা এই বর্ষপঞ্জি। সংবাদ সংস্থাগুলোর খবরে জানানো হয়, ২০ ডিসেম্বর থেকে অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেছেন মেক্সিকোর মায়া সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া প্রতœতাত্ত্ব্কি প্রাচুর্যে ভরা ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে। নতুন মায়া যুগের সূচনাপর্বের অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে জড়ো হন তাঁরা।

দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের আগে সেখানে মায়া বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হতো। এটি বিখ্যাত মেসো-অ্যামেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার হিসেবে পরিচিত। পরে সেখানে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি চালু হয়। সেই বিখ্যাত মেসো-অ্যামেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার পাঁচ হাজার ১২৫ বছরের বৃত্ত শেষ করছে, হয়েছে গতকাল ২১ ডিসেম্বর। সে কারণেই ধ্বংসের গুঞ্জন উঠেছিল। তবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) বিজ্ঞানীরা বেশ আগেই এই আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছিলেন।

অনেক প্রতœতত্ত্ববিদ মনে করেন মায়ানরা খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৩ হাজার ১১৪ বছর আগে থেকে সময় গণনা করা শুরু করেছে। সময় এবং সৃষ্টির কুশলী বিন্যাস সম্পর্কে মায়ানরা অনেক আগেই অবগত ছিলেন। তাদের ছিল ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা। মায়ানরা আগে থেকেই জানত যে চাঁদ, শুক্র এবং অন্য গ্রহ-তারা চক্রাকারে ঘুরছে। সেই সময়েই তারা নিখুঁতভাবে সময় গণনা করতে পারত। তাদের একটি পঞ্জিকা ছিল যাতে সৌর বছরের প্রতিটি মিনিটের নিখুঁত বর্ণনা ছিল। মায়ানরা মনে করত প্রতিটি জিনিসের ওপর সময়ের প্রভাব রয়েছে এবং প্রতিটি জিনিস একেক সময় একেকটি অবস্থানে বিরাজ করছে। মায়ানদের কাছে মহাকাশের উপর ২২টি ভিন্ন ভিন্ন পঞ্জিকা ছিল। এর মধ্যে কোনো কোনো পঞ্জিকা এখন থেকে ১০ মিলিয়ন বছর আগের। খুব বোদ্ধা লোক ছাড়া এগুলো থেকে কিছু বের করাও কঠিন।
http://www.nowbd.com/ittefaq/2012/12/22/1936.htm

মামলায় রাজনীতিকেরা নেই

অবশেষে দুই সাবেক মন্ত্রীকে বাদ দিয়েই পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের মামলা করল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার বনানী থানায় দুপুরে বাদী হয়ে মামলাটি করেন দুদকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান আবদুল্লাহ আল জাহিদ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ১০ জনের নাম থাকলেও মামলা করা হয়েছে সাতজনের বিরুদ্ধে। বাদ পড়েছেন বর্তমান সরকার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনজন। এঁরা হলেন: সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং সরকারি দলের হুইপ লিটন চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী। আর মামলা করা হয়েছে সরকারি তিন কর্মকর্তা এবং কানাডার প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের চারজনের বিরুদ্ধে। তাঁদের মধ্যে তিনজনই বিদেশি নাগরিক।
কয়েক দিন ধরেই মামলায় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর নাম না থাকার বিষয়টি নিয়ে জল্পনাকল্পনা ছিল। সরকারের চাপে দুদক তাঁর নাম বাদ দিচ্ছে বলেও আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হলো রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের।
দুদকের মামলায় এখন আসামি হচ্ছেন: সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, সেতুর নির্মাণ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব কাজী মো. ফেরদাউস, সড়ক ও জনপথের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ এবং এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোস্তফা।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘একে অপরকে আর্থিক লাভবান করার অসৎ অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক অসদাচরণ ও বিধিবিধান ভঙ্গ করে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম তারা পরিচালনা করেছে। এর মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম দরদাতা এসএনসি-লাভালিন ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেটকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা তারা করেছে। এই কাজ দণ্ডবিধির ১৬১ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী অপরাধ করার অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। এ ধরনের ষড়যন্ত্র দণ্ডবিধির ১২০(বি) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ‘নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে এসএনসি-লাভালিন কার্যাদেশ পেলে ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হতো।’
এজাহারে সাবেক দুই মন্ত্রী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনে আবুল হাসান চৌধুরী ও সৈয়দ আবুল হোসেনের ভূমিকা রাখার বিষয়ে অনুসন্ধানের সময় সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও পরিপূরক সাক্ষ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই দুজনের অপরাধ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে খতিয়ে দেখা হবে।’
মামলা দায়ের শেষে গতকাল বিকেলে দুদক কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অনুসন্ধান দলের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে এজাহারে রাখা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি।’ তবে তিনি দাবি করেন, ‘তাঁদেরকে দুদকের পক্ষ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। কানাডার আদালতে জব্দ আলামত হিসেবে রাখা রমেশের ডায়েরির অনুলিপি পেলেই তাঁদেরকে অভিযোগপত্রে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা যাবে।’
দুদকের এই মামলা দায়ের মূলত বিশ্বব্যাংকর শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে করা হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিশ্বব্যাংক প্রধান দাতা হিসেবে পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল গত ২৯ জুন। এরপর সরকার শর্তপূরণের অঙ্গীকার করলে তারা প্রকল্পে ফিরে আসে ২০ সেপ্টেম্বর। এ ক্ষেত্রে চার শর্তের মধ্যে অন্যতম ছিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তদন্ত বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক একটি বিশেষজ্ঞ দল। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গ্যাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বধীন এই দলটি দুই দফা বাংলাদেশ সফর করেছে। সর্বশেষ ৫ ডিসেম্বর ক্ষুব্ধ হয়েই চলে যায় বিশেষজ্ঞ দলটি। মামলায় আবুল হোসেনের নাম থাকা নিয়েই দুদক ও বিশেষজ্ঞ দলটির মধ্যে মতৈক্য হয়নি বলে জানা যায়। এর তিন দিন পর বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘কেবল পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়নে অগ্রসর হবে।’ বিশ্বব্যাংক আরও মনে করিয়ে দেয় যে, তারা দুর্নীতির বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে সাক্ষ্য-প্রমাণও দিয়েছে।
এর পরই দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে তারা মামলা করে বিশ্বব্যাংকের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠাবে। সে অনুযায়ী গতকাল মামলা করল দুদক। তবে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে মামলায় বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হবে কি না, তা গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়ার পরেও সৈয়দ আবুল হোসেনকে ছাড় দেওয়ার জন্য দুদকের সুপারিশ বিশ্বব্যাংক গ্রহণ করেনি। বিশেষজ্ঞ দলটি দুদককে বলে দিয়েছে, তদন্তে যাঁদের নামই আসবে, সবার বিরুদ্ধে সমান ব্যবস্থা নিতে হবে। কাউকেই বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেওয়া যাবে না।
সূত্র জানায়, মামলা করার পর সার্বিক পরিস্থিতি জানানো হবে বিশ্বব্যাংককে। এতে তারা সন্তুষ্ট কি না, তা জানাবে বিশেষজ্ঞ দলটি। এর পরই পদ্মা সেতুর অর্থায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের এই সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের দেওয়ার কথা ১২০ কোটি ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ৬০ কোটি ডলার এবং জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার ৪৫ কোটি ডলার। সবকিছুই এখন নির্ভর করছে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল বলেছেন, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলা হয়েছে, এবার পদ্মা সেতুও হবে। রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে বিজয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভা শেষে পদ্মা সেতু বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
এ সময় মামলা থেকে সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরীর নাম কীভাবে বাদ পড়ল, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন, দুদককে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।’
এর আগে গত নভেম্বর মাসে দুদকের অনুসন্ধানে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক দুদককে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ দেয়। সেই সব প্রমাণ নিয়ে কখনো মুখ খোলেনি দুদকের কেউ। তবে গতকাল দুদকের এজাহারে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের বেশ কিছু ই-মেইল বার্তার কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব ই-মেইল বার্তায় এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের প্রমাণ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব ই-মেইল বার্তাই প্রমাণ হিসেবে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্রের জন্য এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা রমেশ শাহর ডায়েরি ও কম্পিউটার জব্দ করেছিল কানাডার পুলিশ। রমেশ শাহ ও মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে বিচার-প্রক্রিয়া চলছে কানাডায়। এ ছাড়া রমেশ শাহর ডায়েরিতে কাজ পাওয়ার পর কাকে কী পরিমাণ অর্থ ঘুষ দেওয়া হবে, সে তালিকাও রয়েছে। এই তালিকায় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর নাম রয়েছে। আর এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তাদের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আবুল হাসান চৌধুরী এবং নিক্সন চৌধুরী। এই তিনজনের নামই মামলায় নেই।
দুদকের মামলায় তিনজন বিদেশির নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রমেশ শাহ ও মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে কানাডাতেই বিচার চলছে। কানাডার পুলিশ এই দুজনের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগে মামলা করেছে। তৃতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছেন কেভিন ওয়ালেস। তাঁর বিরুদ্ধে কানাডার পুলিশও অভিযোগ আনেনি। কেভিন ওয়ালেস প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন। এসএনসি-লাভালিন নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিউক্লিয়ার রি-অ্যাক্টর তৈরি ও সরবরাহে একটি নতুন কোম্পানি খুলেছে। ক্যানডু এনার্জি নামের সেই প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট এখন কেভিন ওয়ালেস। দুদক তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা করেছে। এই নামটি কানাডায় যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
দুদকের সংবাদ সম্মেলন: গতকাল বিকেলে দুদক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অনুসন্ধান দলের প্রধান আবদুল্লাহ আল জাহিদ বলেন, বাংলাদেশে প্রাপ্ত তথ্যাদি দিয়েই এত দিন অনুসন্ধান করা হয়েছে। তাঁর ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে পাওয়া মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে অনুসন্ধানকাজ করা হয়েছে। শিগগিরই দুদক এ মামলার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নামবে। তখন দুদকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় বিভিন্ন আইনি এখতিয়ার বা অধিকার প্রয়োগ করে বিভিন্ন নথির মূল কপি জব্দ বা বিদেশ থেকে তথ্য বা দালিলিক প্রমাণ আনার বিষয়ে জোর দেবে দুদক।
সেতু বিভাগের সাবেক সচিবসহ সাতজনকে আসামি করার বিষয়ে আবদুল্লাহ আল জাহিদ বলেন, বাংলাদেশে প্রাপ্ত তথ্য এবং ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁদের মধ্যকার ই-মেইলে চিঠির বিষয়ে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রমাণিত। ওই সব তথ্য থেকে ইতিমধ্যে প্রতিভাত হয়েছে, ওই সাতজন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তিনি আরও জানান, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বারবার ভাঙা-গড়ার সঙ্গে সেতু বিভাগের সাবেক সচিব সরাসরি যুক্ত ছিলেন। কারণ, গণখাতে ক্রয় আইন অনুযায়ী, এসব কমিটির দায়ভার সচিবের ওপর বর্তায়, এ ক্ষেত্রে যোগাযোগমন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।
বিশ্বব্যাংকের চাহিদা কতটুকু পূরণ হলো—প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ আল জাহিদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও দুদক উভয় পক্ষই চায়, সবকিছুর বিনিময়ে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন হোক। তাই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের কোনো দূরত্ব নেই। একই সঙ্গে উভয় পক্ষই একটি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিয়েছি।’
সবশেষে আবদুল্লাহ আল জাহিদ জানান, দুদকের নিয়মানুযায়ী তদন্তের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ কর্মদিবস সময় পাওয়া যায়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হবে।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-18/news/314048

কোরীয় প্রতিষ্ঠানের ১৭ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে এনা

কোরীয় প্রতিষ্ঠানের ১৭ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে এনা
সাংসদের প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা

শরিফুল হাসান | তারিখ: ০৮-১২-২০১২

সাংসদ এনামুল হকের প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজের আর্থিক প্রতারণার কারণে রাজধানীর উত্তরার সরকারি ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প থমকে আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ডোঙ্গা এ এইচ অভিযোগ করেছে, প্রতারণা করে তাদের যৌথ ব্যাংক হিসাব থেকে ২১ লাখ মার্কিন ডলার (১৭ কোটি টাকা) তুলে নিয়েছে এনা। এই প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ করছে এনা ও ডোঙ্গা। শুধু টাকা তুলে নেওয়া নয়, ডোঙ্গার কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এনার বিরুদ্ধে। এনা টাকা তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করে এখন কিস্তিতে তা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব কারণে কাজের গতি থমকে আছে। ৩০ মাসের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ করার কথা থাকলেও ১১ মাস চলে গেছে। কিন্তু কাজ এগোচ্ছে না।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের সঙ্গে কোনো সাংসদ ব্যবসা করতে পারেন না। তার পরও দুই সাংসদ সরকারের এত বড় প্রকল্পে যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তা ছাড়া নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগে নেওয়া এই প্রকল্প এখন পুরোপুরি ‘রাজনৈতিক’ হয়ে গেছে। কাজ এগিয়ে নিতে রাজউক ও মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে সম্প্রতি তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠিতে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন ডোঙ্গা এ এইচ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট বু কুন লি। ওই চিঠির অনুলিপি গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং ঢাকার দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসেও দেওয়া হয়েছে।

উত্তরার সম্প্রসারিত ১৮ নম্বর সেক্টরে তিন শ্রেণীতে মোট ২০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য মোট খরচ হবে নয় হাজার ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে ‘এ’ শ্রেণীতে ৭৯টি ভবন (সাড়ে ছয় হাজার ফ্ল্যাট) তৈরির জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি ভবনের কাজ পেয়েছে এনা-ডোঙ্গা-ডিডিজে। বাকি ১৮টি ভবনের মধ্যে ১৬টির কাজ পেয়েছেন সরকারি দলের আরেক সাংসদ ও রিহ্যাবের সভাপতি নসরুল হামিদ। এনার বিরুদ্ধে ডোঙ্গার যত অভিযোগ: রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া চিঠিতে ডোঙ্গার প্রেসিডেন্ট বু কুন লি বলেন, ‘এনার খামখেয়ালির কারণে আমরা কিছু জটিল সমস্যায় পড়েছি। এনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দরপত্র এবং অগ্রিম যত টাকা লাগে, কাজের যত পুঁজি লাগে, সেগুলো যৌথভাবে দেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। এসবের ভিত্তিতেই যৌথ কোম্পানি হয় এবং উত্তরা প্রকল্পে যুক্ত হই। কিন্তু এনা কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখেনি।’

চিঠিতে বলা হয়, এত কিছুর পরও প্রকল্পের স্বার্থে এবং প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও সম্মান বজায় রাখতে ডোঙ্গা এই প্রকল্প থেকে সরে যায়নি। বরং কাজ এগিয়ে নিতে ৪০ লাখ মার্কিন ডলার তহবিল হিসেবে (পারফরম্যান্স বন্ড) জমা রাখে যৌথ ব্যাংক হিসাবে। ওই হিসাব থেকে যৌথ স্বাক্ষরে টাকা তোলার কথা থাকলেও এনা একাই ২১ লাখ মার্কিন ডলার তুলে নেয়। এই টাকা তুলতে তারা ডোঙ্গা প্রতিনিধির সই নেয়নি। শুধু তা-ই নয়, ওই টাকা তারা প্রকল্পে ব্যবহার না করে নিজেদের স্বার্থে খরচ করেছে।
চিঠিতে বলা হয়, ‘এই প্রতারণার বিরুদ্ধে আমরা বাংলাদেশের আদালতে যেতে পারতাম এবং বিচার চাইতে পারতাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব এড়াতে আমরা আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান চেয়েছি। আমরা এনাকে ওই টাকা ফেরত দিতে বলেছি। আর ভবিষ্যতে যেন এ সমস্যা না হয়, সে জন্য আমরা এককভাবে টাকা তোলার ক্ষমতা চাই। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের সহযোগিতা চেয়েছি।’
চিঠিতে আরেকটি অভিযোগে বলা হয়, গত অক্টোবরে ডোঙ্গার চারজন প্রতিনিধি কোরিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকা ছাড়তে চাইলে বিমানবন্দরের অভিবাসন পুলিশের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের যেতে বাধা দেয় এনা। এ ছাড়া জুলাই মাসে এনার লোকজন ডোঙ্গার প্রতিনিধিদের উত্তরায় প্রকল্প এলাকায় যেতেও বাধা দেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এই অবস্থায় সরকারের কাছে নিরাপত্তা চায় ডোঙ্গা।

রাজধানীর প্রাইম ব্যাংকের একটি শাখায় এনা-ডোঙ্গার যৌথ হিসাব ছিল। যোগাযোগ করা হলে ওই শাখার ব্যবস্থাপক ওমর কবীর প্রথম আলোকে বলেন, এ বছরের জানুয়ারির দিকে তাদের একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়েছিল। ঝামেলা হওয়ার পর তারা আলাদা হিসাব চালু করেছে।

এনা প্রপার্টিজের পক্ষে এই প্রকল্পের সার্বিক কাজ তত্ত্বাবধান করছেন পরিচালক সামিউল আলম। ডোঙ্গার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ডোঙ্গার কী নিয়ে দ্বন্দ্ব, সেটা আমি আপনাকে বলতে যাব কেন?’ এনার চিঠি এবং প্রতারণা করে টাকা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি তো সবই জানেন। আমাকে কেন তাহলে জিজ্ঞেস করছেন? আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলব না। আপনি যা লেখার লিখতে পারেন।’ এ বিষয়ে ডোঙ্গা কোম্পানির বাংলাদেশি ব্যবস্থাপক হং জিন কিয়ো প্রথম আলোকে বলেন, এসব বিষয় কোরিয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রাজউককে জানিয়েছে। ডোঙ্গার অভিযোগ ও প্রতারণা করে টাকা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি দলের সাংসদ এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই চিঠির বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আর একটি কাজের শুরুতে অনেক ঝামেলা থাকে। এখন কোনো সমস্যা নেই। কাজ চলছে।’

কাজে অগ্রগতি নেই: গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, এখনো মাটি পরীক্ষার কাজ চলছে। এলোমেলোভাবে কিছু যন্ত্র ও নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। সেখানে কথা হয় ডোঙ্গার কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, এনার সঙ্গে নানা ধরনের সমস্যা হওয়ার কারণে কাজে অগ্রগতি নেই। তা ছাড়া বিদেশ থেকে যেসব যন্ত্র আনার কথা ছিল, সেগুলো আনা হয়নি। স্থানীয়ভাবে কিছু যন্ত্র ধার করে আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ বছরের মার্চে সরকারের আনুষ্ঠানিক চুক্তি হলেও আগেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে তাদের কাজ শুরু করতে হয়। ৩০ মাসে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ১১ মাসে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভিত খননই (টেস্ট পাইলিং) চলছে। দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য মন্ত্রণালয় ও রাজউকের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও কাজে গতি নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। জুলাইয়ের শেষে সাংসদ এনামুল হক চুক্তিবহির্ভূতভাবে ৪০ কোটি টাকা অগ্রিম দাবি করেন। তবে রাজউক তা দিতে রাজি হয়নি। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব খোন্দকার শওকত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনা ও ডোঙ্গার মধ্যে অনেক বিষয়েই দ্বন্দ্ব ছিল। তবে সেসব দ্বন্দ্ব তারা মিটিয়ে ফেলেছে বলে আমাদের জানিয়েছে।’ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে কি না, জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আমরা তাদের বারবার তাগাদা দিচ্ছি। তারা নতুন করে কাজের পরিকল্পনা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়েই তো কাজ শেষ করতে হবে।’ এদিকে তিন দফায় সময় বাড়ানোর পর রাজউকে আবেদন করেছেন ছয় হাজার ১০০ প্রার্থী। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আবেদনপত্রের সঙ্গে তিন লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট পেলে তাঁদের আরও অন্তত ৫৬ লাখ টাকা দিতে হবে। তবে কত বছর পর তাঁরা ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন, তা কেউ বলতে পারছেন না।

প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বি সি—এই শ্রেণীতে উত্তরায় মোট ২০ হাজার ফ্ল্যাট তৈরি হবে। ‘এ’ শ্রেণীতে ৭৯টি ভবন তৈরি হবে। এ জন্য খরচ ধরা হয়েছে দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতিটি ভবন হবে ১৬ তলা। বেজমেন্ট ও কার পার্কিংয়ের জন্য দুটি তলা হবে। বাকি ১৪ তলার একেকটিতে ছয়টি করে মোট ৮৪টি ফ্ল্যাট থাকবে। ৭৯টি ভবনে ছয় হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট হবে। রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর যৌথভাবে এই নির্মাণকাজ তদারক করছে। স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তর ভবনগুলোর নকশা তৈরি করছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, একই প্রকল্পে ‘বি’ শ্রেণীতে মোট ৭২টি এবং ‘সি’ শ্রেণীতে আরও ৭২টি ভবন তৈরি করা হবে। এ জন্য সেপ্টেম্বর মাসের শেষে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৪৪টি ভবন তৈরির কাজ পেতে সাংসদ এনামুল হকের এনা, সাংসদ নসরুল হামিদের হামিদ কনস্ট্রাকশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ৪৫টি দরপত্র কিনলেও কেবল ডোঙ্গা-এসকর্ন-শিকদার যৌথ কোম্পানি দরপত্র জমা দিয়েছে। বর্তমানে গণপূর্ত, রাজউক ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের ছয় সদস্যের কমিটি দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন করছে। অভিযোগ উঠেছে, ডোঙ্গা-এসকর্ন-শিকদার যৌথ কোম্পানিকে কাজ দিতে সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। রিহ্যাবের সভাপতি সাংসদ নসরুল হামিদ চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তৎপর বলে জানা গেছে। তবে এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছেন নসরুল হামিদ।
http://prothom-alo.com/detail/date/2012-12-08/news/311483

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla