Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

গ্রাম্য আদালত বনাম ব্লগ আদালত, ফজর আলী বনাম জোবরা গ্রামের ইউনূস মাস্টার

Dr. Yunus
গ্রাম্য আদালত একত্রিত হয়েছে অনেকদিন পর। স্থান বাংলাদেশের কোথাও কোন এক গ্রাম। সময় বাদ জুমা। একই গ্রামের ফজর আলী আসামীর কাঠগড়ায়। ফজর আলীর অপরাধ সে নাকি পবিত্র কোরানের ছিন্ন একটা পাতা কুড়িয়ে পেয়ে তার প্রতি যথাযত সন্মান দেখায়নি। ক্ষোভে ফেটে পরেছে গোটা গ্রাম। আশেপাশের অনেক গ্রামে দাবানলের মত ছড়িয়ে পরেছে খবরটা। জনরোষ থামাতে গঞ্জের হাটে মাইকিং করা হয়েছে ইতিমধ্যে, খোলা আদালতে বিচার হবে ফজর আলীর। বিচারের দিন জুমা ঘর উপচে পরল মুসল্লিদের ভীড়ে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থীদের একজন অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থা করেছে, অন্যজন যত্ন নিয়েছে পান-সুপারির। মসজিদ কমিটি বরাবর ১০০ টাকা জমা দিয়ে অস্থায়ী একটা চা স্টল বসিয়েছে গঞ্জের চা বিক্রেতা ফজলু কাজী। বিচারকর্মের শুরুতে অভিযোগ উত্থাপন করল জুমাঘরের ইমাম। অভিযোগ খুবই ঘোরতর, ফজর আলী পাতাটা উল্টে পাল্টে ছুড়ে ফেলেছে রাস্তায়। ব্যস্ত রাস্তার উপর পরে থাকা পবিত্র পাতাটার উপর দিয়ে অনেকেই হেটে গেছে ইতিমধ্যে। ইমাম সাহেবের কাছে খবরটা পৌঁছান গ্রামের মুরুব্বী মাঞ্জু বেপারী। পাতাটা তিনিই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন জুমা ঘরে আসার পথে। কেউ দোররা মারার প্রস্তাব করল, কেউ মাথা ন্যাড়া করে তাতে আলকাতরা মাখিয়ে গঞ্জের হাটে ঘোরানোর কথা বলল। ফজর হাঁটু গেড়ে মাফ চাইল, কানে ধরল, তওবা করল এবং সাড়া জীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার প্রতিজ্ঞা করল। কিন্তু মুসুল্লিদের ক্ষোভ তাতে এতটুকু প্রশমিত হলনা। সবাই মারমার কাটকাট সুরে কথা বলল। উপায় না দেখে ফজর আলী উঁচুস্বরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

মিশর হতে ফেরার পর ইজ্জত আলী দফাদার ঘর হতে বের হয়নি। তিনদিন ধরে শুধু ঘুমাচ্ছে আর খাচ্ছে। বেশ কটা দিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছিল সাহারা মরুভূমিতে। পুষিয়ে নিচ্ছে হারানো খাওয়া আর ঘুম। কারও উঁচুস্বরের কান্নায় ঘুম ভাঙল তার। দক্ষিনের জানালা খুলে বাইরে তাকাতে অবাক হয়ে গেল সে। গ্রামে কিছু একটা হচ্ছে আজ। আরব দেশ হতে আনা একমাত্র আলখাল্লাটি গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পরল। রায় ঘোষনা হয়ে গেল ফজরের আলীর। ১০০ ঘা বেত, মাথা ন্যাড়া করে গ্রাম ছাড়া করা সহ আরও অনেক কিছু। বিচারের উপসংহারে ইমাম সাহেব লম্বা একটা ভাষন দিলেন। ভাষনে আখেরাতের কথা বললেন, এই দুনিয়ার হাল্কা শাস্তির বিপরীতে আখেরী দুনিয়ায় ফজরের শাস্তি কতটা কঠিন হবে তার বর্ণনা দিলেন। ইজ্জত আলী মন দিয়ে শুনল ইমাম সাহেবের কথা। প্রতিবেশি ছয়নাল মিয়ার কাছে জানতে পারল পুরো ঘটনা। একটু অবাক হল ইজ্জত, ইমাম সাহেবের হাতে ধরা পাতাটা খুব পরিচিত মনে হল তার কাছে। উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। যা ভেবেছিল তাই সত্য হল, পাতাটার আসল মালিক সে নিজে। ভাবল হয়ত ৪ বছরের ছেলে মজিবরের কাজ। রাগ ধরল নিজের উপর, রাগ ধরল ইমাম সাহেবের উপর, গোটা গ্রামের উপর রেগে গেল ইজ্জত আলী দফাদার। ফজরকে দোররা মারার প্রস্তুতি নিচ্ছিল গ্রামের এখলাস মোল্লা। চীৎকার করে উঠল ইজ্জত।

- অই মিয়ারা আফনেরা থামেন, হেরে মারার আগে আমার দুইডা কথা আছে। আমি ইজ্জত আলী, এই গ্রামেরই বাসিন্দা। তিনদিন আগে দশ বছর পর মিশর হইতে ফিরা আইছি। হেই দেশে গোলমাল, রাইতের আন্ধারে চোরের মত পালাইতে বাধ্য অইছি। ফজরের আফনেরা বিচার করছেন ভাল কতা, তয় বিচারডা মনে হয় সঠিক হয় নাই। যে পাতাডার লাইজ্ঞা হেরে গ্রাম ছাড়া করাতাছেন হেইডার মালিক আসলে হে না, আমি। আমার চাইর বছইরা ছাওয়াল মজিবরের কাম এইডা।

হায় হায় করে উঠল মুসুল্লির দল। ইজ্জতের দাবি অনেকে মানতে চাইল না, ভাবল লেনাদেনা জড়িত এখানে। কেউ কেউ অস্তাগফিরুল্লাহ বলে জিহবায় কামড় দিল। কান্না-কাটি ফেলে এবার হুংকার দিয়ে উঠল ফজরের বিবি। গালি দিল অশ্রাব্য ভাষায়।

- হুনেন, যেই পাতাডারে আফনেরা কোরানের পাতা কইতাছেন হেইডাও হাছা না। একটা ম্যাগাজিনের পাতা এইডা, মিশরীয় ম্যাগাজিন, কিনছি মরক্কোর কাসাব্লাংকা এয়ারপোর্টে। যার লাইগা আলীর বেটারে এতবড় শাস্তি দিতাছেন পইড়া দেহেন কি আছে ঐ হানে, মিশরীয় প্রেসিডেন্ট হসনী মুবারকের আকাম কুকামের কথা, চুরি চামারীর কথা।

*********************
গল্পটা আমার নিজের না, ছোটবেলায় একজন বড় ভাইয়ের মুখে শুনেছিলাম। স্থান, কাল ও পাত্র পরিবর্তন করে মূল লেখার ভুমিকা হিসাবে ব্যবহার করেছি মাত্র। ভূমিকার আকার নিয়ে খিচুরি পাকিয়ে ফেলেছি, তাই মূল লেখাটা ছোট করতে বাধ্য হলাম। জোবরা গ্রামের ’সুদখোর’ ইউনূস মাস্টারকে নিয়ে কথা বলছিলাম জনৈক বামপন্থী নেতার সাথে। উনি বদরুদ্দিন উমর লেভেলের কেউ নন, তবু আমার চোখে বিখ্যাত ভিন্ন কারণে। ভদ্রলোক দুই মিনিট সময় নিয়ে আমার কথা শুনলেন এবং তৃতীয় মিনিটে কথার সুনামিতে সমাহিত করে ফেললেন আমার অস্তিত্ব। ’সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক, কর্পোরেট বিশ্বের বিশ্বস্ত দালাল ইউনূসের কাধে ভর করে আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নেয়ার মহাপরিকল্পনা করেছিল পশ্চিমারা।’ গুণীজনদের জটিল শব্দের লেকচার, বিশ্বকোষের রেফারেন্স আর কার্ল মার্ক্সের ডাচ ক্যাপিট্যাল জাতীয় ভাষা ব্যবহার করে যারা গইগেরামের সাধারণ সমস্যার কথা বলেন তাদের লেখা সযত্নে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু আজকাল চাইলেও তা এড়ানো যাচ্ছে না কারণ জাপানী সুনামির মত বাংলাদেশকে গ্রাস করে নিয়েছে ইউনূস নিধন ভাষা। বাংলায় একটা কথা আছে ‘ছাল নাই কুত্তার বাঘ তার নাম’, আজকাল এত বেশি বাঘের তর্জন গর্জন যা অনুবাদ করলে মনে হবে ইউনূস মাষ্টারের সমালোচনা না করা মানেই অর্থনীতি না বুঝা, ব্যাংকিং না বুঝা, শোষণ না বুঝা, পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র না বুঝার মত মূর্খতা। রুশ ভাষায় বলা হত ’নাউচনি কম্যুনিজম’, অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হলেও বিষয়টা ছিল আমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক। দ্বান্দিক বস্তুবাদ, সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র, পুঁজির শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নব্য উপনিবেশবাদ আর বাংলাদেশ সদ্য প্রসূত রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার তত্ত্ব বছরের পর বছর আমাদের মগজে ঢুকানো হয়েছিল বিশাল আয়োজনে। কিন্তু তত্ত্বের মহাসমুদ্রে ১২টা বছর বাস করতে গিয়ে একটা সত্য উপলদ্ধি করেছি, তত্ত্ব আর বাস্তবতার মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব। যাই হোক, ফিরে আসি নেতার সাথে আলাপ প্রসঙ্গ।

- স্যার, দয়া করে খোলাসা করবেন কি লুটপাটের ব্যাপারটা? অর্থাৎ আপনি বলছেন আমাদের সম্পদ লুটপাটের জন্যে ইউনূস মাস্টারকে দিয়ে মহা আয়োজন করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা। আমি জানতে চাইছি কোন কোন সম্পদ আছে এ তালিকায়?

- আমাদের গ্যাস, আমাদের তেল, কয়লা আরও অনেক কিছু।

- গ্যাসের অভাবে শুনছি ঢাকার মনেশ্বের রোডে চুলা জ্বালছে না। সাম্রাজ্যবাদীরা গ্যাস নিয়ে গেলে শুধু মনেশ্বর রোডে কেন বাংলাদেশের কোথাও কোন চুলা জ্বলবে না। হাহাকার শুরু হবে ঘরে ঘরে। সামাজিক, পারিবারিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং পাশাপাশি তৈরী হবে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতদের জেগে উঠার প্রেক্ষাপট। একজন বামপন্থী হিসাবে এটাই কি আপনার রাজনীতি নয়, শোষিতদের বিপ্লব?

- পেটি বুর্জোয়াদের শোষণ সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র কায়েমের উপযুক্ত শোষণ নয়, তাই এ ধরণের বিপ্লব সহসাই বাংলাদেশে ঘটতে যাচ্ছে না। আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

- ব্যবহার করার মত যথেষ্ট গ্যাস নেই আমাদের, তেলের কাহিনী এখন ইতিহাসের বিষয়, বাংলাদেশের কয়লা মাথায় করে নিয়ে যাবে আমেরিকায়, খোলাসা করবেন কি অর্থনীতির কোন গণিতে এমনটা করতে যাবে পশ্চিমা তথা মার্কিনিরা?

- ইরাক, আফগানিস্তান সহ পৃথিবীর অনেক দেশ হতে মার্কিনিরা সম্পদ লুটে নিচ্ছে। ইউনূস মাষ্টারের নোবেল প্রাপ্তি বাংলাদেশকে এ পথে ঠেলে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।

- স্যার, ইরাক আফগানিস্তান না টেনে আসুন আমাদের সম্পদের কথা বলি। আমাকে সোজা বাংলায় বলবেন কি, কোন সম্পদ লুটপাটের জন্যে মার্কিনিরা ইউনূস মাস্টারকে নোবেল দেয়ার তদবির করেছিল? ১৭ কোটি মানুষ আর থই থই পানি ছাড়া এ দেশ হতে লুটে নেয়ার মত কি এমন সম্পদ আছে যা খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি না? আমাদের পাট? চা? তামাক? পোশাক শিল্প? মানব সম্পদ? ইলিশ মাছ? এ গুলো তো ওদের লুটতে হয়না, বরং আমরাই জলে, স্থলে আর অন্তরীক্ষ দিয়ে তাদের দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার ধান্ধা করছি। ভাইকে বাপ, বোনকে মা আর স্ত্রীকে বোন বানিয়ে ওদের দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছি। প্রতিমাসে লাখ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠাচ্ছি। এ হিসাবে লুট তো করছি আমরা। আমাদের এ লুটের শাস্তি দিতেই কি ইউনূস মাস্টারকে নোবেল দেয়া হয়েছিল? নোবেল প্রাপ্তি বেচারাকে আদালতে ঠেলে দিল, এটা কি শাস্তি নয়?

- সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত চেহারা চিনতে এত সব বুঝার দরকার হয়না। ওরা দেশে দেশে এজেন্ট তৈরী করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে। ইউনূস মাষ্টার তেমনি এক এজেন্ট।

কথা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা এখানেই মরে গেল। আমার বামপন্থী বড়ভাইয়ের চেহারায় কেন জানি মসজিদের ইমাম সাহেবের চেহারাটা ভেসে উঠল। নিজেকে ইজ্জত আলী দফাদার ভাবতে ইচ্ছে হল এ মুহূর্তে। জোবরা গ্রামের ইউনূস মাষ্টারের চেহারাটা মনে হল অবিকল ফজর আলীর মত। আর এই মাস্টারকে শাস্তি দেয়ার গন আদালত, ব্লগ আদালত, বুদ্ধিজীবী আদালত, হাসিনা আদালতকে মনে হল বাংলাদেশের কোথাও কোন গ্রাম্য আদালতের মত।

- সবাইকে ধন্যবাদ।

Comments

কেন আদালতে গেলাম, কেনইবা এমডি থাকতে চেয়েছি :ড. ইউনূস

গত ৫ মে সুপ্রীম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল শনিবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি কেন আদালতে গেলেন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন। তাঁর জবানীতেই বিবৃতি তুলে ধরা হলো।

ড. ইউনূস বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায় আপনারা জেনে গেছেন। আমি কেন আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি, কেন আমি গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকতে চেয়েছি, কেন দেশে-বিদেশে অনেকে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছে, এসব নিয়ে কারো কারো মধ্যে কিছু ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এ সম্পর্কে আমার বক্তব্যটি জানতে পারলে হয়তো এর অবসান হবে। আমি আদালতে গিয়েছি একটি সুনির্দিষ্ট কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে কোন জবাবদিহিতার সুযোগ না দিয়েই আমাকে অপসারণ করার জন্য একটি পত্র দিয়েছে, যাতে এও বলা হয়েছে যে, গত এগারো বছর ধরে আমি এ পদে অবৈধভাবে আছি (যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে বাত্সরিক ভিত্তিতে এই সময়কালে গ্রামীণ ব্যাংক পরিদর্শন করেছে এবং কখনো গ্রামীণ ব্যাংকের কোন বিষয় নিষ্পত্তিহীন রয়েছে বলে কোন অভিযোগ তোলেনি)। আমি এই পত্র আইনসঙ্গত হয়নি এবং এর মাধ্যমে আমার প্রতি ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে বলে মনে করেছি। গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের নয়জন সদস্যও একই রকম মনে করেছেন। তাই আমি ও তাঁরা পৃথকভাবে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি যাতে আমার ও গ্রামীণ ব্যাংকের উপর পত্রটির মাধ্যমে যে অন্যায় হয়েছে বলে আমরা মনে করেছি তার নিরসন হয়। এজন্য বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় বিচার পাওয়ার যতগুলো সম্ভাব্য পর্যায় আছে তার প্রত্যেকটিতে চেষ্টা আমাকে করতেই হতো এবং সেটিই আমি করেছি।

জড়িয়ে আছে চার কোটি গরীব মানুষের ভাগ্য

আমি ঠিক করেছিলাম যে মহামান্য আদালতের শেষ রায় দ্বারা যদি নির্ধারিত হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পত্রটি সঠিক ছিল না তা হলে আমরা যথারীতি গ্রামীণ ব্যাংকের স্বার্থে কাজ করবো, সুন্দরভাবে কীভাবে আমার দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারি সে চেষ্টা করবো। আর যদি সেই রায় আমরা না পাই তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বোর্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের পত্র অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। আমার আদালতে যাওয়ার কারণ এইটুকুই। এই ক্ষেত্রে সুবিচার পাওয়ার আশায় আমাকে এ কাজ করতেই হয়েছে।

কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যত্ রক্ষা এবং এর প্রায় এক কোটি দরিদ্র ঋণ গ্রহিতাদের (যারা এই ব্যাংকের ৯৬.৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকও বটে) আশা-ভরসার স্থলটুকুকে রক্ষার বিষয়টি অনেক বড় ও ব্যাপক বিষয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের চার কোটি দরিদ্র মানুষের ভাগ্য, এর পরোক্ষ প্রভাবে সারা দুনিয়ায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে জড়িত বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যতের। দারিদ্র্য দূরীকরণের এই সফল মডেলটির অস্তিত্বের প্রশ্নগুলোও অবহেলা করার মত নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে বিদায় নেবার আগে-পরে এর ভবিষ্যত্ রক্ষার ক্ষেত্রে আমি কী ভূমিকা নিতে পারলাম বা পারলাম না এটিই আমার এবং সেই সঙ্গে অনেকের বড় ভাবনা।

কেউ কেউ বলেছেন, আদালতে না গিয়ে অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের অনুরোধ অনুযায়ী বিদায় নিলে আমার সম্মান থাকতো। আমি সেটি মনে করি না। তাতেও আমার বিদায়ের ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে ফল একই হতো। বরং এমন একটি আকস্মিক প্রস্তাব মেনে নিয়ে অসংখ্য কর্মী ও ঋণগ্রহিতার পরিবারকে স্বেচ্ছায় অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিলে আমি নিজের কাছে নিজে অপরাধী হয়ে থাকতাম। সেটি আমি সজ্ঞানে করতে পারিনি।

কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি যতদিন পারা যায় আঁকড়ে ধরে থাকাটাই আমার উদ্দেশ্য। আপনারা জানেন এই পদটিই আমার জীবনের পরম আরাধ্য ধন নয়। আমি নিজেও খুবই সচেতন ছিলাম ও আছি যে, আমার বাকি কাজ এই পদে থেকে নয়, বরং এটি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন অবস্থান থেকে তরুণদেরকে সঙ্গে নিয়ে সারাজীবনের মূল কাজটি চালিয়ে যাওয়া— এদেশ থেকে এবং পৃথিবী থেকে দারিদ্র্যকে নির্বাসনে পাঠাবার চেষ্টায়। তবে সেটি যেন গ্রামীণ ব্যাংকের মত একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনরকমের ঝুঁকিতে ফেলে না করতে হয় সেজন্য আমার চিন্তার অন্ত ছিল না। অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে এক বছর আগে লেখা চিঠি প্রকাশ করার মাধ্যমে আমি সেই চিন্তার কথাটিই সবার সামনে তুলে ধরেছি। কীভাবে ওরকম ঝুঁকি এড়িয়ে কাজটি করা যায়, সে সম্পর্কে দু’টি বিকল্প প্রস্তাব আমি তাকে দিয়েছিলাম। আমার সে প্রচেষ্টায় সাড়া আসেনি। কাজেই কেউ যদি বলেন, অন্যায়ভাবে পদ ধরে রাখা, বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে পরিবর্তনের চেষ্টার সঙ্গে সহযোগিতা না করাটাই আমার উদ্দেশ্য, তা হলে আমার প্রতি অবিচার করা হবে।

গত কয়েক মাস ধরে আমার বিরুদ্ধে, গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে এবং ক্ষুদ্র ঋণের ধারণার বিরুদ্ধে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। কী প্রক্রিয়ায় এটা হচ্ছে সেটি সবাই লক্ষ্য করছেন।

দ্বন্দ্বের আবহাওয়ায় নেতৃত্বে পরিবর্তন মঙ্গলজনক হবে না

আমার, দেশবাসীর ও বিশ্বসমাজের উদ্বেগের কারণ এখানেই। এই উদ্বেগ আমার জন্য যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য ও তার কোটি ঋণ গ্রহিতাদের ভবিষ্যতের জন্য। এ জন্যই আমি বার বার বলছি যে, দ্বন্দ্বের আবহাওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে তাতে প্রতিষ্ঠানটির জন্য অমঙ্গল বয়ে আনতে পারে। আমার বরাবর আশা একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ যৌক্তিক পরিবেশে এটি হওয়া উচিত যাতে গ্রামীণ ব্যাংকের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে ভবিষ্যতে গ্রামীণ ব্যাংকের মত একটি প্রতিষ্ঠান তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা, সফল হতে পারবে কিনা, সে সাফল্য ধরে রাখতে পারবে কিনা এগুলোই বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া পড়লে আমাদের দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হয় তা তো সবার জানা। আর গ্রামীণ ব্যাংক তো চলে বিশ্বাস আর আস্থার উপর নির্ভর করে।

শুধু গ্রামীণ ব্যাংক কেন, রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের ও নাগরিক সমাজের কোন জনকল্যাণ উদ্যোগ ও সফল প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে তার স্বকীয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এদেশে চলতে পারবে কিনা সেটা বিবেচনা করে দেখতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে যেখানেই থাকি এক্ষেত্রে আমার নিজের দায়িত্বটিকে অবহেলা করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের স্বকীয়তা ও গরীবদের মালিকানা রক্ষা একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র নয়, দরিদ্র মানুষের ভবিষ্যত্ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি একটি সুদূরপ্রসারী প্রশ্ন। এর জন্য যা কিছু করা সম্ভব তা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব বলে মনে করি।

বিশ্ব সমাজে সিভিল সোসাইটি উদ্যোগের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার অধিকারকে যে আন্তর্জাতিকভাবে সুশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করা হয়— এটি সর্বজনবিদিত। বিশেষভাবে যেখানে তৃণমূলে দারিদ্র্য নিরসনের ব্যাপক কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর একটি সফলতম মডেলের ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন উঠে তখন অনেকেই বিচলিত হন। যে যত ধনী দেশই হোক, এই মডেল তাদের দেশেও বহুদিন যাবত্ তা প্রচলিত আছে। তাদের দেশের গরীব মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে বলে তারা এই মডেলের জন্য বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞ।

আমাদের দেশের পরিচিতি বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে নাগরিক উদ্যোগের এবং উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের সাফল্যের কারণে। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে সিভিল সোসাইটি এ্যাকশন ও তার সাফল্যের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। বাংলাদেশকে বাইরের দুনিয়ায় অসংখ্য মানুষ সম্মান দিতে শুরু করেছে এ কারণেই। এটিই হলো আমাদের গর্ব, বিশ্বের দরবারে আমাদের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। এই ভাবমূর্তি বিনষ্ট হলে জাতি হিসাবে আমরা কি ক্ষতিগ্রস্ত হবো না? আমাদের গর্ব আর আত্মবিশ্বাসে কি চিড় ধরবে না? এই প্রশ্ন আপনাদের কাছে রেখে আমি সম্ভাব্য আশংকাগুলো থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে, বিশেষ করে দরিদ্র নারীর ক্ষমতায়নকে এবং সার্বিকভাবে নাগরিক সমাজের উদ্যোগকে অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করতে সকলের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।

চল্লিশ বছরের মূল্যবান অর্জনগুলো ধরে রাখতে হবে

জাতি হিসেবে এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি করতে না পারলে আমাদের ৪০ বছরের মূল্যবান অর্জনগুলো ধরে রাখা এবং আরো বহু উচ্চতর অর্জনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে গত চার মাসে দেশের সকল স্থান থেকে প্রতিবাদ এসেছে। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনে সোচ্চার বক্তব্য এসেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহিতা এবং তাদের পরিবারের ৩৭ লক্ষ মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট তাদের লিখিত আবেদনের মাধ্যমে নীরবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা ইউরোপ-আমেরিকার বহু শহরে ব্যক্তিগতভাবে এবং সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি যে, আমরা ব্যাংকের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করতে পেরেছি, ততক্ষণ আমাদের প্রতিবাদ জানিয়ে যেতেই হবে।

গরীব মহিলার মালিকানার ব্যাংক

দরিদ্র মহিলার মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের মত বিশ্বখ্যাত এবং দেশের গৌরবের প্রতিষ্ঠানকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেবার কোন সুযোগ সৃষ্টি হোক এরকম কোন পরিস্থিতি আমরা কেউ কামনা করি না।

গত ৩৫ বছরে আমরা গ্রামীণ ব্যাংককে একটি মজবুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছি। ব্যাংক প্রতিবছর মুনাফা অর্জন করতে পারছে। সে মুনাফা শেয়ার মালিক হিসেবে ঋণগ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে আমরা আনন্দ পাচ্ছি।

যে ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৮৫৬ টাকা দিয়ে সে ব্যাংক এখন মাসে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করছে। এর আমানতের পরিমাণ দশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আমানত এসেছে ঋণগ্রহিতাদের কাছ থেকে। আমাদের এমন শাখাও আছে যেখানে সদস্যদের আমানতের পরিমাণ তাদের নেয়া ঋণের দ্বিগুণ। আমাদের ১১ শত ৫০ টি শাখা আছে যেখানে সদস্যদের আমানতের পরিমাণ ঋণের পরিমাণের ৭৫ শতাংশ বা তার চাইতে বেশি। এতেই পাওয়া যায় সদস্যদের আর্থিক বিবর্তনের ইতিহাস। সবচাইতে আনন্দের বিষয় হলো, প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা যেটা সদস্যদের আমানত হিসাবে ব্যাংকে জমা আছে তার ৯৭ ভাগই হলো মহিলাদের সঞ্চয়। এই টাকার উপর মহিলাদের আর কোন ভাগীদার নেই। এছাড়া গৃহঋণের মাধ্যমে প্রায় ৭ লক্ষ মহিলা নিজ মালিকানায় গৃহনির্মাণ করতে পেরেছেন। এতে মহিলাদের ক্ষমতায়নেরও একটা পরিমাপ পাওয়া যায়।

গ্রামীণ ব্যাংকে যে মহিলারা যোগ দিয়েছেন তাঁদের সন্তানদের বয়সও এখন বেড়েছে। শুরুতেই তাদের সবাইকে আমরা স্কুলে পাঠাতে পেরেছি এটাই আমাদের আনন্দ। তাদের অনেককে বৃত্তি দিতে পারছি, উচ্চ শিক্ষার জন্য ঋণ দিতে পারছি তা আমাদেরকে তৃপ্তি দেয়। আজ পর্যন্ত আমরা ১৮ কোটি টাকা বৃত্তি বাবদ দিতে পেরেছি, চারশ’ কোটি টাকা উচ্চ শিক্ষা ঋণ দিতে পেরেছি। উচ্চ শিক্ষা ঋণ পেয়ে ৫০ হাজার ছেলে-মেয়ে এখন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। অনেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী সমাপ্ত করেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন প্রজন্মকে আমরা একটা নতুন জীবন দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাদের মধ্যে আমরা এই অঙ্গীকার জাগিয়ে তুলছি যে, “আমরা চাকরি করবো না, আমরা চাকরি দেবো”। তাদের জন্য আমরা নতুন উদ্যোক্তা ঋণ চালু করেছি। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো দ্বিতীয় প্রজন্মকে চিরস্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে অনেক দূরে সরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। একাজে সাফল্যকে দ্রুত নিশ্চিত করাই হবে এখন আমাদের লক্ষ্য।

সংবাদ মাধ্যমের একাংশ মারফত ক্রমাগত প্রচারিত হতে থাকায় কিছু ভুল ধারণা হয়তো মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগে সেগুলো সম্বন্ধে দু’একটা কথা বলে নিই।

মানুষের মনে হয়তো এরকম ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, গ্রামীণ ব্যাংক বিদেশী টাকায় চলে। এটা মোটেই সত্য নয়। ১৯৯৫ সালের পর থেকে আর আমরা বিদেশী টাকা গ্রহণ করিনি। গ্রামীণ ব্যাংক সম্পূর্ণ নিজের টাকায় চলে। আমানতের খাতে যে টাকা জমা হয় তা দিয়েই ঋণ দেয়া হয়। ঋণের দেয়া টাকার চাইতে আমানতের টাকা প্রায় দেড়গুণ। কাজেই বাইরের কারো কাছ থেকে ঋণ বা অনুদান নেয়ার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া, অতীতের যেসব বিদেশী ঋণ ছিল তা সব আমরা শোধ করে দিয়েছি।

মানুষের মনে ধারণা দেয়া হয়েছে যে, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বেশি। তা সত্য নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ জগতে সর্বনিম্ন। ক্রম হ্রাসমান পদ্ধতিতে শতকরা ২০ টাকা। সরল সুদ। অর্থাত্ সুদের উপর সুদ হয় না। অথচ আমানতের উপর চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ দেয়া হয়। রিভিয়্যু কমিটির রিপোর্টে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন, এটা সরকারি ব্যাংক। কেউ কেউ বলেন, এটা এনজিও। বাস্তবে এটা সরকারি ব্যাংকও নয়, এটা এনজিও নয়। এটা একটা বিশেষ আইনে সৃষ্ট গরীবের মালিকানায় বেসরকারি ব্যাংক।

অভিযোগ করা হয়, গরীবের উপর জোর-জুলুম করে টাকা আদায় করা হয়। জোর-জুলুমের কোন প্রয়োজন নাই গ্রামীণ ব্যাংকে। ঋণগ্রহিতা নিজেই গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ক্রমাগতভাবে বাড়ানো যায়। কত টাকা কিস্তি দেবেন সেটা সম্পূর্ণ ঋণগ্রহিতার উপর নির্ভর করে। ঋণগ্রহিতা বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গে ঋণের অবশিষ্ট টাকা মওকুফ হয়ে যায়। ঋণের দায়িত্ব পরিবারের কারো উপর বর্তায় না। মৃত ঋণগ্রহিতার জানাজার খরচের জন্য ব্যাংক থেকে অনুদান দেয়া হয়, জানাজায় ব্যাংকের ম্যানেজার বা তার প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকতে হয়।

ঋণগ্রহিতার নিজের সঞ্চয়ী হিসাবে সব সময় যথেষ্ট সঞ্চয় জমা থাকে। অনেকের সঞ্চয়ের পরিমাণ ঋণের পরিমাণের চাইতেও বেশি। সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ ব্যাংক যত টাকা ঋণ বিতরণ করে তার অর্ধেক পরিমাণ টাকা ঋণগ্রহিতার সঞ্চয়ী তহবিলেই জমা আছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের মত বিশাল একটি প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে আমরা যত বেশি নাগরিক উদ্যোগের প্রতি যত্নবান হতে পারি তত বেশি মঙ্গলজনক হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নাগরিক উদ্যোগ একটা বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি তাকে ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও নাগরিক উদ্যোগের লক্ষ্য একই- দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যাসমূহের সমাধান নিশ্চিত করা। এক ধরনের সমস্যা আছে যেখানে খয়রাতি সাহায্য ছাড়া আর কোন সমাধান এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে খয়রাতি সাহায্য অবশ্যই জোরদার করতে হবে। কিন্তু সব সমস্যার সমাধানে খয়রাতি সাহায্যের উপর ভরসা করে থাকলে মূল সমস্যার সমাধান কখনো আসবে না। দরিদ্রতম মানুষের মধ্যেও কর্মশক্তি আছে, নিজের দায়িত্ব নিজে নেবার ক্ষমতা আছে- তাকে ক্রমে ক্রমে জাগিয়ে তোলার আয়োজন করতে হবে। সেটা করার জন্য নাগরিক সমাজকে তাদের সৃজনশীলতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমি সামাজিক ব্যবসার ধারণাটাকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং অন্যদেরকেও এব্যাপারে আগ্রহী করার চেষ্টা করছি। দেশে এবং বিদেশে অনেকে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসছেনও। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, পরিবেশের ক্ষেত্রে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে, প্রযুক্তির উদ্ভাবনশীল ব্যবহারের ক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৃহত্তর গণ্ডিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে, ব্যাংকিং-এর ক্ষেত্রে, এরকম আরো বহু ক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবসার ধারণা এবং কাঠামো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।

এই সমর্থন নাগরিক উদ্যোগের অগ্রযাত্রার প্রতি সমর্থন

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে যে সমর্থন দেশের ভেতরে এবং বাইরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে সে সমর্থন শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি সমর্থনই নয়, সে সমর্থন নাগরিক উদ্যোগের অগ্রযাত্রার প্রতিও সোচ্চার সমর্থন। এই সমর্থনকে অব্যাহত রাখতে হবে। জোরদার করতে হবে। এই সমর্থনকে সক্রিয় উদ্যোগে পরিণত করার আয়োজন করতে হবে। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে আমি আমার উদ্যোগ অব্যাহত রাখবো। একাজে শরিক হবার জন্য আপনাদেরকেও আহ্বান জানাচ্ছি। সবাইকে সামাজিক ব্যবসা করতে হবে এমন কোন প্রস্তাব আমি দিচ্ছি না। যে যেভাবে পছন্দ করেন এগিয়ে আসবেন। আমার মূল প্রস্তাবটি হচ্ছে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সামাজিক সমস্যা সমাধানের প্রচুর ক্ষমতা আছে। সে ক্ষমতাকে কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য যেন আমরা এগিয়ে আসি। সে বিপুল ক্ষমতাকে সুপ্ত রেখে, কর্মক্ষেত্রে তাকে বিন্দুমাত্র ব্যবহার না করে শুধু আক্ষেপ আর হা-হুতাশ করে যেন আমরা পৃথিবী থেকে বিদায় না নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে যদি আমরা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই তার ভিত্তিতে আমাদেরকে এখনই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের সুপ্ত ক্ষমতাকে অবিলম্বে কাজে লাগাতে পারলে সে ভিত্তি তৈরি করা অবশ্যই সম্ভব।

চল্লি­শ বছর আগে এদেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে ছিল। এখন আছে ৩২ শতাংশ মানুষ। আর পরবর্তী বিশ বছরে ৩২ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপর ওঠানো কি এতই অসম্ভব? আমার কাছে তা মোটেই অসম্ভব বলে মনে হয় না- বিশেষ করে পৃথিবীর এবং তার সঙ্গে আমাদের নিজেদের পরিবর্তনের গতি অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত হবার পরিপ্রেক্ষিতে এবং আমাদের তরুণদের মধ্যে বিশ্বের পরিবর্তনের গতিটাকে দ্রুত আত্মস্থ করার ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে।

আসুন, আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করি, যে ব্যাংক গরীব মহিলাকে তার সুপ্ত ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে; যে ব্যাংক পৃথিবীতে স্বনির্ভরতার মাধ্যমে দারিদ্র্যের সমস্যার মোকাবিলা করার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। তার সঙ্গে নিশ্চিত করি নাগরিক সমাজের সকল উদ্যোগের স্রোতকে বাধাহীনভাবে বেগবান করার নিরাপত্তাকে। আসুন, সমবেতভাবে নিশ্চিত করি এ-জাতির আত্মমর্যাদায় মহীয়ান ভবিষ্যেক, আর আগামী পৃথিবীতে মানব কল্যাণে আমাদের নেতৃত্ব দেবার সুযোগকে। সরকার এবং নাগরিক সমাজ পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার মধ্যে কাজ করতে পারলে আমাদের এই অর্জন সহজেই সম্ভব। এ সুযোগকে যেন আমরা কিছুতেই হাতছাড়া না করি।
http://new.ittefaq.com.bd/news/view/13055/2011-05-08/1

‘ইউনূস ইস্যুর সুষ্ঠু সমাধান আশা করে ফ্রান্স’

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল ২০১১
স্টাফ রিপোর্টার: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির সফররত বিশেষ দূত মার্টিন হার্শ বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যুতে বাংলাদেশকে হুমকি ধমকি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা শিক্ষা দিতে আসেননি তিনি। বরং বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান আশা করে ফ্রান্স। তিন দিনের সফর শেষে গতকাল ঢাকা ছাড়ার আগে ফ্রান্স রাষ্ট্রদূত শার্ল কসুরের গুলশানের বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে ইউনূসের সঙ্গে সরকারকে সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে সারকোজির বিশেষ দূত বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও সরকার উভয়ই দারিদ্র্যবিমোচনে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করছে। গ্রামীণের ক্ষুদ্রঋণ ও নোবেল জয়ী ইউনূস বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছে। ১৮ মাস আগে ঢাকা সফরের কথা উল্লেখ তিনি বলেন, তখন গ্রামীণ ব্যাংকসহ অন্য ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার একই সুরে কথা বলতো। কিন্তু এবার এসে ভিন্নতা দেখছি। এ ভিন্নতার কারণ জানতেই এসেছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জি-২০’র সদস্যভুক্ত দেশ না হলেও পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিতে পারে। আর এ জন্যই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিগত ৪০ বছরে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে উল্লেখ করে ফ্রান্স প্রেসিডেন্টের এ দূত বলেন, আজ বাংলাদেশ বিনিয়োগের বিশাল ক্ষেত্র, কিন্তু তা তার দেশের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখনও জানেন না। ফলে জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্রান্স সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সারকোজির দূত জানান, তার দেশের বেশির ভাগ মানুষ বাংলাদেশকে চেনে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ ও ড. ইউনূসের মাধ্যমে। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকাস্থ ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম জানায়, ইউনূস ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারকে সহযোগিতার কোন সুযোগ আছে কিনা তা জানতে চেয়েছেন নিকোলাস সারকোজি। তার বিশেষ দূতের বরাত দিয়ে জানানো হয়, নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সরকারে সৃষ্ট জটিলতায় ফ্রান্স বিস্মিত। রোবরার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ফ্রান্স প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সারকোজির একটি চিঠিও হস্তান্তর করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ভুল বোঝাবুঝিতে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিতে পড়ুক ফ্রান্স সরকার এমনটি চায় না বলেও মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্টের দূত।
http://www.mzamin.com/index.php?option=com_content&view=article&id=8191:...

ইউনূস নিজে সুবিধা নেননি ব্যাংকের নানা অনিয়ম

গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার দেশের প্রথম সারির ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। নরওয়েজিয়ান টেলিভিশনে গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর প্রচারিত ‘ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে’ প্রামাণ্যচিত্রের বিষয়টিতে মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কোনো তথ্য মেলেনি। বরং এ বিষয়ে নরওয়েজিয়ান এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (নোরাড), নরওয়ে ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অনেক আগেই সমঝোতা হয়েছে। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের এই কার্যক্রম ক্ষমতাবহির্ভূত ছিল।

গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকার-গঠিত পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। কমিটি গতকাল সোমবার সকালে তাদের প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দিয়েছে। সূত্রে জানা যায়, তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু অনিয়মের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিভিন্ন দাতা ও ঋণদানকারী সংস্থা গ্রামীণ ব্যাংককে যে অর্থ দিয়েছে, তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি মানা হয়নি। গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল প্রথমে গ্রামীণ ফান্ড ও গ্রামীণ কল্যাণে নেওয়া হয়েছে। পরে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ৪৬টি প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো মালিকানাস্বত্ব নেই। এই ৪৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেকগুলোতে অধ্যাপক ইউনূসের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে গড়েও ওঠেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে নিয়মনীতি বা এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে গড়ে উঠেছে। গ্যারান্টি দিয়েও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে; গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ অনুসারে যেগুলো বিধিবহির্ভূত।

এসব কাজ গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুসারে আইনসম্মত হয়নি বলে মনে করে পর্যালোচনা কমিটি। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের জন্য দাতা এবং ঋণদানকারী বিদেশি কয়েকটি দেশ ও সংস্থা এই অর্থ গ্রামীণ ব্যাংককে দিয়েছিল। কমিটি এসব প্রতিষ্ঠানকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদের নয়জন সদস্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন শিক্ষিত নয়। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ইত্যাকার বিষয় পর্যালোচনায় তাঁরা অংশগ্রহণও করতে পারেন না। আবার সরকারের তিনজন প্রতিনিধিকেও তেমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি কাগজপত্রে। তদন্ত কমিটি এই নয়জন পরিচালক কমিয়ে ছয়জন করা এবং তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। তাঁরা ক্ষুদ্রঋণ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ নামের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাড়ে তিন মাস পর্যালোচনা করে কমিটি প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর গতকাল অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার চেয়ে ভালো। এ ছাড়া নোরাডের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের বিষয়ে নরওয়ে ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অনেক আগেই সমাধা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, কমিটিকে যে কার্যপরিধি দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী তারা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন সরকার প্রতিবেদনটি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে।
অন্যদিকে কমিটির প্রধান অধ্যাপক এ কে মনোয়ার উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কার্যপরিধি অনুসারে আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন এটা সরকারের সম্পদ, সরকারই ঠিক করবে তাদের করণীয়।’ তিনি বলেন, তাঁরা একটি চেকলিস্টও দিয়েছেন। বেশ কিছু বিকল্প সুপারিশ সেখানে রয়েছে।

পরে প্রথম আলোকে মনোয়ার উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার মধ্যে সমন্বয় বা এগুলোর বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো নীতিমালা নেই। কমিটি এমন একটি নীতিমালা তৈরি করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে, যে নীতিমালা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে বলে কমিটি আশা করে।’ তিনি বলেন, এই নীতিমালার আওতায় আইন কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়টি আসবে। এদিকে, গতকাল গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের তথ্য ও গণমাধ্যম সমন্বয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জান্নাত-ই-কাওনাইন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দৈনিক পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে যা বলা হয়েছে, তাতে সরকারি কমিটির প্রতিবেদনে নরওয়ের দাতা সংস্থা নোরাডের অনুদানের টাকায় কোনো অনিয়ম হয়নি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থার চেয়ে কম। প্রতিবেদনে এই দুটি প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসায় গ্রামীণ ব্যাংকের সব কর্মী, সদস্য, গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ী স্বস্তি বোধ করছেন। কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অন্যান্য বিষয়ে ব্যাংকের বক্তব্য থাকলে সেটা পরবর্তী সময়ে জানাতে পারবে বলেও বিজ্ঞপিতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গ্রামীণ ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য সরকার গত ১০ জানুয়ারি পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে মনোয়ার উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে এই কমিটিতে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নজরুল হুদা, সাবেক ডেপুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বেগম রোকেয়া দীন, বিআইবিএমের সাবেক অধ্যাপক ও কলামিস্ট আর এম দেবনাথ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মহসীন রশীদ।

জানা যায়, কমিটি গ্রামীণ কল্যাণের তহবিল স্থানান্তর বিষয়ে নরওয়েজিয়ান টেলিভিশন, নরওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়া সংবাদ পর্যালোচনা, গ্রামীণ নামের সঙ্গে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের তালিকা এবং এর সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের আন্তসম্পর্ক, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থার সুদ পর্যালোচনা এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ ও গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ পর্যালোচনা করে তাদের সুপারিশ তৈরি করেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা: একটি সূত্র জানায়, কমিটি তাদের প্রতিবেদনের সুপারিশে গ্রামীণ ব্যাংককে পুরোপুরি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলেছে, ঋণ বিতরণকারী যেকোনো সংস্থার একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা প্রয়োজন। সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এটা প্রয়োজন। গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে দেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমিটি মনে করে, প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংককে এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনা দরকার। কমিটি সূত্র বলছে, বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সুযোগ রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপের। বিশেষত ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৪ ও ৪৫ ধারা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কমিটি মনে করে, এমআরএর আওতায় গ্রামীণ ব্যাংককে আনতে আইনি সংস্কার করা হলে এই দুই ধারা প্রয়োগের জন্য ইতিপূর্বে জারি করা সরকারি গেজেটটি বাতিল করা যেতে পারে।

ঋণের সুদ: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের কার্যকর সুদের হার ২০ শতাংশ। তবে ঋণ নেওয়ার আগেই ঋণ বীমার ফি পরিশোধে বাধ্যবাধকতা, বাধ্যতামূলক সঞ্চয়, কেন্দ্রঘর নির্মাণের চাঁদা ইত্যকার বিষয় বিবেচনা করে সুদের হার সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ০৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়। তবে দেশের প্রথম সারির ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলো, যেমন—ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস, পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র, ব্যুরো বাংলাদেশ—এদের ক্ষেত্রে সবকিছু হিসাবে নিলে সুদের হার ৩০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি। বলে জানায় সূত্রটি। সেই বিবেচনায় গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ে এসব এনজিওর সুদের হার বেশি।

নোরাডের তহবিল স্থানান্তর: সূত্র জানায়, গ্রামীণ কল্যাণের তহবিল স্থানান্তর বিষয়ে নরওয়েজিয়ান টেলিভিশন, নরওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তা প্রকাশ ও প্রচারিত হওয়া সংবাদ পর্যালোচনা করে কমিটি বলেছে, নরওয়ে সরকার নোরাড কর্তৃক গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া অনুদানের অর্থ হস্তান্তর বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগটি নিষ্পত্তি করেছে। অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি গ্রামীণ ব্যাংকের এখতিয়ারের মধ্যে না থাকলেও তাতে তহবিল কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়েছে তা বলা যায় না। কমিটি মনে করে, কর ছাড় পেতে অনুদানের অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানে দিয়ে তা আবার একই প্রতিষ্ঠানে ফেরত আনার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছে, তা গ্রামীণ ব্যাংকের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ।
গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের ৪৬ প্রতিষ্ঠান: সূত্র জানায়, কমিটির পর্যালোচনায় গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী গ্রামীণ ফান্ড, গ্রামীণ কল্যাণসহ অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন বিধিসম্মত হয়নি, যে কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ মুহাম্মদ ইউনূসসহ গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনে অনুমতি দিতে পারে না। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৩ সাল পর্যন্ত অনুমোদন ছাড়াই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্ষদ তাঁকে ২০ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনে কার্যোত্তর অনুমোদনও দেয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল দিয়ে গ্রামীণ ফান্ড ও গ্রামীণ কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার এই দুই প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে তৈরি হয়েছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুসারে এসব প্রতিষ্ঠান গঠন ও অর্থায়ন গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষমতাবহির্ভূত কাজ হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ এসেছে আইএফএডি, নোরাড, সিডা (সুইডেন), সিডা (কানাডা), ইউএসএআইডি, ফোর্ড ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ঋণ ও অনুদান থেকে। এসব অনুদানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ও দারিদ্র্য বিমোচন সহায়ক প্রকল্পে ঋণ বা মূলধন জোগানো। এসব সামগ্রিক বিষয়ে মতামত চাওয়া হলে অধ্যাপক মনোয়ার উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিস্তারিত বিষয়ে আমি বলতে চাই না। তবে আমাদের বিবেচনা হলো, আমরা ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করে আমাদের সুপারিশ তুলে ধরেছি। একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্র ও বিধিবিধানের ব্যত্যয়গুলো তুলে এনেছি।’

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla