Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

আবুল হোসেনের নীরব প্রস্থান ও চেতনার পদ্মা সেতু

Padma Bridge
খুব নীরবে প্রস্থান করছেন প্রাক্তন যোগাযোগ মন্ত্রী জনাব আবুল হোসেন। সরে পরার ক্ষণটা বেছে নিয়েছেন এমন একটা মুহূর্তে যখন গোটা জাতি শোকে মূহ্যমান। কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের প্রস্থান জাতির স্বাভাবিক জীবনকে কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও থমকে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র ও মূল্যবোধ। এই মৃত্যু বিভাজনের দেশে ক্ষণিকের জন্যে হলেও বয়ে এনেছে ঐক্যের বাতাস। ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থানের উর্ধ্বে উঠে আমরা সবাই শোক করছি, মূল্যায়ন করছি দৈনন্দিন জীবনে এই বরপুত্রের অসামান্য অবদান। জাতির যখন অমাবস্যা আবুল হোসেন টর্চ হাতে নিজের পথ আলোকিত করলেন এবং ভাসালেন বিদায় তরী। এর আগে বেশকিছু টাকা খরচ করে বিশাল একটা বিজ্ঞপ্তি ছাপালেন পত্রিকায় এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাফাই গাইলেন। পাশাপাশি জাতিকে মনে করিয়ে দিলেন রাজনীতিবিদ হিসাবে নিজের সাফল্যের কথা। রাজনীতির শেষ চূড়া মন্ত্রিত্ব, যা জয় করার জন্যে দেশে দেশে রাজনীতিবিদরা শ্রম, মেধা ও যোগ্যতা বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বপ্ন দেখে থাকেন। এ বিচারে মাদারীপুরের আবুল হোসেন মন্ত্রী হওয়া কোন অপরাধের বিষয় ছিলনা। বরং সহায় সম্বলহীন পরিবারে জন্ম নিয়েও ক্ষমতার সিড়ি ডিঙ্গানো যায় তার প্রমাণ রেখেছেন জনাব হোসেন। চাইলে এ নিয়ে গর্ব করতে পারি আমরা। একই মন্ত্রিত্বে যখন অপ্রত্যাশিত যবনিকা নামে কষ্ট পাওয়াটা স্বাভাবিক। আবুল হোসেন যতই শৌর্যবীর্যের গান শোনান না কেন, ভেতরে পর্বত সমান কষ্ট নিয়েই যে বিদায় নিচ্ছেন এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কষ্টের কিছুটা হলেও আভাস পাওয়া যায় দপ্তরবিহীন মন্ত্রিত্বের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অলৌকিক ক্ষমতার ইঙ্গিতে। এরশাদ আমলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে চিনতাম যিনি পল্লী বিদ্যুতে ঠিকাদারি করতেন। বৃহত্তর ময়মনসিংয়ের এই মন্ত্রী যেদিন ক্ষমতা হারালেন নিজের কষ্টকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন, ’ডিসি, এসপি সহ প্রশাসনের মোসাহেবি আর পুলিশি স্যালুটের কথা মনে হলে বুকটা ভেঙ্গে যায়, মনে হয় মিশে যাই মাটির সাথে’। আবুল হোসেনের বুকেও নিশ্চয় অনেক কষ্ট। কেবল স্যালুটই উনি মিস করবেন না, মিস করবেন বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের মালিকানা। সহমর্মিতা রইল বিদায়ী মন্ত্রীর জন্যে।

বিশ্বব্যাংকের সাথে সাপ-নেউল খেলায় শেখ হাসিনার প্রাপ্তি কতটুকু তা বিচারের সময় হয়ত আসেনি। কিন্তু যখন আসবে আশাকরি ক্ষমতাসীন সরকার জাতির সামনে উন্মোচন করবে পদ্ম সেতুর আসল কাহিনী। ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য আর সম্মানকে কেন আবুল হোসেনের মত একজন মন্ত্রীর কাছে জিম্মি করা হয়েছিল এবং তার খুটি হিসাবে কারা কাজ করেছিল তাদের আসল পরিচয় জানার অধিকার আমাদের আছে। আশাকরি আগত সরকার গুলো তা প্রকাশ করবে। জাতি হিসাবে আমাদের হারানো সন্মান ফিরে পেতে এদের পরিচয়ই হয়ত যথেষ্ট হবেনা, প্রয়োজন হবে বিচার ব্যবস্থার হস্তক্ষেপ। আশাকরি দেশের আদালত, উচ্চ আদালত যথাযত ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসবে। আবুল মন্ত্রীর পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি, প্রধানমন্ত্রীর সস্তা দেশপ্রেম আর দুদকের গোলাম হোসেনদের ফ্রি লাইসেন্সে বিশ্বাস করার সংস্কৃতিতে কিছুটা হলেও ভাটা লেগেছে। ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরব্য উপন্যাস আমরা অনেক পড়েছি। জাতিকে চেতনার মোহজালে নেশাগ্রস্ত বানিয়ে সরকারী সম্পদ লুটপাটের এসব সুর সুরি অনেকটাই ভোতা হয়ে গেছে, বিশেষ করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। আগামী দিনের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে শিক্ষা হয়ে থাকবে পদ্মাসেতু উপাখ্যান এমনটাই আশা করবো আমরা। এ ব্যাপারে অপরাধ ও শাস্তি পর্বে নিরপেক্ষতা হতে পারে নতুন শুরু।

সেতুর ভাগ্যে শেষপর্যন্ত যাই ঘটুক, শুরু হতে সঠিক পথে থাকার জন্যে অর্থমন্ত্রী ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন। হবুচন্দ্র মন্ত্রীসভায় গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের ক্ষমতা কতটা সীমিত তা জেনেও অর্থমন্ত্রী আগাগোড়া অর্থনীতির ভাষায় কথা বলে নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রতি সুবিচার করেছেন। ধন্যবাদ জনাব মাল মুহিত।

Comments

পদ্মা সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অবান্তর: আবুল হোসেন

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আবারও দাবি করেছেন যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি।

গতকাল সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সদ্য পদত্যাগকারী এই মন্ত্রীকে দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদকের কার্যালয়ে আবুল হোসেন সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তাঁর দাবি, ‘৩৭ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের (পরামর্শক নিয়োগ) কাজ পেতে ৩৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ সাধার অভিযোগ অবান্তর।’

মূল সেতুর ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য এর আগেও এক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আবুল হোসেনকে। তবে দুদক পরে জানায়, ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।

আবুল হোসেন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘পদ্মা সেতুর তদন্তকাজ নিষ্ঠার সঙ্গে এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে। এর ভেতরে কোনো ধরনের দুর্নীতি ধরা পড়ার আশঙ্কাই নেই।’

পদ্মা প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে মন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন আবুল হোসেন। গত ২৬ আগস্ট তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চিঠি পাঠায় দুদক। তবে গতকাল এক লিখিত বিবৃতিতে সাবেক এই যোগাযোগমন্ত্রী দাবি করেছেন, সরকারের কোনো ‘নির্দেশ বা চাপে নয়, স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে স্বেচ্ছায়’ মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের চুক্তি স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। ২৯০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে তাদের ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কার্যক্রম ঢিলে হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে আবুল হোসেনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের শর্ত ছিল, মন্ত্রী আবুল হোসেন, তখনকার সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে সরিয়ে দিতে হবে। সেই শর্ত পূরণ না হওয়ায় চলতি বছরের জুনে অর্থায়ন চুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। তবে এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংককে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন আবুল হোসেন। এক মাস পর তা কার্যকর করা হয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, পরামর্শক নিয়োগের সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে থাকা কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় উপদেষ্টা জিয়াউল হকসহ মোট ২৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।

তারিখ: ০৪-০৯-২০১২
সূত্র: প্রথম আলো

বিবিসি’র হার্ডটক: জনগণ চাইলে ওকে

শুক্রবার, ০৩ আগস্ট ২০১২

নিজস্ব প্রতিনিধি: গত ৩০শে জুলাই বিবিসির হার্ডটকে স্টিফেন সাকুরের মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্যাম্ব্রিজ ও হার্ভার্ড পড়ুয়া সাকুর এ সময় তাকে ও বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে মন্তব্য করেন, বাংলাদেশীদের অনেকে মনে করেন নতুন প্রজন্মের জন্য পথ করে দেয়ার সময় এসেছে। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে উভয়ে সরে দাঁড়িয়ে নতুনদের জন্য পথ খুলে দেয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কতিপয় লোকের কথায়’ নয়, যদি জনগণ চায় তাহলে ‘ওকে।’ অর্থাৎ, তিনি নেতৃত্ব ত্যাগের ইঙ্গিত দেন। তবে তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি, ইতিপূর্বে উচ্চারিত ও তার বহুল আলোচিত মন্তব্য ‘গরিবের রক্তচোষা’ বলতে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বুঝিয়েছিলেন কিনা। নিজেই প্রশ্ন তুলে তিনি বাদানুবাদে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি দোদুল্যমান থেকেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ও তার সন্তানদের বিরুদ্ধে তার সরকার একটিও দুর্নীতির মামলা দায়ের করেনি।’ তার ভাষায়, ‘সব মামলাই বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা।’ বিএনপি অবশ্য দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী অসত্য বলেছেন। কারণ, বর্তমান সরকারের আমলে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই দু’টি মামলা বর্তমানে একটি অভিযোগ গঠন ও অন্যটি অভিযোগ আমলে নেয়ার পর্যায়ে রয়েছে। তারেক রহমানকে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ছাড়াও মানি লন্ডারিং- এই তিনটি নতুন মামলা এবং আরাফাত রহমানকে একটি দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বিবিসি: বড় একটা বিজয় নিয়ে আপনার সরকার গঠনের পর আশা করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের প্রচলিত সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্যের রাজনীতির দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে আপনি সংঘাতের পথ ধরেই চলছেন। বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আপনি দুর্নীতির মামলা করেছেন। তার ছেলের বিরুদ্ধে করেছেন। তার আরেক ছেলেকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে আপনাকে তাড়া করেছিলেন। এখন আপনি তাকে তাড়া করছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী: এটা আপনার ভুল ধারণা। তার এবং তার ছেলের বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির মামলা হয়েছে তা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়ের করেছিল। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করিনি।
বিবিসি: মনে হচ্ছে বিরোধটা ব্যক্তিগত।
প্রধানমন্ত্রী: না, এটাও আপনার ভুল ধারণা। আমরা সংবিধান ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। দুই পক্ষের মধ্যে আদর্শগত ফারাক রয়েছে। তারা মিলিটারি ডিক্টেটরের পার্টি।
বিবিসি: তাহলে সাম্প্রতিক মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কেন তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিুষ্ঠুর নির্যাতন চালাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
প্রধানমন্ত্রী: এটা আমার পূর্বসূরির আমলের ঘটনা।
বিবিসি: না, এটা তো সাম্প্রতিক। তারা বলছে, যে এর সপক্ষে তাদের কাছে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী: না এটা ঠিক নয়। এটা চলছে না। তবে সেইসময়ে যতো মারা গেছে, তার চেয়ে এখন সংখ্যা কমে গেছে। শুধু তাই নয়, আমরা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় র‌্যাবকে মানবাধিকার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যখন যেখানে কোন লংঘনের ঘটনা ঘটে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
বিবিসি: মার্কিন রিপোর্ট বলছে, এ বছরেই ২২ ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছে। শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এরপর তিনি অদৃশ্য হয়ে যান, পরে তার লাশ মেলে।
প্রধানমন্ত্রী: এটা সত্য নয়। আচ্ছা বলুন তো প্রতি বছর লন্ডন থেকে কত লোক অদৃশ্য হয়ে যায়?
বিবিসি: আপনি কাদের কথা বলছেন? আমিনুলের মতো রাজনৈতিক বন্দি বা কর্মীদের কথা বলছেন?
প্রধানমন্ত্রী: আমি জানি না যে, আমিনুল আদৌ রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন কিনা। তবে তার মৃত দেহ অন্য কেউ নয়, আমাদের পুলিশ বিভাগই উদ্ধার করেছে।
বিবিসি: তাকে কি হত্যা করা হয়নি?
প্রধানমন্ত্রী: আমরা তা জানি না। এর আগে আমরা তার কখনও নাম শুনিনি। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরে শুনেছি যে তিনি বিগ লিডার ছিলেন।
বিবিসি: র‌্যাব সম্পর্কে অপনি বিরোধী দলে থাকতে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু এখন তো র‌্যাবকে ডেথ স্কোয়াড বলা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী: না এটা সত্য নয়। ২০০৪ সালে র‌্যাব করেছিল বিএনপি। তারা র‌্যাবকে দিয়ে মানুষ হত্যা করিয়েছিল। আমিই একমাত্র সেসময় তার বিরোধিতা করেছিলাম। আপনাকে সংখ্যা দেখতে হবে। আমরা কখনও র‌্যাবকে এসব কাজ করাতে উৎসাহিত করিনি।
বিবিসি: আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী আপনার জানা থাকার কথা-
প্রধানমন্ত্রী: শুনুন। এটা যখন একবার শুরু হয় তখন থামাতে সময় লাগে। তা রাতারাতি বন্ধ করা যায় না। আমরা তো মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায়। আমরা খুবই সতর্ক। এখন এ বিষয়ে আপনি আমার কাছে প্রশ্ন তুলছেন।
বিবিসি: দেখুন, আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ মন্তব্য রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তার সরকোরের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল থাকবে। আপনি এখন তা মানতে চাইছেন না।
প্রধানমন্ত্রী: অবশ্যই মানছি। জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাস করি।
বিবিসি: কিন্তু আপনার দেশের মানুষ তো প্রশ্ন তুলেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মৌলিক সততা কঠিনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। আপনি কি আপনার সরকারে এর কোন ব্যত্যয় দেখছেন না?
প্রধানমন্ত্রী: বাংলাদেশ দীর্ঘকাল সমারিক ও সেনাসমির্থত সরকার দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। বিগত বিএনপি সরকারও দুর্নীতিতে মদদ দিয়েছে। অপনি কি এটা রাতারাতি বদলে ফেলতে পারবেন? না আপনি তা পারবেন না। আমার সরকার দুর্নীতিতে জড়িত নয়। কখনও ছিল না। যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতাম তাহলে এত উন্নতি কিভাবে করতে পারলাম। বিশ্বব্যাপী এত মন্দার মধ্যে কিভাবে জিডিপি ৬ ভাগে উন্নীত করতে পারলাম। বিদ্যুৎ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ালাম।
বিবিসি: আচ্ছা তাহলে বিশ্বব্যাংক কেন আপনার সরকোরের উপর আস্থা হারালো। দুর্নীতির তদন্তে আপনার সরকারের সহায়তায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী: এটা তারা আকস্মিকভাবে করেছে। অথচ তারা কোন বড় প্রমাণ দিতে পারেনি।
বিবিসি: আপনি কি প্রত্যাখ্যান করছেন যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঠিকাদারি নিয়োগ নিয়ে কোন প্রকারের দুর্নীতি হয়নি?
প্রধানমন্ত্রী: অবশ্যই কোন দুর্নীতি হয়নি।
বিবিসি: তাহলে বলুন তো, যদি কোন অনিয়মই না হবে তাহলে আপনার সরকারের একজন শীর্ষ মন্ত্রী কেন পদত্যাগ করলেন?
প্রধানমন্ত্রী: মানুষ তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলায় তিনি পদত্যাগ করেছেন। সাহস না থাকলে তিনি তো পদত্যাগ করতেন না।
বিবিসি: তাহলে আপনি কেন বিশ্বব্যাংকের দেয়া চিঠিপত্র প্রকাশ করছেন না। অব্যাহতভাবে সেই দাবি নাকচ করে চলেছেন। আর সেটা প্রকাশ করলে মানুষ বিশ্বব্যাংকের অবস্থাটা বুঝতে পারতেন।
প্রধানমন্ত্রী: আপনি সেটা প্রকাশ করতে পারেন না। কারণ সেটা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিবিসি: বিশ্বব্যাংক তো প্রকাশ করতে বলেছে।
প্রধানমন্ত্রী: আমার প্রশ্ন তাহলে বিশ্বব্যাংক কেন প্রকাশ করছে না?
বিবিসি: কারণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাদের একটা চুক্তি রয়েছে। তারা চিঠির কথা-
প্রধানমন্ত্রী: চিঠি বড় কথা নয়। আপনাকে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে। শুধু চিঠি কোন দুর্নীতির প্রমাণ হতে পারে না। তাছাড়া দুদক তদন্ত করছে। তারা বিশ্বব্যাংকের কাছে সব কাগজপত্র দিতে বলেছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক তা দিতে রাজি হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে তারা কেন প্রমাণ দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে? তারা একবার আমাকে দুটি চিঠি দিল। পড়ে দেখি দু’টিই আমার পূর্বসূরির আমলের।
বিবিসি: প্রধানমন্ত্রী আমাকে প্রশ্নটি এভাবে করতে দিন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা একটা লজ্জার বিষয়, তাদের অনেকেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক খুব টক হয়ে গেছে। একইসঙ্গে আপনার দেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধাভাজনদের অন্যতম নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আপনার সম্পর্কও যে অত্যন্ত তেতো হয়েছে সেটাও বাংলাদেশীদের জন্য একটা লজ্জা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আপনি কেন তাকে গরিবের রক্তচোষা বলেছিলেন?
প্রধানমন্ত্রী: আপনি বাংলাদেশে যান। নিজের চোখে দেখুন। তখন উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনি কিভাবে তার নাম নিলেন? আমি কিন্তু কেউ একজন (সামওয়ান) বলেছিলাম। তাহলে কেন আপনার মনে তার নাম এসেছে? আমি কি তার নাম উল্লেখ করেছি। আমি কিন্তু তার নাম বলিনি।
বিবিসি: আমি দুঃখিত। এটা পরিষ্কার করে নিই। আপনি কি তাহলে অস্বীকার করছেন, আপনি ড. ইউনূসকে গরিবের রক্তচোষা হিসেবে দেখেন না?
প্রধানমন্ত্রী: না, আমি অস্বীকার করি না। আমি কিছুই অস্বীকার করছি না। আমি শুধু একটি প্রশ্ন রাখছি।
বিবিসি: তার মানে আপনি তাকে একজন। আপনি তাকে-
প্রধানমন্ত্রী: আমি আপনার কাছে একটি প্রশ্ন রাখছি। কেন আপনার মনে এলো যে কথাটি আমি তাকেই বলেছি। সেটিই আমার প্রশ্ন।
বিবিসি: না আমার মনে হয় আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি বাংলাদেশী মিডিয়ায় এটা পড়েছি। বাংলাদেশী মিডিয়ার অনেকেই।
প্রধানমন্ত্রী: তারা সংখ্যায় কত হবে?
বিবিসি: এটা বিশ্বাস করা হয়, আপনি যখন গরিবের রক্তচোষা কথাটি উল্লেখ করেছেন, তখন সরাসরি ড. ইউনূসকেই বুঝিয়েছেন। আপনি যদি এখন তা প্রত্যাহার করে নিতে চান কিংবা আমাকে বলেন, আপনি তাকে বোঝাননি তাহলে সেটা তো উত্তম। আপনি তাকেই বুঝিয়েছিলেন নাকি বোঝাননি?
প্রধানমন্ত্রী: শুনুন, শুনুন। আমি আপনাকে একটা কথা বলছি। দরিদ্র লোকদের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ সুদ নেয়া হচ্ছে। এটা কি ন্যায্য? এটা তো ফেয়ার নয়। গরিব মানুষের কাছে থেকে যদি ৩৫ থেকে ৪৫ ভাগ সুদ নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তারা কিভাবে ঋণের সুবিধা পাবে?
বিবিসি: সারা পৃথিবী তাকে শ্রদ্ধা করছে। তিনি দরিদ্র মানুষের বন্ধু হিসেবে নন্দিত হচ্ছেন। কিন্তু আপনি তাকে মানতে পারছেন না।
প্রধানমন্ত্রী: আপনাকে বিষয়টি তদন্ত করতে হবে। দেখতে হবে কত লোক দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। তার গ্রামে গিয়ে খবর নিন। গরিবের সংখ্যা কমিয়েছে তো আমার সরকার। ৩ বছরে শতকরা ১০ ভাগ দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে।
বিবিসি: ২০০৭ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি রাজনৈতিক দল খুলেছিলেন। কিন্তু আপনি সেটা মেনে নিতে পারেননি। এবং সেকারণেই-
প্রধানমন্ত্রী: ওই সময়ে আমি কাস্টডিতে ছিলাম। আমি তো জেলে ছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি এমন একজন ‘বিগ পার্সন’, উনি কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন। সব সুযোগ সুবিধাই তো তার ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে আমি তাকে অপসারণ করিনি। তিনি নিজেই নিজেকে অপসারণ করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংক একটি সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক। আইনে আছে, কারও বয়স ৬০ বছর হলে তিনি এমডি পদে থাকতে পারবেন না। তার বয়স ৭০-৭১ হয়ে গিয়েছিল। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে তিনি কোর্টে গিয়েছিলেন। কোর্টে তিনি হেরে গেছেন।
বিবিসি: আপনি যখন বেগম খালেদা জিয়া ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে কথা বলছেন, তখন তাতে বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছে এবং তাতে বোঝা যায়, বাংলাদেশ সমাজের যে ক্ষত তা সারেনি। আপনি মিলনসাধন করতে পারেননি। জাতি বিভক্ত অবস্থায় আছে।
প্রধানমন্ত্রী: আমার দেশ ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালে আপনি এটা অনুধাবন করতে পারবেন।
বিবিসি: আপনার সরকারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিরোধী দল মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে আপনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে হুমকিগ্রস্ত করেছেন এবং তারা আগামী নির্বাচনে নাও যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী: অবশ্যই হুমকিগ্রস্ত হয়নি। সংবিধান এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে যাতে প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হবে। অসাংবিধানিক ও অথরাটারিয়ান সরকার ভবিষ্যতে আসতে পারবে না।
বিবিসি: এখন আপনাকে উন্নয়নের একটি বঙ্কিম পথ সম্পর্কে অপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। সবকিছু ছাপিয়ে এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। ৩০ মিলিয়ন মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রী: বিশ্বের কাছ থেকে আমাদের অধিকতর সমর্থন দরকার।
বিবিসি: সকল দীর্ঘমেয়াদি লড়াই বেগম খালেদা জিয়া ও আপনার মধ্যে চলেছে, এর অবসান হওয়া দরকার। বাংলাদেশের একটা প্রজন্মগত পরিবর্তন দরকার বলে অনেক বাংলাদেশী বলে থাকেন। আপনাদের উভয়ের উচিত হবে আগামী নির্বাচনে আপনাদের উভয়ের মঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ানো এবং নতুন নেতৃত্বকে পথ করে দেয়া।
প্রধানমন্ত্রী: এটা জনগণের উপর নির্ভর করে। যদি জনগণ বলে তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু কিছু লোক বা স্বার্থান্বেষী মহলের কথায় নয়। কেন তারা তা বলেন?
বিবিসি: আপনি কি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন? আপনি কিন্তু মজার একটা কথা বলেন, কেবল ‘আমিই এটা করতে পারি।’
প্রধানমন্ত্রী: অবশ্যই। আমার দল ও জনগণ চাইলে অবশ্যই। আর হ্যাঁ, আমি না বলে আমাদের শব্দটি আমার ব্যবহার করা উচিত ছিল। (হাসি) আমি এটা জানি।

পদ্মা সেতুর উপর প্রধানমন্ত্রীর অমরবাণী...

০৪.০৭.১২
“যেখানে তারা এক পয়সা ছাড় দেয়নি, সেখানে দুর্নীতি হলো কী করে। বরং এর পেছনে কারা আছে, তাদের কী উদ্দেশ্য তা খোঁজ নেওয়া দরকার। একটি বিশেষ কোম্পানিকে কাজ দিতে বিশ্বব্যাংক তিনবার চিঠি দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সে কোম্পানিটি ভুয়া। তাহলে দুর্নীতি কোথায়?

আমি যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবকে সরিয়েছি। প্রকল্প পরিচালককে সরিয়েছি। এর থেকে বেশি আর কে করেছে।”

০৮.০৭.১২
“বিশ্বব্যাংক একটা ব্যাংক, জানি না এ ব্যাংকের অডিট (নিরীক্ষা) হয় কি না। এ ব্যাংকে যাঁরা কাজ করেন তাদের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয় কি না। সেখানে টাকাপয়সা কী হচ্ছে, তার হিসাব-নিকাশ চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমরা বিশ্বব্যাংকের অংশীদার। তাদের হিসাব-নিকাশ বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটা আমাদের দাবি।”

-সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে

০৯.০৭.১২
“বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে এক পয়সার দুর্নীতি খুঁজে পায়নি। তবে দুর্নীতির গন্ধ পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে এক পয়সা অর্থ দেয়নি। ঋণ বাতিল করেছে। পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য সরকার দাতাদের পেছনে ঘুরবে না। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াব। নিজেদের তহবিল থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু করব।

-জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে

১১.০৭.১২
“যারা ভেবেছিল পদ্মা সেতুর দুর্নীতির কথা বলে সরকারের মুখে কালিমা লেপন করে জনবিচ্ছিন্ন করবে, তাদের ধারণা যে কতবড় ভুল ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে উল্টো দেশের মানুষ যেন সরকারের পক্ষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই আবার জেগে উঠেছে।”

-আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলনে

১৬.০৭.১২
“কোনো এক ব্যক্তিবিশেষের একটি ব্যাংকের এমডি পদ নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঋণ বন্ধ করে দেবে, এ কথা অনেকে বলেছেন, আমি আগে থেকেই শুনে আসছিলাম।”

-গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে

১৭.০৭.১২
“আমাদের ওপর অহেতুক কেউ অপবাদ চাপাবে তা বরদাশত করা হবে না। আমরা দান-খয়রাত চাই না, হাত পেতে চলতে চাই না। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সেতু নির্মাণ করে দেখিয়ে দেব আমরাও পারি।”

-জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে

২৬.০৭.১২
“আবুল হোসেন দেশপ্রেমিক। তাই তিনি দেশের সম্মান রাখতে পদত্যাগ করেছেন। কোন মন্ত্রীর ‘গাটস’ থাকে যে পদত্যাগ করে! এটা একমাত্র আওয়ামী লীগ আমলেই সম্ভব। আমাদের সেই সাহস আছে।”

“নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি দেখেই বিশ্বব্যাংক আবুল হোসেনের সঙ্গে লেগেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগের জন্য বারবার চাপ দিচ্ছিল। সেই বিশেষ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো কমিশন খেয়েছে কি না, আপনারা সাংবাদিকেরা সেটা খতিয়ে দেখেন।”

-লন্ডনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে

পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ফাঁস হলো যেভাবে

ভোরের কাগজ : ২৯/০৭/২০১২

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : রুমানা হাসানের ঘটনা, টেংরাটিলা গ্যাসের ঘুষের কারণে ক্যালগরির নাইকো কোম্পানিকে ৯৪ লাখ ৯৯ হাজার ডলার জরিমানা, মঞ্জুর মোরশেদ নামে এক প্রতারক ৭টি কন্ডো বিক্রির নামে ২ কোটি ডলার প্রতারণা প্রভৃতি নেতিবাচক ঘটনার পর আবার দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত হলেন বাংলাদেশী-কানাডিয়ান মোহাম্মদ ইসমাইল।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এসএনসি নাভালিনার ভাইস প্রসিডেন্ট রমেশ সাহা ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান আর আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল বাংলাদেশী-কানাডিয়ান। ইসমাইলের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া। তিনি বুয়েটের ৮৯ ব্যাচের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। কানাডা এসে অটোয়ার কার্লটন ভার্সিটি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে প্রথমে অটোয়ায় স্ট্যানটেক চাকরি করে পরে এসএনসি নাভালিনার কোম্পানিতে যোগ দেন। তিনি প্রথমে ২০০৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত মেটেরিয়াল এক্সপার্ট, ২০০৬ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং ২০০৮ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এসএনসি-নাভালিনার পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর রমেশ সাহা (৬২) বর্তমানে সাসকাচুয়ানের একটি ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। আর মিসিসাগার মোহাম্মাদ ইসমাইল (৪৯) টরন্টোর অকভিলে ২০১১ জুন থেকে এএসসিও নামে নিজ ফার্মের প্রেসিডেন্ট এবং সিও।

রমেশ সাহা ইতোপূর্বে বাংলাদেশে ২-১টি প্রকল্পে এসএনসির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। তার আউট-পুন এবং আচরণ সন্তোষজনক নয় বলে তাকে শুরুতে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চায়নি। সে জন্যই উক্ত কোম্পানি প্রথমে তাকে এ প্রকল্পের প্রস্তাব প্রণয়ন ও দাখিলের সঙ্গে যুক্ত করেনি। ইসমাইলের সঙ্গে তার সদভাব ছিল না। ফলে কারিগরি মূল্যায়নে এসএনসি প্রথম হতে না পারায় রমেশ কৌশলের ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে ইসমাইলকে কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরপরই সাহাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেন এবং তার পরিবর্তে ইসমাইল নিজেই বাংলাদেশে এসএনসির প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। উক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কেভিন ওয়ালেসের সঙ্গে বাংলাদেশে আসেন এবং দেনদরবার করেন।

২০১১ সালে মোহাম্মদ ইসমাইল বাংলাদেশে গিয়ে হোটেল শেরাটনে অবস্থান করেন এবং ঢাকা ক্লাবে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করে তা রমেশ সাহাকে প্রতিনিয়ত রিপোর্ট করতেন, যা রমেশ ডায়েরিতে নোট করতেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে বিষয়টি ফাঁস করে দেন। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি প্রকাশ পায়। অন্য একটি প্রজেক্টের কারণে মোহাম্মদ ইসমাইলকে চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে রমেশ সাহা ভূমিকা রাখেন। ঘটনার জের ধরে ইসমাইল পরবর্তীতে রমেশকেও চাকরি থেকে আউট করে দেন।

প্রতিহিংসার কারণেই অফিসিয়াল সিক্রেট বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগরিটি ডিপার্টমেন্টের কানে পৌঁছে। তারপর শুরু হয় হৈচৈ। বিষয়টি কানাডা সরকারকে জানালে অভিযুক্ত কোম্পানি এসএনসি নাভালিনার বিরুদ্ধে রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেন পুলিশ তদন্ত শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর নাভালিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশী টাকায় ৩৪৫ কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায়। ফলে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের চুক্তি বাতিল করে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ইসমাইলকে আরসিএমপি গ্রেপ্তার করে। পরে রমেশ সাহাকেও আটক করা হয়। তারা দুজনেই মুচলেকা দিয়ে বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। আগামী বছর এপ্রিলে তাদের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে বিচার শুরু হবে। বাংলাদেশ ও নেপালে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এলেন গোল্ডস্টেইন স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বব্যাংকের এ রিপোর্টের জন্যই রমেশ আর ইসমাইলকে গ্রেপ্তার হয়েছে। কানাডিয়ান দৈনিক গ্লোব এন্ড মেইলের মাধ্যমে জানা যায়, নাভালিনার আরেক প্রকৌশলীকে সুইজারল্যান্ডে আটক করা হয়েছে। মন্ট্রিয়ল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাভালিনা কানাডার একটি নামকরা কোম্পানি হলেও এদের বদনামও রয়েছে। যদিও ক’দিন আগে এসএনসি-নাভালিনা নিজ দেশের ৫০টি সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১তম স্থান অর্জন করে নিন্দিত থেকে নন্দিত হলো। অনেকেই মনে করছেন, নিজেদের বদনাম ঢাকার জন্যই এটা সাজানো ব্যাপার।

রমেশ-ইসমাইল ছাড়াও টরন্টোতে বসবাস করেন এমন চারজনের কাছে নাভালিনা মনোনীত ব্যক্তি অর্থ দিয়েছে, এমন তথ্য প্রমাণ কানাডিয়ান পুলিশের কাছে আছে। তাদের তিনজন সম্প্রতি ঢাকা সফর করেছেন। তাদের প্রত্যেককেই ঢাকায় প্লট বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে যদি রুমানা হাসান, মঞ্জুর মোরশেদ, নাইকো, নাভালিনা, ইসমাইলরা তাদের অপকর্মকা- ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রাখেন, তাহলে কানাডায় আমাদের মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না!

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : কবি, সাংবাদিক।
http://www.bhorerkagoj.net/new/blog/2012/07/29/67492.php

আবুল হোসেন ‘দেশপ্রেমিক’

সদ্য পদত্যাগী মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রশংসা করে তাঁকে দেশপ্রেমিক হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার রাতে লন্ডনে একটি হোটেলে স্থানীয় বাংলা গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আবুল হোসেন দেশপ্রেমিক। তাই তিনি দেশের সম্মান রাখতে পদত্যাগ করেছেন। কোন মন্ত্রীর গাটস থাকে যে পদত্যাগ করে! এটা একমাত্র আওয়ামী লীগ আমলেই সম্ভব। আমাদের সেই সাহস আছে।’
ব্রিটেনের রানির আমন্ত্রণে লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে লন্ডন পৌঁছান শেখ হাসিনা। সন্ধ্যায় তিনি লন্ডনে কর্মরত বাংলা গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে ইফতার ও মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার রাশেদ চৌধুরী ও সোশ্যাল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সৈয়দ আলীর পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন।
পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা পিছু হটে না। আমি বলেছি, দেশের টাকায় পদ্মা সেতু হবে, সেটা হবেই।’
পদ্মা সেতু দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির গত আমল থেকেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে সহায়তা বন্ধ করছে। পদ্মা সেতু নিয়ে তারা যে কাণ্ড করছে, সেটা ভিত্তিহীন। নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি দেখেই বিশ্বব্যাংক আবুল হোসেনের সঙ্গে লেগেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগের জন্য বারবার চাপ দিচ্ছিল। সেই বিশেষ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো কমিশন খেয়েছে কি না, আপনারা সাংবাদিকেরা সেটা খতিয়ে দেখেন।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘সরকার ইতিমধ্যেই দেড় হাজার কোটি টাকা নিজস্ব অর্থায়ন থেকে খরচ করেছে। আমাদের সে উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। কোনো সংস্থা যদি এগিয়ে আসে আমাদের সহায়তার জন্য, আমরা সেটা নেব। তবে আমরা কারও কাছে হাত পাতব না, আমরা স্বনির্ভরভাবেই পদ্মা সেতু করব।’
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতিসংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দেন তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। একই সঙ্গে ছুটিতে গেছেন সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণ করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রগুলো বলেছে। বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি অব্যাহত রাখতে মন্ত্রীসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার নাম দিয়ে তাঁদের ছুটিতে পাঠানোর শর্ত দিয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। এ সময় সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। গত জানুয়ারিতে তাঁকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নামে একটি নতুন মন্ত্রণালয় করে তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সৈয়দ আবুল হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের দুই দফায় দুবার মন্ত্রী হয়েছিলেন। দুবারই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। দুই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশভ্রমণের দায়ে তাঁর মন্ত্রিত্ব যায়। আর এবার গেল পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে।

লন্ডনে অন্যান্য প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী
প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি লন্ডন-সিলেট-লন্ডন সরাসরি ফ্লাইটের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শিগগিরই লন্ডন-সিলেট-লন্ডন ফ্লাইট চালু করা হবে। প্রবাসীরা যাতে দেশে গিয়ে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তার জন্য সরকার সব সময় সচেষ্ট।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ যাত্রায় আমাদের সাড়ে তিন বছরে ১০% দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে ৮৪৮ ডলার হয়েছে। গ্রামের মানুষের ব্যাপক আর্থিক উন্নতি হয়েছে। প্রতিবছর খাদ্য উত্পাদন বেড়ে চলেছে।’
স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজে আমরা নিয়োজিত আছি। প্রত্যেক ইউনিয়নে, গ্রামে এখন ইন্টারনেট-সুবিধা পৌঁছে গেছে। চার হাজার ৫৯২টি ইউনিয়নে এখন ইন্টারনেট-সুবিধা আছে, যা কিছুদিন আগে কেউ কল্পনাও করতে পারত না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির সময় দেশ ছিল সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য। আর তত্ত্বাবধায়কের সময় ছিল আতঙ্করাজ্য। এখন বাংলাদেশের সেই পরিচয় নেই। আমাদের সময় মাঝেমধ্যে দু-একটা ঘটনা ঘটছে, তবে তা ধবধবে সাদা জামার মধ্যে সামান্য ছিটেফোঁটার মতো। এ জন্যই এটা বেশি চোখে পড়ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্রিটেনে আপনারা অর্থনৈতিক মন্দা অনুভব করলেও বাংলাদেশে বসে তা বোঝার উপায় নেই। দেশের প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশ বজায় রেখেছি। আমাদের সময় সাক্ষরতার হার বেড়েছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কারণে প্রভূত উন্নতি হয়েছে।’ সিলেট অঞ্চলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের সময় এই অঞ্চল শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল। এখন এসএসসি, এইচএসসির ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, দেশের সেরা সিলেট।’
বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে তিন হাজার আট মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করেছি। আরও ছয় হাজার তিন মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজ চলছে।’
সাংবাদিকদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর ইফতার আয়োজন ও মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনার সাইদুর রহমান, ‘সাপ্তাহিক জনমত’-এর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা, সাংবাদিক বেলাল আহমদ, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও ‘সাপ্তাহিক জনমত’-এর সম্পাদক নবাব উদ্দিন, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’র সম্পাদক এমদাদুল হক চৌধুরী, ‘সাপ্তাহিক সুরমা’র সম্পাদক সৈয়দ মনসুর উদ্দিন, সাংবাদিক আবু মুসা হাসান, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজেদুর রহমান ফারুক প্রমুখ।
- দৈনিক প্রথম আলোর সৌজন্যে

যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ - হুমায়ুন আহমেদ

[এখানে যে যোগাযোগমন্ত্রীর গল্প বলা হচ্ছে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা এরশাদ আমলের মন্ত্রী নন। অন্য কোনো আমলের। তবে আনন্দের বিষয়, সব আমলের জিনিস একই। —লেখক]

যোগাযোগমন্ত্রী সালাহউদ্দিন খান ভুলু সাহেবের দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমানোর অভ্যাস। মন্ত্রীর কঠিন দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি এই অভ্যাস বহাল রেখেছেন। একটু উনিশ-বিশ অবশ্য হচ্ছে; আগে ঘুমানোর সময় একজন গায়ের ঘামাচি মেরে দিত, এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায়ই ভাবেন, পলিটিক্যাল পিএসকে ঘামাচি মারতে বলবেন। সে আগ্রহ নিয়ে কাজটা করবে। একটাই ভয়, কোনো পত্রিকায় যদি নিউজ চলে যায়! পত্রিকাগুলো চলে গেছে দুষ্টুদের দখলে। তারা সম্মানিত মন্ত্রীদের ওপর টেলিস্কোপ ফিট করে রেখেছে। আরাম করে ১০ মিনিট ঘুমানোর উপায়ও নেই।

সালাহউদ্দিন খান ভুলু দিবানিদ্রা সেরে উঠেছেন। মন-মেজাজ এখনো ধাতস্থ হয়নি। তিনি কয়েকবার হাই তুললেন। এই সময় তাঁর পিএস (সরকারি) ঢুকলেন। বিনীত গলায় বললেন, স্যারের ঘুম ভালো হয়েছে?

মন্ত্রী বললেন, আমি আপনাকে অনেকবার বলেছি, দুপুরে আমি ঘুমাই না। চোখ বন্ধ করে একধরনের যোগব্যায়াম করি। ‘শবাসন’ এই ব্যায়ামের নাম। এতে টেনশন কমে।

পিএস বললেন, স্যার, সরি। আমি যোগব্যায়ামের ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। আপনার নাক ডাকার শব্দে বিভ্রান্ত হয়েছি।

আর বিভ্রান্ত হবেন না। নাক ডাকা না। দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ফেলা যোগব্যায়ামেরই অংশ। আমার নাকে পলিপ আছে বলে দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় নাক ডাকার মতো শব্দ হয়। এখন ক্লিয়ার হয়েছে?
অবশ্যই, স্যার।

কোনো কাজে এসেছেন?

একটা রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মাইক্রোবাস ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে। পাঁচজন মারা গেছে।
অ্যাকসিডেন্ট হলে মানুষ মারা যাবে, এটা নতুন কী? এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছেন?

অনেকেই আপনাকে দুষছে। রাস্তাঘাট ভাঙা, খানাখন্দে ভরা। এই কারণেই অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে।
এটা কী মাস?

ভাদ্র মাসের শুরু।

বৃষ্টি হচ্ছে না?

রোজ বৃষ্টি হচ্ছে।

এই বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ঠিক থাকে?

থাকে না, স্যার।

বাস্তবতা বুঝতে হবে। তুচ্ছ বিষয়ে মন্ত্রীকে দুষলে হবে না। বুঝেছেন?

জি স্যার।

খরা মৌসুম আসুক, রাস্তাঘাট ঠিক হবে।

সাংবাদিকেরা আপনার কাছ থেকে শুনতে চায়।

শুনতে চাইলেই আমি শোনাব না। আপনি বলে দিন, গতবারের সরকারের যোগাযোগ খাতে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে রাস্তাঘাটের আজ এমন বেহাল দশা। একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দিন।
জি স্যার। স্টেটমেন্টের ব্যবস্থা করছি। তবে আপনাকে একটু কষ্ট করে হাসপাতালে যেতে হবে।
কেন?

মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় কিছু বিখ্যাত মানুষ মারা গেছেন। যাঁরা আহত, তাঁদের দেখতে যাওয়া উচিত।
বিখ্যাত মানুষ কে মারা গেল?

পিএস বিখ্যাত মানুষদের তালিকা বললেন।

মন্ত্রী বিরক্ত গলায় বললেন, এরা বিখ্যাত হলো কবে? আমি তো নামও শুনি নাই। মিডিয়া এদের বিখ্যাত বানিয়েছে। সব মিডিয়ার কারসাজি। দেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে মিডিয়া।

যথার্থ বলেছেন। তবে মিডিয়াকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।

হাসপাতালে গিয়ে কী বলব, ঠিক করে এনেছেন? উল্টাপাল্টা কিছু বলে ফেলতে পারি। মুডি মানুষ তো, মুডের ওপর চলি।

পিএস বললেন, আমি দুই ধরনের বক্তব্য তৈরি করে এনেছি, যেটা আপনার পছন্দ। আপনি বলবেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের কী করার আছে?

মন্ত্রী বললেন, ভালো বক্তব্য। আল্লাহর ওপর কোনো কথা নেই। ধর্মভিত্তিক দল আমার এই বক্তব্য পছন্দ করবে।

অথবা আপনি বলবেন, মাইক্রোবাসের চালকের অদক্ষতাই দুর্ঘটনার কারণ। সে ওভারটেক করতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে দোষটা ওদের ঘাড়ে গিয়েই পড়বে।

মন্ত্রী বললেন, এটাও খারাপ না। আমি বরং দুটো একত্র করে বলি। প্রথম বলি, মাইক্রোবাস চালকের ভুল। তারপর বলি, আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়েছে। বুদ্ধিটা কেমন বের করেছি?

অসাধারণ। আপনার চিন্তাধারাই বৈপ্লবিক।

আমাদের এই মুডি মন্ত্রী নানা ধরনের কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। মিডিয়া তাঁকে নিয়ে কিছু কাজকর্ম করল। মন্ত্রী যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তার বেহাল দশা দেখতে গেলেন, তখন বদগুলো তাঁর হাসিমুখের ছবি ছাপাল। রাস্তায় বিশাল এক গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাসছেন—এ রকম ছবি। এই অপরাধ ক্ষমা করা যায়, কিন্তু তাঁর পদত্যাগ চেয়ে প্রতিবেদন ক্ষমা করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছে? মন্ত্রীরা হলেন কচ্ছপ। কচ্ছপের মতো কামড় দিয়ে তাঁরা মন্ত্রিত্ব ধরে রাখবেন। এটাই নিয়ম।

মন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক সচিবের পরামর্শে কিছু জটিল পদক্ষেপ নিয়ে নিলেন। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। একটা ছোট্ট সমস্যা তাতে হলো; দেখা গেল, সবাই দুর্নীতিবাজ। রসুনের বোঁটা অবস্থা। একজনকে শাস্তি দিলে বাকিরা খেপে যাবে। ওদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। কাজেই অনেক ঝামেলা করে একজন সৎ কর্মচারী খুঁজে তাঁকে বরখাস্ত করা হলো।
মন্ত্রী মহোদয় সব পত্রিকায় তাঁর একটি ছবি পাঠালেন। সেই ছবিতে তিনি কোদাল হাতে ভাঙা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো। নিচে লেখা, ‘মন্ত্রী মহোদয় নিজেই রাস্তা মেরামতে নেমে পড়েছেন’।
কোনো পত্রিকা এই ছবি ছাপাল না, উল্টো এক বদ পত্রিকা এই ছবি নিয়ে কার্টুন বানিয়ে ছাপিয়ে ফেলল। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, রাক্ষস টাইপ চেহারার এক লোক খালি গায়ে খাকি হাফপ্যান্ট পরে বেলচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ের এবং পায়ের বড় বড় লোম দেখা যাচ্ছে। কার্টুনের নিচে লেখা, ‘যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, আমি একাই ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করব, ইনশাআল্লাহ।’
মন্ত্রী তাঁর পিএসকে ডেকে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, তিন কোটি টাকার একটা মানহানি মামলার ব্যবস্থা করুন। আমার ছবি বিকৃত করে ছেপে আমার মানহানি করেছে।

পিএস বললেন, বিকৃত করে তো ছাপে নাই, স্যার। কার্টুনে আপনাকে চেনা যায়।
আমাকে চেনা যায়?
জি স্যার।
আমার গা-ভর্তি লোম?

লোমের পয়েন্টে মামলা করতে পারেন। তবে এখন নতুন ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না। এরপর এরা নিউজ করে দেবে—কার্টুন ছবিতে মন্ত্রীর গায়ের লোম দেখানোয় এক কোটি টাকার মানহানির মামলা।
এক সকালবেলার কথা। মন্ত্রীর স্ত্রী সালমা বানু (বিশিষ্ট সমাজসেবী, পরিবেশ রক্ষাকর্মী, বিপন্ন হনুমান বাঁচাও আন্দোলনের সভানেত্রী) তাঁর স্বামীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে তীক্ষ গলায় বললেন, আমাকে না জানিয়ে, আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে তুমি কী করে এই কাজ করলে?
মন্ত্রী বললেন, কী কাজ করলাম?

পদত্যাগ করেছ, আমাকে না জানিয়ে।
পদত্যাগ করব কোন দুঃখে?
পত্রিকায় নিউজ এসেছে। এই দেখো।

মন্ত্রী মহোদয় হতভম্ব হয়ে পড়লেন, ‘যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী মহোদয় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।’

হতভম্ব মন্ত্রী তাঁর পিএসকে টেলিফোন করলেন। অনেকবার রিং হলো, পিএস ধরলেন না। তিনিও নিউজ পড়েছেন। এখন যে মন্ত্রী নন তাঁর টেলিফোন কেন ধরবেন! আমজনতার টেলিফোন ধরার কিছু নেই।

মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পিএসকে টেলিফোন করলেন। পিএস তাঁর কোনো কথা না শুনেই বললেন, পদত্যাগ করে ভালো করেছেন। দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আচ্ছা রাখি।
মন্ত্রী লাইন কেটে দেওয়ার পর অনেকবার চেষ্টা করলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব টেলিফোন ধরলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি লক্ষ করলেন, পত্রিকার এই বানোয়াট খবর সবাই বিশ্বাস করে বসে আছে। তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর সিগারেট ফুঁকছিল, তাঁকে দেখে সিগারেট ফেলে না দিয়ে শুধু পেছনে আড়াল করল।

মন্ত্রী মহোদয় প্রধানমন্ত্রীকে ধরার অনেক চেষ্টা করলেন। তাঁর চেষ্টা দেখতে পেলে রবার্ট ব্রুসও লজ্জা পেত। একসময় চেষ্টা সফল হলো। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন ধরলেন এবং বললেন, আপনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। মন্ত্রী না থেকেও জনগণের সেবা করা যায়। জনগণের সেবা করুন।
প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন রেখে দিলেন।

[গল্পের মোরাল: মন্ত্রীদের বুকে এবং পায়ে লোম না থাকা বাঞ্ছনীয়।]

- সৌজন্যে প্রথম আলো

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla