Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

পদ্মা সেতুর ইউনুস নামা ও ইত্যাদি

Padma Bridge
বিশ্বব্যাংক এবং পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর অনেক দেশের রাজধানী এখন সরব। মিডিয়াও ফলাও করে প্রচার করছে সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তের খবর। প্রচার পেলেও বাংলাদেশ ছাড়া দ্বিতীয় কোন দেশের সাধারণ মানুষ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে এমনটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। কারণ বাংলাদেশ নিয়ে এসব খবর বাকি বিশ্বের জন্যে নতুন কোন খবর নয়। স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্ব মানচিত্রে আবির্ভূত হওয়ার শুরু হতেই প্রচার মাধ্যমে বাংলাদেশের খবর স্থান পেয়ে আসছে ভুল কারণে। বন্যা, খরা, সন্ত্রাস, খুন, গুম, দুর্নীতিতে হ্যাটট্রিক শিরোপা সহ জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ে এমন সব আতঙ্কজনক খবর প্রচার পাচ্ছে যা দেশ হিসাবে বাংলাদেশের পরিচয়ে নিগেটিভ কিছু কম্পোনেন্ট স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাই দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে বিশ্ব মিডিয়া বাংলাদেশের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে হাইলাইট করছে বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যকে। নয় মাস আগে এ জাতীয় দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম প্রকাশ করে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের বিখ্যাত উইকিলিকস। সরকারের উঁচু মহল এ খবরটাকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অর্থমন্ত্রীর সিগনেচার মন্তব্য ’রাবিশ’ কায়দায় উড়িয়ে দেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্রথম হতেই সিরিয়াস ছিল এবং ঘটনার সূত্রধরে কানাডার জনৈক কোম্পানীর অফিসে পর্যন্ত হানা দিয়েছিল। সরকারের তাতেও ঘুম ভাঙ্গেনি। হয়ত ভেবেছিল বিরোধী দল ঠেঙ্গানোর কায়দায় বিশ্বব্যাংককেও ঠেঙ্গিয়ে লোন আদায় করে নেবে। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরণের লোন বন্ধ এবং পরবর্তীতে নতুন করে সচল করার কাহিনী বিশ্বব্যাংকের জন্যে এই প্রথম নয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার ইতিহাস ঘাঁটলে এর পক্ষে প্রমণ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ সরকারের হয়ত তা ভাল করেই জানা ছিল। এ যাত্রায় বিশ্বব্যাংক তার সিদ্ধান্তে এতটা অটল থাকবে সরকারের জন্যে তা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এবং এখানেই ভূত হিসাবে দৃশ্যপটে হাজির করা হচ্ছে দেশের নোবেল লরিয়েট ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসকে।

বিশ্বব্যাংক কাগজে কলমে যদিও একটি স্বাধীন সংস্থা কিন্তু এ কোন লুকানো সত্য নয় যে সংস্থার প্রায় সবটাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যাংকের প্রধান পদটি অলিখিতভাবে নির্দিষ্ট করা থাকে মার্কিন নাগরিকদের জন্যে। সে দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভাব বিশ্বব্যাংকের লেনাদেনা কে প্রভাবিত করেনা এমনটা ভাবা হবে বোকামি। গেল দুবছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি ঘটেছে। সরকারের কোন মহলেই এ নিয়ে লুকোচুরি ছিলনা। অবশ্যই এর অন্যতম কারণ ডক্টর মোহম্মদ ইউনুস। মার্কিন সরকার বাকি বিশ্বের অন্তত ১০০ দেশের সরকারের মত ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংক ভিত্তিক মাইক্রো ক্রেডিটকে উৎসাহ দিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন ফোরামে তা প্রমোট করছে। ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের রিকমেনডেশন ছিল তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার পরে না। নোবেল পুরস্কার প্রদান প্রসেসটাই এরকম, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে বিখ্যাত সব ব্যক্তিরা মনোনয়ন পাঠায় এবং নোবেল কমিটি তা যাচাই বাছাই পূর্বক একজনকে মনোনিত করে। এ বিবেচনায় বিল ক্লিনটনের পছন্দ ডক্টর মোহম্মদ ইউনুস হয়ে থাকলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে এমনটা ভাবা হবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। ক্লিনটন পরিবারের সাথে ডক্টর ইউনুসের বন্ধুত্ব বিল ক্লিনটন যখন আরকানস অঙ্গরাজ্যের গর্ভনর ছিলেন সে আমল হতে। ক্লিনটন আমেরিকার ইতিহাসে সফলতম প্রেসিডেন্টদের একজন। তার আমলেই আমেরিকার অর্থনীতি ফুলে ফেপে আকাশে উঠেছিল। বেকারত্ব নেমে এসেছিল সর্বকালের নিম্ন পর্যায়ে। এমন একজন সফল প্রেসিডেন্টের পছন্দকে বাংলাদেশের অসুস্থ রাজনীতির দাড়িপাল্লায় বিচার পূর্বক শাস্তি দেয়া হবে অলীক, অবাস্তব ও ঘোরতর অন্যায়। ওবামা প্রশাসন একাধিকবার অনুরোধ করেছিল ইউনুসকে যেন সরকারের আক্রোশ হতে রেহাই দেয়া হয়। এ অনুরোধ নিয়ে দেশটার বেশ কজন আন্ডার সেক্রেটারী বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং সরকারের উঁচুমহলে দেখা করে মার্কিন সরকারের মনোভাব সরকার প্রধান সহ অনেকের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার ব্যস্ত ছিল অন্য মিশনে। এখানে গোটা সরকার বললে অনেকটাই বাড়িয়ে বলা হবে, বরং সরকার প্রধান বলাটা হবে যুক্তিসঙ্গত। ইউনুসকে গ্রামীন ব্যাংক হতে সরানো সরকার প্রধানের জন্যে জরুরি ছিল দুটো কারণে; প্রথমত, ১/১১’র আমলে রাজনীতিতে প্রবেশ চেষ্টার ’অপরাধ’ ও শাস্তি, দ্বিতীয়ত, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের পরিচয়ে প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবের নাম পেছনে ফেলে সে আসনে ইউনুস নাম প্রতিষ্ঠার ’অপরাধ’ ও শাস্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। দেশটা ঘোষক আর পিতা রোগে আক্রান্ত নয় যে পছন্দ অপছন্দের জন্যে বাংলাদেশের দ্বারস্থ হতে হবে। তারা পছন্দ করছে বাংলাদেশের ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসকে আর আমরা তাকে শাস্তি দিচ্ছি; দুটো সার্বভৌম দেশের নিজ নিজ সিদ্ধান্ত আর পছন্দ অপছন্দকে স্বাগত জানানোটাই হোত পারস্পরিক সন্মান শ্রদ্ধার চিহ্ন। ডক্টর মোহম্মদ ইউনুস আসলেই কি বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে গিয়ে আর্জি জানিয়েছিলেন পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের জন্যে? এখানেই চলে আসে অপ্রিয় কিছু সত্য কথন।

০.৭৫% হারে পদ্মা সেতুর জন্যে লোন দিতে বিশ্বব্যাংক কি বাধ্য ছিল, নাকি আমরা নিজেদের স্বার্থেই ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিলাম সহজ শর্তের এ লোনের জন্যে? আর আমরাই যদি করে থাকি তাহলে আমাদের কি জানা ছিলনা এই ব্যাংকের প্রায় সবটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক? একই দেশের সাথে বিভিন্ন কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে এই লোন পাওয়া যে সহজ হবেনা তা কি সরকারের বাঘা বাঘা উপদেষ্টা আর অথর্ব মন্ত্রীদের মগজে প্রশ্ন জাগেনি? এখানেই প্রশ্ন উঠে ডক্টর মোহম্মদ ইউনুসকে কি গায়ের জোরে, বয়সের মত হাস্যকর যুক্তি দিয়ে গ্রামীন ব্যাংক হতে সরানোটা জরুরি ছিল, নাকি ক্ষমতাধর এই বাংলাদেশিকে সাথে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে দেশের জন্যে সুবিধাদি আদায় করাটা ছিল বেশি জরুরি? ইউনুস কি গ্রামীন ব্যাংক নিয়ে সুরঞ্জিত বাবুর মত রাতের আধারে বমাল ধরা পরেছিলেন, নাকি অবৈধ টাকা কামিয়ে ভূমধ্যসাগরের কোন দ্বীপে প্রাসাদ বানিয়েছিলেন যার জন্যে তার প্রস্থানটা ছিল বাধ্যতামূলক? উনি সুদের ব্যবসা করেন, এই ব্যবসার ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু গোটা বিশ্বকে অখুশি করে দেশীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা যে বর্তমান দুনিয়ায় সহজ নয় রাজনীতি করতে গেলে এ সহজ সত্য গুলো উপলব্ধি করার সময় এসেছে। এখানেই প্রশ্ন আসে প্রধানমন্ত্রী উদ্দেশ্য ও সততা নিয়ে। উনার কাছে কি পদ্মা সেতুটা জরুরি ছিল, নাকি জরুরি ছিল বাবার নাম প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপক্ষ নির্মূল করার মত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মিশন বাস্তবায়ন? গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়ায় একসাথে দুটো কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু হতে সরে গেছে। এ নিয়ে ব্যাংকের চরিত্র হননের চেষ্টা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন নতুন বাঁধা সৃষ্টির হাতিয়ার হিসাবে কাজ করবে মাত্র। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ে বিচারক সাজার আসনে বসে নেই বাংলাদেশ। ১৬ কোটি মানুষের পেটে ভাত আর মাথার উপর যেনতেন ছাদ নিশ্চিত করার কাজে এ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে পোষাক রপ্তানী আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোতে আদম রফতানির কোন বিকল্প তৈরী হয়নি।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা যাচ্ছে সৌদি আরব সে দেশে বসবাসরত বিশ লাখ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে ঢাকায় নিহত দেশটার কুটনীতিক হত্যার বিচারে সরকারের ব্যর্থতা ও অনীহার কথা। সৌদি ঘোষনা আসা মাত্র সরকারের প্রচার যন্ত্র হুমড়ি খেয়ে পরবে জামাতিদের উপর। উপলক্ষ হিসাবে টেনে আনবে যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রসঙ্গ। মার্কিন পররাষ্ট্র সেক্রেটারী হিলারি ক্লিনটন হাল্কা করে হলেও হুমকি দিয়ে গেছেন আমিনুল হক নামের শ্রমিক নেতা হত্যার বিচার না হলে দেশটায় পোশাক রফতানি অনিশ্চয়তার কথা। জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করার মত অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। যতদিন এ অবস্থান তৈরী না হচ্ছে ততদিন কুমিরের সাথে বুঝা পরার মাধ্যমে কি করে বেচে থাকা যায় সে কৌশল আবিস্কার করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সুরঞ্জিত বাবুর মত চোর আর পিতা-ঘোষকের অসুস্থ লড়াই চালিয়ে আগামী ১০০ বছরে যদি সে অবস্থানে যাওয়া যায় তাই হবে চরম পাওয়া।

Comments

news for sheikh Hasina

We are out of law because we are enforceable.
Now no right poor. the law for them.
they are oppressor, they are unable to protect this
the Bangladesh Police doing all the work to their wishes. no need to take any step without money.
police are king in thana. we are fallen in a depth hole
the request of poor is vibe to the police.

গ্রামীণ vs. সোনালী

Kicking Grameen Bank for being honest and embracing Sonali Bank for Tk 3,547 crore scam! Way to go "Awami League"...

ক্ষমতায় গেলে ইউনূসের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হবে মওদুদ

সমকাল প্রতিবেদক

গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপকে 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস' হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্মান ও গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল রোববার 'রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক : নাগরিক ভাবনা' শিরোনামে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। 'বাংলাদেশ প্রজন্ম একাডেমী' আয়োজিত আলোচনা সভায় সংগঠনের উপদেষ্টা মেজর (অব.) মেহবুব রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি নেতা আবদুল মতিন প্রধান, হাফিজুর রহমান কবীর, সংগঠনের সভাপতি কালাম ফয়েজি, জিয়া সেনা নেতা মঞ্জুর হোসেন ইসা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিচে নামাতে গিয়ে সরকার নিজেই নিচে নেমে যাচ্ছে_ তা বুঝতে পারছে না। ড. ইউনূসের প্রতি প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিহিংসা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলীয়ভাবে নয়, জাতীয়ভাবে তাকে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।' স্বাধীনতার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল বিজয় সবচেয়ে বড় অর্জন বলে দাবি করে তিনি বলেন, 'সরকারের হীনমন্যতার কারণে জাতিকে সরকার কলঙ্কিত করেছে। সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে উল্লেখ করে মওদুদ আহমদ বলেন, 'কেন তার করের হিসাব নেওয়া হচ্ছে? সরকার তাকে নিয়ে কী করতে চায়? মানুষ ইউনূসের প্রতি সরকারের এ আচরণ মেনে নেবে না। ব্যালট বাক্সে জনগণ এর জবাব দেবে।'

সরকারের ব্যর্থতার স্বীকৃতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালা লাগিয়ে সবাইকে বাড়ি যেতে বলেছেন।' তিনি পাল্টা প্রশ্ন রাখেন_ 'সবাই কি তালা খুলে বাড়িতে যায়?' ড. ইউনূসকে সরকার নানাভাবে হয়রানি ও অপমান করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, 'আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলীয়ভাবে নয়, জাতীয়ভাবে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে তাকে স্বীকৃতি জানানো হবে। তার সম্মান ও গৌরব আমরা ফিরিয়ে দেব। তাই সরকারকে বলছি, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে আর অপমান করবেন না। প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত বন্ধ করুন।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'আমরা মনে করি, অধ্যাপক ইউনূসের মতো একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এ সরকারের আমলে একজন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কোথায়, তা আজ সবাই বুঝতে পারছে।' তিনি বলেন, 'বিএনপি ক্ষমতায় গেলে গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো অনুযায়ী ড. ইউনূসের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। কেবল তাই নয়, আমরা অধ্যাপক ইউনূসের বিশ্বব্যাপী যে খ্যাতি রয়েছে, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করব।'

প্রসঙ্গত, ২ আগস্ট গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিধি পরিবর্তন করে 'সংশোধিত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ' জারির সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ইউনূসের নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কি-না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে ইউনূস ওয়েজ আর্নার হিসেবে বিদেশ থেকে কত টাকা এনেছিলেন; তিনি তা আনতে পারেন কি-না; ওই টাকার জন্য কী পরিমাণ কর অব্যাহতি নিয়েছেন ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। এ মাসেই এ প্রতিবেদন জমা দেবে এনবিআর।
http://www.shamokal.com/

নাইকো কেলেঙ্কারির হোতা তৌফিক-ই-ইলাহী!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা ছাড়াই বারবাডোসে নিবন্ধিত অখ্যাত ও অনভিজ্ঞ ক্ষুদ্র কানাডীয় কম্পানি নাইকো রিসোর্সেসের সঙ্গে পেট্রোবাংলা বা বাপেক্সের তথাকথিত জয়েন্ট ভেঞ্চার দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিত্যক্ত ও প্রান্তিক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের নামে দেশবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে এ দেশের কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের ১ দশমিক শূন্য ১৯ ট্রিলিয়ন গ্যাসের নিশ্চিত মজুদের মালিক বনে যায় নাইকো। এতে বাংলাদেশকে এখন নিজস্ব গ্যাসসম্পদ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় কিনতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশবিরোধী এই নাইকো চুক্তির `মূল নায়ক` বা `হোতা` হলেন সাবেক জ্বালানিসচিব এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। সে সময় তিনি নাইকোর পক্ষে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদনের জন্য কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নানা জালজালিয়াতিরও আশ্রয় নেওয়া হয়। তবে বিএনপি সরকারের সময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বেলায়ও দায়িত্বে না থাকলেও এই তৌফিক-ই-ইলাহীর ছক অনুযায়ীই সব কিছু হয়। জানা গেছে, শুরু থেকেই নাইকোর পক্ষে কাজ করেন তাঁর ভাগ্নে নাইকোর ভাইস প্রেসিডেন্ট (দক্ষিণ এশিয়া) কাশেম শরীফ।

তৌফিক-ই-ইলাহীর জাতীয় স্বার্থবিরোধী ভূমিকার কারণে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তারও দেখানো হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে দাবি করে এ সম্পর্কিত কমিটি তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও দুদক প্রত্যাহার করেনি। খালেদা জিয়া ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে দুটি মামলার কার্যক্রমই বর্তমানে স্থগিত আছে।

শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারের সময় নাইকো রিসোর্সেস তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সেকেন্ড রাউন্ড বিডিংয়ে অংশ নিলেও ৯ ও ১০ নম্বর ব্লকে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া তাল্লো ও শেল/কেয়ার্নের চেয়ে যথাক্রমে ৪২.৯ ও ৫০.৮ নম্বর কম পায়। তাই কোনো ব্লকই বরাদ্দ না পেয়ে নাইকো ভারতে পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে পূর্ব-অভিজ্ঞতার দাবি করে প্রান্তিক ও পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ও উৎপাদনের একটি প্রস্তাব ১৯৯৯ সালের ২১ জুন তদানীন্তন জ্বালানিসচিব ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর কাছে পেশ করে। পরে ২৮ জুন নাইকো ছাতক, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত ও প্রান্তিক চিহ্নিত করে বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার আগ্রহ দেখায়। ১৯৯৯ সালের ১ জুলাই তৌফিক-ই-ইলাহীর সভাপতিত্বে এক সভায় নাইকোর প্রস্তাব গ্রহণ এবং ছাতক, কামতা ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্রকে প্রান্তিক হিসেবে উন্নয়ন ও উৎপাদন এবং এ জন্য বাপেক্স ও নাইকোর মধ্যে যৌথ অংশীদারি চুক্তির (জেভিএ) সিদ্ধান্ত হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নাইকোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে ১৯৯৯ সালের ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠায়। এতে নাইকোর অযাচিত প্রস্তাব গ্রহণ করে `সুইস চ্যালেঞ্জ` নামের অননুমোদিত নতুন এক পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব পাওয়ার ব্যাপারে দরপত্র আহ্বান এবং প্রাপ্ত প্রস্তাব গ্রহণে নাইকোর অগ্রাধিকার থেকে যায়।

১৯৯১ সালের ২৩ আগস্ট বাপেক্স এবং নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেডের যৌথ সহযোগিতায় ছাতক, ফেনী ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রের মূল্যায়নের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এফওইউ) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যৌথ সমীক্ষাটি গ্যাস মজুদ নিরূপণ, কূপ খনন পরিকল্পনা এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যয় প্রাক্কলনে সীমাবদ্ধ বলে দেখানো হয়। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাপেক্স এবং নাইকোর যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন সম্পন্ন হলে দেখা যায়, সব প্রক্রিয়াই নাইকোর অনুকূলে চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত `সুইস চ্যালেঞ্জ`-এর কথা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংশ্লিষ্টরা ভুলে যান। তবে এ সময় আলোচ্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি পরিত্যক্ত ঘোষণার নীতিমালাও তৈরি হয়নি। ২০০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর `প্রান্তিক/পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন নীতিমালা` প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির সুপারিশ প্রধানমন্ত্রী ২০০১ সালের ৬ জুন অনুমোদন করেন।

পরবর্তীকালে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের আট দিন পর ১৪ জুন এ নীতিমালায় যুক্ত ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সাল থেকে নাইকোর সঙ্গে সম্পাদিত সব কার্যক্রম অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে। পরবর্তীকালে ঊর্ধ্বতন মহলের অভিপ্রায়ে তিনটি গ্যাসক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত/প্রান্তিক ঘোষণা করা হয়। এ বিষয়টি উপযুক্ত কারিগরি কর্তৃপক্ষ দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও জানা যায়।

২০০১ সালের ৩ জুলাই এক পত্রে নাইকো ছাতক (পূর্ব) গ্যাসক্ষেত্রকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের অন্তর্ভুক্ত করা হলে ওই অংশের জন্য আকর্ষণীয় আর্থিক শর্ত প্রদানের ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য এর আগে ২০০১ সালের জুনে সরকার ঘোষিত প্রান্তিক/পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন পদ্ধতিতে আলাদা এলাকা সত্ত্বেও ছাতক (পশ্চিম) ও ছাতক (পূর্ব) এলাকাকে একটি গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু যখন নাইকোকে বলা হলো, ছাতক (পশ্চিম) হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র, ছাতক (পূর্ব) নয়, তখন নাইকো তা মানতে অস্বীকার করে।

২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বাপেক্সের সঙ্গে নাইকোর চুক্তির প্রক্রিয়া নাকচ হয়ে যায়। সরকারের প্রভাবশালী মহল, বিশেষ করে হাওয়া ভবনের গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে ম্যানেজ করা হলে সরকারের সব অঙ্গ একযোগে নাইকোর স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীকেও ম্যানেজ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তিনিই নাইকোকে কাজ উদ্ধারের পদ্ধতি বাতলে দেন। কানাডীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি ছাড়াও নাইকোর স্বার্থরক্ষায় কানাডীয় এক মন্ত্রী ঢাকা সফর করেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকায় কামাল সিদ্দিকীর নাইকোর পক্ষে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের ওপর দফায় দফায় চাপ প্রয়োগ সম্ভব হয় বলে জানা যায়।

২০০২ সালের ৮ জুলাই বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে লেখা পত্রে নাইকোর ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ ছাতককে (পূর্ব) অন্তর্ভুক্ত করা না হলে তাঁদের পক্ষে জয়েন্ট ভেঞ্চার করা সম্ভব হবে না বলে জানান। বাপেক্স নাইকোর এ হুমকির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে এ বিষয়ে ২০০২ সালের ২৯ জুলাই জ্বালানিসচিব খায়রুজ্জামান চৌধুরী সভা আহ্বান করেন।

এদিকে বাপেক্স-নাইকো জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির খসড়া সম্পর্কে বাপেক্স ২০০২ সালের ২০ আগস্ট পেট্রোবাংলার কাছে যে মতামত পাঠায় তাতে বলা হয়, জ্বালানি বিভাগের ২০০২ সালের ২৯ জুলাই সভার সিদ্ধান্তের আলোকে প্রস্তাবিত জয়েন্ট ভেঞ্চারে এখন থেকে ছাতক গ্যাসক্ষেত্র বলতে ছাতককে (পশ্চিম) বোঝাবে এবং জয়েন্ট ভেঞ্চারের আওতায় ছাতক (পশ্চিম) ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্রকে বোঝাবে। নাইকো সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বদলের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেয়।

বাপেক্স তথা পেট্রোবাংলার সিদ্ধান্তে নাইকোর চাহিদা পূরণ না হওয়ায় খায়রুজ্জামান চৌধুরীকে বদলি করে প্রথমে খন্দকার শহীদুল ইসলাম ও পরে নজরুল ইসলামকে সচিব করা হয়। পেট্রোবাংলার ওপর প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ থেকে নাইকোর অনুকূলে মতামত দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। নাইকোর অনুকূলে মতামতদানের জন্য বারবার তাগিদ এবং চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পেট্রোবাংলা তথা বাপেক্স নাইকোর অভিপ্রায় অনুযায়ী ছাতককে (পূর্ব) ছাতক (পশ্চিম) পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রের আওতাভুক্ত দেখাতে বাধ্য হয়। চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া শুরুর প্রাথমিক অনুমোদন চাওয়া হলে ২০০৩ সালের ১৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন করেন। এ অনুমোদনের ভিত্তিতে চুক্তির খসড়া ও কাঠামো তৈরির জন্য পেট্রোবাংলা একটি কমিটি গঠন করে। চুক্তির খসড়া প্রথমে বাপেক্সে ও পরে পেট্রোবাংলার বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়। এরপর মতামতের জন্য অর্থ এবং আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যাওয়া মাত্রই আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তা অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন। আইনমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি ছিলেন নাইকোর আইন উপদেষ্টা। আর নাইকোর `প্রধান পৃষ্ঠপোষক` ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মওদুদ আহমদের ভায়রা।

এরপর চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে সার-সংক্ষেপ তৈরি হয়। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন চুক্তির খসড়াসহ সার-সংক্ষেপ হাতে করে নিয়ে ২০০৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

বাপেক্স এবং নাইকোর মধ্যে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি করার জন্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী পেট্রোবাংলাকে যে নির্দেশ দেন তার নোটে প্রতিমন্ত্রী লেখেন, ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তিনি চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করেছেন। ২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীর সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন নোটে দাবি করেন, `মুখ্য সচিব টেলিফোনে আমাকে এই যৌথ সহযোগিতা চুক্তি (জেভিএ) চূড়ান্তকরণের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন এবং সেই নির্দেশ অনুযায়ী চুক্তি চূড়ান্ত করার অনুরোধ জানান।`

নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে লিখিত চূড়ান্ত অনুমোদন অপরিহার্য। তাছাড়া তিনি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও ছিলেন বলে ফাইল এবং সার-সংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সরকারের কার্যবিধিমালায় (রুলস অব বিজনেস) এ ধরনের চুক্তি করার আগে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর বাপেক্স ও নাইকোর মধ্যে প্রান্তিক/পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি হয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকায় নাইকোর সঙ্গে বাপেক্সের চুক্তিটি তাই বৈধ নয়।

২০০৪ সালের নভেম্বরে গ্যাস অনুসন্ধানের সময় নাইকোর অদক্ষতায় ছাতকের টেংরাটিলায় বিস্ফোরণ হলে গ্যাসসম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নাইকোর পক্ষ থেকে মোশাররফ হোসেনকে দামি গাড়ি ছাড়াও ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। তবে এ কেলেঙ্কারির স্থপতি তৌফিক-ই-ইলাহী কী `পুরস্কার` পেয়েছেন তা এখনো অজ্ঞাত রয়ে গেছে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=e1a19c58affd8e8794f8bd8...
বাংলাদেশ সময় ০৭৩৮ ঘণ্টা, জুলাই ০৮, ২০১২

'বঙ্গবন্ধু হত্যায় সিআইএ জড়িত থাকতে পারে’

মনজুর-এ আজিজ : মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কৃষক লীগের বর্ধিত সভায় বিডিআর বিদ্রোহ ও এর বিচার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক রিপোর্টের সমালোচনার সূত্র ধরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কৃষক লীগের সভাপতি ড. মির্জা জলিলের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দীন নাসিম, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন মোল্লা প্রমুখ।

মন্ত্রী বলেন, সিআইএ বিশ্বের অনেক প্রগতিশীল নেতা হত্যার সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তারা জড়িত থাকতে পারে। তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সমালোচনা করা হয় না। তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলেও বলা হয় না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনকে ধৃষ্টতা ও ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের র‌্যাব পুলিশ কীভাবে চলবে সেটা নিয়ে তারা কথা বলছে। এ সম্পর্কে তারা কথা বলার কে? র‌্যাব পুলিশ যদি কোনো অন্যায় করে সেটা আমাদের দেশের পুলিশ দেখবে। তারা কীভাবে বিডিআর বিদ্রোহ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে চায়?

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেভাবে হয়েছে তার চেয়ে আরও উন্নত উপায়ে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। আমরা অপরাধীদের আপিল করার সুযোগ দিচ্ছি।

আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে বিচার বন্ধ করার জন্যে। তারা বিদেশি লবিস্ট দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে চাচ্ছে। এটা কোনোদিন সফল হবে না

এবার লড়াই বিশ্বব্যাংকের সাথে

সহজ কথা

॥ আলফাজ আনাম ॥

আওয়ামী লীগ শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর এই শক্তি নিঃসন্দেহে আরো বেড়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় শক্তি সামর্থ্য দক্ষতা যা-ই থাকুক না কেন, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা বা মন্ত্রীদের লড়াকু মানসিকতার কোনো অভাব নেই। ইতোমধ্যে প্রধান বিরোধী দলকে একরকম নাস্তানাবুদ করে ফেলা হয়েছে। প্রথম সারির সব নেতাকে লাল দালানে পাঠিয়ে সরকার বিরোধিতার পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়ার কাজটিও সম্পন্ন হয়েছে। শক্তিশালী দলের জন্য চাই শক্ত প্রতিপক্ষ। বলতেই হবে আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপি একটি দুর্বল দল। এ জন্য দলটি শক্ত প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছে। সেটি আর কেউ নয়, বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আওয়ামী লীগের ধারণা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখন সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। এখন লড়াই শুরু হয়েছে মার্কিন প্রভাবাধীন বিশ্বব্যাংকের সাথে। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সাবেক চাকুরে ও বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞের দাবিদার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সামনের সারিতে তার পাশে আছেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন। তাদের পেছনে বেসরকারি লোকজনও আছে বলে মনে করে লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ বিশ্বব্যাংক।

যেভাবে তৈরি হয় লড়াইয়ের ক্ষেত্র
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর জন্য বাংলাদেশ সরকারের সাথে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি করেছিল ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল। বিশ্বব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের পরের মাসে ২৮ মে জাইকা ৪১ কোটি ডলার এবং ১ মে আইডিবি ১৪ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর পরের মাসে ৬ জুন এডিবির সাথে ৫৩ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার চুক্তি হয়। এসব চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬ মাস না যেতেই ২১ সেপ্টেম্বর সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন পেশ করে বিশ্বব্যাংক। অর্র্থমন্ত্রী এই প্রতিবেদন পাওয়ার এক মাস পর ১৩ অক্টোবর এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে জানান পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তার যুক্তি সেতুর কাজ শুরুই হয়নি দুর্নীতি কিভাবে হলো। অর্থমন্ত্রী আরো জানান, এখন পর্যন্ত এ সেতুর ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজ স্বচ্ছভাবেই হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের দাবি প্রত্যাখ্যান করে দেয়া তার এ বক্তব্যের মধ্যেও ছিল অসঙ্গতি। দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিতে আগেই কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়, যেমন ৯ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। এর তিন দিন পর ১৩ অক্টোবর সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে বদলি করা হয়। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। সরকারের এসব পদক্ষেপে সন্তুষ্ট না হওয়ায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বিশ্বব্যাংকসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলো ঋণ সহায়তা স্থগিত করে। দেখা যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী এক দিকে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, দুর্নীতি হয়নি, অপর দিকে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছেন। কিন্তু সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপে বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ফলে বিশ্বব্যাংকের সাথে টানাপড়েন বাড়তে থাকে।

দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের রূপ
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিবরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে যেসব প্রতিবেদন পাঠিয়েছে তাতে কিভাবে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বিশ্বব্যাংকের দেয়া প্রতিবেদন অনুসারে, সেতু নির্মাণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ছিল চার কোটি ৭০ লাখ ডলার। পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে ১০ শতাংশ কমিশন চেয়েছিলেন তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া এবং পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম। এনএসসি-লাভালিনের সাথে প্রতিযোগী ছিল যুক্তরাজ্যের হালক্রো গ্রুপ, নিউজিল্যান্ডের একম অ্যান্ড এজেডএল, জাপানের ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান হাই পয়েন্ট রেনডাল। বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে বলেছে, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী তার আত্মীয় জিয়াউল হককে (বাংলাদেশে এসএনসি-লাভালিনের প্রতিনিধি) নিয়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে সেতু ভবনে পদ্মা সেতু সম্পর্কিত এক বৈঠকে অংশ নেন। জিয়াউল হকের লালমাটিয়ার এ ব্লকের ৭/৪ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট কোম্পানি (ইপিসি) কমিশন চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ছিল। আরেকজন মধ্যস্থতাকারী ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরী। কানাডা ও বাংলাদেশে কখন কোথায় এ ব্যক্তিদের স্বাক্ষর ও বৈঠক হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থার মতে, রিতা কনস্ট্রাকশনের মালিক নিক্সন চৌধুরীর সাথে মন্ত্রী, সচিব, প্রকল্প পরিচালক ও এসএনসির জিয়াউল হকের সাক্ষাৎ শুরু হয় পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের টেন্ডার আহ্বানের পরপরই। বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো অভিযোগ উত্থাপন করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। সে সময় অর্থমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়ে এ দুর্নীতির সাথে সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান সাকোর কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথা জানানো হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ জানানো হয়। এরপর সরকার মন্ত্রী, সচিব ও প্রকল্প পরিচালককে অন্যত্র সরিয়ে দিলেও আর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সৈয়দ আবুল হোসেন এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী। দায়ীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বিশ্বব্যাংক আবারো চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল চিঠি দেয়। তাতেও সরকার তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি লোকদেখানো তদন্ত করে দুর্নীতি হয়নি বলে ঘোষণা দেয়। কিন্তু তা গ্রহণ করেনি বিশ্বব্যাংক। সব শেষ গত মাসে আবারো একটি চিঠি পাওয়ার পর দুদক আবারো তদন্ত শুরু করে।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে নিক্সন চৌধুরী জানান, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক ইসমাইলের কথায় সম্মত হয়ে তিনি মধ্যস্থতার কাজ করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে নিক্সন চৌধুরী জানান, কানাডায় বসবাসরত ভারতীয় নাগরিক রমেশ চন্দ্র এসএনসি-লাভালিনকে পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দিতে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ইসমাইলকে দায়িত্ব দেন। এরপর ইসমাইল যোগাযোগ করেন তার (নিক্সন চৌধুরী) সাথে। এ নিয়ে ইসমাইলের সাথে তার কয়েক দফা বৈঠক হয়। এসএনসি-লাভালিনের অফিস তল্লাশির সময় তার ডায়েরিতে পাওয়া যায় কাকে কত টাকা দিতে হবে তার তালিকা। যেখানে আরো অনেকের নাম পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল মন্ত্রী আবুল হোসেন ও দুই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হোক। একই সাথে তার ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দ করার কথাও বলে বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সরকার তাতে সম্মত হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের বিবৃতি
ঋণ বাতিল করে বিশ্বব্যাংক যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে দুর্নীতিপ্রক্রিয়ার পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সেই বিবৃতিটি পর্যালোচনা করলে যে দিকগুলো আসছে :
১.পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা, এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ তথ্য-প্রমাণ বিশ্বব্যাংকের কাছে রয়েছে।
২. বিশ্বব্যাংক ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়ারম্যানের কাছে দু’টি তদন্তের তথ্য-প্রমাণ প্রদান করেছে।
৩. কানাডায় যেখানে এসএনসি-লাভালিনের সদর দফতর অবস্থিত সেখানে বিশ্বব্যাংকের রেফারেন্সের ভিত্তিতে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসেস কয়েকটি সার্চ ওয়ারেন্ট তামিল করে এবং এক বছরব্যাপী তদন্ত চালিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট দুইজন সাবেক এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করেছে। তদন্ত ও বিচার কাজ অব্যাহত রয়েছে। আদালতে পেশকৃত তথ্য এই ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
৪. বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল সেগুলো হচ্ছে ক. যেসব সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ছুটি প্রদান; খ. এই অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদকের অধীনে একটি বিশেষ তদন্ত দল নিয়োগ এবং গ. আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বিশ্বব্যাংকের নিয়োগকৃত একটি প্যানেলের কাছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সব তথ্যের পূর্ণ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকারে সরকারের সম্মতি প্রদান যাতে এই প্যানেল তদন্তের অগ্রগতি, ব্যাপকতা ও সুষ্ঠুতার ব্যাপারে উন্নয়ন সহযোগীদের নির্দেশনা দিতে পারে।
৫. বিশ্বব্যাংকের অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং সরকারের জবাব জানার জন্য ঢাকায় একটি উচ্চপর্যায়ের দল পাঠিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া বা জবাব সন্তোষজনক ছিল না।
৬. বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে বলছে, দুর্নীতির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি চোখ বুজে থাকতে পারে না, তা উচিত নয় এবং থাকবেও না। বাংলাদেশ সরকার থেকে পর্যাপ্ত বা ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সহায়তায় ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
বিশ্বব্যাংকের এই বিবৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়, দুর্নীতির সাথে আরো কিছু বেসরকারি লোক জড়িত তারা কারা এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেই ব্যক্তিদের নামগুলো কি বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করবে? সেই বেসরকারি ব্যক্তিদের সাথে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা কতখানি তা এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তবে অনুমান করা যায়, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন বা সচিবদের চেয়েও তাদের সরকারের শীর্ষব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠতা কম নয়।

মুহিত-জোয়েলিক-কিম
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প বাতিলের পর অর্থমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানান, এই বিবৃতি বিশ্বব্যাংকের নয়, বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিকের বিবৃতি। তিনি পদ্মা সেতুতে ঋণসুবিধা বাতিলের এই সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি রবার্ট জোয়েলিককে দায়ী করেন। জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক তার মেয়াদকালে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য একটি অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশেষভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তিনি তার বক্তব্য শেষ করেছেন এভাবেÑ আমরা যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনায় লিপ্ত হব বলে আশা রাখি। আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে এই অর্থবছরে আমরা পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করব। অর্থমন্ত্রী এই আশাবাদ প্রকাশ করার ১২ ঘণ্টা না যেতেই বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম জানিয়ে দেন পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক। দায়িত্ব নেয়ার পর সাংবাদিকদের সাথে তিনি আলাপে এ কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের মঙ্গলের বিষয়ে আমরা সজাগ কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংক কখনোই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। কিমের এই বক্তব্যের পর জোয়েলিকের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে বৈঠক করে আবার ঋণ আনতে পারবেন তেমন আশা নেই। বিশ্বব্যাংকের সাথে আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার চেয়েও তাকে হয়তো এখন আরো বেশি বিতর্কে লিপ্ত হতে হবে। অর্থমন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগকে দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর না ভেবে শুধু ঋণচুক্তি বাতিলকে দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর বলছেন। অথচ দুর্নীতির অভিযোগ না উঠলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করত না। এই সত্যটি অর্থমন্ত্রীসহ সরকার স্বীকার করতে চাইছে না। ফলে বিশ্বব্যাংকের সাথে জটিলতা আরো বাড়ছে।

মন্ত্রীবচন ও গণমাধ্যম
পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের পর মন্ত্রীরা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই সিদ্ধান্তকে প্রথম দিন বজ্রাঘাত বলে উল্লেখ করলেও পরের দিন বলেন, বিশ্বব্যাংকের চেয়েও সহজ শর্তে পদ্মা সেতু হবে। সেটা হবে একটি চমক। এরপর তিনি বলেন, তদন্তের আগে শাস্তি দেয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক ও রহস্যজনক। তদন্ত চলা অবস্থায় বিশ্বব্যাংক এটা করে একটি দেশকে দুর্নীতিবাজ বলতে পারে না। এর পরও আগামী আট মাসের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন বিশ্বব্যাংক পুনর্মূল্যায়ন করবে। যোগাযোগমন্ত্রী এর পরদিন জানান, চমক দেয়ার কথা বলা তার ঠিক হয়নি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এই প্রকল্পটি দেশীয় ষড়যন্ত্র ও বিদেশী কূটকচালের শিকার। দুদক চেয়ারম্যানের মতে, বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। আর অর্থমন্ত্রী তো রবার্ট জোয়েলিককে দায়ী করে বলেছেন, দুদক তদন্ত করছে বলে তিনি মাথা ঘামাননি। দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রীরা দুর্নীতির অভিযোগকে ষড়যন্ত্রের প্রলেপে ঢেকে দিতে চাইছেন। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, পদ্মা সেতু এই সরকারই করবে। কারো দিকে তাকাবে না। এর আগে ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। যদি প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে দাতাদের কাছ থেকে আমরা পদ্মা সেতুর জন্য কোনো অর্থ নেব না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিশ্বব্যাংকের সাথে আর আলোচনার অবকাশ আছে কি? ঋণ বাতিলের পর বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, দুর্নীতির সাথে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা জড়িত রয়েছে। আর মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, মন্ত্রী আবুল হোসেনকে সরিয়ে দেয়া উচিত ছিল। তিনি মূলত ঋণ বাতিলের জন্য মন্ত্রী আবুল হোসেনকে দায়ী করেছেন।
তবে মজার ব্যাপার হলো, সরকার সমর্থক গণমাধ্যম পদ্মা সেতুর দুর্নীতির চেয়ে বিশ্বব্যাংক কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান তা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশে ব্যস্ত ছিল। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলের খবরের সাথে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির খবর সমানভাবে প্রচার করে। অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের সাথে যখন যুদ্ধে লিপ্ত সে সময় বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামে সরকার সমর্থক গণমাধ্যম। বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রচারণাযুদ্ধ চলে সমানতালে। বিশ্বব্যাংকের নীতি-কৌশল বা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বহু দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এগুলো নতুন কোনো তথ্য নয়। বহু দেশে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি বা অনিয়মের খবরও নতুন নয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আগে কখনোই এসব খবর প্রচার করা হয়নি।

স্বাধীন দুদক!
পদ্মা সেতুর এই দুর্নীতির পুরো প্রক্রিয়া সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের জানানোর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংক দুদককে প্রস্তাব দিয়েছিল তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাদের একজন কর্মকর্তাকে রাখতে। দুদক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
একই সাথে দুদক জানায়, এ নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বিশ্ব্যব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য ও অন্যায্য। প্রশ্ন হলো, দুদকের তদন্ত শেষ হয়নি। দুদক কিভাবে নিশ্চিত হলো দুর্নীতি হয়নি এবং বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি।
দেখা যাচ্ছে দুর্নীতিবাজদের ধরার চেয়ে আড়াল করার কাজে দুদক এখন বেশি ব্যস্ত। ইতোমধ্যে দুদক দুর্নীতির কালো বিড়ালদের সাদা করেছেন। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে তাদের নিষ্কলুষ সার্টিফিকেট প্রদান করার প্রধান দায়িত্ব এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের। রেল কেলেঙ্কারির মতো পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রেও একই ভূমিকা নিয়েছে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন।

পরিণতি কী
বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণ সহায়তার বড় উৎস বিশ্বব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির ঋণ সহায়তার নীতি-কৌশল নিয়ে দুনিয়াজুড়ে বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়, সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষা করা বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য। কিন্তু বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলোর বৈদেশিক সহায়তার প্রধান উৎস বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ আসে বিশ্বব্যাংক থেকে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তাতে বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে এসব ঋণ আসবে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ৩৫টির মতো নানা ধরনের প্রকল্প চলমান রয়েছে। এখন মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই বাংলাদেশ চলতে পারবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ সহায়তার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক হচ্ছে লিড ডোনার। প্রতিষ্ঠানটি সাহায্য প্রত্যাহার করলে বা সাহায্য দিতে অস্বীকার করলে অন্য সংস্থা বা দাতা একই নীতি গ্রহণ করে থাকে। যে কারণে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তের সাথে সাথে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ঋণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাইকা ও আইডিবি সরাসরি নাকচ না করলেও ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্বব্যাংক শুধু পদ্মাসেতু নয়, হাইটেক পার্ক স্থাপনসহ আরো দুটো প্রকল্প থেকে সরে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন নাজুক। এর মধ্যে দাতা সংস্থার সাথে লড়াইয়ে নেমেছে সরকার। এই লড়াইয়ের খেসারত দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন শুধু ধূলিসাৎ হলো না, বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের ওপর যে প্রভাব পড়বে তাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।
alfazanambd@yahoo.com

২০১০ সালে বিশ্বব্যাংক যা বলেছিল...

১০ আগস্ট ২০১০ সাল।

সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানো হলেও ব্যবহার নিয়ে চিন্তিত বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশে বড় কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশে সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও এর ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাংক চিন্তিত। সংস্থাটি মনে করে, বাংলাদেশে যেকোনো বড় উন্নয়নকাজই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়ে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের যোগসাজশ ও ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টিও নিয়মিত। বাংলাদেশের জন্য আগামী চার বছরে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে কৌশলপত্র তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশভিত্তিক সহায়তা কৌশলপত্র (সিএএস) নামের এই প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে অনুমোদন হয়েছে। দাতা সংস্থাটি ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ৬৫৫ কোটি ডলার বা চার হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত তিন বছরে অর্থাৎ ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে ৩১টি দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রকল্পে ক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি খুঁজে পায় বিশ্বব্যাংক। ঠিকাদারদের এসব কাজ পরে বাতিল করা হয়। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলেও দরপত্রে ত্রুটি থাকার কারণে কয়েকটি প্রকল্পে অর্থ ছাড় হয়নি বলে জানা গেছে। একটি বিদেশি ঠিকাদার কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট এক মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে গিয়ে পুরো কাজটিই আটকে গেছে এবং বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাংক তাদের নতুন কৌশলপত্রে সহায়তা দ্বিগুণ করেছে। সরকারের প্রতি আস্থা ও বাংলাদেশের উন্নয়ন চাহিদার কথা বিবেচনা করেই এই সহায়তা দেবে তারা।

বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতার ব্যাপারটিতে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সরকারও আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সেটি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়টি সরকার অবহিত আছে। সুতরাং ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তদন্ত বা পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকারেরই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর তা অনেকটা নির্ভর করছে। পদ্মা সেতুসহ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা উচিত।
বিশ্বব্যাংকের নতুন এই কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনসহ আগামী দশকে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতেই বিশ্বব্যাংক ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি বিপুল পরিমাণ সহায়তা দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা এবং মানব উন্নয়নের অগ্রগতিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।

নতুন কৌশলপত্র অনুমোদনের পর সংস্থার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর এলেন গোল্ডস্টেইন বলেন, ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে যে সহায়তা দিয়েছে, নতুন কৌশলপত্রের আওতায় তার দ্বিগুণ সহায়তা দেওয়া হবে। নতুন এই সহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোর ঘাটতিকে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক বিরোধিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, আগামী তিন বছরে শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি প্রকল্পেই অর্থায়ন করা হবে প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার বেশির ভাগই অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত। নতুন কৌশলপত্রে শীর্ষ প্রকল্পের তালিকায় আছে পদ্মা সেতু। এই প্রকল্পে প্রধান অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক। গত বছর ডিসেম্বরের আগে প্রকল্পটির জন্য মাত্র ৩০ কোটি ডলার দিতে রাজি হলেও এখন তারা ১২০ কোটি ডলার বা আট হাজার ২৮০ কোটি টাকা দিতে প্রস্তুত। ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতু অর্থায়নের প্রস্তাবটি বোর্ডে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উঠতে পারে।
দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) প্রকল্পে অর্থায়ন। এ জন্য বিশ্বব্যাংক ২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা এক হাজার ৭৭৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চট্টগ্রামে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা এক হাজার ২০৭ কোটি টাকা সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক। রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার বা ৮২৮ কোটি টাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার উন্নয়নে আরও ১৫ কোটি ডলার বা এক হাজার ৩৫ কোটি টাকা দেবে বিশ্বব্যাংক। তালিকায় আরও আছে পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির চার কোটি ডলার বা ২৭৬ কোটি টাকা, সামাজিক খাত বিনিয়োগে ১০ কোটি ডলার বা ৬৯০ কোটি টাকা, জাতীয় সুরক্ষা প্রকল্পে নয় কোটি ডলার বা ৬২১ কোটি টাকা এবং ঢাকার পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ৪৮৩ কোটি টাকা।

দেশে বিদ্যুতের চরম সংকট থাকলেও আগামী কৌশলপত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। তবে দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ১৫ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প আছে।
নতুন কৌশলপত্রে হাজার হাজার কোটি টাকার এসব প্রতিশ্রুতি নির্ভর করছে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব ক্রয়নীতিমালা মেনে চলার ওপর। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) জানিয়ে দিয়েছে, তারা যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করবে, সেসব প্রকল্পে পণ্য ও সেবা ক্রয় এবং ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থার নিজস্ব নীতিমালা মেনে চলতে হবে। উল্লেখ্য, ক্রয় আইনের (পিপিআর) সংশোধন অনুযায়ী, দুই কোটি টাকা পর্যন্ত সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা লাগবে না এবং কাজের জন্য লটারির ব্যবস্থা চালু থাকবে। ফলে বিশ্বব্যাংকের নতুন কৌশলপত্রে বিপুল পরিমাণ সহায়তার আশ্বাস থাকলেও সরকার প্রকল্প কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ২০০৬-০৯ সময়কালের জন্য দেশভিত্তিক সহায়তা কৌশলের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই সময়কালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দিয়েছে ২৬০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন কৌশলপত্রে এই সহায়তা দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়েছে।

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla