Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

একজন আবু বকরের মৃত্যু ও কিছু প্রাসংগিক কথা...

Student Politics in Bangladesh
নিন্দা, প্রতিবাদ ও শোকবানীর ঢেউয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাসতে দেখা যায়নি অনেকদিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১৮মাস বন্ধ থাকার পর আর্ন্তদলীয় কোন্দলে অস্ত্র ও পেশী প্রদশর্নীর পাশাপাশি রক্তও ঝরছিল একটু আধটু। এ বিবেচনায় আবু বকরই বোধহয় প্রথম লাশ। পরি পরি করেও পরছিলনা, আহত, মারাত্মক আহত, পংগুত্বের মাঝেই সীমাবদ্ব ছিল লাশের দৌঁড়। কিন্তূ পূর্ণাংগ লাশ যে পরতে যাচ্ছে এ ব্যাপারে কারও কোন সন্দেহ ছিলনা। আবু বকর সে অপেক্ষায় ইতি টেনে নতুন করে জানিয়ে দিয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব একেবারেই ডালভাত। ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে যারা ঐতিয্যের ডান্ডায় বেধে ঝান্ড হিসাবে মূল্যায়ন করেন, তাদের কাছে আবু বকরের লাশ কেন এতটা রাগের, ক্ষোভের বুঝার কোন উপায় নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে লাশ একটি অতিমূল্যবান ও এফেক্টিভ ফ্যক্টর, আমাদের অতীত ইতিহাস কি তাই বলেনা? মৃত আবু বকর এ বিবেচনায় নিজকে আনলাকি ভাবতে পারেন, কারণ উনার লাশ আর্ন্তদলীয় কোন্দলের লাশ, যা আন্দোলন দাঁনা বেধে উঠার লাশ হিসাবে কাজ করতে পারবে না।

রাজনৈতিক লাশ নিয়ে বিগত জোট সরকারের তথ্যমন্ত্রী ব্যরিষ্টার নাজমুল হুদার একটা মূল্যবান মন্তব্য আছে, যা মনে করে শুশীল সমাজ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারেন। ‘সন্ত্রাষীরা নিজদের ভেতর গোলাগুলি করে মরে সরকারের কাজকেই সহজ করে দিয়ে যায়’। হুদা সাহেবের এ ধরনের বেহুদা মন্তব্যে অনেকদিন পর্যন্ত বিমোহিত ছিলাম। কিন্তূ যেদিন শোনলাম উনার দুই কন্যা লন্ডনে মাসিক ২০ লাখ টাকা খরচ করে লেখাপড়া করছেন, বুঝতে বাকি থাকেনা এ ধরনের মন্তব্যের উৎস কোথায়। বলা হচ্ছে মৃত আবু বকর ছিল ইসলামের ইতিহাস বিভাগের মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রলীগের ক্যাডার। একটা সত্য খটকা লাগায়, একজন মেধাবী ছাত্র যখন ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া করতে যায় কোনটা তার কাছে বেশী শিক্ষনীয়, ইসলামের শিক্ষা না নেত্রীর তথাকথিত আদর্শ? যদি নেত্রীর আদর্শই মেধা মূল্যায়নের মানদন্ড হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন গোলমাল আছে, অথবা ইসলামের ইতিহাস একজন মেধাবী ছাত্রকে দলীয় ক্যাডারত্ব হতে দূরে রাখায় কাজ করছেনা। আবু বকরের মৃত্যুকে বিশ্লেষন করতে গেলে এ চ্যাপ্টারটুকু বিবেচনায় আনার জন্যে শুশীল সমাজকে অনুরোধ করব।

আমার নিজের কলেজ ঢাকা কলেজে ক’দিন ধরেই ক্ষমতসীন দলের ছাত্ররা অস্ত্রের মুখে কর্তৃপক্ষকে জিম্মি করে রেখেছে ভর্ত্তি বানিজ্যের কারণে। এ কথা কারও কাছে নতুন তথ্য নয় ঢাকা কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতির মূল কাজটা কি। নিউ মার্কেট হতে শুরু করে সমগ্র এলাকাজুড়ে চলে চাঁদাবাজির মহোৎসব, বছরে ’আয়’ হয় কোটি কোটি টাকা। এ টাকা হতে নিজেরা ভাগ পায়, উপরওয়ালাদের দিতে হয় মোটা অংকের বখড়া, এবং ভীত গাড়তে হয় ভবিষৎ রাজনীতির পাকা সিঁড়ি। এ সিঁড়ি বেয়ে যাওয়া যায় ক্ষমতার খুব কাছে, নিঃশ্বাষ অনুভব করা যায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। একজন আমানুল্লাহ আমান হতে পারে এর জ্বলন্ত উদাহরন। উপড়ে উঠার এ লড়াই মসৃন হবে এমনটা আশাকরা হবে অন্যায়। কারণ ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে ডিগ্রী প্রাপ্তির পর কি ভবিষৎ অপেক্ষা করছিল আবু বকরের জন্যে? যেন তেন একটা চাকরী? মাথা গোজার একটা ঠাই? জন্ম-মৃত্যুর স্বাভাবিক নিশ্চয়তা? কোনটাই না। অথচ ছাত্ররাজনীতির নেত্রীত্ব তাকে এনে দিতে পারত বিত্ত বৈভব্যের প্রাচুর্য, খুলে দিতে পারত ক্ষমতার সোনালী দুঁয়ার। সমসাময়িক রাজনীতির প্রথম সাড়ির ছাত্র ও যুব নেতাদের সারিবদ্বভাবে উলংগ করা গেলে তাদের নেত্রী পূঁজার লেবাস খসে যা বের হবে তা কেবলই টাকা, কেবলই সম্পত্তি আর প্রাচুর্যের ফোয়াড়া।

কথার পেছনে কথা গেঁথে অনেক কথাই বলা যাবে, কিন্তূ তাতে কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয়না। দু’দিন পর সব ঠান্ডা হয়ে আসবে, আবু বকরের ঠাঁই হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাশের তালিকায়। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনভাবেই রাজনীতি হতে রেহাই দেয়ার উপায় নেই কারণ অনেক রাঘব বোয়ালদের স্বার্থ জড়িত এতে। লাল-নীল-সাদা শিক্ষক হতে শুরু করে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাও অনেকাংশে নির্ভর করে ছাত্ররাজনীতির উপর। ’৫২’র ঐতিয্য, ৭১’এর শৌয্য বীর্য্য, স্বৈরতন্ত্র উৎখাতের অধ্যায়, গণতন্ত্র পাহাড়া দেয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব, এত সব সোনালী অতীত আর বর্তমানকে পদদলিত করে শিক্ষাংগন হতে রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো হবে জাতির সাথে ’বেঈমানী’ করা। তাহলে কি আবু বকরদের লাশ ঐতিয্যের কাফনে দাফন করে দায়মুক্তি পাওয়ার সাংস্কৃতি চলতেই থাকবে? হয়ত তাই, কিন্তূ এ ব্যাপারে আমার একটা প্রস্তাব আছে।

হিসাব কষে দেখা গেছে ছাত্র নেতাদের অনেকেরই বয়স চল্লিশের উপর। অনেকে আবার পিতা হতে পিতামহ পর্যন্ত হয়ে গেছেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের বয়স সে তুলনায় এমন কিছু নয়। আসুন দাবী জানাই প্রধানমন্ত্রীর দরবারে, জয় ওয়াজেদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পূর্বক ছাত্রলীগের প্রধান বানানো হোক। আমরা দেখতে চাই প্রধানমন্ত্রীর তনয় হাতে কাটা রাইফেল নিয়ে লড়াই করছেন মাতা ও পিতামহের আদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্যে। খালেদা জিয়ার দুই সন্তানকে যথাক্রমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজে ভর্তি করে দায়িত্ব দেয়া হোক ছাত্রদলের। যেহেতু ঐতিয্যের ছাত্র রাজনীতি কিছুতেই আমাদের শিক্ষাংগন হতে দূর করার নয়, তাহলে চলুক সে ঐতিয্য। এবং সে ঐতিয্যের অগ্রদূত হিসাবে সামনে আসুক নেতা-নেত্রীদের সন্তানগন। ভার্জিনিয়ার আয়েশী জীবন শেষ হোক, লন্ডনের ফিউজেটিভ জীবনের সমাপ্তি হোক, আমরা সেনাপতি হিসাবে যোগ্য সেনাদের চাই, আবু বকরদের মত তৃতীয় সাড়ির সেনাপতি নয়।
************************************************************************
দ্রষ্টব্যঃ ভিন্ন সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। কেউ বলছে আবু বকর ছিল সাধারন ছাত্র। তদন্ত শেষে সত্য বেরিয়ে আসলে যদি কারও কাছে ক্ষমা চাইতে হয় তাহলে মৃত আবু বকরের কাছেই চাইব, অন্য কারও কাছে নয়!

Comments

HAIRE AMAR MONMATANO DESH

Court rejects SQ Chy's case
Wed, Mar 24th, 2010 5:46 pm BdST Dial 2324 from your mobile for latest news

Dhaka, Mar 24 (bdnews24.com)—A Dhaka court has rejected a case by Salauddin Quader Chowdhury's over an alleged attempt to poison Sheikh Hasina during her stay in 2007-08, while the government has said it is probing the matter.

Advocate AKM Fakhrul Islam filed the case with the Chief Metropolitan Magistrate's Court on Wednesday morning on behalf of Chowdhury, an MP from Chittagong and senior figure of the opposition BNP.

The case accused former president Iajuddin Ahmed, ex-chief adviser Fakhruddin Ahmed, former army chief Gen Moeen U Ahmed and four others over the alleged poisoning.

The metropolitan magistrate AKM Imdadaul Haque rejected the case following an afternoon hearing.

DUTO KAHINI KATOTA SAMONJOSSO PURNO
-==========================================
JOY KE VOIP BUISSNES MAN BOLATE FARUKER BIRODDE ARREST WARRENT

bichitro deseser bichitro prodanmontri

বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৩০ জন আ. লীগের: হাসিনা
Wed, Mar 24th, 2010 8:13 pm BdST Dial 2324 from your mobile for latest news

চট্টগ্রাম, মার্চ ২৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৩০ সেনাকর্মকর্তা আওয়ামী লীগ পরিবারের বলে জানিয়েছেন দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ-মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৩০ সেনা কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ পরিবারের উল্লেখ করে হাসিনা বলেন, "যাদের আমরা ক্ষমতায় এসে এসএসএফসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে।"

গত বছরের ২৫-২৬ ফেব্র"য়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহে ৫৬ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন।

বুধবারের সভায় জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার অভিযোগ আনেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, "জিয়াউর রহমান খুনীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরষ্কৃত করেছে। এর পর এরশাদ এসে খুনি কর্নেল ফারুককে প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেট করলো রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য।"

"পরবর্তীতে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে খুনি কর্নেল রশিদকে এমপি বানিয়ে পার্লামেন্টে বসিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে" অভিযোগ করে তিনি বলেন, "তারা একের পর এক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদদ দিয়েছে।"

এছাড়া বিএনপি বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলায় নিু আদালতের রায় ঘোষণার দিন হরতাল ডেকেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, বিগত জোট সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনে কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নিয়ে লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। চারদলীয় জোট সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন করলে এখন দেশের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

দেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করেন হাসিনা। তিনি বলেন, "সন্ত্রাসীদের মদদাতা যে দলেরই হোক সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।"

পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "গত জোট সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করে উল্টো পথে চলায় পার্বত্য চট্টগ্রামে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।"

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, "হামলার পরে প্রচার করা হয়েছিল- আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে হামলা করেছিলাম। বিডিআর বিদ্রোহের পরও একই ধরণের প্রচারণা চালাচ্ছে।"

এরপর হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সার্কিট হাউজে চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমসি/পিডি/২০০৭ ঘ.

এবার প্রথম হয়ে কাঁদালেন বকর

জীবনটা ছিল ঘাম-ঝরা পরিশ্রমের। কিন্তু চোখজুড়ে ছিল স্বপ্ন। সে স্বপ্ন সত্যিও হয়েছে। কিন্তু তার আগেই রক্তে ভিজে চলে গেছেন আবু বকর। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়ে যুগ্মভাবে প্রথম হয়েছেন তিনি।

১ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে নিজ কক্ষের বারান্দায় মাথায় আঘাত পান আবু বকর। ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। পড়ালেখার খরচ জোগাতে প্রাণান্ত চেষ্টা আর পরিবারের দুঃখ-দারিদ্র্য সবাইকে নাড়া দেয় তাঁর মৃত্যুর পর।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ফল গতকাল প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক প্রথম আলোকে বলেন, চতুর্থ সেমিস্টারে আবু বকরের তিনটি কোর্স ছিল। এর মধ্যে ২০৬ নম্বর কোর্সে বকর তিন দশমিক ৭৫ এবং ২০৭ ও ২০৮ নম্বর কোর্সে তিন দশমিক ৫০ করে পেয়েছেন। তাঁর সহপাঠী নাজমা প্রতিটি কোর্সে তিন দশমিক ৫০ করে পেয়েছেন। আগের সব সেমিস্টারের ফল মিলিয়ে বকর নাজমার সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন।

বকরের সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়ার খবরে অঝোরে কেঁদেছেন তাঁর শিক্ষক-সহপাঠীরা। কেঁদেছেন পরিবারের সদস্যরা। বকরের বড় ভাই আব্বাস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল বকর। সর্বশেষ বিভাগীয় চূড়ান্ত পরীক্ষায় সিজিপিএ তিন দশমিক ৫২ পেয়ে প্রথম হলো। কিন্তু কী হবে এই ফল দিয়ে...?’ কান্নায় ভেঙে পড়লেন আব্বাস।

আবু বকর ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সর্বশেষ পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ তিন দশমিক ৫৮ নিয়ে দ্বিতীয়, পরের সেমিস্টারেই তিন দশমিক ১৭ নিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েন। তৃতীয় সেমিস্টারে তিন দশমিক ৭৫ পেয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ান। তার পর চতুর্থ সেমস্টাির...। প্রথম হওয়ার খবর আর জানবেন না বকর।

তবে চতুর্থ সেমিস্টারের পরীক্ষা দিয়েই প্রথম হওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন আবু বকর। বকরের বন্ধু আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরীক্ষার শেষ দিনে একসঙ্গে বের হচ্ছিলাম হল থেকে। বকর বলল, এবার প্রথম হব, দোস্ত। সে প্রথম হলো ঠিকই, কিন্তু নিজে জানতে পারল না।’

বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত ফাতেমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পঞ্চম সেমিস্টারের শেষ মিডটার্ম পরীক্ষায় আমার কোর্সে ১৫ তে বকর সর্বোচ্চ ১২ পেয়েছে। এত ভালো ছাত্রটি এভাবে চলে গেল!’ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আবু বকরের প্রথম হওয়ার খবরটি আনন্দের। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার কথা মনে হলে এই ফল বেদনা জাগায়। এভাবে যেন আর কোনো স্বপ্নের মৃত্যু না হয়।’

সূত্র: প্রথম আলো

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না আবুবকরের

মালেক আদনান টাঙ্গাইল
নিহত ছাত্র আবুবকর : নয়া দিগন্ত
Photobucket
স্বপ্ন দেখে না পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্বপ্নের ভিন্নতা থাকলেও ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবাই বুকের কোণে স্বপ্নের জাল বোনে। তবে অপার সুযোগ থাকার পরও স্বপ্ন পূরণের শর্ত না মানার কারণে অনেকেই তাদের লালিত স্বপ্নের সীমানায় পৌঁছতে পারেন না। আবার এমনো অনেক আছে যারা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস আর মেধার ওপর ভর করে স্বপ্ন পূরণের শর্ত মেনে কাáিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে চেষ্টা চালিয়ে যায় নিরন্তর।

এমনই একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র আবুবকর সিদ্দিক। তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন। মানুষের মধ্যে সুশিক্ষার আলো ছড়াবেন। হাসি ফুটাবেন মা-বাবা, ভাইবোনদের মুখে। তাকে নিয়ে গর্ব করবে বìধু-বাìধবসহ এলাকার সবাই। কিন্তু স্বপ্নের সীমানায় এসেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণ হলো না তার। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন আবুবকর সিদ্দিক।প্রায় ১৮ ঘন্টা মৃত্যুর সাথে লড়ে গত বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে সবাইকে দু:খের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পারি জমান তিনি। গত বুধবার সìধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে আবুবকরের নিথর দেহ তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়িতে আনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোলাবাড়িসহ গোটা মধুপুরে। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনহারাদের বুকফাটা কান্নায়। প্রচণ্ড শীত ও রাতের আঁধারকে তুচ্ছ করে প্রিয় আবুবকরকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে আবালবৃদ্ধবনিতারা বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো ছুটে আসেন তাদের বাড়িতে। বাড়ির সামনেই কবর খোঁড়ে তাকে দাফন করা হয়। নির্মম হলেও সত্য যে, আবুবকরের সাথে দাফন হয়ে যায় তার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটিও। একই সাথে দাফন হয়ে যায় তাকে নিয়ে মা-বাবা, ভাইবোনসহ সবার রঙিন স্বপ্নগুলোও।

তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আবুবকর ছিলেন তৃতীয়। বাবা রুস্তম আলী দিনমজুর। মা রাবেয়া বেগম গৃহিণী। বড় ভাই স্খানীয় বাজারে মুদি দোকান করেন। ছোট ভাই ওমর ফারুক গোলাবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সর্বত্রই দারিদ্র্যের ছাপ। বাঁশের বেড়ার তৈরি ভাঙাচোরা দু’টি দো-চালা ঘর। দরিদ্র পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিল আবুবকরকে ঘিরে। তার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে সবাই হারভাঙা পরিশ্রম করেছেন। বাবা আর বড়ভাই মিলে দোকান করার পাশাপাশি অন্যের ক্ষেতখামারে কাজ করে তাকে টাকা দিয়েছেন। অনেক সময় অন্যের কাছ থেকে ধার করে ঢাকায় আবুবকরের কাছে টাকা পাঠাতেন। সেই সাথে তার মা রাবেয়া বেগমও হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রির টাকা এবং মাথায় কখনো তেল না দিয়ে সেই তেলের সামান্য টাকাও জমিয়ে রাখতেন ছেলের জন্য। আবুবকর বাড়ি এলে এক-দুই টাকা করে জমানো সেই টাকাগুলো তুলে দিতেন তার হাতে। আবুবকর নিজেও ছুটিতে বাড়ি এলে ক্ষেতখামারে কাজ করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন। আবুবকর আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না এটা কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। ছেলে হারানোর বেদনায় মা রাবেয়া বেগম বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন। আর সংজ্ঞা ফিরে এলেই দু’হাতে বুক চাপড়ে শুধু বলছিলেন, ‘আমার ছেলেরে এনে দাও’। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একবুক বেদনা নিয়ে তার বাবা রুস্তম আলী বলেন, ‘ও বলছিল লেখাপড়া শেষ হইলেই ভালো একটা চাকরি হবে। তখন আর এত কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু তাতো আর হইলো না। তার আগেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’ আক্ষেপ করে রুস্তম আলী বলেন, ‘যেখানে পড়তে গিয়ে ছাত্র গুলি খেয়ে মারা যায় সেটা কেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?’

আবুবকর ছুটিতে বাড়ি এলেই ছোট ভাই ফারুককে লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব তাগিদ দিতেন, বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। আর এজন্যই বুঝি প্রিয় ভাইকে হারিয়ে ফারুকের কান্না বাঁধ মানছে না। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতেই ফারুক বলে ওঠে ‘আমার ভাইতো কোনো দল করত না। তারপরও কেন তাকে এভাবে মরতে হলো?’ জান যায়, আবুবকরই গোলাবাড়ি গ্রামের একমাত্র ছেলে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত। এজন্য তিনি পরিবারের পাশাপাশি গ্রামবাসীরও গর্ব ছিলেন। ২০০৪ সালে গোলাবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এ গ্রেড পেয়ে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মধুপুরের শহীদ স্মৃতি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ গ্রেড পেয়ে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গোলাবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আ: লতিফ জানান, ছোটবেলা থেকেই সে খুব ভালো ছাত্র ছিল। তবে সে কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। বড় ভাই আব্বাস বলেন, ‘সে কোনো ছাত্র রাজনীতি পছন্দ করত না। সব সময় লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকত।’ সর্বশেষ গত কোরবানির ঈদে বাড়ি এসেছিলেন আবুবকর। মায়ের শত আবেদনের পরও শুধু লেখাপড়ার চাপে তিনি আর বাড়ি আসতে পারেননি। কারণ, যার স্বপ্ন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া তিনি কি চাইলেও বাড়ি আসতে পারেন। তবে মোবাইল ফোনে তার মাকে তিনি বলেছিলেন, মার্চে পঞ্চম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে লম্বা ছুটিতে বাড়ি আসবেন। আববুকর তার মায়ের কাছে বেঁধে দেয়া সময়ের আগেই বাড়ি এসেছেন, তবে জীবন্ত নয় লাশ হয়ে! আনন্দ নয় বেদনার বহর নিয়ে!
http://www.dailynayadiganta.com/fullnews.asp?News_ID=193683&sec=1

বকরের মৃত্যুর দায় কার?

কালের কন্ঠ রিপোর্ট | ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা বলেছেন, আবু বকরের মৃত্যু হয়েছে মাথায় পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেলের আঘাতে। কিন্তু তা মানতে নারাজ পুলিশ। তাদের দাবি, তাদের ব্যবহৃত আধুনিক টিয়ার শেলের আঘাতে এ মৃত্যু সম্ভব নয়। তাহলে কী কারণে প্রাণ গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিকের? এ প্রশ্নই এখন ঘুরছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ছাত্রদের জোরালো অভিযোগ, পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতই ইসলামের ইতিহাসের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র বকরের মৃত্যুর কারণ। পুলিশের দাবি, ইট-পাটকেল, লোহার রড, হাতুড়ি বা শক্ত কিছুর জোরালো আঘাতের পর ব্যাপক রক্তক্ষরণে বকরের মৃত্যু হয়েছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী গ্রামের এক অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান আবু বকরের মৃত্যুশোকে এখনো আচ্ছন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সাধারণ ছাত্র হয়েও রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার বকরের এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। এ অকাল মৃত্যুর কারণ খুঁজছেন তাঁরা। সেই রাতে (সোমবার) এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘাতের একপর্যায়ে পুলিশের অ্যাকশন চলাকালে অন্য সব সাধারণ ছাত্রের মতো চার তলায় থাকা বকরও অস্থির হয়ে আত্দরক্ষার পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু সে সুযোগ তিনি আর পাননি। সহপাঠীদের বর্ণনায়, হঠাৎ মাথায় পুলিশের একটি টিয়ার শেলের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন বকর। রক্ত ঝরতে থাকে অঝোরে। কিন্তু বাইরের পরিস্থিতির কারণে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অসাধ্য হয়ে ওঠে। প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষার পর রাত ৩টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বকরকে। বুধবার সকালে তিনি মারা যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ : স্যার এ এফ রহমান হলের ৪০৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন আবু বকর। তাঁর রুমমেট দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নাদিম বলেন, 'প্রথমে পুলিশ আমাদের রুমে ঢুকে পর পর চারটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ধোঁয়ায় রুম অন্ধকার হয়ে গেলে আমরা আটজন ব্যালকনিতে গিয়ে আশ্রয় নিই। আমাদের ঠিক ওপরে ৫০৩ নম্বর রুমে সে সময় পুলিশের অ্যাকশন চলছিল। তাদের বেধড়ক মারধরে ছাত্ররা চিৎকার করতে থাকে। ওই সময় পুলিশ ওপরের রুমের ব্যালকনি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। তারই একটি আবু বকরের মাথার পেছনে আঘাত করলে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।' সোমবারের সেই ঘটনার সময় নিহত আবু বকরের কাছাকাছি থাকা অন্য সহপাঠীদের বিবরণও একই রকম।

আহত হওয়ার সময় আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে ছিলেন আরো সাতজন। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ ছাড়া তাঁদের ওপর আঘাত করার কেউ ছিল না। পুলিশই তাঁদের রুমের ভেতরে ঢুকে বেধড়ক পেটায়। রুমের ভেতরে চারটি টিয়ার শেল মারে। ধোঁয়া থেকে বাঁচতে তাঁরা প্রথমে লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। পরে সহ্য করতে না পেরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানেও টিয়ার শেল এসে পড়লে আহত হন আবু বকর সিদ্দিক।

পুলিশ ও চিকিৎসকদের কথা : এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ চলাকালে হল কর্তৃপক্ষই পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে প্রথমে পুলিশ সেখানে গিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের তোপের মুখে পিছু হটে। পরে আরো পুলিশ সদস্য নিয়ে সেখানে যান শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম। পরে যান পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (রমনা) সৈয়দ নুরুল ইসলাম। পুরো অভিযানে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তদারকি করেন উপপুলিশ কমিশনার (রমনা) কৃষ্ণপদ রায়। অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নুরুল ইসলাম ছাত্রজীবনে এ হলেরই ছাত্র ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের এফ রহমান হল শাখার সভাপতিও ছিলেন বলে জানা যায়। এ ব্যাপারে নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অতীতে বা ছাত্রজীবনে কী করেছি সেটা মুখ্য নয়। এখন পুলিশের সদস্য, এটাই বড় কথা।'

এফ রহমান হলের ছাত্রদের অভিযোগ, পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতেই আবু বকর সিদ্দিক মারা গেছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শফিউল আলম সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাঁর মাথার পেছন দিকে ব্রেইনের কাছে স্টিল-জাতীয় বস্তু পাওয়া গেছে। আহত হওয়ার পর তাঁর মাথায় অস্ত্রোপচার করেন চার চিকিৎসক। তাঁদেরই একজন ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজিউল হক। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বকরের মাথার পেছনের অংশ থেঁতলানো ছিল। আঘাতের জায়গায় ৫ সেন্টিমিটার গোল হয়ে দেবে গেছে। মাথায় লম্বা হয়ে বেশ কিছু অংশ ফেটেও যায়। এটা কোনো বুলেটের আঘাত নয়। মাথার গোল হয়ে দেবে যাওয়া অংশে কোনো চামড়া ছিল না। তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগে তাঁর মাথার অস্ত্রোপচার করতে। ব্রেইনের নিচে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিসের আঘাত তা স্পষ্ট নয়। তবে গুলি বা রডের আঘাত বলে মনে হয়নি।

এফ রহমান হলে সোমবার রাতে পুলিশের ভূমিকা ও বকরের মৃত্যুর ব্যাপারে উপপুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনার সময় পুলিশ ৩৫-৩৬টি টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়েছে। ওই শেলগুলো পুরনো শেলের মতো নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এই টিয়ার শেল থেকে যে বস্তুটি বের হয়ে যায়, তা কারো শরীরে লাগলে কোনো অবস্থাতেই মৃত্যু হতে পারে না। আসলে সেটা বারুদের গোলার মতো। কোথাও লাগলে সেই স্থানে তাপ লাগতে পারে বা সামান্য পুড়ে যেতে পারে। আর টিয়ার শেলে অ্যালুমিনিয়াম বা ধাতবের যে অংশ থাকে, সেটা গানের মধ্যেই থেকে যায়। গান খুলে শেলের ওই ধাতব অংশ বের করতে হয়। টিয়ার শেলের ভেতরেও কোনো স্প্লিন্টার থাকে না বলে তাঁরা জানান। দুই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, ইট-পাটকেল, লোহার রড, হাতুড়ি, বা শক্ত কিছুর জোরালো আঘাতেই আবু বকর আহত হন। আর মৃত্যুর কারণ এই আঘাত ও রক্তক্ষরণ। ময়নাতদন্ত রিপোর্টেও মৃত্যুর কারণ হিসেবে এ কথাই উল্লেখ রয়েছে বলে তাঁরা জানান। এ ব্যাপারে প্রাথমিক তদন্ত করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে একটি রিপোর্টও দিয়েছেন বলে জানান কৃষ্ণপদ রায়।

হল প্রশাসনের ব্যর্থতা : প্রক্টর
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিকের মৃত্যুতে হল প্রশাসনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। হলগুলোতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের রাজনীতিতে যত বেশি রুমের নিয়ন্ত্রণ, তত বেশি কর্মীর নিয়ন্ত্রণ। দাপটও তত বেশি রাজনীতিতে। আর এ পরম্পরা মেনেই চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি। ইসলামের ইতিহাসের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু বকরের নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী এফ রহমান হলের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মোর্শেদ জাহান মিথুন গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, হল ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুক সমর্থিত গ্রুপ এমনিতেই বেশির ভাগ রুম নিয়ন্ত্রণ করত। কয়েক দিন ধরে নতুন ছাত্র উঠছিল অনেক। তাদের জায়গা দিতে হচ্ছিল মসজিদে অথবা গেস্ট রুমে। নিয়ন্ত্রিত কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে ফারুক ও তার সমর্থকরা কোনো বাছবিচার না করেই অতিরিক্ত ছাত্রদের রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে আসছিল। বাদ পড়েনি প্রতিপক্ষ গ্রুপের রুমগুলো। উত্তেজনা উসকে দেওয়ার জন্য এটাই ছিল যথেষ্ট। সোমবার সন্ধ্যা থেকেই উত্তেজনার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। মধ্যরাতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় দুই পক্ষ।

পরস্পরের প্রতি বিষোদ্গার পথ করে দেয় সংঘর্ষের। পুলিশ মোতায়েন করা হয় হলের সামনের রাস্তায়। দেরিতে আসেন হলের প্রভোস্ট ড. মো. আবদুস সাত্তার। এরপর প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা নাজমুল আলম সিদ্দিকীর সংঘর্ষ থামানোর অনুরোধ উপেক্ষা করে বিবদমান দুই পক্ষই। এ সময় প্রক্টর হলে প্রবেশ করেন। তাঁর উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগ হল শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদীর মাথা ফাটিয়ে দেয় প্রতিপক্ষ। সংঘর্ষের ভয়াবহতা দেখে প্রক্টর বেরিয়ে যান। সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়তে থাকলে আরো পুলিশ এসে যোগ দেয় হলের সামনে। প্রক্টরের সিদ্ধান্তে পুলিশ অ্যাকশনে যায়। যাকে সামনে পাওয়া গেছে তাকেই নির্বিচারে পেটাতে থাকে পুলিশ। মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ওই দিন এফ রহমান হলের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীরা। প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'রাত পৌনে ১টায় মেহেদী আমাকে ওই ঘটনাটি জানায়। আমি তাকে বলি প্রভোস্টকে বিষয়টি জানাতে। কেননা হলের পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রভোস্টের। তিনি (প্রভোস্ট) মনে করলে আমি উপাচার্যের অনুমতি নিয়ে যেতে পারি। ১০ মিনিট পর প্রভোস্ট আমাকে যেতে বললে আমি সহযোগী প্রক্টর আমজাদ আলীকে পাঠাই। এরপর প্রভোস্টের অনুরোধে আমি সেখানে যাই এবং তাঁরই (প্রভোস্ট) অনুরোধে পুলিশকে আসতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পর ঝুঁকি নিয়ে আমি ও সহকারী প্রক্টর এবং আরো কয়েকজন মিলে হলের তিন তলায় উঠি। ছেলেরা আমাদের ওপর দিয়েই মেহেদীর মাথায় আঘাত করে। পেট্রোল ভর্তি বোতলের মুখে আগুন লাগিয়ে দুই পক্ষই ছোড়াছুড়ি করতে থাকে। এক পর্যায়ে সহকারী প্রক্টরের গায়ে ইটের আঘাত লাগে। তখনো প্রভোস্ট সিঁড়িতেই ছিলেন। অবস্থা ভয়াবহ দেখে আমরা নিচে নেমে আসি। সেখানে গিয়ে দেখি, একের পর এক ছাত্র আহত হয়ে নিচে নামছে। নিচে দাঁড়ানো ছাত্ররা আমাকে হলে পুলিশ ঢোকাতে অনুরোধ করে। এক পর্যায়ে আমি পুলিশকে হলে সংঘর্ষরত দুই পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান নিতে বলি। পুলিশ না ঢুকিয়ে কোনো উপায় ছিল না।'

হলের নিয়ন্ত্রণ প্রভোস্টের হাতে না থাকা এবং আবু বকরের মৃত্যু সম্পর্কে প্রক্টর আরো বলেন, 'প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে এমনটি ঘটেছে। ইচ্ছা করলেই প্রভোস্ট এটি রোধ করতে পারতেন। অনেক হাউস টিউটর তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকেন কী করতে? তারা কী ছাত্রদের খোঁজ-খবর রাখেন? হল প্রশাসন সক্রিয় থাকলে তারাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারত। পুলিশও লাগত না, প্রক্টরও লাগত না।' এফ রহমান হলের প্রভোস্ট ড. মো. আব্দুস সাত্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যে শিক্ষার্থীরা হলে থাকে, তারা সবাই রাজনীতি করে। বড় দুটি রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় তারা হলে থাকে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী হলে অবৈধভাবে থাকে। এটা একটা রাষ্ট্রীয় সম্যসা।' হলে পুলিশ ঢোকানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, 'পুলিশ ঢুকাইলেও দোষ, না ঢুকাইলেও দোষ।'

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘এটা কোনো ব্যাপার না এমন ঘটতেই পারে’

প্রথম আলো | তারিখ: ০৫-০২-২০১০

শিক্ষাঙ্গনের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বললেন, ‘এটা কোনো ব্যাপার না, এমন ঘটতেই পারে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত তিন মন্ত্রণালয়ের এক সমন্বয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রের মৃত্যুসহ সারা দেশে কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সরকার কী ভাবছে, জানতে চাইলে সাহারা খাতুন বলেন, ‘সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা কোনো ব্যাপার না। এমনটি ঘটতেই পারে। তবে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি সেটিই বড় বিষয়।’"

বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই সমন্বয় বৈঠক করে। এতে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা দমনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—সাংবাদিকেরা বৈঠক শেষে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাই নেওয়া হচ্ছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর ভর্তিবাণিজ্য যা-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী, বকরের মা-বাবাকে কী বলবেন?

মতিউর রহমান, সম্পাদক
প্রথম আলো | তারিখ: ০৫-০২-২০১০

সরকার-সমর্থক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের পরিণতিতে এবার প্রাণ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক। দিনমজুর বাবার এই সন্তানকে ঘিরে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী গ্রামের দরিদ্র পরিবারটি স্বপ্ন দেখেছিল সোনালি এক ভবিষ্যতের। আবু বকর নিজেও দিনমজুরের কাজ করেছেন—নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে, পরিবারকে সাহায্য করতে। এভাবে তিনি স্কুল ও কলেজ-জীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতেও বাড়ি গিয়ে দিনমজুরের কাজ করতেন।

গত ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আবু বকর ছোট ভাই ওমর ফারুককে বলেছিলেন, ‘আর একটি বছর তোমরা কষ্ট করো। এরপর আমি পাস করে বের হব। ভালো চাকরি হবে। তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।’ কিন্তু পরিবারটির সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আবু বকরের পরিবারকে কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই। আবু বকর ছাত্ররাজনীতি করতেন না। কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির করুণ শিকারে পরিণত হলেন।

অপেক্ষায় আছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবু বকরের মা-বাবাকে কী বলবেন?
আমরা গত বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথম আলোয় লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলান।’ ২৯ ডিসেম্বর (২০০৮) নির্বাচনের পরের দিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তখন ওই লেখায় আমরা বলেছিলাম, শেখ হাসিনার শাসনামলের শুরুতেই যদি ছাত্রলীগ এভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাতে থাকে, তাহলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত শান্তিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আমাদের স্বপ্ন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীরা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন বলে আমরা শুনেছিলাম; কিন্তু কোনো ফল হয়নি।

গত বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আবার ছাত্রলীগের একাধিক পক্ষ বেপরোয়া সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত এবং শিক্ষকদের বাসভবনে ভাঙচুর হয়েছিল। এমন আরও ঘটনা ঘটেছিল। আমরা তখন এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের হুঁশিয়ারিমূলক ‘নির্দেশ’ শুনেছি বারবার।

গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী ঘটনাবলির পটভূমিতে আবার আমরা লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলাতে পারছেন না?’ বলেছিলাম, ‘শেখ হাসিনা ছাত্রলীগকে সামলাতে পারলেন না বা পারছেন না—এ কথা আমরা এত তাড়াতাড়ি বলতে চাই না। আমরা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে চাই; দেখতে চাই, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে কীভাবে সামলান, কতটুকু সামলান।’

আমাদের মনে আছে, সেদিন (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের ৬১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভা ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধান অতিথি। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ছাত্র হোক আর যে-ই হোক; আইন অমান্য ও চাঁদাবাজি করলে গ্রেপ্তার করা হবে, শাস্তি দেওয়া হবে, সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই হুঁশিয়ারি কোনো কাজে আসেনি। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর কথাও শোনেনি ছাত্রলীগ। বরং ফেব্রুয়ারির পর মার্চ আর এপ্রিলে ছাত্রলীগ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সশস্ত্র সংঘাতের ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ১৩ মার্চ (২০০৯) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস ঘটনার পর শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়েছিল ঢাকা ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ। তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছিল ছাত্রলীগ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অস্ত্র নিয়ে নেমে পড়ছিল বারবার। সে সময়ে খুলনা, সিলেট ও পটুয়াখালীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ঘটে সহিংস ঘটনা।

ওই সব সন্ত্রাসী ঘটনার পর শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ ছেড়ে দেন। ৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভা শেষে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যমকে। একই সঙ্গে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু এর পরও বন্ধ হয়নি ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদা আর টেন্ডারবাজি; বরং সারা দেশে এসব আরও ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে।

আমরা হিসাব করে দেখেছি, গত এক বছরে শুধু প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছে দেশব্যাপী ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীদের ১২১টি ছোট-বড় সন্ত্রাসী ঘটনার খবর। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরের মৃত্যুসহ মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সংঘর্ষের ফলে। মনে পড়ে, তখন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব হুঁশিয়ারি ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এবারের সহিংসতার পর যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ছাত্রলীগের এ এফ রহমান হল শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুককে দল থেকে বহিষ্কার এবং এই কমিটি বিলুপ্ত করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা কোনো ব্যাপার না। এমন ঘটতে পারে। তবে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি সেটাই বড় বিষয়।’

মনে পড়ে, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পল্টনে ছাত্রলীগের সেই পুনর্মিলনী সভায় বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী পরোক্ষভাবে প্রথম আলোর লেখালেখির কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের এক মাস সময়ও দিতে চায় না। এখনই লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার গঠন করেছি মাত্র ৩৫-৩৬ দিন হলো। এর মধ্যে সব ঠিক করে ফেলতে হবে! আলাদিনের চেরাগ নিয়ে তো ক্ষমতায় আসি নাই!’
আমরা কখনো বলিনি, কোনো সরকারের হাতে আলাদিনের চেরাগ আছে, ক্ষমতায় এসেই তারা এক মাসের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। আমরা নতুন সরকারের শুরুতেই ১৯ জানুয়ারি (প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলান) ও ১৭ ফেব্রুয়ারি (প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগকে সামলাতে পারছেন না?) দুটি মন্তব্যমূলক লেখা প্রকাশ করে সরকারকে বিনীতভাবে সজাগ করতে চেয়েছিলাম। কারণ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে ছাত্রলীগসহ সরকারি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো যে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, তা তখন বিভিন্ন আলামত থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অতীতেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬—২০০১) এসবের পরিণতি ভালো হয়নি, আমরা এমনটা দেখেছি।

আমাদের মনে আছে, একইভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আসার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল ছাত্রদল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের ৩৫ দিন পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম আলোয় মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রদলকে সামলান!’ ওই লেখার দুই বছর পর ২০০৩ সালের ৮ আগস্ট আমরা আবার লিখেছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রদলকে সামলাতে পারেননি।’ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পাঁচ বছর ধরেই ছাত্রদলের অব্যাহত ছাত্র-সন্ত্রাস, বন্দুকযুদ্ধ, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, জবরদখল চলে। এ সবকিছুর পরিণতি আমরা জানি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট মাত্র ৩১টি আসন পেয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। তার পরও থেমে নেই ছাত্রদল। এই সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের দুই পক্ষে সংঘর্ষ ও বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ আড়াই বছর আগে শেষ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কমিটিকেই নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। সাধারণভাবে শোনা যায়, কেন্দ্রীয়সহ দেশের বেশির ভাগ কমিটিতেই অছাত্ররা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আছেন। তাঁদের ‘প্রধান পেশা’ চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি।

এসব বিবেচনায় আমরা শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে বিভিন্নভাবে সাবধান করেছি। কিন্তু এসবে কোনো কাজ হয়নি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সমাবেশে আমাদের এসব লেখালেখির ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমালোচনা করেছিলেন, তা আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এরপর সরকারের এক বছর পার হয়েছে। আশা করেছিলাম, এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে উদ্যোগী হবে, ছাত্রলীগকে সামলাবে। কিন্তু তিনি পারলেন না। এ কথা বলতে গিয়ে আমরা কষ্ট পাচ্ছি। কারণ, স্বাধীনতার পর প্রায় চার দশক জুড়ে ছাত্ররাজনীতির নামে বাংলাদেশকে এক সন্ত্রাসকবলিত বিপন্ন দেশে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ ছোট-বড় বহু শিক্ষাঙ্গনে খুনোখুনি, গোলাগুলি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর হল দখলের ঘটনা ঘটেছে; ঘটছে সব সরকারের আমলেই। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্ররাজনীতির দোহাই দিয়ে এসব আর মেনে নেওয়া যায় না। এখন সময় হয়েছে প্রশ্ন তোলার যে, ছাত্রসংগঠন ও ছাত্ররাজনীতির নামে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমরা আর কত দিন মেনে নেব?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এখন আপনি কী বলবেন? আপনি আবু বকরের দিনমজুর বাবাকে, তাঁর অসহায় মাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যুকলঙ্ক

ছাত্রলীগের কোন্দলের শিকার সাধারণ ছাত্র, ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ

প্রথম আলো রিপোর্ট | তারিখ: ০৪-০২-২০১০

ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে প্রাণ দিতে হলো সাধারণ ছাত্র আবু বকর ছিদ্দিককে। গত সোমবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান ছাত্রবাসে মাথায় আঘাত পেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল বুধবার সকালে বকর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ-ভাঙচুর করেন। তাঁদের সঙ্গে পুলিশেরও সংঘর্ষ হয়।

ওই রাতে বকরের কক্ষে অবস্থানকারী তাঁর সহপাঠীরা দাবি করেছেন, তাঁর মাথায় পুলিশের ছোড়া গুলি লেগেছে। পুলিশ বলেছে, তারা ওই রাতে কোনো গুলি করেনি। টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়েছে। আর চিকিত্সকেরা বলেছেন, বড় ধরনের আঘাতে বকরের মাথার পেছনের হাড় ভেঙে গেছে।

এর আগে ক্যাম্পাসে ২০০৪ সালে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে সংগঠনটির নেতা মাহাবুবুল আলম ওরফে খোকন মারা যান। এবার প্রশ্নবিদ্ধ ছাত্র রাজনীতির করুণ শিকার হলেন একজন সাধারণ ছাত্র। আবার মৃত্যুর কালিমায় কলঙ্কিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আবু বকর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। থাকতেন হলের ৪০৪ নম্বর কক্ষে। প্রথম দুই বছরের ফলাফলে তাঁর অবস্থান ছিল প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয়। তবে তৃতীয় সেমিস্টারে তিনি রেকর্ড নম্বর পেয়েছিলেন।

গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায় আবু বকরের মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তাঁর সহপাঠীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে তাঁরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুর শুরু করেন। পুলিশ বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণ ছাত্রদের বিক্ষোভ ঠেকাতে তত্পর ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারাও। তাঁরা মল চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ছাত্রদের মিছিলে বাধা দেন, ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন।

ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার শেল) নিক্ষেপ করে। দুপুর একটা পর্যন্ত পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। ছাত্ররা বেশ কয়েকটি গাড়ি ও প্রক্টরের কার্যালয় ভাঙচুর করেন।

সোমবার ভোরে আহত আবু বকরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চার ঘণ্টা ধরে চলে তাঁর অস্ত্রোপচার। মঙ্গলবার থেকেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আবু বকর মারা গেছেন। ওই দিন বিকেলে একবার জ্ঞান ফেরে তাঁর। তবে রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যান। তারপর সকাল নয়টা ২০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিত্সক শফিকুল আলম বকরকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকেরা জানান, মাথার পেছনের অংশে বড় ধরনের আঘাতের কারণে সৃষ্ট ‘সাব-ডিউরাল হ্যামারেজে’ বকরের মৃত্যু হয়েছে। তবে আঘাতটি কিসের, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উপাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেভাবেই হোক, আমি এটাকে হত্যাকাণ্ডই বলব। আমি বরাবরই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির নামে মাস্তানি চলতে দেওয়া যায় না।’ তিনি জানান, এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দোষী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। উপাচার্য বলেন, ‘আবু বকরকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে।’

গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় বকরের মৃত্যুতে শোক ও নিন্দা প্রকাশ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সহ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদকে আহ্বায়ক করে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

বিক্ষোভ: সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ক্যাম্পাসে যান চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। বকরের মৃত্যুর খবর জানা গেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হওয়া বকরের সহপাঠীরা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। মিছিল থেকে রোকেয়া হলের সামনে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আরেকটি মিছিল বের হয়। ওই মিছিল উপাচার্যের বাসভবনের কাছে গেলে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইট ছোড়াছুড়ি হয়। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়ে। একদল ছাত্র বেলা ১১টার দিকে প্রক্টরের কার্যালয় ভাঙচুর করেন। এর পরই কলা ভবনের ভেতরের কলাপসিবল ফটকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রগতিশীল ছাত্রজোটসহ বাম সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল থেকে হত্যাকারীদের বিচার ও হলগুলোতে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

দুপুর দেড়টার দিকে স্বজনেরা আবু বকরের লাশ নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে রওনা হয়। এর ১৫ মিনিট পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পথগুলো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। কীভাবে মারা গেলেন বকর: সোমবার রাতে এ এফ রহমান হলের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। রাত দেড়টা থেকে ভোর পর্যন্ত ওই সংঘর্ষ চলে। উভয় পক্ষ রামদা, চাপাতি, পাইপ, লাঠি, হকিস্টিক নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আহত হন ৩০ জন। এ সময় আবু বকর ৪০৪ নম্বর কক্ষেই ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী আবু বকরের রুমমেট ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সবাই কক্ষে ছিলাম। কক্ষের সামনে ছাত্রলীগের একটি পক্ষ স্লোগান দিচ্ছিল। রাত তিনটার দিকে আমাদের কক্ষের সামনে পুলিশ আসে এবং জানালা দিয়ে আমাদের কক্ষে চার-পাঁচটি টিয়ার শেল ছোড়ে। অন্ধকার হয়ে যায় পুরো কক্ষ। শেলের আঘাতে দেয়াল ফেটে যায়। আমরা টিয়ার শেল থেকে বাঁচতে ব্যালকনিতে আশ্রয় নিই।’ মাহবুবুল আরও বলেন, ‘আমরা যখন ব্যালকনিতে, তখন নিচে প্রক্টর স্যারকে দেখতে পাই। আমরা বলি, ‘স্যার, আমাদের বাঁচান। এ সময় আমাদের ওপরের তলার ৫০৩ নম্বর কক্ষে ছিল পুলিশ। আমাদের চিত্কার শুনে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে আবু বকরের মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আমরা কক্ষে ঢুকে পানি এনে বকরের মাথায় পানি দিই। একপর্যায়ে আমরা প্রক্টরকে জানাই, স্যার, একটা অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। অ্যাম্বুলেন্স এলে বকরকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘সেদিনের ঘটনা ছিল ভয়াবহ। দুই পক্ষ পরস্পরকে আক্রমণ করছে। চোখের সামনে হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদীর মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আরও অনেকে আহত হন। আমরা শত চেষ্টা করেও স্বাভাবিক করতে পারিছলাম না।’ আবু বকরের আহত হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বকর তাঁর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। পঞ্চম তলা থেকে কেউ পাথর বা লোহার রড ছুড়ে মারে। এর আঘাতে তার মাথার পেছনের অংশে বড় ধরনের জখম হয়।’ তিনি বলেন, ‘চিকিত্সক ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিয়ার শেলের আঘাতে এত বড় ক্ষত হতে পারে না।’ গুলি লেগেছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে এসেছে, ভারী কিছুর আঘাতে বকরের মৃত্যু হয়েছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে সে রাতে বাধ্য হয়ে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছিল। পুলিশ কোনো গুলি ছোড়েনি। তবে ঢিল বা কোনো আঘাতে বকরের মৃত্যু হতে পারে।’ আবু বকরের শরীরে অস্ত্রোপচারকারী স্নায়ু ও শল্য (নিউরোসার্জারি) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোয়াজ্জেম বরকতউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বকরের মাথার হাড় ভাঙা ছিল। মগজের পর্দা থেঁতলানো ছিল। মগজও ছিল ফোলা। রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। বরকতউল্লাহ বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় বকরের মাথায় স্প্লিন্টার বা ধাতব কোনো পদার্থ পাওয়া যায়নি।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে আবু বকরের লাশের ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র জানায়, তাঁর মাথা কিংবা শরীরে কোনো স্থানে স্প্লিন্টার বা ধাতব কোনো পদার্থ পাওয়া যায়নি। মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আঘাতের কারণেই মৃত্যু হয়েছে।
নোংরা রাজনীতির বলি আবু বকর: এফ রহমান হলের একাধিক ছাত্রের দাবি, ছাত্রলীগের নোংরা রাজনীতির শিকার আবু বকর। হলের সিট দখল আর নিজেদের শক্তির প্রদর্শন করতে গিয়েই সেদিন সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাহমুদ হাসান বলেন, এ এফ রহমান হলে সংঘর্ষের ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হবে। এরই মধ্যে ওই হলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। হলের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম জানান, ওই সংঘর্ষের পর ফারুকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের গতকাল আদালতেও পাঠানো হয়।

লাশ দাফন: দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে আবু বকরের বড় ভাই আব্বাস আলী ও মামা আজহারুল ইসলাম গ্রামের বাড়িতে তাঁর লাশ নিয়ে যান। এ এফ রহমান হলের দুজন আবাসিক শিক্ষক ও বিভাগের দুজন শিক্ষক তাঁদের সঙ্গে গেছেন।

টাঙ্গাইল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে আবু বকরের লাশ বাড়িতে পৌঁছায়। কয়েক গ্রামের মানুষ আগেই এসে ভিড় করেছিল আবু বকরের বাড়িতে। গোলাবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে আবু বকরের জানাজা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।

প্রেক্ষাপট

মধ্যরাতে ঢাবিতে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপে গোলাগুলি, আহত ৩৫

সমকাল, Wed 3 Feb 2010

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দু'পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়, সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জে সোমবার মধ্য রাতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হল। ছাত্রদলের দু'পক্ষের সংঘর্ষ-গোলাগুলির জের শেষ না হতেই ছাত্রলীগের দু'পক্ষের সংঘর্ষ-গোলাগুলি ক্যাম্পাসে নতুন করে ভীতিকর অবস্থা তৈরি করেছে। রাতভর সংঘর্ষে ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটার আঘাতে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানসহ কমপক্ষে ৩০ ছাত্র আহত হয়েছেন। পুলিশের টিয়ার শেল আর ছাত্রলীগ কর্মীদের গোলাগুলির ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে গভীর রাতে ৬/৭ জন ছাত্র হলের চতুর্থ ও পঞ্চম তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। গুলিবিদ্ধ আবু বকর যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন, এমন আশঙ্কাও রয়েছে চিকিৎসকদের মনে। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুকসহ ৯ জনকে আটক করেছে। এ ঘটনায় মেহেদীর পক্ষে ওমর ফারুক বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুকের পক্ষের কর্মীদের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান পক্ষের কর্মীদের বিরোধ ও মতানৈক্য ছিল। উভয় পক্ষই চেয়েছে হলের কক্ষ দখল করে কর্মী সংখ্যা বাড়াতে। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় মেহেদীর দখল করা একটি কক্ষে (৩১১ নম্বর) প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে সিটে তুলে দেয় ফারুক পক্ষের কর্মীরা। এ ঘটনাকে ঘিরেই উভয়পক্ষের মধ্যে দেখা দেয় উত্তেজনা। আর এতে জড়িয়ে পড়েন সংগঠনের কেন্দ্রের ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতারা।

অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ফারুককে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকীব বাদশা আধিপত্য ধরে রাখার জন্য মেহেদীকে ইন্ধন দিয়েছেন। নিজেদের পক্ষের শীর্ষ নেতাদের আদেশ মানতে গিয়েই ওই দুই নেতা কোন ছাড় দিতে চাননি। জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে কেন্দ্রীয় ওই দুই নেতার সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুই নেতার সঙ্গে। কেন্দ্রীয় নেতাদের অবহিত না করে এবং ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র লংঘন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দায়িত্বশীল দুই নেতার প্রতি ক্ষুব্ধ কেন্দ্রের শীর্ষ নেতারা। কেবল আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের পকেটম্যানদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করেছিলেন তারা। অন্যদিকে গত বছর হল কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে ক্ষুব্ধ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা। এ রেষারেষির জের ধরেই গত কয়েক দিন ধরে সংগঠনের ভেতরে চলছিল কলহ। সংশ্লিষ্টদের মতে ওই কলহেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সোমবার রাতের ভয়াবহ সংঘর্ষে। রাত বাড়তে থাকলে উভয় পক্ষ সংগঠিত হতে থাকে। রাত সাড়ে ১২টায় সংগঠনের বিবদমান দুটি পক্ষের নেতাকর্মীরা হলের ভেতরেই মহড়া দিতে শুরু করে। ফারুক পক্ষের কর্মীরা হলের উত্তর ব্লকে আর মেহেদী পক্ষের কর্মীরা হলের দক্ষিণ ব্লকে অবস্থান নেয়। রাত ১টায় দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। বাড়তে থাকে উত্তেজনা।

যেভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রাত দেড়টার দিকে ফারুক ও মেহেদী পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। লাঠিসোটা, রড, হকিস্টিক, চাপাতি, দা, লোহার পাইপ দিয়ে এক পক্ষ হামলা করে আরেক পক্ষকে। ফারুক পক্ষের নেতৃত্বে ছিল এনামুল, সালাম ও রনি। আর মেহেদী পক্ষের ছিল সৈকত ও আসিফ। সংঘর্ষে একবার ফারুক পক্ষ পিছু হটে। আবার তারা সংঘবদ্ধ হয়ে ধাওয়া করলে মেহেদী পক্ষ পিছু হটে। এভাবে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ হল প্রাঙ্গণ থেকে ছড়িয়ে যায় ক্যাম্পাসেও। পছন্দের পক্ষকে সমর্থন করে পার্শ্ববর্তী সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, এসএম হল ও হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা যোগ দেয় সংঘর্ষে। এতে সংঘর্ষ আরও বড় আকার ধারণ করে। রাত ২টার দিকে হল প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল টিম ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পেঁৗছলেও সংঘর্ষ থামাতে ব্যর্থ হয়। তাদের উপস্থিতিতেই সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে দু'পক্ষের মধ্যে। এ সময় ফারুক ও মেহেদী নিজেরাও অংশ নেন মারামারিতে। সভাপতি ফারুক লাঠি দিয়ে সাধারণ সম্পাদক মেহেদীর মাথায় ও পিঠে আঘাত করেন। এতে মেহেদী পক্ষের কর্মীরা আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা ফারুকসহ তার পক্ষের কর্মীদের ওপর চড়াও হয়। থেমে থেমে চলতে থাকে সংঘর্ষ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শাহবাগ থানা পুলিশের সঙ্গে আর্মড পুলিশ সদস্যরা যুক্ত হয়ে পুরো হল ঘিরে অবস্থান নেয়। নিচ থেকে হলের বিভিন্ন তলায় টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে থাকে। হলের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছাত্রদের ওপর। কোনো রকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই লাঠিচার্জ করে পুলিশ সদস্যরা। এ সময় কর্তব্যরত দৈনিক সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হুজাইফা পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি হন। থেমে থেমে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ছাত্রলীগের দু'পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। এ অবস্থায় সব মিলিয়ে পুলিশ কমপক্ষে ৪০ রাউন্ড টিয়ার শেল ছোড়ে। টিয়ার শেলের শব্দের মধ্যেই ছাত্রলীগের উভয় পক্ষ ৮/১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে নিজেদের সশস্ত্র অবস্থান জানান দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ সময় গুলিতে আহত হন আবু বকর। আর মেহেদী আঘাত পাওয়ায় তার ক্ষুব্ধ কর্মীরা ফারুকের দোকান হিসেবে পরিচিত টিএসসিতে একটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়।

আহতদের অবস্থা : সংঘর্ষে ফারুক ও মেহেদীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০/২৫ জন কর্মী আহত হয়েছেন। ভয়ে চতুর্থ ও পঞ্চম তলা থেকে লাফ দিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ৬/৭ জন। এছাড়া টিয়ার শেলের আঘাত লেগেছে অনেকের শরীরে। লাঠিচার্জে একাধিক ছাত্রসহ সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আহত হন। হলের ছাত্ররা জানান, পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেলের কারণেই ছাত্ররা বেশি আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত আবু বকরের (ইসলামের ইতিহাস/তৃতীয় বর্ষ) মাথায় টিয়ার শেলে স্পিল্গন্টার ও রাবার বুলেট লেগেছে। তার ৪০৪ নম্বর কক্ষের জানালার কাঁচ ভেঙে পরপর তিনটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয় কক্ষে। রাজনৈতিক কক্ষ ভেবেই টিয়ার শেল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা ওই কক্ষের অন্য ছাত্রদের। কিন্তু পৃথকভাবে ৪০৩ নম্বর কক্ষটি রাজনৈতিক কক্ষ। আবু বকর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রয়েছেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, ১৬ ঘণ্টা পর তার জ্ঞান ফিরলেও এখনও শঙ্কামুক্ত নন তিনি। একই হাসপাতালে গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি রয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র উজ্জ্বল। এছাড়া হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন রুহুল আমিন, জাহিদ, ওমর ফারুক, সালেহীন, শুভ, শাওন, শাকিল, হাফিজ, ফারুক, তপু, আমিনুল প্রমুখ। এদিকে ফারুক দাবি করেন পুলিশ তাকে আটক করার পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়াসিম উদ্দিন জুয়েল হকিস্টিক দিয়ে মাথায় আঘাত করেন তার। এতে তিনি আহত হন।

গ্রেফতার ও মামলা : ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ফারুকসহ ৯ জনকে আটক করেছে। ফারুকের বিরুদ্ধে নীলক্ষেতে চাঁদাবাজিসহ পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনেক অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের থানায় রাখা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন, ফয়সাল (লোক প্রশাসন), জসীম (ব্যবস্থাপনা বিভাগ), রকি (ইতিহাস বিভাগ), রাজীব (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ), আলাল (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ), জুয়েল (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ) ও রকিব (হিসাববিজ্ঞান বিভাগ)। এদিকে আটককৃতদেরসহ ফারুককে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ওমর ফারুক (আইন বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ) বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অন্য আসামিদের মধ্যে এনামুল (আইন বিভাগ), জনি (দর্শন), তুষার (মার্কেটিং), আলমগীর (আইন বিভাগ) উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় একটি মামলা নিয়েছে থানা। তবে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই বাধ্য হয়েছেন তারা।

ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্য : সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন ও মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে রিপন সমকালকে বলেন, এমন ঘটনা অপ্রীতিকর। সংগঠনের যারাই এর সঙ্গে যুক্ত থাকুক এ ঘটনা ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু ও সাজ্জাদ সাকীব বাদশা দাবি করেন, অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন।

প্রশাসনের বক্তব্য
প্রক্টর ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, একটি সংগঠনের বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে মারামারি ঘটেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সমকালকে বলেন, আজ বুধবার সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় ঘটনা বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে।

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla