Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

সোনালী বনাম গ্রামীণ ব্যাংক, তানভীর মাহমুদ বনাম ইউনুস মাষ্টার

Grameen Bank and Sonali Bank
আগারগাঁও তালতলা বাজারে মুদি দোকানের মালিক ছিলেন তিনি। মালিক বললে হয়ত কিছুটা বাড়িয়ে বলা হবে, ব্যবসাটা ছিল আসলে বাবার, সন্তান হিসাবে সাথে থাকতেন কেবল। দোকানের আয় রোজগার ভাল না হওয়ায় এক সময় মাসিক ৩০০০ টাকা বেতনে চাকরি নিতে বাধ্য হন। তাও আবার গার্মেন্টসে, যেখানে চাকরির বাজার সংরক্ষিত মুলত মহিলাদের জন্যে। নিদারুণ কষ্টের ভেতর এভাবেই সংসারের হাল ধরেন এবং আর দশটা স্বদেশির মত চালাতে থাকেন জীবন যুদ্ধ। একজন খেটে খাওয়া বাংলাদেশির এ অতি পরিচিত কাহিনী। এ নিয়ে গল্প, উপন্যাস অথবা রাজনৈতিক লেখালেখির কোন প্রেক্ষাপট নেই। অতিরিক্ত কটা বিয়ে, ফুঁসলিয়ে ফাসলিয়ে দু একজন মহিলা সহকর্মী ধর্ষন অথবা খুন, গার্মেন্টস শিল্পে একজন পুরুষ কর্মীর উল্লেখ করার মত ঘটনা বলতে আমরা এসবই বুঝে থাকি। কিন্তু তানভির মাহমুদের বেলায় ব্যাপারটা অন্যরকম। দশ বছর আগের গার্মেন্টস কর্মী তানভীর আজ ১০০০ কোটি টাকার মালিক (নিজে দাবি করছেন ৫০ হাজার কোটি)। ভবিষ্যত ৪৭ টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক দুদকে হাজিরা দিতেও ব্যবহার করেন নাম্বার প্লেটবিহীন পাজেরো ভিসিক্স গাড়ি। বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৭ টা গাড়ি নিয়ে মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ায় চোখ ধাঁধানো আলিশান বাড়িতে বাস করেন এবং রাস্তায় বের হন সামনে পিছে গাড়ির বহর ও সশস্ত্র গার্ড নিয়ে। রূপকথার কল্পলোকের মত উত্থান ঘটছিল এই অতিমানবের। তরতর করে অতিক্রম করছিলেন উচ্চতার সবকটা শিখর। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কোন এক আসনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখার পর্বও সেরে নিচ্ছিলেন বিনা বাঁধায়। কিন্তু পাপড়ি বিছানো ফুলেল পথে কাটা লুকিয়ে থাকতে পারে তা বোধহয় স্বপ্নেও কল্পনা করেননি মাহমুদ সাহেব। সবই ছিল এবং সবাই ছিল সাথে। একদিকে সরকারী ব্যাংক, পাশপাশি সরকার প্রধানের ডানহাত একজন উপদেষ্টা। ৪৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মচারীদের নামে বেনামে ৩৫০০ কোটি টাকা লোন দেখিয়ে তার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ভূয়া এলসির মাধ্যমে আত্মসাৎ করে নিয়েছেন ইতিমধ্যে।

মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করার কাজে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জনাব মোদাচ্ছের আলী বিশেষ অভিজ্ঞ। তত্ত্বাবধায়ক আমলে নেত্রীর মনোরঞ্জনের জন্যে কাজটা তিনি হরহামেশাই করেছিলেন। জরুরি ভিত্তিতে চোখ, কানের চিকিৎসা না করালে প্রিয় নেত্রী কালা ও আন্ধা হয়ে যাবেন, এমন সব মিথ্যা প্রেসক্রিপশন দিয়ে নেত্রীকে জেল হতে বের করে আনার কাজ অনেকটাই সহজ দিয়েছিলেন তিনি। বিনিময়ে পুরস্কার হিসাবে পেয়েছেন মন্ত্রীর সমমর্যাদার উপদেষ্টা পদ। ক্ষমতার রং মহলে একটা উপকথা চালু আছে, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের নিয়োগ যদি মন্ত্রনালয়ের কাজের জন্যে হয়ে থাকে, উপদেষ্টাদের নিয়োগ নাকি মুলত প্রধানমন্ত্রীর পরিবারিক কাজের জন্যে। এইচ টি ইমাম, মসিউর ও মোদাচ্ছের সহ এই টিমের বাকি সবাই কাজটা খুব ভাল ভাবে করে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখায় মোদাচ্ছের আলীকে উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল কিনা কারও জানা নেই। তবে এই উপদেষ্টাকে প্রায়ই দেখা যেত ব্যাংকের এই শাখায়। শোনা যায় হলমার্ক গ্রুপের ৩৫০০ কোটি লোন পাওয়ার মূল ভূমিকায় ছিলেন তিনি। গ্রুপের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও হাজির থাকতেন। অবশ্য উপদেষ্টা নিজে বলছেন অন্য কথা। নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার একজন মহিলা কর্মকর্তার সাথে দেখা করার জন্যেই নাকি ব্যাংকে যেতেন। আগ বাড়িয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েও যে উপদেষ্টার দেখা পাওয়া দুস্কর, একই উপদেষ্টা একজন মহিলার সাথে দেখা করার জন্যে নিজে একটা ব্যংকে যেতেন এর সত্যতা আশাকরি উপদেষ্টার স্ত্রী অথবা পরিবারের বাকি সদস্যরা যাচাই করে দেখবেন। প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া না গেলে উপদেষ্টার চরিত্র নিয়ে কথা উঠতে পারে। আমরা যারা হাভাতে বাংলাদেশি তাদের সাথে মোদাচ্ছেরদের নতুন করে পরিচয় দেয়ার কিছু নেই। আমার মত লাখ লাখ স্বদেশির চোখে এরা শ্রেফ লুটেরা। কথার মারপ্যাঁচে দলীয় উচ্ছিষ্টভোগীদের মোহগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও এসব রাষ্ট্রীয় লুটেরাদের পরিচয় কোনভাবেই ঢেকে রাখা যাচ্ছেনা যেন। এদের একজনকে নিয়ে বাদ সেধেছে বিশ্বব্যাংক। অন্য একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিদ্যুৎ খাতের ’আয়-রোজগারের’ গায়ে ডানা বসিয়ে তা সাত-সমুদ্র তের নদী পাড়ি জমানোর ব্যবস্থা করেন। মোদাচ্ছের সাহেব হলমার্ক গ্রুপ কত হিস্যা পেয়েছেন তার সংখ্যা জানতে আমাদের বোধহয় আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী পাশে থাকলে মন্ত্রী এমপিদের অনেকের মগজ নাকি মাথায় থাকেনা। গুম কৃত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলিকে নিয়ে প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের মন্তব্য এ ব্যাপারে বিশেষ উদাহরণ হয়ে থাকবে। নির্বাচন যত সামনে আসবে মন্ত্রী, এমপিদের জন্যে প্রধানমন্ত্রীর মনোরঞ্জন ততটাই জরুরি হয়ে পরবে। নেত্রী খুশি থাকলেই কেবল দলীয় মনোনয়ন, মন্ত্রিত্ব আর পাশাপাশি সরকারী খাজাঞ্জিখানা উজার করার সিসিম ফাঁক মন্ত্র। দলীয় উচ্ছিষ্টখোরদের ভাল করেই জানা থাকে নেত্রী সন্তুষ্টির নাড়িনক্ষত্র। গ্রামীন ব্যাংক ও ডক্টর মোহম্মদ ইউনুস তেমনি দুটি বিষয় যার উপর ঢালাও সমালোচনা নিশ্চিত করতে পারে দলীয় মনোনয়ন। ডক্টর মো ইউনুস ও গ্রামীন ব্যাংক ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে গেলে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলেছে উন্নত বিশ্ব। সম্পর্কের সোনালী দিনে ছেলে ও মেয়েকে দেখতে ঘন ঘন আমেরিকায় যেতেন তিনি। ফ্লোরিডায় নিজস্ব মিনি কার্যালয় পর্যন্ত খুলতে বাধ্য হয়েছিলেন এক সময়। সে সময় এখন সোনালী অতীত। যুক্তরাষ্ট্রের মত পৃথিবীর অনেক দেশের সরকারের কাছে ব্যক্তি শেখ হাসিনা এখন বর্জিত, পরিত্যাক্ত, অনাকাঙ্খিত। গ্রামীন ব্যাংক ও ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে হেস্তনেস্ত হতে হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন ফোরামে। মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ ও এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ভাল জানা আছে প্রধানমন্ত্রীর এই দুর্বল অংশ। দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্যে এই দুজনের অবস্থান অনেকটাই নাকি নড়বড়ে। জনসংযোগে ধ্বস সহ লুটপাটের অভিযোগ আছে দুজনের বিরুদ্ধে। এমন এক প্রেক্ষাপটে কেবল নেত্রীর মনোরঞ্জন নিশ্চিত করতে পারে আগামী ৫ বছরের সোনালী ভবিষ্যত। তাই সংসদে পাওয়া সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে ভুল করলেন না দুজনেই। প্রধানমন্ত্রীকে পাশে পেয়ে গ্রামীন ব্যাংক ইস্যুতে দুজনেই ঝাঁপিয়ে পরলেন অর্থমন্ত্রীর উপর। গ্রামীন ব্যাংকের ৩% মালিকানা নিয়ে বাকি ৯৭%’এর মালিকদের উপর কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ জারী করেছে সরকার। এই অধ্যাদেশের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা ইতিমধ্যে কেন বাস্তবায়িত হয়নি তার জন্যে অর্থমন্ত্রীকে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়েছেন আশরাফ মন্ত্রী ও লতিফ এমপি। অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ক্ষোভের সাথে প্রকাশ করলেন কিছু কঠিন বাস্তবতা। তিনি জানালেন, ইউনুস ইস্যুতে গোটা দুনিয়া বাংলাদেশকে একঘরে করে ফেলেছে, বলতে গেলে আমরা এখন দ্বীপে বাস করছি। অর্থমন্ত্রীর মুখে বেফাস সত্যকথা বন্ধ করার প্রয়াসে প্রধানমন্ত্রী গর্বের সাথে জানালেন, আমরা স্বাধীন দেশ, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে।

আসলেই কি আমরা স্বাধীন? প্রধানমন্ত্রী সহ দেশীয় রাজনীতির বাকি খেলোয়াড়দের বিচারে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি ৪১ বছরেও আমরা জানতে পারিনি। ব্যক্তি ও পরিবার পূজার পসার সাজিয়ে ভক্তি করার ফাঁদ পাতার অপর নাম যদি স্বাধীনতা হয় নিশ্চয় আমরা স্বাধীন। ৪১ বছর ধরে ১৬ কোটি মানুষের প্রায় সবাইকে আটকানো গেছে এ ফাঁদে। চাইলে এ নিয়ে গর্ব করতে পারেন স্বনামধন্য রাজনীতিবিদগণ। সোনালী ব্যাংকের ৩৫০০ কোটি, ডেসটিনির হাজার হাজার কোটি, কালো বিড়ালের ৭০ লাখ, আবুল হোসেন আর মসিউরদের কোটি কোটি, নেত্রীদের বগল তলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের নিশ্চয়তার জন্যেই বোধহয় আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। বাংলাদেশে ব্যাংক থাকবে আর তা হতে রাজনীতিবিদগণ লুটতে পারবে না, এর নাম নিশ্চয় ব্যাংক নয়? স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী এসব ব্যাংক ও ব্যাংকারদের জন্যে নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়? ব্যাংক হবে তানভীর মাহমুদের জন্যে, সেতু হবে আবুল হোসেনের জন্যে, রেল হবে কালো বিড়ালের জন্যে, দল হবে পরিবারের জন্যে, দেশ হবে নেতার জন্যে, তবেই না স্বাধীনতা, তবেই না মুক্তিযুদ্ধ, তবেই না বাংলাদেশ! ৮৬ লাখ গ্রাহক আর বিলিয়ন টাকা পুঁজি নিয়ে ইউনুস মাষ্টার ৪১ বছরের বাস্তবতা মিথ্যা প্রমাণ করবেন, এমনটা মেনে নেয়া হবে রাজাকারের খাতায় নাম লেখানোর শামিল। আমরা নিশ্চয় সে পথে হাটতে যাবো না?

Comments

আবার ‘ইউনূস বধ কাব্য’, জবান খুলেছে মা’লের : ‘মুখারী’র দোকান চাই

আবদুল হাই শিকদার
পেরিয়ে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। কালের ধূলির নিচে চাপা পড়ে গেছে কত রাজ্য, রাজা, রাজধানী। বদলে গেছে মানচিত্র। পাল্টে গেছে মানুষ। তবুও মানব জাতির মহোত্তম উচ্চারণগুলোর অংশ হিসেবে আজও বিশ্বময় সমানভাবে আদৃত ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’। আমরা যাকে আরব্য রজনী বা আরব্যোপন্যাস হিসেবে জানি। হাজার এক রজনীর অনবদ্য সব গল্প দিয়ে গাঁথা এই গ্রন্থে নেই এমন জিনিস নেই।
তো এ গ্রন্থে দেখা যায়, মন্ত্রতন্ত্র আর জাদুর বলে মানুষ পরিণত হয় পশু-পাখিতে। শয়তান পরিণত হয় দরবেশে। রাজপুত্র হয়ে যায় পথের ফকির। ফকির হয়ে ওঠে রাজার পুত্র। উদ্ভট, অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর, রক্ত হিম করা কাহিনীর পাতায় পাতায় কল্পনার বিশাল বিস্তার। রূপকথা আর রূপকথা।
এসব কথা আর কাহিনীতে দেখা যায় সঙ্কটকালে গাধা, ছাগল, ঘোড়া, পাখি ইত্যাদি প্রাণীরও জবান খুলে যায়। তারা মানুষের ভাষায় কথা বলার ক্ষমতা লাভ করে।
কথা বলার এই যে অসীম ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা আবার লাভ করেছেন আমার সম্মানিত বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মা’ল আবদুল মুহিত। এর আগে বেফজুল কথা বলার জন্য তিনি তিরস্কৃত হয়েছিলেন সংসদে। টকশো ও পত্র-পত্রিকায় গালাগালের বন্যা বয়ে গেলে, প্রথমবারের মতো অনুধাবন করেছিলেন যে, তিনি সম্ভবত এদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। তারপর দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়ে জীবনে আর কখনও বেল তলায় যাবেন না শপথ গ্রহণ করে বন্ধ করেছিলেন তার জবান। ফলে জাতি রেহাই পেয়েছিল জান ঝালাপালা হওয়ার হাত থেকে।
কিন্তু আল্লাহর লীলা বোঝা ভার। আল্লাহর অসীম কুদরতেই হোক আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃপালাভের জন্যই হোক, অতি অলৌকিকভাবে তিনি আবার তার আগের জবান ফিরে পেয়েছেন। জবান ফিরে পেয়েই তিনি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। এবার তার জবানপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তিনি লাভ করেছেন অন্তর্দৃষ্টি। অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা যে কোনো ব্যক্তিকে খ্রিস্টানরা বলে সেন্ট, হিন্দুরা বলে স্বামী, বৌদ্ধরা বলে নির্বাণপ্রাপ্ত মহাথেরো। আর মুসলমানদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আল্লাহর ওলি বা দরবেশ। তবে আমাদের মন্ত্রী মহোদয় কোন কাতারের দরবেশ বা তিনি কোন তরিকার ওলি, তা এখনও খোলাসা করে বলেননি। তবে ধারণা করা যায়, তিনি ‘মুজিবীয় তরিকার’ একজন জবরদস্ত কামেল।
এই অন্তর্দৃষ্টি লাভ এবং জবান খুলে যাওয়ার কারণেই তার কথার ধার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শব্দ দূষণ পরিমাপ যন্ত্রের হিসেবে তা কত ডেসিবল, বলতে পারব না। তবে তিনি যেসব ‘অমৃত বাণী’ জবান দ্বারা নির্গত করেছেন, তার সারাংশ হলো—বাংলাদেশের একমাত্র সমস্যা হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি দেশে বিদেশি বিনিয়োগে একমাত্র বাধা। আমাদের বিনিয়োগ যে তেমন বাড়েনি, সরাসরি বিনিয়োগও যে কমে গেছে তার জন্য একমাত্র দায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিদেশে তার মিথ্যা প্রচারণার কারণে দেশে বিনিয়োগ আসছে না। বিনিয়োগের অভাবে আমরা মরে যাচ্ছি।
অর্থমন্ত্রী আবুল মা’ল যখন কথার মাধ্যমে এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন, কাণ্ডজ্ঞানহীন, ঘৃণা ও বিদ্বেষপ্রসূত গু-গোবর উগড়াচ্ছিলেন, সে সময় সুদূর ভিয়েনার এক সেমিনারে স্পেনের রানী সোফিয়াকে পাশে নিয়ে, বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী, বিশ্বনন্দিত সোশ্যাল বিজনেস তত্ত্বের উদ্ভাবক ও প্রয়োগকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলছিলেন—সন্ত্রাস ও সংঘাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে শান্তির ঠিকানায় পরিণত করতে হলে অবশ্যই দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাতে হবে।
আমাদের দেশের এসব গলিত-দূষিত ‘মালামালের’ সঙ্গে প্রফেসর ইউনূসের পার্থক্য বোঝার জন্য মহাপণ্ডিত বা গবেষক হওয়ার দরকার নেই। দুটো বক্তৃতা পাশাপাশি রাখলেই হবে। বাংলাদেশের সীমা পার হয়ে তিনি যখন দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য চারণের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বময়, সেই সময় বাংলাদেশের ‘তুই চোর’গুলো নিজেদের পাপ ও ব্যর্থতার দায়ভার এই মানুষটির ওপর চাপিয়ে সাধু সাজার হাস্যকর কসরত করছেন। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে। সূর্যের সঙ্গে শত্রুতা করে অন্ধকারের পেঁচা! এ যেন ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর’।
আবুল মা’লকে ‘বাংলিশ’ ভাষা আবিষ্কারের জন্য এর আগে অভিনন্দিত করেছিলাম আমি। সেই সময় তার কবরের এফিটাফের একটা নমুনাও পেশ করেছিলাম। তিনি সে সময় যেসব বাণী ঝাড়তেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—‘আই অ্যাম একদম ফেড-আপ’, ‘ননসেন্স’, ‘শেয়ারবাজার ফটকাবাজার’, ‘লগ্নিকারীরা জুয়াড়ি’, হিলারি-ইউনূস ‘রাবিশ’, ‘চার হাজার কোটি টাকা কেলেঙ্কারি এমন কিছুই নয়’ ইত্যাদি।
৩৩ লাখ লগ্নিকারীকে পথে বসিয়ে শেয়ারবাজারকে মতিঝিলে দাফন করেও তার খাসলত বদলায়নি। তিনি যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক হতেন তাহলে তাকে প্রশ্ন করা যেত, যে বিনিয়োগের অভাবে মরছেন, তার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কাজটি করেছেন?
কোনো ব্যক্তি কি একটা সরকার বা রাষ্ট্রের চেয়েও ক্ষমতাধর হতে পারে? বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা কি সরকারের আদৌ ছিল? চুরি, লুটপাট, দুর্নীতি করে নিজেরাও ডুবেছে দেশকেও ডুবিয়েছে এই সরকার, দায়দায়িত্ব কার? দাতারা এই সরকারকে বিশ্বাস করে না। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে কার দোষে? নির্দিষ্ট সময়ে অনুমতি দেয়া, কারখানা স্থাপন ও উত্পাদনে যাওয়ার অনুকূল ব্যবস্থা কি দেশে এখন আছে? ঘুষ ছাড়া কি অন্য কোনো খাদ্য বর্তমান সরকার খায়? গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে বিনিয়োগ চাওয়া কোন জাতীয় রসিকতা? বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের দায়িত্ব কি ড. ইউনূসের? শেয়ারবাজার ধ্বংস করার নায়ক কে? সোনালী ব্যাংক-হলমার্ক কেলেঙ্কারিও কি ড. ইউনূসের? প্রতিদিন গুম, খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি কি ড. ইউনূসের কাজ? পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি কার কীর্তি? বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি কাদের দ্বারা হচ্ছে? যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের আওতায় কোনো বৈঠক হচ্ছে না কেন? জনশক্তি খাতে যে বন্ধ্যত্ব সেটা কার দোষে? কোনো দেশের সঙ্গেই নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে না কেন? দাতাদের সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে দেশকে ভারতমুখী করে বন্ধুহীন করা কার কাজ? বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী কেন্দ্রের নাম বদলিয়ে চীনের সঙ্গে গণ্ডগোল পাকিয়েছে কে? বাংলাদেশ মৌলবাদী দেশ, জঙ্গিবাদী দেশ—এসব প্রচারণা বিশ্বময় কে করেছে? সব কাজ শিকায় তুলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে মেতে থাকছে কারা? এলজিইডিকে দুর্নীতির খনি বানিয়েছে কারা? বস্তাভর্তি টাকাসহ ধরা পড়া কালো বিড়াল সুরঞ্জিতের বিচার কি হয়েছে? দীলিপ বড়ুয়ার এক ডজন প্লট কোত্থেকে এলো? লতিফ বিশ্বাসের ৭ তলা রংমহল কি ড. ইউনূস বানিয়ে দিয়েছেন? শিক্ষাঙ্গনকে ধ্বংস করছে কে?
দুর্নীতির পঞ্চপাণ্ডব আবুল হোসেন, ফারুক খান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মসিউর রহমান ও সৈয়দ মোদাচ্ছের কি ড. ইউনূসের সহচর? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কার সৃষ্টি? দীপু মনির কাজে-অকাজে ১০০টি বিদেশ সফর কেন? তিনি কি ড. ইউনূসের ‘ওয়ান্ডারফুল পাবলিসিটি মেশিনারি’র সঙ্গে পেরে উঠছেন না? নৌমন্ত্রী ও দিলীপ বড়ুয়ার অর্ধশত বার বিদেশ সফরও তাহলে ব্যর্থ? রেন্টাল-কুইক রেন্টাল খাতে লুটপাটের নায়ক কারা? চোরা আবুলকে ‘দেশপ্রেমিক’ বানিয়েছে কে? বিশ্বব্যাংককে বাপ-মা তুলে গালাগালি কে করেছে? এসব প্রশ্নের মতো হাজার প্রশ্ন সর্বত্র। বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও কুশাসনের দেশ হিসেবে সর্বত্র পরিচিত করিয়ে, নিজেদের হাড়-হাড্ডি আর চামড়া বাঁচানোর জন্য এখন ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাচ্ছেন প্রফেসর ইউনূসকে? বড়ই মোটা দাগের জোকস এটা। নাচতে না জানলে যে উঠান বাঁকা হয়ে যায়, একথা সবাই জানে। তো সবকিছুই যদি ড. ইউনূসের কাজ তাহলে আপনাদের মতো ‘অপদার্থ’রা ক্ষমতা আগলে বসে আছেন কেন? এবার জাতির রক্ত-মাংস খাওয়ার বদলে দয়া করে ঘাড় থেকে নামুন। আমরা একটু দম নেই।
দুই.
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপস্থাপন করে যে ফায়দা বাংলাদেশ ঘরে তুলতে পারতো, তার উল্টো কাজই করেছে আমাদের সরকার। তারপর দিচ্ছে জঘন্য সব অপবাদ। এরই মধ্যে দেশে এবং দেশের বাইরে প্রফেসর ইউনূসের ইমেজের বারোটা বাজানোর জন্য এই সরকার পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নির্বিচারে ব্যবহার করেছে। এই বিশ্বের তাবত্ দেশের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বস্তা বস্তা পত্র প্রেরণ করে জানিয়েছে—লোকটি খুবই খারাপ। তিনি সুদখোর। গ্রামীণ ব্যাংকটা তিনি কুক্ষিগত করে রাখতে চেয়েছিলেন। আল্লাহর রহমতে শেখ হাসিনার সরকার তার খপ্পর থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে রক্ষা করেছে! তাছাড়া তাকে তো ঘরছাড়া করেছে আদালত! আর আমাদের আদালত তো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য মশহুর! সে জন্য এই লোকটির সঙ্গে কোনো কাজ-কারবার করবেন না কেউ।
তারপরও এই মানুষটি দেশের জন্য আরও কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ইউনূস সেন্টারের কথা শোনা যাক : “একজন নাগরিকের প্রভাব থাকলে তা খাটানোর কাজে সরকারের একটা ভূমিকা দরকার হয়। সরকারের রায় থেকে সেই নাগরিককে এই দায়িত্ব অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও দিতে হয়। দু’দিকের সরকারকে বুঝতে হবে যে, সেই নাগরিকের সঙ্গে কথা বললে তিনি সেকথা অন্য দিকের সরকারকে জানাতে পারবেন এবং তারা সেটা বিবেচনা করবেন; নাগরিক শুধু তার প্রভাব খাটিয়ে আলোচনাকে সহজ করে দিচ্ছেন মাত্র। তখন যে কোনো আলোচনা অগ্রসর হতে পারে। প্রফেসর ইউনূসের বর্তমান পরিস্থিতি সেরকম নয়। বর্তমান যুগের শক্তিশালী মিডিয়ার কারণে সব দেশের সরকার জেনে গেছে, প্রফেসর ইউনূস বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনেকটা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। তাছাড়া সেটা তারা চাক্ষুষ দেখেনও। প্রফেসর ইউনূসের সম্মানে যখন কোনো একটি দেশে একটি অনুষ্ঠান হয় সেখানে সে দেশের মন্ত্রীরা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা আমন্ত্রিত হন; অনেকে আগ্রহ সহকারে উপস্থিত হন। কিন্তু একশ’ ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অনুপস্থিত থাকেন। সবাই জানতে চায়, যে দেশের একজন বিশিষ্ট মানুষের সম্মানে অনুষ্ঠান, সে দেশের রাষ্ট্রদূতের তো সেখানে গৌরবের সঙ্গে উপস্থিত থাকার কথা, অথচ তিনি অনুপস্থিত কেন? অবশ্য কারণ বুঝতে কারও কষ্ট হয় না। তাদের ধারণাটি আরও বদ্ধমূল হয় যে, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে প্রফেসর ইউনূসের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।
প্রফেসর ইউনূস একটা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিন বছর আগে। তার নাম গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস। প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। বিভিন্ন দেশের কোম্পানি সরাসরি এর মাধ্যমে জনশক্তি আমদানির জন্য তার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কয়েকটি কোম্পানি অগ্রিম চাহিদাও দিয়ে রেখেছিল। সেসব দেশের সরকারও এই উদ্যোগে উত্সাহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত আমাদের সরকারের কাছ থেকে এ কাজ শুরু করার অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তাই এই কোম্পানির কার্যক্রম কোনোদিন আর শুরু করা যায়নি। অটোমেকানিক, অটো-ইঞ্জিনয়ারিং প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য জাপানি একটা কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ খোলার ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। সে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে কিনা, এখনও বলা মুশকিল। প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার জন্য জার্মানির একটা বিখ্যাত কোম্পানি ২০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করার সব প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল, তারা হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন।
তিন বছর আগে সৌদি রাজপরিবারের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য প্রিন্স তালাল বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি লেখেন যে, তিনি তার প্রতিষ্ঠান ‘আরব গালফ ফান্ডের’ বাত্সরিক পুরস্কার বিতরণী সভাটি বাংলাদেশে করতে চান। তাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে আরব দেশগুলোর সংবাদ মাধ্যম উপস্থিত থাকবে। তিনি নিজে এবং আরব দেশগুলোর অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তি এখানে উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করার জন্য তিনি আমন্ত্রণ করেন এবং অনুষ্ঠানের সামগ্রিক অনুষ্ঠানসূচি বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দেন। প্রিন্স তালাল প্রফেসর ইউনূসের দীর্ঘদিনের বন্ধু। আরব গালফ ফান্ডের মাধ্যমে তিনি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুকরণে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ সরকার থেকে জানানো হয় যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সানন্দে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, তবে তার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশী বক্তৃতা করতে পারবেন না। এই জবাবে প্রিন্স তালাল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি প্রফেসর ইউনূসকে জানান, প্রফেসর ইউনূসকে সম্মান জানানোর জন্যই এই সমগ্র অনুষ্ঠানটি তিনি বাংলাদেশে করতে চেয়েছিলেন। যদি প্রফেসর ইউনূস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে না পারেন তাহলে তিনি বাংলাদেশে এই অনুষ্ঠান করবেন না। তিনি এই অনুষ্ঠান কুয়ালালামপুরে নিয়ে যান। পহেলা ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে প্রিন্স তালাল এবং আরব বিশ্বের অন্যান্য গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে এ অনুষ্ঠান কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সব আতিথেয়তা দেখিয়ে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অতিরিক্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নাজিব প্রফেসর ইউনূসকে সম্মানিত করেন। প্রধানমন্ত্রী নাজিবের পরিবারের সঙ্গে প্রফেসর ইউনূসের অনেক আগের সম্পর্ক। ১৯৯৪ সালে তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রফেসর ইউনূসকে ‘তুন আবদুর রাজ্জাক পুরস্কার’ দেয়া হয়েছিল। তার বাবার স্মৃতিতে এই পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রফেসর ইউনূস নিশ্চয়ই আনন্দিত হবেন যদি তার কোনো ভূমিকা দেশের কোনো সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু তাকে কাজে লাগাতে হবে তো।”—প্রফেসর ইউনূসকে কাজে লাগানোর লোক কি বর্তমান সরকারে আছে? কার ঘাড়ের ওপর কয়টি মাথা!
তিন.
ছোটবেলায় গান শুনতাম, ‘থাকিলে ডোবা নালা/হবে কচুরীপানা/স্বভাব তো কখনো যাবে না।’ সেই গানের মতোই প্রবাদ বাক্য কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। গ্রাম দেশে বলে চোরের মায়ের বড় গলা। চাষীদের কথা, যে গরু গু খাওয়া শিখে যায় তাকে আর ওই কর্ম থেকে বিরত রাখা যায় না। এজন্যই আগের দিনের মুরুব্বিরা বলতেন, কেউ যদি বলে হিমালয় পর্বত এক মাইল সরে গেছে, এটা বিশ্বাস করা যায়। কারণ বিষয়টি প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক। কিন্তু কেউ যদি দাবি করে আমার স্বভাব বদলে গেছে, তা বিশ্বাস করা উচিত নয়।
এই স্বভাব সংক্রান্ত আমার নিজের দেখা একটা গল্প বলছি। ছোট বেলাকার কথা। আমাদের গরুর পাল দেখাশোনার জন্য কয়েকজন রাখাল ছিল। এর মধ্যে একজন ছিল একটু বয়স্ক। চুপচাপ স্বভাবের কিন্তু কর্মঠ। একবার সব রাখাল ওর বিরুদ্ধে নালিশ করলো যে অমাবস্যার রাতে ও যেন কোথায় চলে যায়? লাগানো হলো গোয়েন্দা। দেখা গেল ও শুকনো বিলের মাঝখানে গিয়ে মাটি খুঁড়ছে। এভাবে ভোরের আজান পর্যন্ত। তারপর বাড়ি ফিরলো। সবাই ধরে ফেললো। অনেক জোরাজুরির পর বললো, যুবক বয়সে সে ছিল একজন সিঁধেল চোর। পরে পীরের নির্দেশে সে কর্ম ত্যাগ করে। কিন্তু কৃষ্ণপক্ষে ওর ওই পুরনো অভ্যাসটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কী করা! আবার পীরের শরণাপন্ন। পীর বললো, ওমন হলে দূরে কোনো নির্জন স্থানে গিয়ে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করো। তাতে একদিন হয়তো নেশাটাও যাবে, আর কায়িক পরিশ্রমের কারণে ঘুমও ভালো হবে। এছাড়া তওবা করবে সব সময়। এতে তার অনেক উপকার হয়েছে। সেজন্যই প্রতি অমাবস্যার রাতে সে এই কর্ম করে।
আওয়ামী লীগ এবং তাদের মন্ত্রীরা অনেক জ্বালিয়েছে শেখ মুজিবকে। রাগে-ক্ষোভে তিনি এদের চোরের দল, চাটার দল বলে গালমন্দ করতেন। এদের মানুষ করার জন্য খান আতাকে দিয়ে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবি বানিয়েছিলেন। তারপরও আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের স্বভাব বদলায়নি। বদলায়নি বলেই এরা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির তুফান ছুটিয়ে দেয়। আর এই দুর্নীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়িয়ে ফেলে চোয়ালের জোর। চোয়ালবাজিতে এদের সঙ্গে পেরে ওঠার সাধ্য কারও নেই। এরা দুর্নীতিতেও চাম্পিয়ন, চোয়ালবাজিতেও এক নম্বর। চুরি করবে কিন্তু সাধু সেজে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দেবে মঞ্চে। আর ব্যর্থতার সব দায় চাপাবে অন্যের ঘাড়ে। এবার তারা ঘাড় হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রফেসর ইউনূসকে।
চার.
আওরঙ্গজেব। দিল্লির সম্রাট নন। আমার বাঁধা রিকশাওয়ালা। এবার ঈদে সে আমাকে গরুর মাংস কাটার ফাঁকে ফাঁকে অনেক জ্ঞান দিয়েছে। বলে—ভাইজান, আপনি এলেমদার মানুষ। দুইডা কথা কইলে কি বেজার অইবেন?
বললাম, না।
আওরঙ্গজেব বললো, আমাগো গেরাম দেশে ঘোড়ার মুখে লাগাম পরানো অয়। লাগাম না দিলে ঘোড়ার পিঠে উঠতেই পারবেন না। গরুর জন্যও ব্যবস্থা আছে। গরুর পাল নিয়া আমরা যখন ধানের ক্ষেতের কিনার দিয়া যাই, গরু হালা ক্ষেতে মুখ দিবই। তো আমরা করি কি, যাওয়ার আগেই গরুর মুখে ‘মুখারী’ পরাইয়া নেই। মুখারী পরানো থাকলে হাজার ‘চুদুরবুদুর’ করলেও গরু আর ধান গাছ খাইতে পারে না।
বললাম, তা তুমি আমাকে কী বলতে চাচ্ছ?
আওরঙ্গজেব বললো, তেমন কিছু না ভাইজান। কথা অইলো, আগে গেরামে ছিলাম ভালোই আছিলাম। এখন শহরে থাকি। রেডিও-টেলিভিশন দেহি। ওই সব বাক্সে আমাগো দেশের নেতা, মন্ত্রী সাবরা যা সব কথা কয় হুইনা আমার শরীলডা জ্বইলা যায়?
বললাম, শরীর যদি জ্বলেও যায় তোমার তো কিছু করার নেই।
আওরঙ্গজেব নির্বিকার, না ভাইজান, আমাগো কিছু করণের নাই কথাডা ঠিক। তয় আপনাগো কিছু করণের আছে?
বললাম, কী করার আছে বল।
বললো, ভাইজান, আপনে মুখারী বেচার একটা দোকান খুলেন।
আমি অবাক, মুখারী বিক্রির দোকান খুলবো আমি? কেন?
আওরঙ্গজেব ঠাণ্ডা গলায় বললো, ভাইজান আমি আপনেরে লাগাম বেচার কথাই কইতাম। কিন্তু লাগাম পরানোর কামডা একটু কঠিন। প্রথমত লোহা লাগে। তারপর আবার নাক ছিদ্র করতে হয়, বহুত হাঙ্গামা। কিন্তু মুখারীতে কোনো হাঙ্গামা নাই। মুখারীতে খরচও কম। লাগে খালি বাঁশ আর দড়ি। পট কইরা মুখে বাইন্ধা দিলেই অয়। আমি কইতাছি ভাইজান, ভালো ব্যবসা অইব। মুখারী আমি দেশ থাইকা আইনা আইনা আপনারে দিমু। আপনি খালি বইয়া বইয়া বেচবেন। আপনেও একটা ভালা কাম পাইলেন, আমিও দুইডা পয়সা পামু।
বললাম, তা তোমার ওই মুখারী কে কিনবে?
আওরঙ্গজেবের গলায় প্রত্যয়, কি কন ভাইজান। কেনার জন্য দোকানের সামনে লাইন পড়বো। আমার কথাটা বিশ্বাস করেন, চারিদিকের অবস্থা দেইখা মানুষ খেইপা গনগনা চুলা অইয়া রইছে। দোকান খুললেই টের পাইবেন।
বললাম, সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাকে বল, তোমার ওই মুখারী দিয়ে শহরের মানুষ করবে কী?
নতুন আবিষ্কারের আনন্দ আওরঙ্গজেবের চোখে-মুখে, বলেন কি ভাইজান। কি করবে মানে? আমাগো নেতারা এবং মন্ত্রী সাবরা যেসব আলতু-ফালতু কথাবার্তা কন, সেসব হুইনা সবাই রাইগা টং। কিন্তু কথা হইল তেনারা সম্মানিত মানুষ। তাগো তো নাক ছিদ্র কইরা লাগাম পরান যায় না। তাদের জন্য সহজ মুখারীর ব্যবস্থা। আদাব সালাম দিয়া আমরা বেবাগে মিলা তাগো মুখে মুখারী পরাইয়া দিমু। ব্যস। তাগো মুখ বন্ধ। লগে লগে না-হক কথাও বন্ধ। দেশের মানুষও বাঁচবো তাগোর কথার অত্যাচার থাইকা। বিদেশেও দেখবেন আমাগো নামডাক অইবো। আল্লায় যদি রহম করে, আফ্রিকা আর আরব দেশগুলোতেও আমরা মুখারী বেইচা ডলার কামাইতে পারমু। হা, হা, হা। ঠিক কই নাই ভাইজান?
আওরঙ্গজেবের চোখে খেলতে থাকে দুঃসাহসী নতুন স্বপ্নের ঢেউ। আর গুম হয়ে বসে রইলাম আমি।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

‘ড. ইউনূস একমাত্র সমস্যা’

‘ড. ইউনূস একমাত্র সমস্যা’
শুক্রবার, ০৯ নভেম্বর ২০১২

স্টাফ রিপোর্টার: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কথার মধ্যে কোন সততা নেই। তিনি আমাদের দেশের ব্যাপারে দেশে-বিদেশে অসত্য বলে বেড়াচ্ছেন। তিনিই আমাদের একমাত্র সমস্যা। কারণ, ইউনূসের কারণে আমাদের বিনিয়োগ কমে গেছে। আমরা বিনিয়োগের অভাবে মরে যাচ্ছি। গতকাল সকালে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) মূল্যায়ন সভা শেষে এনইসি মিলনায়তনে সাংবাদিকদের কাছে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পরিকল্পনা কমিশনে এ সভা হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, এ দেশে এত ভাল কাজ হচ্ছে, এটা পৃথিবীর কোথাও প্রাধান্য পায় না। এর একমাত্র কারণ ইউনূস। কলামনিস্ট স্বদেশ রায়ের একটি লেখায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কথা উদ্ধৃত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অমর্ত্য সেন বলেছেন, এখানে এত কিছু হচ্ছে, কিন্তু কোথাও তা প্রাধান্য পায় না। অমর্ত্য সেনের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তুলনা করে মুহিত বলেন, উনি বলেন গ্রামীণ ব্যাংক ওনার প্রতিষ্ঠান। এটা কোনমতেই তিনি ছাড়বেন না। এটিই হলো সমস্যা। একজন ব্যক্তি দেশের জন্য কিভাবে এত বড়ো সমস্যা হতে পারেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, হি (ইউনূস) হ্যাজ এ ওয়ান্ডারফুল পাবলিসিটি মেশিনারি। উনি যেসব কথা বলেন, তার মধ্যে পুরোপুরি সত্যতা নেই। বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ হচ্ছে না- এখন যেখানে বিরাট পরিবর্তন এসেছে- বলা হচ্ছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে, অথচ গত চার বছর ইকোনমিস্টের উদ্দেশ্যই ছিল এ সরকারকে হেয় করা। তিনি বলেন, আমাদের বিনিয়োগ বাড়েনি, এফডিআই হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? আমাদের সম্পদ কম, বহু ভোগান্তি, ছোট ছোট ঘুষ...। বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে অপপ্রচারের ভূমিকা রয়েছে দাবি করে মুহিত বলেন, সেখানেও একটা বিরাট পরিবর্তন হলো ইকোনমিস্ট। গত চার বছরে তাদের লক্ষ্য ছিল, আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করা। তিনি বলেন, সরকার চায়, ইউনূস গ্রামীণব্যাংক থেকে সরে যান। কিন্তু তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকারের সভাপতিত্বে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এস এ সামাদসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা।

‘নো রিভেঞ্জ, পিস পিস’ স্লোগানে মুখর নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক :

Photobucket বিভিন্ন ইস্যুতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন হয়রানির শিকার তখন ১৫ হাজারের বেশি আমেরিকানের এক সমাবেশে দারিদ্র্য বিজয়ের স্বপ্ন দেখালেন তিনি। গ্লোবাল প্রভার্টি প্রজেক্ট নামের একটি সংগঠনের বার্ষিক কনসার্টে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সিটির বিখ্যাত সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠিত হয় এ কনসার্ট। এতে অন্যান্যের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ স্যার জ্যাফরি সেকস, সংগঠনের কর্মকর্তা মাইকেল ট্রেইনার, ঊর্মি বসুসহ যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্ব বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ড. ইউনূসের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজারও আমেরিকান গ্রামীণ ও ড. ইউনূসের পক্ষে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে সেন্ট্রাল পার্ক। অনুষ্ঠানে ড. মোহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের দারিদ্র্যপীড়িত নারী সমাজের পক্ষ থেকে আমেরিকানদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আমরা সবাই চাইলে দারিদ্র্যকে বিজয় করতে পারি। সমাজে নয়, এটাকে পাঠাতে হবে জাদুঘরে।

তিনি বলেন, অভাবী মানুষ দারিদ্র্য সৃষ্টি করেনি। এটাকে বিতাড়িত করতে সমাজকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজকের তরুণরাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর। তারা চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এজন্য সৃষ্টি ও সৃজনশীলতা নিয়ে তরুণদের দারিদ্র্য বিমোচনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। ড. ইউনূস বলেন, চাইলে আমরা পারি। ইতিহাসের অমোঘ বিধানের চেতনায় দারিদ্র্যকে বিদায় করতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
ড. ইউনূসের বক্তব্যের সময় উপস্থিত আমেরিকানদের অনেকেই ‘নো রিভেঞ্জ, পিস পিস স্লোগানে মুখরিত করে তোলে নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্কের আশপাশ।

ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নন স্রেফ কর্মচারী

ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নন স্রেফ কর্মচারী : রাষ্ট্রদূতদের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোপন

ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকে স্রেফ একজন পাবলিক সার্ভেন্ট বা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকায় গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো লাভ হয়নি; বরং অনেক ক্ষতি হয়েছে। তিনি ব্যাংকে সময় না দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রচার ও প্রসারের জন্য বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর থেকে পাঠানো এক গোপন প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত ২০ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির দফতরের পরিচালক আন্দালিব ইলিয়াস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে এই প্রতিবেদন পাঠান। তিনি তার ই-মেইল বার্তায় রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে এই নোট পাঠানো হলো। হোস্ট কান্ট্রির কর্মকর্তাসহ অন্যান্য বিদেশি মিশন এবং সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছে এই নোট তুলে ধরার জন্য অনুরোধ জানানো হলো। গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান এই নোটের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের পর ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপে পড়েছে সরকার। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি অব্যাহতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। পাল্টা জবাব হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রচারণা শুরু করা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর থেকে পাঠানো এই প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণের পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকার গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির রিপোর্ট, উচ্চ আদালতের রায় এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বেশকিছু কর্মকর্তার লেখা চিঠিসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক একটি সংবিধিবদ্ধ ব্যাংক। গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সরকার/বাংলাদেশ ব্যাংক। এটা কোনো ব্যক্তিমালিকানার ব্যাংক নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয় : “Professor Yunus is not the founder of Grameen Bank. Professor Yunus is a public servant plain and simple.” সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যে চাকরির বয়সসীমা তা ড. ইউনূসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি হাইকোর্টে যে আবেদন করেছিলেন, সেখানে তিনি নিজের পেশাকে গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রফেসর ইউনূসকে একজন নিয়মিত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল তার কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নির্বাচিত হননি, তাকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল একজন নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তার মর্যাদায়। “Professor Yunus is a ‘public officer’, ‘public employee’, ‘public servant’, under the constitution.” তাকে জানানো হয়েছিল, তার বয়স পার হয়ে গেছে। তার দায়িত্বে থাকার কোনো অধিকার নেই। সুতরাং ড. ইউনূসের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে এটা বলা যাবে না। এছাড়া তিনি নিজের ইচ্ছায় আদালতে গিয়েছিলেন এবং হেরেছেন।প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রফেসর ইউনূস খুব ভালো করেই জানতেন তার চাকরির বয়সসীমা পার হয়ে গেছে এবং ২০০০ সালের পর তার দায়িত্বে থাকার কোনো অধিকার নেই।

বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া প্রফেসর ইউনূসের চাকরির মেয়াদ নির্ধারণ করার কোনো এখতিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকায় ব্যাংকের কোনো লাভ হয়নি বলে গ্রামীণ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে গোপন এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্কট নিরসনে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। ব্যাংকে সময় না দিয়ে বছরে তিনি গড়ে ১৩০ দিন বিদেশে কাটিয়েছেন। ক্ষমতা এবং দায়িত্ব হস্তান্তরে প্রফেসর ইউনূসের অপারগতা গ্রামীণ ব্যাংককে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একের পর এক বিদেশ সফরে প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত প্রচার ও প্রসার হয়েছে; কিন্তু ব্যাংকের কোনো লাভ হয়নি বরং ক্ষতি হয়েছে। প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত খ্যাতি এবং প্রতিপত্তি এমন এক পর্যায়ে গেছে, যার ফলে তিনি জবাবদিহিতার অনেক উপরে অবস্থান করেছেন। ফলে সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার মুখে পড়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বঞ্চনার শিকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2012/09/22/165023

উপদেষ্টা ছাড়াও প্রভাবশালী পরিচালকরা জড়িত

আড়াই বছর আগে সোনালী ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ পরিকল্পনার সঙ্গে শুধু সরকারের একজন উপদেষ্টাই নন, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকতাসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। চক্রটি এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান করছিল যার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে তা হাতিয়ে নেয়া যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী হলমার্ককে সঙ্গে নেয়া হয়। এলসি ঋণের নামে এ প্রতিষ্ঠানসহ আরও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণের জন্য আবেদন করা হয়। ব্যাংকের শাখা হিসেবে বেছে নেয়া হয় সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা হোটেল শাখা। কেননা, ওই শাখার ম্যানেজারের বাড়ি গোপালগঞ্জ। এছাড়া উপদেষ্টার সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্যাংকটির ওই শাখার মাধ্যমেই অর্থ বের করে নেয়ার সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা করে চক্রটি। যার সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক এমডি হুমায়ুন কবিরসহ ৪০ থেকে ৫০ জন বিভিন্ন স্তরের ব্যাংক কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মাসের তদন্তে এমনই স্পর্শকাতর তথ্য বের হয়ে এসেছে। সোনালী ব্যাংকের একজন পরিচালকও (যিনি কয়েকদিন আগে বাদ পড়েছেন) জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি অংকের টাকা বের করে নেয়ার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। এ টাকা বের করতে ৩১টি পাজেরো ভি সিক্স গাড়িও ঘুষ দিয়েছে হলমার্ক। কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি এ গাড়িসুবিধা নিয়েছে তার রহস্য বের করারও চেষ্টা চলছে।
এদিকে দুদকের তদন্তে ব্যাংকের টাকা লুটের সঙ্গে জড়িতদের মুখোশও উšে§াচিত হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। হলমার্কের ঘটনায় কত লোকের বিরুদ্ধে মামলা হবে এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, আসামির সংখ্যা শতাধিকও হতে পারে। হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদসহ ঘটনার আড়ালে অনেক রাঘব-বোয়ালও আসামির তালিকায় পড়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনার ছক তৈরি করেই সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্কের নামে বের করে নেয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ঋণ নেয়ার আগে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন প্রভাবশালীরা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, আমলা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীরাও জড়িয়েছেন এ প্রক্রিয়ায়। এর মধ্যে কে কত পাবেন সেসব ভাগ-বাটোয়ারার হিসাব নিকাশও করা হয়েছিল অনেক আগেই। ২০১০ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল অর্থ লুটের কারসাজি, যার বাস্তবায়ন ঘটে নানা ধাপে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার না মেনে এবং কোন ধরনের ব্যাংকিং নিয়মনীতি না মেনে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া শুধু ভাউচারের মাধ্যমে সরকারের প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় ঘটেছিল ঋণের নামে ব্যাংক লুটের এ নজিরবিহীন ঘটনা। জানা গেছে, সচিবালয়ে পেশাদার এক তদবিরবাজের পরামর্শে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিতে বেছে নেয়া হয় সোনালী ব্যাংকের নিরিবিলি শাখা হিসেবে পরিচিত হোটেল রূপসী বাংলার করপোরেট শাখাকে। রূপসী বাংলা শাখার ম্যানেজারের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় সেটিকেও সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় তানভীর। সোনালী ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডিকে হাত করে ব্যাংকের অর্থ লুটপাটে গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী চক্র। সোনালী ব্যাংকে অখ্যাত কোম্পানি হলমার্কের ঋণ কেলেংকারির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এমন স্পর্শকাতর তথ্য পাচ্ছে দুদক।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংকের তৎকালীন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের (আইটিএফডি) মহাব্যবস্থাপক মাশরুল হুদা সিরাজীর বক্তব্যেও হলমার্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। হলমার্কের ঋণ কেলেংকারির বিষয় অডিট করতে গিয়ে সরকারের একজন উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির রোষানলে পড়েছিলেন সিরাজী। যার জন্য ৬ মাসের ব্যবধানে তাকে তিনবার বদলিও করা হয়।
সূত্র জানায়, হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদকে প্রায়ই দেখা যেত সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে। বৈঠক করতেন কর্তাদের সঙ্গে। উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথাও জানতেন ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। অর্থ কেলেংকারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে আসা পরিচালক কাশেম হুমায়ুনও মনে করেন, এত বড় অংকের অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নিতে অবশ্যই শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট অনেক আগে থেকে পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খুব সহজেই কোন কোম্পানি যে কোন ব্যাংক থেকে বের করে নিতে পারে না। তিনি যুগান্তরকে জানান, হলমার্কসহ এর সহযোগী কোম্পানিগুলো যেসব পণ্যের এলসি খুলে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে সেসব পণ্য আসেনি। তিনি দাবি করেন, এত বড় অর্থ কেলেংকারির ঘটনা তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি। সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ফেব্র“য়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে হলমার্কের নামে সর্বাধিক ঋণ নেয়া হয়। এ সময়ে ব্যাংকটির যারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা কোন ব্যবস্থা নেননি, নির্লিপ্ত থেকেছেন। ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হলমার্ক থেকে সুবিধা নেয়ার ইঙ্গিত করা হয়েছে। ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে যখন হলমার্ক টাকা বের করে নিচ্ছিল, তখন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন হুমায়ুন কবির।
মাশরুল হুদা সিরাজী জানান, হলমার্কের অর্থ কেলেংকারি অডিট না করতে রাজনৈতিকভাবে চাপ দেয়া হয় তাকে। শুধু তাই নয়, হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদের পক্ষ হয়ে ব্যাংকের ভেতর থেকেও তার কাজে চরমভাবে বাধা দেয়া হয়। ব্যাংকটির সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির তাকে সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় থেকে কুমিল্লায় বদলি করে দেন। সেখানেও শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়নি তাকে। বদলির কয়েক দিনের মাথায় দ্বিতীয় দফায় সরানো হয় সিলেটে। সেখান থেকে রংপুরে। তিনিও মনে করেন, এ অর্থ নেয়ার পরিকল্পনা একদিনে হয়নি।
সূত্র জানায়, হলমার্কের অর্থ বের করে নেয়ার ঘটনাটি ঘটেছে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের যোগসাজশেই। কারণ ওই শাখায় মার্চ মাসে আমানতের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০৯ কোটি টাকা, আর এপ্রিলে ছিল ৬৫৬ কোটি টাকা। কিন্তু হলমার্ককেই দেয়া হয় এর প্রায় পাঁচ গুণ বেশি অর্থ। অর্থাৎ অন্য শাখা থেকে এনে প্রধান কার্যালয়কে এ অর্থ জোগান দিতে হয়েছে। এ কাজ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনুমোদন ছাড়া কোনভাবেই হওয়ার সুযোগ ছিল না বলে মনে করেন দুদকের কর্মকর্তারাও। দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ব্যাংকের অর্থ লুটের সঙ্গে যত বড় শক্তিশালী হাতই জড়িত থাক না কেন, তদন্তে প্রমাণ পেলে মামলা হবে। আমরা কারও প্রভাবে তদন্ত থেকে সরে আসব না। সঠিকভাবে তদন্ত পরিচালনার জন্য ৬ সদস্যের তদন্ত টিমকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ফন্দিফিকির করে ব্যাংক থেকে যেভাবে টাকা বের করে নেয় চক্রটি : দুদক জানায়, ব্যাংক থেকে হলমার্কের নেয়া ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও চলতি মূলধন জাতীয় ঋণও আছে। তবে এ অর্থের ৯০ ভাগই অপর কয়েকটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলে বের করে নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ মার্চ হলমার্ক গ্র“প হোটেল রূপসী বাংলা শাখাতে সুতা কিনতে আনোয়ারা স্পিনিং মিলস ও স্টার স্পিনিং মিলসসহ তিনটি স্পিনিং মিলের অনুকূলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এলসি খোলে। দুদক কর্মকর্তারা জানান, ব্যাক টু ব্যাক এলসি খাত, এক্সপেক্টেড বিল পার্সেস (এবিপি) খাত, এক্সপেক্টেড খাত ও পিসি খাতসহ ৬টি খাতের নামে হলমার্কসহ অন্য গ্র“পগুলো ওই টাকা হাতিয়ে নেয়। চক্রটি কথিত রফতানিকারক। হোটেল শাখার সঙ্গে আগে থেকেই তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। নিয়ম অনুযায়ী কোন কোম্পানি বিদেশ থেকে অর্ডার পেলে এর বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলে। হলমার্কও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সেজে এলসি খুলেছিল। দুদক কর্মকর্তারা জানান, তারা বিদেশে গার্মেন্টস সামগ্রী রফতানির নামে যে অর্ডারটি জামানত হিসেবে রেখেছিল সেটাই ছিল জাল ও ভুয়া। হলমার্কসহ কয়েকটি জালিয়াতি গ্র“প নিজেরাই বিদেশের পার্টির সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতা সেজে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করে ব্যাংক থেকে পেমেন্ট নিয়ে যায়। অথচ এক্ষেত্রে কোন ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি কিছুই হয়নি। দুদক জানায়, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান তিনটিও ছিল হোটেল রূপসী বাংলা শাখার গ্রাহক।
দুদকের কাছে রক্ষিত তথ্যে দেখা যায়, হলমার্ক যে টাকা হাতিয়ে নেয় ওই টাকা তাদের কোম্পানির একটি ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়। পরে ওই হিসাব থেকে সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের নামে খোলা চলতি হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে টাকাগুলো বের করে নেয় হলমার্ক গ্র“প। দুদক জানায়, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস ও স্টার স্পিনিং মিলসসহ তিন স্পিনিং মিলস ও সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের নামে খোলা চলতি হিসাবগুলোও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে করা। যেগুলো হলমার্কেরই বেনামি প্রতিষ্ঠান।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে হলমার্ক ৪২টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। তবে এর বাইরেও এমন অন্তত ৮৪টি নামসর্বস্ব জালিয়াত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে দুদক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায়ও উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য সাভারে ১০ লাখ টাকা মূল্যের জমি বন্ধক রাখতে ১০ কোটি টাকা দাম দেখিয়ে দলিল করে হলমার্ক। এছাড়া সরকারি খাসজমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে ওই জমি স্ত্রীর নামে উচ্চমূল্যে বিক্রি দেখিয়ে ব্যাংকে বন্ধক রেখেছেন তানভীর।
সূত্র আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলা শাখা সব মিলিয়ে ঋণ ও অগ্রিম দিয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকাই দেয়া হয়েছে নিয়ম বহির্ভূতভাবে। এ অর্থের মধ্যে ২ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা একাই নিয়েছে হলমার্ক গ্র“প।
রফতানি আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতি : ২০১১ সালের ডিসেম্বরে হলমার্ক গ্র“পের রফতানির বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় প্রিশিপমেন্ট ক্রেডিট (পিসি) বা প্রাক জাহাজীকরণ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২৩৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এটি কমে হয়েছে ১৯০ কোটি টাকার মতো। এ পিসি অর্থায়নের সুদের হার সরকার নির্ধারিত ৭ শতাংশ। প্রশ্ন উঠেছে, হলমার্ক কীভাবে এত টাকা অত্যন্ত কম সুদে ঋণ পেতে পারে।
পিসি দেয়া হয় মোট রফতানি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশের ওপর মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। সেক্ষেত্রে ২৩৬ কোটি টাকা পিসি পেতে হলে আড়াই হাজার কোটি টাকার রফতানি থাকতে হবে। যেখানে দেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানিকারক গোষ্ঠীর বার্ষিক রফতানির পরিমাণ এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার মতো। পোশাক রফতানির বিপরীতে সরকার নগদ সহায়তা দেয়। ব্যাক টু ব্যাক অর্থাৎ রফতানির বিপরীতে বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও কর ছাড় দেয়া হয়। এ জন্য রফতানিতে কি পরিমাণ কাপড়-সুতা লাগবে, তার একটি ঘোষণা অর্থাৎ ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডি থাকতে হয়। জানা যায়, গত বছরের মে মাস থেকে হলমার্ক গ্র“পের তিনটি ইউনিট এ ইউডি নিচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ ইউনিটগুলো ১১৭টি ইউডি নিয়েছে, যাতে রফতানি মূল্যের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ ডলার বা টাকার অংকে মাত্র ১৮৮ কোটির মতো।
যেভাবে ধরা পড়ে হলমার্ক কেলেংকারি : রূপসী বাংলা শাখার ঋণ অনিয়মের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে চলতি বছর জানুয়ারিতে। ডিসেম্বরের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন থেকে সোনালী ব্যাংকের তিনটি শাখার অনিয়মের তথ্য পান তৎকালীন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের (আইটিএফডি) মহাব্যবস্থাপক মাশরুল হুদা সিরাজী। এর মধ্যে স্থানীয় শাখায় (লোকাল অফিস) অনিয়মের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৫ কোটি টাকা, রূপসী বাংলা শাখায় ৩৫০ কোটি টাকা এবং গুলশান শাখায় প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। এ তিন শাখা পরিদর্শনের জন্য অনুমতি চাইলে ২৬ জানুয়ারি তা অনুমোদন দেন ব্যাংকের এমডি হুমায়ুন কবির। কিন্তু সে পরিদর্শন কাজ শুরু হয় এর ২ মাস পর ৪ এপ্রিল। রহস্যজনক কারণে পরিদর্শন কাজ শুরু হওয়ায় ওই দুই মাসে রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্ক গ্র“প ও আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে নিয়ে যায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকটির এমডি হুমায়ুন কবির আইটিএফডিকে নিরীক্ষা চালানোর অনুমোদন দিলেও এর সঙ্গে একটি মৌখিক নির্দেশ দেন। নির্দেশটি হল, আগে স্থানীয় শাখা ও গুলশান শাখায় নিরীক্ষা করতে হবে। এই দুই শাখার নিরীক্ষা শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়ে তবেই যেতে হবে রূপসী বাংলা শাখায়।
এরপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিদর্শন শাখা থেকে গুলশান শাখা পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হলে বাধা দেন ডিএমডি মাইনুল হক। এ পরিদর্শন সেলের তৎকালীন উপ-মহাব্যবস্থাপক ছিলেন এসএইচএস আবু জাফর। পরিদর্শন দলের দলনেতা ছিলেন সেলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) শওকত আলী। মাইনুল হক তাকে গুলশান শাখায় পরিদর্শন না করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের কথা শওকত আলী জানিয়ে দেন ডিজিএম আবু জাফরকে। এরপর মাশরুল হুদা সিরাজী এবং আবু জাফরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা যান এমডির কাছে। সবার সামনেই এমডি ফোন করেন ডিএমডিকে। সবশেষে এমডির আদেশই বহাল থাকে।
তবে এ পরিদর্শনও নির্বিঘেœ হয়নি। ডিএমডি মাইনুল হক পরিদর্শন দলের দুই সদস্যকে বিভিন্ন সময় ডেকে এনে অন্য কাজ দেন। এ ফাঁকে বাড়তে থাকে রূপসী বাংলা শাখার অনিয়ম। শাখাগুলোর দায়িত্বে থাকা মহাব্যবস্থাপক কার্যালয় বা জিএম অফিসের দায়িত্বে ছিলেন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ননী গোপাল নাথ। আইটিএফডি থেকে পরীক্ষামূলক পরিদর্শন করার জন্য ১৪ মার্চ চিঠি দেয়া হয় জিএম অফিসকে।
আইটিএফডিকে এ সময় জানানো হয়, রূপসী বাংলা শাখায় অনিয়ম হচ্ছে। অভিজ্ঞ লোকবল দিয়ে প্রধান কার্যালয় থেকেই এর পরিদর্শন করা ঠিক হবে। তখন রূপসী বাংলা শাখায় অনিয়মের পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি টাকা।
অনিয়ম বাড়তে থাকায় আইটিএফডি আর নিরীক্ষা সেল থেকে রূপসী বাংলা শাখা পরিদর্শনের জন্য আবারও অনুমোদন চাওয়া হয় এমডির। এবার এমডি অনুমোদন দেন। ১ এপ্রিল ঠিক হয় ৪ এপ্রিল থেকে শুরু হবে পরিদর্শনের কাজ। এরপর শুরু হয় নতুন এক সংকট। ২ এপ্রিল আইটিএফডির জিএম মাশরুল হুদাকে বদলি করা হয় কুমিল্লায়। পরদিনই ছাড়পত্র দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বদলি করতে বাধ্য হয়েছেন এবং চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি মাশরুল হুদাকে এ কথা এমডি নিজেই ডেকে নিয়ে বলেছিলেন। তবে এর আগের দিন অর্থাৎ ১ এপ্রিল পরিদর্শন সেলের ডিজিএম আবু জাফর রূপসী বাংলা শাখা পরিদর্শনের জন্য এজিএম শওকত আলীর নেতৃত্বে একটি দল তৈরি করে দেন। এরপরও বদলি করা হয় আবু জাফরকে। তবে ৪ এপ্রিল থেকে রূপসী বাংলা শাখা পরিদর্শন কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত তখনও বহাল ছিল। ৩ এপ্রিল রাত সাড়ে ৭টায় শওকত আলীকে ফোন করে পরিদর্শন সেলের জিএম নুরুল ইসলাম চৌধুরী পরদিন রূপসী বাংলা হোটেল শাখায় না যেতে নির্দেশ দেন। তবে নির্দেশটি মৌখিক থাকায় পরদিন পরিদর্শন দল রওনা হলে শাখায় পৌঁছানোর আগেই আবার ফোন দেন জিএম নুরুল ইসলাম চৌধুরী। ডিএমডি মাইনুল হকের নির্দেশ অনুযায়ী ফিরে আসতে বলেন তিনি। এজিএম শওকত আলী ফিরে এসে পুরো বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে জিএমের লিখিত নির্দেশ চান। এমডিকে জানানো হলে বলা হয়, ডিএমডি মাইনুল হকের নির্দেশে আরেকটি দল করা হয়েছে, তারাই যাবে পরিদর্শন কাজে। ডিজিএম সফিজ উদ্দীন আহমেদেও নেতৃত্বে সেই দলটি পরিদর্শন কাজ শুরু করে আরও এক সপ্তাহ পর। এ দল পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দেয় ৩০ জুন। এর মধ্যেই কুমিল্লায় বদলি করা হয় এজিএম শওকত আলীকেও।
হলমার্ক কেলেংকারিতে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা যেভাবে জড়ালেন : তদন্তকালে জানা যায়, হোটেল রূপসী বাংলা শাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত চলাকালে সেখানে উপস্থিত হন ওই উপদেষ্টা। এ সময় পরিদর্শন কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা চালান তিনি। তদন্ত দলের সঙ্গে আলাপ করে নিজের একটি ভিজিটিং কার্ডও ধরিয়ে দেন এবং যেকোনও প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। উপদেষ্টার এ তদবিরের প্রমাণ মেলে ২৯ আগস্ট দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হওয়া সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার ঋণপত্র (এলসি) বিভাগের কনিষ্ঠ কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের কথায়। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন জুনিয়র অফিসার, কেরানি হিসেবে এখানে কাজ করি। কোন বিল-ভাউচার বা কাগজে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি কিভাবে জড়িত থাকব। হলমার্ক ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে উপরের দিকের লোকেরা জড়িত। যারা বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেছেন, তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ তো দুদকের কাছেই আছে।’ সাইদুরের কাছে দুদক জানতে চায়, ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করা অবস্থায় হলমার্কের ব্যাপারে কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি যেতেন কি না। অর্থ কেলেংকারির সঙ্গে কোন প্রভাবশালী জড়িত কি না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী মাঝে মাঝে শাখায় আসতেন। ডিজিএমের কক্ষে যেতেন। ওই শাখার এক নারী কর্মী তার আত্মীয়। উপদেষ্টা তার কাছে আসতেন।’
কেলেংকারির অন্যতম হোতা আÍস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ ডিজিএম মইনুল হক : চাঞ্চল্যকর সোনালী ব্যাংক-হলমার্ক কেলেংকারির অন্যতম হোতা সদ্য ওএসডি হওয়া সোনালী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোঃ মইনুল হক। দুদকের কাছে এমনই তথ্য এসেছে। দুর্নীতি ও আত্মসাতের নানা ঘটনায় বহুল আলোচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের ছোট ভাই মইনুল হক ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। বড় ভাইয়ের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকার জীবনে বহু অপকর্ম চালান তিনি। রাতারাতি ধনী বনে যাওয়া উচ্চাভিলাষী এ ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রূপালী ও কৃষি ব্যাংক থেকে অর্থ আÍসাৎ ও জালিয়াতির একাধিক মামলা রয়েছে। যখনই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তখনই প্রভাব খাটিয়েছেন উচ্চ আদালতে আসীন বিচারপতি খায়রুল হক। হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনায় সম্প্র্রতি মইনুল হককে ওএসডি করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সোনালী ব্যাংকে অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন মইনুল হক। ২০০৮ সালে জরুরি সরকারের সময়ে ট্র-থ কমিশনে দুর্নীতির স্বীকারোক্তি দিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ জমাও দিয়েছিলেন মইনুল। ট্র-থ কমিশনে আÍস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ হিসেবে তার নম্বর ২৪০। চিহ্নিত এ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বড় ভাইয়ের প্রভাবে বর্তমান সরকারের সময়ে শুধু চাকরিতে বহালই হননি, পদোন্নতি নিয়ে বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। ২০১১ সালের ১০ মার্চ সোনালী ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন মইনুল। অথচ দুর্নীতির অভিযোগে রূপালী ব্যাংকে তার পদোন্নতি আটকে গিয়েছিল। ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২৬ জানুয়ারি মইনুলকে সোনালী ব্যাংকের গুলশান, লোকাল অফিস ও রূপসী বাংলা শাখা তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে তিনি লোকাল অফিস তদন্ত করলেও অজ্ঞাত কারণে রূপসী বাংলা শাখা তদন্ত করেননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, হলমার্ক গ্র“পের কাছ থেকে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তদন্ত থেকে তিনি বিরত ছিলেন। এমনকি মার্চে বঙ্গবন্ধুর জš§দিনে হলমার্কের অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
রূপালী ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এ ব্যাংকে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পাইয়ে দেয়ার সহযোগিতায় মোটা অংকের অর্থ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে তিনি বরিশালের একটি মেডিকেলকে ঋণ পাইয়ে বিপুল অংকের টাকা ও সুযোগ নিয়েছিলেন। দুদক হলমার্কের অর্থ লুটে সহযোগিতা করে সুবিধা নিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা করে তদন্ত চালাচ্ছে। জানা যায়, এ তালিকায় সরকারি দলের একাধিক প্রভাশালী নেতা, উপদেষ্টা ও ডজন ডজন ব্যাংক কর্মকর্তা রয়েছেন। হলমার্ক কেলেংকারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যেকোন সময় নোটিশ দেয়া হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীর কাছে। দুদক সূত্র জানায়, খুব শিগগিরই তাকে তলব করা হবে।
http://jugantor.us/enews/issue/2012/09/18/all0391.htm

ঋণের নামে রূপালী ব্যাংকের ১৫ কোটি টাকা লোপাট

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকের ১৫ কোটি টাকা আÍসাতের ঘটনায় ব্যাংকটির তিন কর্মকর্তা এবং এভারেস্ট হোল্ডিংস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের এমডি ও চেয়ারম্যানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার আসামিরা হলেনÑ ৭৭৫, সাতমসজিদ রোড ধানমণ্ডির এভারেস্ট হোল্ডিংস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবু বোরহান সিদ্দিক চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এএইচএম বাহাউদ্দিন আহমেদ, রূপালী ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয় দিলকুশা শাখার মহাব্যবস্থাপক এসএম আতিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী এবং সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আবদুস সামাদ সরকার।

রোববার দুদকের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মতিঝিল থানায় এ মামলা দায়ের করেন। এভারেস্ট হোল্ডিংসের এমডি বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগেও প্রতারণার মামলা করেছিল একজন গ্রাহক। তাকে ধানমণ্ডি থানার পুলিশ গ্রেফতার করে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এই প্রতিষ্ঠানটি রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে জালিয়াতি করে ১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে মেরে দেয়। যে কাজে ব্যাংকের ওই তিন কর্মকর্তারও হাত ছিল। তারাও জালিয়াতি করে নেয়া টাকার মধ্যে দুই কোটি টাকা ভাগ পান বলে জানা গেছে।

দুদকের মামলার অভিযোগে বলা হয়, রূপালী ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা ও এভারেস্ট হোল্ডিংস অ্যান্ড টেকনোলজির এমডি ও চেয়ারম্যানসহ পাঁচ কর্মকর্তা মিলেমিশে এভারেস্ট হোল্ডিংসের সিদ্ধেশ্বরী এলাকার ১৪ তলা বিশাল এপার্টমেন্ট প্রকল্প পরিদর্শন না করে, এমনকি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কোন তল্লাশি না করে এবং গ্রাহকের মিথ্যা ও ভুয়া দায়মুক্ত সনদ যাচাই না করে বিক্রীত জমি ও ফ্ল্যাট অবিক্রীত ও বন্ধক দেখিয়ে ঋণের নামে ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ব্যাংকের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা ওই টাকা অনুমোদন করে আÍসাতে সহায়তা করেন।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, এভারেস্ট হোল্ডিংস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম বাহাউদ্দিন ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ের তৎকালীন উপ-মহাব্যবস্থাপক এসএম আতিকুর রহমানের বরাবর ২৫ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুরির আবেদন করেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবু বোরহান সিদ্দিক চৌধুরী ও এমডি বাহাউদ্দিন একই বছরের ২৪ আগস্ট একই ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী বরাবর ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সম্পর্কিত অঙ্গীকারনামা দাখিল করেন। এছাড়াও ওই বছরের ৬ জুন আবু বোরহান সিদ্দিক চৌধুরী ও এমডি এএইচএম বাহাউদ্দিন আহমেদ একটি মিথ্যা ও জাল দায়মুক্ত সনদ দাখিল করেন। যাতে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় এভারেস্ট হোল্ডিংস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের যে ১৪ তলা ভবন আছে সেই ভবনের ডিপি খতিয়ান নং, দাগ নং এবং সিটি কর্পোরেশন হোল্ডিং নং মিথ্যা দেয়া হয়েছে। কোম্পানিটির ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ের তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক এসএম আতিকুর রহমান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আবদুস সামাদ সরকার ঋণ প্রদানের প্রস্তাব তৈরি করেন এবং ওই প্রস্তাব রূপালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় প্রেরণ করেন। ব্যাংক থেকে ২০১০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কোম্পানির প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে প্রকল্পের নির্মাণাধীন ভবন আকর্ষণীয় এবং লাভজনক প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়।

মামলায় বলা হয়, রূপালী ব্যাংকের এই তিন কর্মকর্তা তাদের পরিদর্শন সময়ে কোনরকম তদন্ত না করেই কোম্পানির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মিথ্যা ও ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের আগে ওই প্রকল্পের ১৭৭টি ফ্ল্যাটের মধ্যে অনেকগুলো ফ্ল্যাট সাফ কবলা মূলে এবং ব্যাংকের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করার সময়ও অনেকগুলো ফ্ল্যাট সাফ কবলা দলিল মূলে বিক্রি করা হয়। রূপালী ব্যাংকের ওই তিন কর্মকর্তা ঋণ প্রদানের পূর্বে প্রকল্পের স্থান সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেননি। এমনকি স্থানীয় ও আশপাশের লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোন তথ্য নেননি। এভাবে এসআরও অফিসের দাখিলকৃত মিথ্যা দায়মুক্ত সনদের সঠিকতা ও বিষয়াদির কোনরূপ সত্যতা না দেখেই ২০১০ সালের ৬ জুন ঋণ প্রস্তাবে সুপারিশ করেন তারা। পরে তাদের মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ২০১০ সালের ৯ নভেম্বর রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় থেকে এভারেস্ট হোল্ডিংসের নামে ১৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়।
http://jugantor.us/enews/issue/2012/09/17/news0858.htm

সোনালী ব্যাংক লন্ডন শাখা থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৬৫ কোটি টাকা

হলমার্কের ঋণ কেলেংকারি শুধু দেশের ভেতরের ব্যাংকগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ কেলেংকারির ঘটনা সুদূর লন্ডনেও ছড়িয়েছে। সোনালী ব্যাংকের মালিকানাধীন লন্ডনে অবস্থিত সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড থেকেও জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্ক গ্র“প নিয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। বৈদেশিক এলসির টাকা না দিয়ে হলমার্ক গ্র“প ওই দেনা সোনালী ব্যাংককে পরিশোধ করতে বাধ্য করেছে। সোনালী ব্যাংকের শেরাটন (বর্তমানে রূপসী বাংলা) শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে হলমার্ক ওইসব টাকা তুলে নিয়েছে। সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পরিদর্শন বিভাগের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে এভাবে দেনা পরিশোধ ব্যাংকের স্বার্থ পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকের শেরাটন হোটেল শাখা, প্রধান কার্যালয়ের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগ, তহবিল ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সচিবালয়ের গাফিলতির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। তারা সতর্ক হলে এ ঘটনা এড়ানো যেত। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রদীপ কুমার দত্ত লন্ডনে সোনালী ব্যাংকের (ইউকে) শাখা পরিদর্শন করে এসেছেন। তিনি ওইসব শাখার সার্বিক অবস্থাও পর্যালোচনা করেছেন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বৈদেশিক এলসির খোলার সময় মোট মূল্যের একটি অংশ গ্রাহককে দিতে হয়। বাকি টাকা ব্যাংক ঋণ হিসেবে দেয়। এলসির দেনা শোধের সময় গ্রাহক ওই পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে পণ্য ছাড় করাবে। নিয়ম অনুযায়ী এলসির দেনা শোধের আগে শেরাটন হোটেল শাখা প্রয়োজনীয় টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে নিয়ে প্রধান কার্যালয়ের তহবিল ব্যবস্থাপনা বিভাগে পাঠাবে। ওই বিভাগ টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা কিনে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড শাখায় প্রধান কার্যালয়ের নষ্ট্র অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করবে। এরপর প্রধান কার্যালয় থেকে এলসির দেনা শোধের নির্দেশ পাওয়ার পর তা শোধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে ওই নিয়ম মানা হয়নি। গ্রাহকের কাছ থেকে কোন টাকা আদায় না করেই প্রধান কার্যালয় থেকে এলসির দেনা শোধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশ পেয়ে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড বৈদেশিক মুদ্রায় দেনা শোধ করে দিয়েছে। পরে ওই টাকা হলমার্কেও ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালের ৩০ আগস্ট থেকে ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখার ৭৯টি এলসির দেনা বেআইনিভাবে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শোধ করা হয়েছে। যার বেশির ভাগই হলমার্ক গ্র“পের এবং পরিশোধ করা হয়েছে সোনালী ব্যাংকের লন্ডনে অবস্থিত সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডে রক্ষিত নষ্ট্র অ্যাকাউন্টে রাখা বেদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নষ্ট্র অ্যাকাউন্ট থেকে এলসির বকেয়া দেনা শোধ করা হলেও এখন পর্যন্ত হলমার্ক থেকে ওইসব টাকা আদায় করতে পারেনি সোনালী ব্যাংক। ফলে ওইসব টাকা ব্যাংকের অনাদায়ি হিসেবে রয়ে গেছে। প্রায় ১৪ মাস ব্যাংকের শেরাটন হোটেল শাখা, তহবিল ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বেআইনিভাবে দেনা শোধ করা হলেও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শাখার এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম প্রতিরোধেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রধান কার্যালয়। এলসির দেনা শোধের জন্য একদিকে যেমন হলমার্ক থেকে ব্যাংক টাকা আদায় করতে পারেনি, তেমনি এলসির দেনা শোধের ক্ষেত্রেও ব্যাংক দুই থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত দেরি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে।
http://jugantor.us/enews/issue/2012/09/17/news0846.htm

বেরিয়ে আসছে লোপাটের বিচিত্র ঘটনা...

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের আশঙ্কা

আশরাফুল ইসলাম

ব্যাংকিং খাত থেকে হলমার্কের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের বিচিত্র কাহিনী বেরিয়ে আসছে। অর্থ আত্মসাতের এসব কাহিনী আড়াল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারের প্রভাবশালী মহল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও নতুন করে আর কোনো তদন্ত না করার চাপ দেয়া হচ্ছে। সোনালী ও জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সদস্য হলমার্ক জালিয়াতিকে ধামাচাপা দিতে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ আসছে। হলমার্কের মতো জালিয়াতির ঘটনার সাথে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও আরো প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের জালিয়াতি উদ্ঘাটন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপকভিত্তিক তদন্তের বিকল্প নেই বলেও তারা মনে করছেন।
এ দিকে অর্থনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ ব্যাংকারেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন হলমার্কের অর্থ জালিয়াতি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটে ফেলতে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতকে। এর মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে, তা উদ্ধার করা মোটেও সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে যে পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়েছে, তা এখন বাধ্য হয়েই ব্যাংকিং খাতকে ঋণ হিসেবে নিতে হবে। আর যেহেতু অর্থ আদায় প্রায় অসম্ভব, এ কারণে এসব ঋণ চলতি মাসের মধ্যেই খেলাপিতে পরিণত হবে। আর খেলাপিতে পরিণত হলে এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকিং বিধি মোতাবেক প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে। এতে যেসব ব্যাংক থেকে হলমার্ক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ওইসব ব্যাংকের বছর শেষে প্রকৃত আয় শূন্য বা নেগেটিভ হয়ে যাবে। অপর দিকে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ আটকে পড়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ ক্ষমতাও কমে যাবে। এই ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিতে পারবে না। পাশাপাশি যেসব গার্মেন্ট শিল্প ও টেক্সটাইল হলমার্কের প্রতারণার শিকার হয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপিতে পরিণত হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে ওই প্রতিষ্ঠান আর নতুন করে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিতে পারবে না বা পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপন (এলসি) করতে পারবে না। ফলে নগদ টাকার সঙ্কটে পড়বে এসব প্রতিষ্ঠান, যা চূড়ান্তভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্য গুটানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। সব মিলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংক বিশ্লেষকেরা।
ব্যাংক থেকে যেভাবে অর্থ বের করে নেয়া হয় : বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুসারে সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সুকৌশলে স্মরণকালের ভয়াবহ ব্যাংক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিপুল অর্থ বের করে নেয় বিতর্কিত হলমার্ক গ্রুপ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার মতে, হলমার্ক ব্যাংকিং খাত থেকে একাই এত টাকা হজম করতে পারেনি, হলমার্কের পাশাপাশি আরো সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি রয়েছে, যারা নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে। কেননা, এ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেয়ার তথ্য-প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক পেয়েছে, তাতে দেখা গেছে বেশির ভাগ অর্থই ভাউচারের মাধ্যমে বের করে নেয়া হয়েছে। কোনো চেকের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লেনদেন হয়নি। এ কারণে প্রকৃত বেনিফিশিয়ারি কারা তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তবে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামের সব ব্যাংকের প্রধান প্রধান শাখাগুলো তদন্ত করলে বেরিয়ে পড়ত নেপথ্যের হোতারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হলমার্ক গ্রুপ পোশাক তৈরির কাজে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল (সুতা বা কাপড়) সংগ্রহের জন্য সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় এলসি খোলার আবেদন করে। আবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও ছিল হলমার্কের বেনামী প্রতিষ্ঠান। ভুয়া এলসির বিপরীতে পণ্য সরবরাহ না করেই বিল সৃষ্টি করা হয়। এসব বিল জনতা, অগ্রণী, রূপালীসহ আরো ২৬টি বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকে উপস্থাপন করে। এসব ব্যাংক যাচাই-বাছাই না করেই সোনালী ব্যাংকের গ্যারান্টি দেয়া বিল কিনে নেয়। এসব অর্থ একপর্যায়ে হলমার্কের অ্যাকাউন্টে চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, হলমার্ক জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে নিতে তাদের শতাধিক বেনামী ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত মাত্র ৪৩টি প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু অভ্যন্তরীণ বিল সৃষ্টির মধ্যেই টাকা হাতিয়ে নেয়া সীমাবদ্ধ ছিল না, অর্থ কেলেঙ্কারির জন্য বিদেশী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবহার করা হয়েছে। ভুয়া পণ্য আমদানির এলসি করে এর বিপরীতে খালি কনটেইনারে পণ্য না এনেই ওইসব প্রতিষ্ঠানে ডলার পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। তবে বিস্তারিত তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
কত টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে : বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপ তাদের বেনামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত থেকে কী পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তার সঠিক তথ্য বের করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু সোনালী ব্যাংকের তিনটি শাখা, জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের একটি শাখার মাধ্যমে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা গায়েব করার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বহুল আলোচিত হলমার্কের অর্থ জালিয়াতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ দুদকের কর্মকর্তাদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন তারা যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন তার বিশ গুণ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু এসব সম্পদের উৎস কী তা তিনি জানাননি। বরং হলমার্ক জালিয়াতির খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর যেসব জমিজমায় এতদিন হলমার্কের সাইনবোর্ড ঝুলছিল তা আকস্মিকভাবে গায়েব হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার অর্থ কেলেঙ্কারির তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাহলে এর বিশ গুণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯০ হাজার কোটি টাকা। একটি স্বল্প পরিচিত কোম্পানির এ বিপুল অর্থ কীভাবে এলো, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের মতে, এসব ব্যাংকের রাজধানী ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান শাখাগুলো তদন্ত করলে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার একটি ধারণা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজধানীর রোকেয়া সরণিতে সব ব্যাংকের সব শাখা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ বিতর্কিত হলমার্কের প্রধান কার্যালয় রোকেয়া সরণি এলাকায়। সুতরাং এসব শাখায় দ্রুত তদন্ত করলে তাদের হাতিয়ে নেয়া অর্থের কিছুটা হলেও এসব ব্যাংক থেকে পাওয়া যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নতুন করে কোনো শাখায় তদন্তের অনুমোদন মিলছে না বলে ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন।
টাকা উদ্ধারের জটিল প্রক্রিয়া : প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হলমার্ক ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তা উদ্ধার প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। কারণ ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ টাকা বের করে নেয়া হয়েছে তার বেশির ভাগই হয়েছে ভাউচারের মাধ্যমে। ভাউচারের মাধ্যমে নেয়ায় প্রকৃত বেনিফিশিয়ারি কারা তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। চেকের মাধ্যমে লেনদেন হলে সহজেই চিহ্নিত করা যেত প্রকৃত বেনিফিশিয়ারিদের। ইতোমধ্যে হলমার্কের বেনামী প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলা শুরু করেছে।
সোনালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, হলমার্ক যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছিল তাদের বেশির ভাগই ছিল নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। কিছু প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ছিল। তারা প্রাথমিকভাবে ওই সব প্রতিষ্ঠান সাইনবোর্ড দেখে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্তভাবে যখন তদন্ত করতে যাওয়া হচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আর আগের সাইন বোর্ড নেই। অন্য প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলে আছে। ওই কর্মকর্তার মতে, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে হলমার্ক সহজেই অর্থ ফেরত দেবে না।
বেকায়দায় পড়েছে দুই শতাধিক গার্মেন্ট শিল্প ও টেক্সটাইল মিল : বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, হলমার্কের ভুয়া বিল কিনে বেকায়দায় পড়েছে দুই শতাধিক গার্মেন্ট শিল্প ও টেক্সটাইল মিল। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান সোনালী, জনতা ও অগ্রণীর স্বীকৃত বিল কিনেছিল। কিন্তু ওই সব বিলের মেয়াদ পার হলেও সোনালী ব্যাংক ওই সব বিলের অর্থ পরিশোধ করছে না। এমন বিলের পরিমাণ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। হলমার্কের জালিয়াতির শিকার এমন একটি টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সোনালী ব্যাংক দ্রুত তাদের অর্থ পরিশোধ না করলে চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবেন। আর ঋণ খেলাপি হিসেবে তারা চিহ্নিত হলে তাদের শিল্পের কাঁচামালসহ পণ্য আমদানি করতে আমদানি ঋণপত্র স্থাপন (এলসি) করতে পারবেন না। ফলে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়বে। হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রফতানি আয়ে।
ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘ স্থায়ী প্রভাব পড়বে : হলমার্কের কারণে শুধু দুই শতাধিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানই নয়, এর সাথে ২৬টি বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংক রয়েছে, যারা সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃত বিল কিনে এখন বেকায়দায় পড়েছেন। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ১২টিই রয়েছে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক। সাতটি দ্বিতীয় প্রজন্মের, আর দুইটি রয়েছে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রায় সবই নগদ টাকার তীব্র সঙ্কট ছিল। পুঁজিবাজারে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে পড়ায় এসব ব্যাংকের ত্রাহি অবস্থা রয়েছে। পুঁজিবাজারনির্ভর এসব ব্যাংকের গত বছর মুনাফাও কমে গেছে। এর ওপর প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মতো বিল আটকে পড়ায় এসব অর্থ নিশ্চিতভাবেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হবে। আর খেলাপি ঋণ বেশি হলে ওইসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের আয় খাত থেকে টাকা এনে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এমনিতেই পুঁজিবাজারের মন্দাভাব, এর ওপর বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গেলে বার্ষিক মুনাফা ব্যাপক হারে কমে যাবে, কোনো কোনো ব্যাংকের লোকসানের সম্মুখীন হবে। দ্বিতীয়ত. ব্যাংকের ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যাবে। তারা নতুন করে ঋণ দিতে পারবে না। এতে ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক। এ ব্যাংকের এ বিপুল টাকা একসাথে স্বল্প সময়ের মধ্যে আটকে পড়ার অর্থই হলো ব্যাংকিং খাতে দুর্দিন বয়ে আনা। সবমিলে ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘ দিন হলমার্কের কেলেঙ্কারির দায় বহন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা : এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, হলমার্কের এ অর্থ কেলেঙ্কারির দায় সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ওপরই পড়বে। যে পরিমাণ অর্থ বের হয়ে গেছে তা আদায় না হলে ওই সব ঋণ খেলাপিতে পরিণত হবে। আর খেলাপি হলে প্রভিশন রাখতে হয়, এতে ব্যাংকের আয় কমে যায়। পাশাপাশি কমে যায় ব্যাংকের বিনিয়োগসক্ষমতা। তবে তিনি ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনার ওপর হতাশ না হয়ে আমানতকারীদের আমানত প্রত্যাহার করে অন্যত্র বিনিয়োগ না করার জন্য গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়েছেন।
ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেল পরিচালনা পর্ষদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্ককারির দায় সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এড়াতে পারবে না। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ উপেক্ষা করে আগের পর্ষদকে নতুন করে নিয়োগ দিয়েছে। এ বিষয়ে ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সোনালী ব্যাংকের এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারির দায় এড়াতে পারবে না পরিচালনা পর্ষদ। এমনকি এসব পরিচালকদের পুনঃনিয়োগ দেয়াও ঠিক হয়নি।
সরকারের ওপরের মহলের চাপ ছিল : এ দিকে সাবেক এমডি হুমায়ুন কবীর দুদকে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, হলমার্কের সাথে সরকারের ওপরের মহলের চাপ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও যেখানে হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারির সাথে সোনালী ব্যাংকের পরিচালকেরা জড়িত, এ কারণে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, নেপথ্যের নায়ক পরিচালনা পর্ষদ ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
সোনালী ব্যাংকের ১১ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে সাতজনই রয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। পর্ষদের চেয়ারম্যান রয়েছেন সোনালী ব্যাংকেরই সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের উপদেষ্টা কাজী বাহারুল ইসলাম। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা সুভাষ সিংহ রায়, কক্সবাজার-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী সাইমুম সারওয়ার কমল, দৈনিক সংবাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাশেম হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের আত্মীয় সিরাজগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী এবং মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা হেনরী, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক এ এস এম নাঈম এফসিএ, বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি কে এম জামান রোমেল, আনোয়ার শহীদ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শহীদুল্লাহ মিয়া। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকার বলে পরিচালক হিসেবে থাকেন।
অন্য দিকে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বেশির ভাগই রয়েছেন আওয়ামী রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন আওয়ামী ঘরানার অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত, ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আলহাজ এ কে এম শাহজাহান কামাল, দৈনিক সংবাদের ইকনোমিক এডিটর ড. আর এম দেবনাথ, ড. জামালউদ্দীন আহমেদ এফসিএ, এফবিসিসিআই পরিচালক মো: নজিবর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব দবির উদ্দীন আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা: মো: আবদুর রউফ সরদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: এমদাদুল হক ও পারভীন মাহমুদ এফসিএ।
http://www.dailynayadiganta.com/details/68153

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla