Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

একজন আবুল হোসেনের আবুলীয় কাহিনী

Bangladeshi
দিন তারিখ মনে রাখার অভ্যাস নেই, তাই ঘটনার তারিখটা (এমনকি সন) চাইলেও মনে করতে পারছিনা। অষ্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল বিশ্বচ্যম্পিয়নের মুকুট নিয়ে সবেমাত্র দেশে ফিরেছে। দেশটার ক্রিকেট পাগল প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড সিদ্বান্ত নিলেন জাতীয় বীরদের এই বীরত্বকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করতে হবে। কোন এক রোববার, সরকারী ছুটির দিন, সিডনীর ডার্লিং হারবারে নিমন্ত্রন জানানো হল শহরের ক্রিকেটপ্রেমী বাসিন্দাদের। ওরা এল, সংখ্যায় হাজার হাজার। হরেক রকম পোশাক, হাতে বাহারী রংয়ের ফেষ্টুন সহ অনেকে এল সপরিবারে। ক্রিকেটারদের আনা হল হুড খোলা গাড়িতে করে। চারদিকে বীয়ারের ফোয়ারা বয়ে গেল, কনফেটির বন্যায় ভেসে গেল ডালিং হারবার, অক্সফোর্ড ষ্ট্রীট সহ শহরের মূল রাস্তাগুলো। অজিরা নাচলো, গাইলো, পাশাপাশি খেলোয়াড়দের বেধে ফেলল ভালবাসার র্নিভেজাল বন্ধনে। পার্টি শেষে যে যার ঘরে ফিরে গেল, সোমবার সকাল হওয়ার আগেই রাস্তাঘাট পরিস্কার করে মুছে ফেলা হল আগের দিনের চিন্‌হ।

স্থান মাদারীপুরের কালকিনি নামের ছোট্ট একটা শহর। সময় গভীর রাত। শহরের কালকিনি নদীর উপর হেক্সাগন ডেভেলাপমেন্ট লিঃ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সেঁতু বানানোর চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে কারণ নির্মান কাজ এগুচ্ছেনা কিছুতেই। নদীতে সেন্ড বয়েলিং হচ্ছে প্রচন্ড, তাই পাইলিং করা সম্ভব হচ্ছেনা। এ নিয়ে সেঁতু কর্ত্তৃপক্ষ (এলজিআরডি) প্রতিনিয়ত B-B-Q বানাচ্ছে ঠিকাদারদের। কাজ সমাধা করায় বাকি পূঁজি কোত্থেকে আসবে এ নিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানে চলছে শোকের মাতম। রাত ২টা হবে তখন, একদল অস্ত্রধারী নিঃশব্দে প্রবেশ করল ঠিকাদারদের স্থানীয় ক্যাম্পে। যতটা সম্ভব মালামাল সহ ২জন দক্ষ শ্রমিককে অপহরন করে রাঁতের আধারে মিলিয়ে গেল বিনা বাধায়। ভোরের আলো ফোটার সাথে ক্যাম্পে হাজির হল একদল ’মুরুব্বী’, রাতে যা ঘটে গেছে তার একটা ফয়সালা করার মধ্যস্থতা করতে চান উনারা। ৫ লাখ টাকা হলেই লোক দুটোকে ফেরৎ পাওয়া যাবে, সাথে পাওয়া যাবে বাকি কাজ বিনা বাধায় সমাপ্ত করার নিশ্চয়তা, এবং দ্বিতীয় কোন দস্যুদল যাতে হানা দিতে না পারে তার জন্যে ২৪/৭ পাঁহাড়ার ব্যবস্থা। ৫ লাখ দূরে থাক, ৫ হাজার টাকার জন্যেই ঠিকাদার ধর্না দিচ্ছে দুয়ারে দুয়ারে। অনোন্যপায় হয়ে শহরের মালিক জবান আবুল হোসেন সাহেবের শরনাপন্ন হল তারা। সৈয়দ আবুল হোসেন, কালকিনি রাজনীতির ধ্রুব নক্ষত্র, সদ্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মা-বাবা, সংসদ সদস্য, এবং বলা হয় শহরের গাছপালাও সেজ্‌দা দেয় ’মহান’ এই মানুষটাকে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মহামানবের দেখা পেল সমাজের অন্যতম ’উচ্ছিষ্ট’ ঠিকাদারের দল। শহর-বাবা রাগে ক্ষোভে ফেটে পরলেন বাবার দুয়ারে ধর্ন না দিয়ে এলাকায় এত বড় একটা নির্মান কাজ হাতে নেয়ার জন্যে। বাবা নির্দেশ দিলেন কাজ বন্ধ ও ক্যাম্প গুটিয়ে শহর ছেড়ে দ্রুত পালানোর জন্যে। এর পরের ঘটনা বাংলাদেশের নৈমত্তিক ঘটনার পুনঃপ্রদর্শন মাত্র যা নিয়ে লেখালেখির খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। তবু বলছি। ঠিকাদার ঢাকায় ফিরে যোগাযোগ করেন অন্য এক বাবার সাথে, বাবায় বাবায় কথা হয় এবং শেষ পর্য্যন্ত দফা হয় কালকিনি বাবার ৬জন স্বসস্ত্র গুন্ডাকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে চাকরী দেয়ার মাধ্যমে। ১ বছরের কাজ আড়াই বছরে শেষ করে ঠিকাদার যেদিন কালকিনি হতে বিদায় নেয় ততদিনে তাদের প্রতিষ্ঠানের জ্বলে গেছে মৃত্যুবাতি।

যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনের কালকিনি প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে রূপকথা পড়লাম, তা নিয়ে দু’কলম না লিখলে বেচারাকে অসন্মান করা হবে নিশ্চয়! নির্বাচনী রায় নিয়ে সেই যে লোকালয় ছেড়ে গেলেন ১৩মাস পর সময় পেলেন গৃহ প্রত্যাবর্তনের। আর সময়ই বা কোথায়? বিডিআর ম্যাসাকার সামাল দিতে হল, বিরোধী দলের বিছানো এয়ারপোর্টের কাঁটা পরিস্কার করতে হল, সংসদে নিয়মিত হাজিরা দিতে হল, তাছাড়া ১৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেঁতুর ব্যবস্থা যে উনাকেই করতে হল। তবু উনি এলেন, নাড়ির টান চাইলেই কি ভুলা যায়? ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প মালিকের আগমন কি যেন তেন হলে চলে? তাই এ আগমনকে রাজার আগমন বানানোর সিদ্বান্ত নেয়া হল। উনার SAHCO (শাহ আবুল হোসেন & কোম্পানী - The sky is our limit) সাম্রাজ্যে ১ কোটি এমন আর কি টাকা, তাই নিজ সন্মানের খাতিরেই দিতে হল অংকটা। সে টাকায় হাতী সাজল, ঘোড়া নাচল, স্কুল হতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের রাস্তায় নামানো হল, ঢাকা হতে শিল্পী এল, বিদ্যুতের জন্যে বসানো হল অতিরিক্ত ট্রানসফরমার, আলোর বন্যায় ভেসে গেল কালকিনি নামের ছোট্ট একটা উপজেলা শহর। সাংবাদিকরা অবশ্য সামান্য একটু সমস্যা করল রাজার আগমনের রাজসিক বর্ণনা দিয়ে। আফটার অল জনগণ বলে একশ্রেনীর ’অপদার্থ’ প্রাণী বাস করে বাংলাদেশে, ডাল-ভাতের লড়াই শেষে ঘরে ফিরে এসব রসালো বর্ণনা তাদের হিংস্রতা বাড়িয়ে দেয়। মন্ত্রী জানতেন এমনটা, তাই ধমক দিয়ে সাবধান করে দিলেন বেয়াদব সাংবাদিকদের, একই ধরনের আরও ২০টি সম্বর্ধনা আছে সামনে, এ নিয়ে যেন লেখালেখি না হয়।

আসলেই বোধহয় লজ্জা নেই রাজনীতিবিদ নামের এসব ম্লেচ্ছদের। বছরও ঘুরেনি ১/১১’র দুঃস্বপ্ন হতে, আবারও শুরু হয়ে গেল লুটপাট আর অবৈধ আয়ের উলংগ প্রদর্শনী। বাগান বাড়ির হরিনগুলো হারিয়ে অফিস পিওন ফালু কতটা কষ্ট পেয়েছিল তা উনিই বলতে পারবেন, কিন্তূ আমরা যারা ’অপদার্থ’ প্রাণী, তারা দেখেছিলাম ফালু উত্থান পর্বের অলৌকিক কাহিনী। খুব কি অন্যায় হবে নতুন কোন আউলা ঝাউলা বাউলা সরকার যদি আবুল হোসেনদের মত গডফাদারদের চ্যাংদোল করে নাজিমুদ্দিন রোডের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ঠেলে দেয়? ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রকল্পের মালিক আবুল সাহেবের হয়ত মনে নেই রাতের আধাঁরে চেলা-চামুন্ডা পাঠিয়ে ১ কোটি টাকা প্রকল্প মালিকদের পথে বসানোর কাহিনী, কিন্তূ যারা সেদিন পথে বসেছিল, ডাল-ভাতের লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে যারা কালকিনি নদীতে দু'ফোটা চোঁখের পানি ফেলেছিল, তাঁরা কোনদিনও ভুলবেনা এ সব হিংস্র হায়েনাদের আসল চেহারা। পয়সার জোড়ে তোরন সাঁজিয়ে, আধিপত্যের দাপটে স্কুল হতে বাচ্চাদের রাস্তায় নামিয়ে আর আলোকসজ্জার প্লাবনে ভেসে আবুল হোসেনরা যতই স্বর্গের কাছাকাছি যাক না কেন, সময়ই এদের আছড়ে ফেলবে কঠিন বাস্তবে। হতে পারে সে বাস্তবতা নাজিমুদ্দিন রোডের লাল দালান!

Comments

এক নানকের এলাকায় ২০১ কোটি টাকা!

রাজধানীর রাস্তা সংস্কারে বরাদ্দবৈষম্য : বাকি ৯ অঞ্চলে ৩৪৯ কোটি

অমিতোষ পাল | কালের কন্ঠ
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০

ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) রাজধানীকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সম্প্রতি রাজধানীর ভাঙাচোরা রাস্তাগুলোর মেরামত ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিসিসি। সেখানে মোট ১০টি অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। বিস্ময়কর হলো, এই ৫৫০ কোটির মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর অঞ্চলের জন্যই বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২০১ কোটি টাকা। আর বাকি ৩৪৯ কোটি টাকা অন্য ৯টি অঞ্চল মিলিয়ে।

জানা গেছে, এই বিপুল বৈষম্যের কারণ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। তাঁর নির্বাচনী এলাকা হলো ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর, আদাবর, রায়েরবাজার, লালমাটিয়া এলাকা)। আর ডিসিসি হলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। অভিযোগ উঠেছে, ডিসিসির অতি উৎসাহী কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিমন্ত্রীর নেকনজর পাওয়ার আশায় এমন বৈষম্যমূলক বরাদ্দ চেয়েছেন। আর মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তাও তাতে উৎসাহ জুগিয়েছেন।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৬-এর (মোহাম্মদপুর এলাকা) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মেসবাহুল করিমের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'মোহাম্মদপুরের রাস্তাঘাটের উন্নয়নের জন্য অন্য এলাকার চেয়ে বেশি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে কি না, তা জানি না। আমি এ পদে আসার আগে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন আহমদ আলী শাহ। তাঁর সময়েই উন্নয়ন প্রকল্পপত্রটি তৈরি হয়েছিল।' এ প্রসঙ্গে কথা বলতে নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ আলী শাহর কিচেন মার্কেট কার্যালয়ে দুই দিন গেলেও তিনি দেখা দেননি। তৃতীয় দিন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, 'বারবার এখানে আসেন কেন? কোনো কিছু জানার দরকার হলে জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।'

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদপুর এলাকার সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমি কাউকে আমার নির্বাচনী এলাকায় বেশি বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলিনি। ডিসিসি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করেছে বলেও আমার জানা নেই।' তবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত সাত বছরে মোহাম্মদপুর এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয়নি; যে কারণে এখানকার রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার। এ ছাড়া দ্রুত বর্ধনশীল এলাকা হওয়ায় মোহাম্মদপুরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ঘরবাড়ি উঠছে। রাস্তা বাড়ছে। এ জন্য এ এলাকার উন্নয়নে বিশেষ স্কিম হাতে নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে মোহাম্মদপুর ও ধানমণ্ডি এলাকার উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।

দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের জন্য তৈরি ডিসিসির উন্নয়ন প্রকল্পপত্রে আহমদ আলী শাহ ছাড়াও ডিসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল কাদির ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুস সালামের স্বাক্ষর রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল কাদিরও জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের প্রশ্নের জবাব এ শাখা থেকে দেওয়া হয় না।

তবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) আবদুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী এলাকার ভাঙা রাস্তাঘাটের তালিকা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এলাকায় বেশি বরাদ্দ দিতে হবে, এমন কথা তিনি বলেননি। অন্যান্য এলাকার তুলনায় মোহাম্মদপুরে বেশি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে কি না, তাও তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, 'খোঁজ নিয়ে দেখব।'

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর রাজধানীর সব পাড়া-মহল্লার ভাঙাচোরা সড়ক-উপসড়ক, অলিগলির মেরামত ও উন্নয়নের জন্য ডিসিসিকে নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকার দেবে বলে ডিসিসিকে জানিয়ে দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ২৬ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল কাদির ডিসিসির ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটের তালিকা ও খরচাপাতির বিবরণ (উন্নয়ন প্রকল্পপত্র বা ডিপিপি) তৈরি করতে বলেন। আঞ্চলিক নির্বাহী প্রকৌশলীরা ১০টি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পপত্র তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। মোহাম্মদপুর এলাকার (অঞ্চল-৬ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড) ১১০টি রাস্তার উন্নয়নের জন্য ১৬৪ কোটি ছয় লাখ ১২ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। আর ঢাকা শহরের অন্য সব এলাকার (৯টি অঞ্চল) জন্য ৩৮৯ কোটি ৭৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেগুলো ডিসিসির প্রকৌশলীদের হাতে দিয়ে বলেন, ওই এলাকা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হওয়ায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য পারলে খরচাপাতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন আর অন্যান্য অঞ্চলের খরচাপাতি কমিয়ে দেন।

এর পরই ডিসিসির ৯ জন আঞ্চলিক নির্বাহী প্রকৌশলী কাগজ-কলম নিয়ে বসেন খরচ কমানোর জন্য। আর মোহাম্মদপুর অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ আলী শাহ খরচ বাড়ানোর পথ খুঁজতে থাকেন। তিনি ১৬৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২০১ কোটি ৩৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকার উন্নয়ন প্রকল্পপত্র তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। অন্য নির্বাহী প্রকৌশলীদের প্রায় সবাই মিলে উন্নয়ন ব্যয় ৪১ কোটি টাকা কমিয়ে ৩৪৮ কোটি ৯৬ লাখ দুই হাজার টাকা নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই অর্থ বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার উপপ্রধান শামসুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব এলাকায় অতীতে কাজ হয়নি, ওই সব এলাকার উন্নয়ন করে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সারা দেশে এ রকম অনেক এলাকা আছে, যেখানে অতীতে উন্নয়ন হয়নি। এ জন্যই এটা করা হচ্ছে। আর ওই বরাদ্দ প্রস্তাবগুলো তো এখনো মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেনি।

নাম প্রকাশে নারাজ একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান, তাঁর এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। কিন্তু ওই এলাকার বরাদ্দ কমাতে হয়েছে। অথচ মোহাম্মদপুর এলাকায় বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পের অধীন অন্তত ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে। তার পরও সেখানে অন্য এলাকার চেয়ে বেশি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

আরেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ আলী শাহ প্রতিমন্ত্রীর মন জোগাতে এ কাজ করেছেন। তার পরও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি তাঁকে অঞ্চল-৬ থেকে কিচেন মার্কেট প্রকল্পে বদলি করেছে কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসনের (ডিসিসির অঞ্চল-৭) মিরপুর অঞ্চলের অলিগলিপথ ভেঙেচুরে একাকার। শেওড়াপাড়া থেকে পীরেরবাগ পর্যন্ত সড়কটিতে গত চার বছরে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তাটির অবস্থা খুবই খারাপ। কাগজে-কলমে রাস্তাটি ৩০ ফুট চওড়া। কিন্তু দুই পাশে টং দোকানঘর বসায় সরু হয়ে গেছে। পীরেরবাগের বাসিন্দা গৃহিণী স্বপ্না বিশ্বাস বলেন, এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টের।

আবার বাসাবো অঞ্চলে গিয়ে দেখা যায় রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা। কদমতলা সড়কটি বছর দেড়েক আগেও একবার মেরামত হতে দেখা গেছে। অথচ এখন এ রাস্তা দিয়ে রিকশায় চলতে গেলে ঝাঁকিতে শরীর ব্যথা হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও এ দুই অঞ্চলেই রাস্তা উন্নয়নের খরচ কমানো হয়েছে।

ডিসিসির প্রথম ও দ্বিতীয় দফার উন্নয়ন প্রকল্পপত্রগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর এলাকার মতো ধানমণ্ডি ও গুলশান এলাকার (অঞ্চল-৫) জন্যও খরচ বাড়ানো হয়েছে, তবে তা অত বেশি নয়। ধানমণ্ডির ৪৮টি রাস্তার জন্য খরচ ২৯ কোটি ২১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪১ কোটি আট লাখ টাকা আর অঞ্চল-৯-এর (গুলশান) ৮২টি রাস্তার ব্যয় ৪৪ কোটি দুই লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করা হয়েছে। অঞ্চল-১-এর (যাত্রাবাড়ী এলাকা) বরাদ্দ অপরিবর্তিত রয়েছে। এখানে ১১টি রাস্তার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

এ ছাড়া অঞ্চল-২-এর (রমনা) ১৪টি রাস্তার ব্যয় আট কোটি থেকে কমিয়ে ছয় কোটি টাকা, ৩ নম্বর অঞ্চলের (কোতোয়ালি) ১৫টি রাস্তার ব্যয় ১৯ কোটি থেকে ১২ কোটি টাকা, ৪ নম্বর অঞ্চলে ১১৫টি রাস্তার ব্যয় ৯৯ কোটি থেকে ৯৭ কোটি টাকা, ৭ নম্বর অঞ্চলের ৬৮টি রাস্তার ব্যয় ৬৪ কোটি থেকে ৫১ কোটি টাকা, ৮ নম্বর অঞ্চলের ৫৯টি রাস্তার ব্যয় ৮৩ কোটি থেকে ৬৭ কোটি টাকা, ১০ নম্বর অঞ্চলে ৩০ কোটি ৩০ লাখ থেকে কমিয়ে ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, অঞ্চল-৯-এর উন্নয়ন প্রকল্পপত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোফাজ্জলের পক্ষে সহকারী প্রকৌশলী বশির উদ্দিনের স্বাক্ষর রয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি সেটা জমা দেওয়া হয়। অঞ্চল-৮-এর উন্নয়ন প্রকল্পপত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাকের স্বাক্ষর রয়েছে। ১৩ জানুয়ারি এটা জমা পড়ে। অঞ্চল-৭-এর উন্নয়ন প্রকল্পপত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। ৪ জানুয়ারি এটা জমা পড়েছে। এ ছাড়া অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুদ্দিন, অঞ্চল-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান, অঞ্চল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাশেমের প্রকল্পপত্রসহ প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পপত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর রয়েছে।

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla