Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

পদ্মাসেতু তদন্ত ও 'অপরাধী' ডক্টর মোহম্মদ ইউনূস পর্ব

Padma Bridge corruption
মোবাইল ফোনের রাজত্ব তখনও শুরু হয়নি। যোগাযোগ বলতে ট্রাডিশনাল ফোন আর চিঠিই একমাত্র ভরসা। তেমনি একটা সময়ের কথা। ফোনের তীব্র আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। রাত বাজে দুটা। দুঃসংবাদ না হলে এত রাতে কারও ফোন করার কথা নয়। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। হূৎপিণ্ডের ধুকধুকানি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরলাম রিসিভারটার উপর। বিরক্ত হলাম ও প্রান্তের গলার আওয়াজ শুনে। বন্ধুর ফোন। ঢাকা হতে কুষ্টিয়া যাওয়ার আগে অফিসে আমার সাথে দেখা করে গিয়েছিল। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কি একটা টেন্ডারে অংশ নিতে কুষ্টিয়া যাচ্ছে। ফোনে যা বলল তা শুনে মেজাজ একেবারেই বিলা। ৩ লাখ টাকা দরকার তার, এবং তা যথা সম্ভব ভোরে। চাপ দিতে খুলে বলল ব্যাপারটা। টেন্ডার বিক্রি হচ্ছে এবং সকাল ১০ টার ভেতর ৩ লাখ টাকা নগদে পরিশোধ করলে নিশ্চিত পাওয়া যাবে এ কাজ। গ্রাউন্ড ওয়ার্ক নাকি ইতিমধ্যে শেষ করা আছে। বাকি শুধু লেনাদেনা। অনেকের কাছে মনে হতে পারে অলৌকিক, অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজের উপর যাদের সম্যক ধারণা আছে তাদের কাছে এসব ডালভাত। বেঁচে থাকার জন্যে এসব খাদ্য আমাদের দৈনন্দিন মেনুতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ঘটনাটা এ রকমঃ দুপুর ১টার ভেতর নির্ধারিত বাক্সে দরপত্র ফেলে অংশগ্রহনকারীদের সবাই যে যার মত চলে যায়। কোন এক অদ্ভুত নিয়মে ঠিক করা হয় পরের দিন খোলা হবে এ বাক্স। আসলে এখানেই নাকি লুকানো ছিল তেজারতির আসল ধান্ধা। রাত ১০টার দিকে জানালা ভেঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের কেউ একজন সীল করা রুমে ঢুকে পরে। তাকে অনুসরণ করে আমার বন্ধু। দুজনে মিলে পূর্ব প্রস্তুতি মোতাবেক খুলে ফেলে টেন্ডার বাক্স। অতিরিক্ত একটা দরপত্র বন্ধুকে আগ হতে বরাদ্দ করা হয়েছিল। টর্চের আলোতে একে একে সবকটা দরপত্র খোলা হয় এবং সর্ব নিম্ন দরদাতার চাইতে ১০০ টাকা কম কোট করে নতুন একসেট দরপত্র বাক্সে ফেলে সিলগালা মেরে একই পথে বেরিয়ে আসে দুজন। জানালা মেরামত করার জন্যে আগ হতে তৈরী ছিল বিশ্বস্ত একজন কাঠমিস্ত্রি। প্রফেশনাল লাইফের যতটা সময় বাংলাদেশে কাটিয়েছি তার কোন লেভেলেই একসাথে ৩ লাখ পাঠানোর মত সঙ্গতি ছিলনা। তাই এ যাত্রায় বন্ধুকে হতাশ করতে বাধ্য হলাম। অবশ্য সে যে খুব হতাশ হয়েছিল এমনটাও নয়। কারণ তার জানা ছিল আমার দৌড় হাজারের উপর নয়। কিন্তু জেনেও ফোন করেছিল বিশেষ একটা উদ্দেশ্যে, ব্যবসা বাণিজ্যে তার লম্বা হাতের গর্বিত একটা চিত্র আমাকে উপহার দেয়া।

পদ্মা সেতুর দুর্নীতিতে সরকারের মনোভাব পরিবর্তন কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। যে দুদক তদন্তের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আবুলদের ফুলের মত পবিত্র সনদ দিয়ে সন্মানে ঠেকা দিয়েছিল, বিদেশি কজন বিগ গানের সফর শেষে তারাই আবার সুর পালটে ফেললো। ব্যাপারটা কেমন জানি অবাংলাদেশি লাগছে। এ দেশে অপরাধের চামড়া এতটা পুরো কামান দাগলেও তা প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। সোনা রফিক বলে কক্সবাজারের একজন এমপি ছিলেন। ভদ্রলোক মনে হয় ইন্তাকাল করেছেন এ বছর। সোনা চোরাচালানি পেশা হতে রাজনীতিতে ঢুকে সবকিছু পরিষ্কার করতে সক্ষম হলেও সময়মত নামটা পরিষ্কার করতে পারেননি। তাই মৃত্যুর পরও লোকজন তাকে সোনা রফিক হিসাবেই চেনে। এই রফিক সাহেব তত্ত্বাবধায়ক আমলে গুলসানের এক রেস্ট হাউজে একাধিক দেহপসারিনী সহ পুলিশের হাতে ধরা পরেছিলেন। বাংলাদেশের একজন সাংসদ শত কোটি টাকা আয় করবেন আর একাধিক নারী ভোগ করবেন না আমার মত অনেকের কাছে এটাও অবাংলাদেশি। সে যাই হোক, রফিক সাহেবদের শয়নকক্ষের খবর আমার লেখার উদ্দেশ্য না। উদ্দেশ্য হচ্ছে হোটেল কক্ষে বমাল ধরা পরার পর উনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা আলোকপাত করা। সাংবাদিকদের সামনে উনি জোর গলায় নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসাবে দাবি করে বলেছিলেন হোটেল কক্ষে বেশ্যাদের উপস্থিতি নাকি বিরোধী দলীয় ষড়যন্ত্রের অংশ। টাকার বস্তা সহ ধরা পরে সুরঞ্জিত এন্ড গং’রাও দাবি করছে ষড়যন্ত্রের, রাজনৈতিক লীলাখেলার। আবুল মন্ত্রী, মসিউর উপদেষ্টা আর মোশারফ ভূঁইয়াদের মত রুই কাতলারাও দাবি করছেন উনারা ফুলের মত পবিত্র, আর মানি লোকের মান ইজ্জত নিয়ে খেলছে বিশ্বব্যাংকের মত নষ্ট প্রতিষ্ঠান। তাদের একজনকে দেশপ্রেমের সনদ ও জাতিসংঘের মত ফোরামে চৌদ্দগুষ্টি উদ্বারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জেহাদ ঘোষনা করলেন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে। আমার মত অনেকে ভেবেছিল বিশ্বব্যাংকের বারোটা বাজল বলে! বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ বাবু সুরঞ্জিত সেনের কথা যদি বিশ্বাস করি আমাদের মানতে হবে বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে, কিন্তু শেখ হাসিনায় ধরলে ছাড়ে না। তো আমার মত অনেকেই আশা করেছিল আর্ন্তজাতিক এই সংস্থাকে সহজে ছাড়ছেন না আমাদের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ভোজবাজির মত কেমন যেন সব পালটে গেল।

সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা চোর ধরতে বিদেশ হতে বিশেষজ্ঞরা এলেন এবং দুদকের কানে কিছু মন্ত্র দিয়ে গেলেন। ব্যাস, তাতেই কর্ম কাবার। উলটো সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন শেখ হাসিনার গোলাম হোসেন। সাবেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা আর আমলাদের তিনি ঘন ঘন তলব করছেন নিজ কার্যালয়ে, পাশাপাশি হুমকি দিচ্ছেন মামলা করার। কোথায় যেন কি একটা গোলমাল চলছে যা জাতি হিসাবে আমাদের জানতে দেয়া হচ্ছেনা। নিজস্ব সূত্র হতে পাওয়া ক্লাসিফাইড খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী আবুল আর মশিউরদের বলির বিনিময়ে দফারফা করেছেন বিশ্বব্যাংকের সাথে। এ যাত্রায় বেঁচে যাচ্ছেন নুরু রাজাকারের নাতি ও প্রধানমন্ত্রীর জামাই মশরুর হোসেন। সামনে নির্বাচন। অসময়ে হাড়ি ভেঙ্গে পরলে পদ্মা সেতুর ঝোলা হতে বেরিয়ে আসতে পারে হরেক কিসিমের বেড়াল। এসব বেড়ালদের চেহারা ভূমিকম্প তুলতে পারে ব্যালট নামক পানিপথের যুদ্ধে। তাই শেখ হাসিনা এ যাত্রায় রেহাই দিচ্ছেন বিশ্বব্যাংককে।

এতদিন বলা হয়েছে বিশিষ্ট ’সুদখোর’ ডক্টর মোহম্মদ ইউনূসের কারণে নাকি পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেমে গেছে। নোবেলজয়ী এই ব্যাংকারের বিরুদ্বে অভিযোগ তিনি নাকি বিদেশী মুরুব্বিদের চেম্বারে দরজা আটকে কাতর হয়ে অনুনয় করেন বিনিয়োগ বন্ধের জন্যে। কিন্তু হায়, দুদক নিজ দরবারে সবাইকে সমন পাঠালেও কি এক অদৃশ্য কারণে তলব করছেনা ’মূল’ আসামিকে। তা যদি না-ই করবে তাহলে এই ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়ার কি কিছু নেই হাসিনা-মুহিত গংদের? সংসদে দাড়িয়ে খোদ সাংসদরা দিনের পর দিন বেশাতি করে গেছেন প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সহ সরকারের বাকি প্রচারযন্ত্রের প্রায় সবাই এক বাক্যে দায়ী করে গেছেন বিশ্ববরেণ্য এই মানুষটিকে। কিন্তু তদন্তের কোন পর্যায়ে কেন এই ব্যক্তির নাম আসছেনা জাতি হিসাবে তা জানার অধিকার কি আমাদের নেই? নাকি আমরা সবাই হীরক রাজ্যের মূর্খ প্রজা, আর উনারা রাজাধিরাজ!

কুষ্টিয়া পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির টেন্ডার বিক্রির প্রসঙ্গটা এখানে শুধু শুধু টেনে আনিনি। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সাথে এর কিছুটা হলেও যোগসূত্র আছে। খবরে প্রকাশ, টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই দরপত্রের একটা কপি হস্তান্তর করা হয়েছিল লাভালিনের টেবিলে। এবং বিনিময়ে দাবি করা হয়েছিল আকাশ সমান কমিশন। আবুল হোসেন, মশিউর রহমান, মোশারফ ভূইয়া আর মশরুর হোসেন সিন্ডিকেটের অস্বাস্থ্যকর মিলনের ফসল আজকের বিশ্বব্যাংক তদন্ত কমিশন। ওরা বিদেশি হয়ে দেশের মাটিতে চোর খুঁজছে, এর চাইতে লজ্জাজনক, অপমানজনক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে ইতিপূর্বে কোথাও মোকাবেলা করতে হয়েছে বলে মনে হয়না। নির্লজ্জ এসব চোরের দলের সামান্যতম মূল্যবোধ থাকলে সমাজে বিচরণ করার কথা ছিলনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, ওরা সুস্থ, সবল এবং প্রচন্ড শক্তিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে। এবং ওদের কাছেই বর্গা দিতে হচ্ছে আমাদের প্রতিদিনের জীবন। ধিক!

Comments

রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াই

রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াই এজাহার দিচ্ছে দুদক
দৈনিক ইত্তেফাক : ০৭/১২/২০১২
শুক্রবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১২ : ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগের দায়ে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরে অনড় বিশ্ব ব্যাংক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের যথেষ্ট উপাদান নেই :দুদক ৩১ জনের জবানবন্দি ও তথ্য-উপাত্ত জনসম্মুখে প্রকাশের সিদ্ধান্ত

ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগ ও সন্দেহজনক আচরণের দায়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও এসএনসি লাভালিনের লবিস্ট সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। বিশ্বব্যাংকের এ সুপারিশ গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক থেকে বলা হয়েছে, এই দুইজনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের জন্য যথেষ্ট উপাদান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।

দুদক পদ্মা সেতু প্রকল্পের সরকারি কর্মকর্তা এবং তিন বিদেশির বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের প্রস্তাব করে। এজাহার দায়েরের পর তদন্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জড়িত থাকার যথেষ্ট উপাদান পাওয়া গেলে অভিযোগপত্রে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেয় দুদক। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্যানেল এজাহারেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে অনড় থাকে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে বৈঠকশেষে চলে যায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল। এদিকে আগামী রবিবার দুদকের বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে এজাহার দায়ের করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছাড়াই এজাহার দাখিল করা হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা সেতু দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদকের প্রাপ্ত সকল তথ্য এবং ৩১ জনের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। গত ২ ও ৪ ডিসেম্বর দুদকের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক প্যানেল তিন দফা বৈঠক করে। বৈঠকে অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত দরপত্রের কার্যক্রম, দণ্ডবিধি আইন দীর্ঘ আলোচনা হয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যে ৩১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্য এবং বিশ্বব্যাংকের দেয়া কয়েকটি নথিপত্রের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। এদের মধ্যে কাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির কোন আইনে মামলা করা যায় তারও বর্ণনা ছিল। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক কাজী ফেরদৌস, ইপিসির ডিএমডি গোলাম মোস্তফা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, কানাডিয়ান নাগরিক রমেশ শাহা, মোহাম্মদ ইসমাইল এবং কেভেন ওয়ালিশের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকে দুদক থেকে তিন বিদেশিসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা যায় বলে প্যানেলকে জানানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্যানেল থেকে বলা হয়, তিন বিদেশির বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হলে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে। তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়, তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে কানাডার আদালতে মামলা রয়েছে। প্যানেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী আবুল হোসেন এবং আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগ এবং সন্দেহজনক আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে দুদক এজাহার দায়ের করতে পারে। কিন্তু দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং আইন উপদেষ্টা এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করার মত যথেষ্ট উপাদান এখনো আমরা পাইনি। জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলের প্রধান ওকাম্পো বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের লবিস্টের সঙ্গে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন বৈঠক করেছেন। এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের সঙ্গেও কয়েক দফা বৈঠক করেছেন আবুল হোসেন। রমেশের ডায়েরিতেও কাকে কাকে ঘুষের টাকা দিতে হবে তারও বর্ণনা রয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের জন্য চারবার মূল্যায়ন কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফা কমিটি গঠনের ১৯ দিনের মাথায় তৃতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এজাহার দায়ের করার জন্য এগুলো যথেষ্ট উপাদান।

জবাবে দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, একজনের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে কি লেখা রয়েছে শুধুমাত্র তা দিয়ে যে কারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায় না। আমাদের দেশের আইন এটা অনুমোদন করে না এবং আদালতে টিকবে না। ওকাম্পো বলেন, আপনারা এজাহার দায়ের করে তদন্ত শুরু করেন, যথেষ্ট উপাদান না পেলে অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি যদি বিবেচনা করেন, পদ্মা সেতুর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটি সহায়ক হবে। জবাবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। এটি সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ব্যাপার। আমরা তদন্ত করছি দেশের আইন কানুন ও বিধি বিধান অনুযায়ী। কোন এজাহার দায়েরের আগে আদালতের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা বিবেচনায় নিতে হয়। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্ক হয়। শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক ছেড়ে চলে যায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল। তবে যাওয়ার আগে প্যানেল দুদককে আরো অনুসন্ধানের পরামর্শ দেয়। দুদক থেকে জানানো হয়, এজাহার দায়েরের পর আইনগতভাবে তদন্ত শুরু হবে। বিশ্বব্যাংকের যেসব পরামর্শ রয়েছে সেগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

এ ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আমাদের কিছু কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। এটা শেষ করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কি কাজ অসমাপ্ত রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাদের কিছু মতামত দিয়েছে। ওই মতামতের ভিত্তিতে আমরা নতুন করে পুরো বিষয়কে পর্যালোচনা করবো। তিনি জানান, বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের ভিউ তুলে ধরেছে, আমরা আমাদের ভিউ তুলে ধরেছি। আমাদের দেশের আইন-কানুন অনুযায়ী অনুসন্ধান রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দুই-এক দিনের মধ্যেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরী এবং নিক্সন চৌধুরীকে বাদ দিয়েই এজাহার দাখিল করা হচ্ছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দুদক অনানুষ্ঠানিক ভাবে সরকারের নীতি নির্ধারকদের পরামর্শ নেবে। এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের আইন কানুন ও বিধি বিধান অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। পদ্মা সেতু দুর্নীতি তদন্তের তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করার ব্যাপারে দুদকের আইনজীবী আনিসুল হক বলেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে জনমনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সেটা দূর করতে সকল তথ্য প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তা প্রকাশ করা হবে।
http://www.nowbd.com/ittefaq/2012/12/07/624.htm

এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে

এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দিতেই বারবার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে। আর এই কাজ পেতে ১০ শতাংশ ঘুষ লেনদেনেরও আলোচনা হয়েছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য পরামর্শক সংস্থা এসএনসি-লাভালিনকে প্রথম হিসেবে নির্বাচনের পর কার্যাদেশ দিতে কাজের ১০ শতাংশ ঘুষ লেনদেনের আলোচনা, সে অনুযায়ী ষড়যন্ত্র করে দরপত্র অংশগ্রহণকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেছনে রাখতে বারবার দরপত্র কমিটি পরিবর্তন এবং পরামর্শক সংস্থা নিয়োগের কাজটি চূড়ান্ত করতে এক বছর ১০ মাস সময়ক্ষেপণের বিষয়টিই সন্দেহজনক ও দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে দুদক।
গতকাল মঙ্গলবার কমিশনের কাছে জমা দেওয়া খসড়া প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশের পেছনে এসব তথ্যকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে অনুসন্ধান দল। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সেতু বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সেতুর জন্য পরামর্শক সংস্থা নির্বাচন-প্রক্রিয়ার কার্যক্রম শুরু করে সেতু বিভাগ। ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের পরিচালক রফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এটি ছিল দরপত্র মূল্যায়ন করার জন্য প্রথম কমিটি। কমিটির কাজ ছিল দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা।
সেতু বিভাগ ও দুদক সূত্রে জানা যায়, প্রথম দরপত্র কমিটি গঠনের পর রহস্যজনক কারণে তা ভেঙে দিয়ে ২০১০ সালের ৭ জুন আবার দ্বিতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. সেকান্দার আলীকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি তৈরি হয়। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে দুদককে জানিয়েছেন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশেই এই দ্বিতীয় কমিটি তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় কমিটি তৈরির ১৬ দিনের মাথায় ২০১০ সালের ২৩ জুন নতুন করে তৃতীয় কমিটি তৈরি করা হয়। সেতু বিভাগের তৎকালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া হন এই কমিটির প্রধান।
জানা গেছে, এই কমিটি প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম তদন্ত দলকে বলেন, কমিটি ঠিকমতো কাজ না করায় এবং মন্ত্রী-সচিবের সরাসরি নির্দেশে চতুর্থবারের মতো একটি কমিটি তৈরি করা হয়। একই বছরের ৪ নভেম্বর চতুর্থ কমিটি গঠন করা হয়।
এভাবে বারবার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ভাঙাগড়ার পেছনে দুদক বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সময় নষ্ট করা হয়েছে। আর এর মূল লক্ষ্য ছিল এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দেওয়া। এভাবে কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও কয়েকজন বেসরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়েছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরও জানা গেছে, কানাডিয়ান কারিগরি প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিল না। অথচ এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিতেই চারবার গঠন করা হয় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। এমনকি অভিযুক্তরা সবশেষে গঠিত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিটির কাছেও অন্যান্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক বিষয়াদি-সংক্রান্ত অনেক তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে যানা গেছে।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে কমিটির তিনজন সদস্য বলেছেন, ‘আমরা ঠিকমতোই কাজ করছিলাম। হঠাৎ একদিন শুনি, আমাদের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেটাও লোকমুখে। আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি দিয়েও আমাদের বিষয়টি জানানো প্রয়োজন মনে করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুধু জেনেছি, মন্ত্রীর নির্দেশে কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এসব আচরণ দেখে আমাদের মনে হয়েছে, এসএনসি-লাভালিনকে কাজ দিতে সব রকমের চেষ্টাই করা হয়েছে।’
http://prothom-alo.com/detail/date/2012-12-05/news/310800

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla