Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

স্মৃতির মনিকোঠায় ১৯৭৫

1975
১৯৭৫ সালের আগষ্ট মাস। ভাষা কোর্স সমাপ্ত করে ইউক্রেনের আজব সাগরের তীরে ছোট্ট একটা রিসোর্টে ছুটি কাটাচ্ছি আমরা। তিনদিকে গহীন জংগল, সামনে আজব সাগরের নীলাভ ঢেউ, আর চারদিকে স্বল্প বসনা তরুনীদের উদ্দাম চলাফেরা। সব মিলে স্বপ্ন রাজ্যের নৈসর্গিক পরিবেশ। সদ্য মায়ের কোল খালি করে আসা ক’জন বাংলাদেশী আমরা, চেহারায় কৈশোর আর তারুন্যের সন্ধিক্ষনের ছোয়া। দিনের প্রায় সবটাই কাটিয়ে দেই সাগরের নোনা জলে, বিকেল হলেই হাতছানি দেয় নৈশ জীবনের রংগীন উদ্দামতা। দারুচিনি দ্বীপের মত এমন একটা বিচ্ছিন্ন লোকালয় হতে জননী জন্মভূমি কত হাজার মাইল দূরে ছিল তা হিসাব করার মত সময় আর ধৈর্য্য কোনটাই ছিলনা আমাদের। আমরা এসেছি গেল বছরের ক্লান্তি ধূয়ে আরও একটা বছরের জন্যে তৈরী হতে।

দেশী বিদেশী মিলিয়ে আরও বেশ কিছু ছাত্র আমাদের মতই ছুটি কাটাচ্ছিলো রিসোর্ট এলাকায়। বিভিন্ন ইভেন্টে আর্ন্তদেশীয় প্রতিযোগীতাও ছিল আমাদের ছুটির রুটিনে। এমনই এক ইভেন্টে দৌঁড়াতে গিয়ে পায়ের গোড়ালি মচকে ফেলে আমাদের এক বন্ধু। এম্বুলেন্স এসে তাঁকে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় দূরের কোন এক হাসপাতালে। কে যেন আসার সময় একটা রেডিও সাথে এনেছিল, ওটাই আহত বন্ধুকে দিয়ে দেয়া হল হাসপাতালের একাকিত্ব কাটানোর জন্যে। সবার মন খারাপ করে দিয়ে চলে গেল হাসপাতালে। মুঠো ফোন দূরে থাক সাধারণ ফোনেরও ব্যবস্থা ছিলনা ত্রিসীমানায়, তাই যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা রইলনা বাইরের দুনিয়ার সাথে। অদ্ভূদ একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল মধ্যরাতে। আমাদের বাড়িটা দেবে গেছে মাটির সাথে, মা-বাবা, ভাই-বোন সহ কেউ বেঁচে নেই, চারদিকে রক্ত আর রক্ত। ভয়ে আতংকে রুমের বাকি ৩ জনকে ঘুম হতে জাগাতে বাধ্য হই। রাতের বাকি সময়টা না ঘুমিয়ে সবাই মিলে সমুদ্র পারে চলে যাই সূর্য্যোদয় দেখব বলে।

সকাল হতেই আগের দিনের এম্বুলেন্সটাকে দেখা গেল আশপাশে। খবর নিয়ে জানা গেল পাশের ক্যাম্পে কেউ একজন অতিরিক্ত মদ্যপানে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। একই হাসপাতালে যাচ্ছে এম্বুলেন্সটা, এবং প্রায় খালি। অনুরোধ করতেই আমাদের ক’জনকে নিয়ে যেতে রাজী হল। বন-জঙ্গল আর আঁকা বাঁকা পথ পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছতে প্রায় ঘন্টা খানেক লেগে গেল। গোড়ালিতে ব্যন্ডেজ সহ বন্ধুকে আবিস্কার করলাম হাসপাতাল বেডে, চোখে মুখে ভয়াবহ আতংক। কোন কিছু জিজ্ঞাস করার আগে চীৎকার করে উঠল, ‘মারাত্মক কিছু ঘটে গেছে আমাদের দেশে!‘। ধীরে ধীরে বলে গেল রাতে শোনা বিবিসির খবর। শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার পরিবারেরও কাউকে রেহাই দেয়া হয়নি। দেশে সামরিক শাষন জারী হয়েছে এবং দফায় দফায় চলছে ক্ষমতার পালা বদল। নিথর নিস্তব্দ হয়ে গেলাম আমরা।

১৭-১৮ বছরের তরুন আমরা, বিদেশে এসেছি সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশের প্রতিনিধি হয়ে। গত একটা বছর স্বপ্নের সময় কাটিয়ে দেশকে তুলে ধরেছি বিভিন্ন স্কুলে, কলেজে, হাসপাতালে। যেখানেই গেছি হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে মুক্তিকামী মানুষের বিজয়কে। হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটের উপর, যুদ্বের উপর (আমাদের একজন ছিল যুদ্ব ফেরত), বাংলাদেশ শব্দটা সহ আজম খানের ‘রেল লাইনের ঐ বস্তিতে‘ গানটা গেয়েছি দিনের পর দিন। কিন্তূ সব চাইতে যে প্রশ্নের উপর আমরা বেশী সময় ব্যায় করেছি তা ছিল শেখ মুজিব ও তার জীবনের উপর। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা আমাদের সাথে ছবি তুলে নিজদের ধন্য করেছে যুদ্বজয়ী একটা জাতিকে সন্মান জানাতে পেরেছে বলে। আমরাও বুকের পাটা ১০ ইঞ্চি সামনে নিয়ে উঁচু মাথায় জয় করেছি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্বের অন্যতম সহযোগী সোভিয়েত দেশের মানুষদের হূদয়। হঠাৎ করেই মনে হল আমাদের পৃথিবীটা মাটিতে নেমে গেছে, মনে হল আজব সাগরের ভয়াবহ জলোচ্ছাস আমাদের ঠেলে দিয়েছে নিঝুম কোন দ্বীপে। কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলামনা। একজন প্রস্তাব করল মস্কো হাইকমিশনে যোগাযোগ করতে। ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টার পর পাওয়া গেল হাইকমিশনকে। তারাও কোন ধারণা দিতে পারলনা কি হচ্ছে দেশে।

ছুটি শেষ না করেই ফিরে গেলাম শহরে। সরকারী স্কলারশীপের কি হবে এ নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পরলাম আমরা। সাড়াটা দিন কাটিয়ে দেই রেডিওর চার পাশে, কিন্তূ সব খবরেই কেমন অনিশ্চয়তা আর জটিল সমীকরন মেলানোর প্রয়াস। বেশ কিছুদিন লেগে গেল আসল অবস্থা নিশ্চিত করতে। ক্ষমতার জন্যে রক্ত মাংসের মানুষ এতটা পশু হতে পারে আমাদের তরুন মন এর কোন উত্তর খুঁজে পেলনা। শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে, আমরা প্রতিদিন খবরের অপেক্ষায় থাকতাম প্রতিবাদের, প্রচন্ড আন্দোলনের, এমনকি সসস্ত্র প্রতিরোধের। কিন্তূ কোথাও কিছু হলনা। আন্ধা আর বোবার মত শুধু শুনে গেলাম একদল খুন করছে, আরেক দল তৈরী হচ্ছে খুনের জন্যে। শিক্ষামন্ত্রী মনসুর আলী আমাদের বিদায় জানিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে, উপদেশ দিয়েছিলেন বিদেশে জন্মভূমির সন্মান সমুন্নত রাখতে, শুনিয়েছিলেন ভবিষৎ নিয়ে অনেক আশার কথা। সেই লোকটাকেও মেরে ফেলা হল জেলখানার অন্ধ প্রকোষ্ঠে।

বাংলাদেশ নিয়ে হঠাৎ করেই বদলে গেল সোভিয়েতদের আগ্রহ। রাস্তায় কারও সাথে পরিচয় হলে দুয়ো দিতে শুরু করল শেখ মুজিব হত্যার জন্যে। আমাদের বঞ্চিত করা হলনা স্কলারশীপ হতে, কিন্তূ ঠাঁই দেয়া হল বিশ্বাষঘাতকদের তালিকায়। সেই ’৭৫ হতে অপেক্ষায় ছিলাম প্রতিরোধের, প্রতিবাদের ও বিচারের। শেষ পর্য্যন্ত এল সে দিন, কিন্তূ ততদিনে কৈশোর পেরিয়ে, যৌবন হাতড়িয়ে জীবনের হিসাব নিকাষ চূড়ান্ত করার দাড়প্রান্তে দাড়িয়ে আমরা। আজব সাগরের সেই সমুদ্র রিসোর্ট আজও নিশ্চয় উচ্ছল হয়ে উঠে তারুন্যের পদভারে, সমুদ্রের নীলাভ ঢেউ ’৭৫এর মতই হয়ত আছরে পরে বিস্তৃত কুল জুড়ে। কোথাকার কোন বাংলাদেশের ক’জন কিশোরের সেদিনের চাওয়া, পাওয়া আর কষ্টগুলো কি খুঁজে পাওয়া যাবে সাগরের নোনা জলে? হয়ত না।

Comments

মুজিব বেঁচে থাকলে কিছু করা সম্ভব হতো না, তাই তাকে হত্যা করি

আইটিভিতে কর্নেল রশিদের সেই উক্তি

০ আসিফুর রহমান সাগর

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর লে. কর্নেল রশিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ মুজিব দেশ শাসনের কিছুই জানতেন না। তাই তাকে সপরিবারে হত্যা করি। ১৯৭৬ সালের ২ আগস্ট যুক্তরাজ্যের আই টিভিতে প্রচারিত গ্রানাডা টেলিভিশনের ‘ওয়ার্ল্ড ইন অ্যাকশন’ অনুষ্ঠানে এ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন মেজর রশীদ ও তার ভায়রা মেজর ফারুক উপস্থিত ছিলেন। লেঃ কর্নেল রশীদ স্বীকার করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শাসনক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে এই মেজররা ঘোষণা করে ‘বাংলাদেশ এখন আর ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নয় বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে পরিচিত হবে।’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রায় এক বছর পর তারা এ সাক্ষাৎকার দেন। এই দুই খুনীর নানা বক্তব্য ও আলোচনায় উঠে আসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশের জন্য ভাল হয়নি।

আপনারা কি তাঁকে (শেখ মুজিব) পদত্যাগে বাধ্য করতে পারতেন? তাঁকে হত্যা করার প্রয়োজন ছিল? ম্যাসকারেনহাসের এ প্রশ্নের জবাবে লে. কর্নেল রশিদ বলেন, ‘ শেখ মুজিব শাসনের কিছুই জানতেন না। শুধু একটা ভাল

গুণ তাঁর ছিল, তিনি জনগণকে উত্তেজিত (সংগঠিত) করতে পারতেন। কাজেই তিনি বেঁচে থাকলে সমস্যার সমাধান করা আমাদের পক্ষে কঠিন হতো। কারণ তিনি রাজনীতির ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। ম্যাসকারেনহাস প্রশ্ন করেন কাজেই তাকে হত্যা করতে আপনারা বাধ্য হনঃউত্তরে রশীদ বলেন হ্যাঁ, ‘আমাকে তাই করতে হয়’।

সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর খুনি চক্র খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে। এই খুনি চক্র যে আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সাথে চক্রান্ত করছিল সে কথাও তারা স্বীকার করে। ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যাবেলা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন ফারুক। আর খন্দকার মোশতাকের সাথে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেই দেখা করেন রশিদ। তখন খন্দকার মোশতাককে রশিদ আভাসে জানান যে, শেখ মুজিবকে ও তার সরকারকে বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে এবং এর ফলে মুজিব নিহত হতে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে রশিদ খোলাখুলি বলেন, খন্দকার মোশতাকের সাথে তার কি কি কথা হয়েছিল।

রশিদ বলেন, মোশতাককে আমি প্রশ্ন করি। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এদেশ কি উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে? উত্তরে মোশতাক বলেন, এর কোন সম্ভাবনা নেই। এক পর্যায়ে খন্দকার মোশতাক বলেন, কারো যদি সাহস ও মুরোদ থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ নেতার জন্য (শেখ মুজিবকে অপসারণের পর যিনি নেতা হবেন) তা ভালই হবে।

তবে রশিদ জানান, ‘১৫ আগস্টেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে এটা মোশতাককে জানাইনি। আমরা শঙ্কিত ছিলাম যদি এটা তিনি শেখ মুজিবের কাছে ফাঁস করে দিয়ে তার আস্থাভাজন হতে চান। কিন্তু খন্দকার মোশতাক তা করেননি। যদিও সরকারের একজন মন্ত্রী হিসাবে তিনি জানতেন যে বঙ্গবন্ধুকে যে কোন সময় হত্যা করা হতে পারে।’

সেদিনের সেই সাক্ষাৎকার পর্বে ফারুক বলেন, প্রথমেই আমরা জেনারেল জিয়াকে উপযুক্ত ব্যক্তি বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যাবেলা তার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি। জেনারেল জিয়া বলেন, ‘আমি একজন সিনিয়র অফিসার; আমি এ ধরনের ব্যাপারে জড়িত হতে পারি না। তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি এটা করতে চাও, তাহলে এগিয়ে যাও।’

জিয়ার সাথে কি কথা হয়েছিল এ প্রশ্নের জবাবে ফারুক বলেন, ‘সরাসরি না বলে জিয়াকে আমি কথাটা ঘুরিয়ে বলি। আমি বললাম, দুর্নীতিতে দেশ ভরে গেছে, দেশের জন্য একটি পরিবর্তন দরকার।’ এটুকু বলতেই জিয়া বলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলো আমরা বাইরে লনে গিয়ে বসে আলাপ করি।’ সেখানে আমি তাকে জানাই যে, আমরা জুনিয়র অফিসাররা পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা তৈরি করেছি। সব শুনে তিনি এই উক্তি করেছিলেন।

এই আলোচনা ও প্রস্তাব পেশ করার পরও তৎকালীন সামরিক বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ফারুকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে খবর পাঠাননি বা গ্রেফতার করেননি। এ প্রসঙ্গে ফারুক বলেন, না, তিনি তার এডিসিকে শুধু এরপর আমাকে সাক্ষাতের অনুমতি আর না দেয়ার জন্য বলেন।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ফারুক বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য খন্দকার মোশতাক যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা তিনি রক্ষা করেননি। দেশের যে পরিবর্তন করবেন বলে তিনি বলেছিলেন তা রক্ষা করেননি। জেনারেল জিয়াও কিছুই করেননি।
http://ittefaq.com.bd/content/2010/01/30/all0365.htm

ডেডলাইন ১২:০১

কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে কারাবিধি অনুযায়ী তাকে তওবা পড়ানো হয় (মুসলমান হলে)। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পাঁচ ঘাতক তওবা পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। তাই তওবা ছাড়াই তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসির আসামিদের কাছে জানতে চাওয়া হয় তার শেষ ইচ্ছা কী; পছন্দের কোনো খাবার খেতে চায় কি না; শেষবারের মতো কিছু বলার আছে কি না। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর করার আগেও পাঁচ আসামির কাছে এসব জানতে চেয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পাঁচ আসামির সবাই বলেছে, এসব কিছুর ইচ্ছা তাদের নেই। উপরন্তু দুজন বলেছে, এসব করে আর বলে লাভ কী? কারণ তাদের ভাষায়, শাস্তি দেওয়ার নামে যা করা হচ্ছে, তা অবৈধ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তারা এমন কিছু জানে, যা প্রকাশ করলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। বের হয়ে আসবে থলের বিড়াল। কিন্তু মরার আগে আর কাউকে তারা বিব্রত করতে চায় না। তবে একজন কিছু চেয়েছিল। তার চাওয়া ছিল মৃত্যুর আগে নয়, মৃত্যুর পর যেন তার লাশ হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। তার স্বজনরাও কারাগারে মৌখিকভাবে এই আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু লিখিত কোনো আবেদন করেননি বলে তা সম্ভব হয়নি। এ রকম অনেক নাটকীয় ঘটনার পর বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর পাঁচ ঘাতকের ফাঁসি কার্যকরের পালা। কারাগারের বিভিন্ন সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
তওবায় অনীহা : বুধবার রাত ১১টার দিকে কারা কর্মকর্তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার পুকুরপাড় মসজিদের ইমাম মনির হোসেনকে রজনীগন্ধা সেলে নিয়ে যান পাঁচ বন্দিকে তওবা পড়াতে। কিন্তু ইমামসহ কারা কর্মকর্তাদের অবাক করে দিয়ে পাঁচ বন্দির কেউই তওবা পড়তে রাজি হয়নি। তারা বলেছে, আমরা নিজেরাই তওবা পড়তে পারি। কোনো আনুষ্ঠানিকতার তওবা বা ইমামের প্রয়োজন নেই। এরপর ইমাম সাহেব তাঁর মতো করে তওবা পাঠ করে শোনান।

শেষ ইচ্ছা বলে কিছু নেই : শেষ ইচ্ছার কথা বলা হলে পাঁচ বন্দির সবাই বলেছে, তাদের কোনো শেষ ইচ্ছা নেই। লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি) ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) বলেন, শাস্তি দেওয়ার নামে যা করা হচ্ছে, তা অবৈধ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরো এমন অনেকে জড়িত, যা আমরা জানি। শেষ ইচ্ছা ছিল এগুলো বলার, কিন্তু তা বলতে চাই না। বললে অনেক রাজনীতিক রাঘব বোয়ালের নাম প্রকাশ পাবে। বের হয়ে আসবে থলের বিড়াল। মারা যাওয়ার আগে আর কাউকে বিপদে বা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চাই না। মেজর (অব.) বজলুল হুদা বলে, 'আমার শেষ ইচ্ছা যা, তা কারা কর্মকর্তাদের সামনেই এর আগে স্ত্রীকে বলেছি। স্ত্রীকে বলেছি, জীবন তো আর এমন হওয়ার কথা ছিল না। তাকে আরো বলেছি, পরকালে তার সঙ্গে আবার দেখা হবে। সবাই দোয়া করবেন, যাতে আমি পরকালে স্ত্রীর দেখা পাই।' শেষ ইচ্ছার কথা না জানালেও সবাই বলেছে, তাদের কবর যেন স্বজনদের পাশে দেওয়া হয়।

খাবারে পছন্দ নেই : বন্দিদের বলা হয়েছিল তাদের বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছা করছে কি না। তারা বিশেষ পছন্দের কোনো খাবারের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। ফলে রুটিন হিসেবেই তাদের শেষবেলার খাবার দেওয়া হয়। এই তালিকায় ছিল ভাত, রুটি, ডাল, গরুর মাংস, আলু-টমেটো-ফুলকপি দিয়ে তৈরি সবজি আর গরুর দুধ। সবাই এসব খেয়েছে, তবে পরিমাণে অল্প। বিকেলে অবশ্য তাদের নিজেদের টাকা থেকেই (প্রিজনার্স ক্যাশ) সিঙাড়া, পুরি ও কেক এনে খায়। তবে সরবরাহ করার আগে প্রতিটি খাবারই কারা কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দিতেন।

রায় শোনার পরও অবিচল : ওই দিন রাত ১০টার দিকে স্বজনরা চলে যাওয়ার পরপরই সোয়া ১০টায় কারা কর্মকর্তারা সেলে গিয়ে বন্দিদের জানান, আজই তাদের সাজা কার্যকর করা হবে। কিন্তু কাউকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। মনে হয়েছে, এ রকম প্রস্তুতি তারা নিয়েই রেখেছিল। কেউ কোনো কান্নাকাটিও করেনি। যা করেছে তা স্বজনদের সামনে এবং তাঁদের কাছে পেয়ে। অবশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংবাদ পেয়ে প্রায় সবাই বলেছে, তারা অপরাধী না। ন্যায্য বিচার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

গোসল-পোশাক : মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সবাইকে গোসল করতে বলা হয়। সবাই গোসল করতে রাজি হলেও লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান রাজি হয়নি। তার গোসলের ইচ্ছা বা প্রয়োজন নেই বলে সে জানায়। সেলের পাশেই গোসলখানা। চার বন্দি মগে করে নিজেরাই পানি ঢেলে গোসল করে। এ সময় কারা মসজিদের ইমামও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর উপস্থিতির প্রায় পুরো সময়ই দোয়া-দরুদ পড়ে গেছেন। বন্দিরা অনেক সময় তাদের সাধারণ পোশাক পরত। তবে গোসলের পর সবাইকে কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত পোশাক পরতে বলা হয়। তারা সে পোশাকই পরে। এ সময় কেউই কোনো আপত্তি করেনি। এই পোশাক হচ্ছে সাদা-কালো ডোরাকাটা ফতুয়া ধরনের পাঞ্জাবি আর পায়জামা।

ফাঁসির মঞ্চ : রজনীগন্ধা সেলের মাত্র কয়েক গজের মধ্যেই ফাঁসির মঞ্চ। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে মঞ্চ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। কাপড় দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় মঞ্চ। ঝোলানো হয় ম্যানিলা রোপ বা ফাঁসির দড়ি। চারপাশে জ্বালানো হয় উচ্চক্ষমতার লাইট। মঞ্চের অদূরে সারি সারি সাজানো হয় চেয়ার। এই চেয়ারে এসে একে একে বসতে থাকে ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট আর চিকিৎসকের দল। কারা কর্মকর্তাদের কয়েকজন জল্লাদদের সঙ্গে নিয়ে ফাঁসি কার্যকর করার হাতল বা লিভার টেনে পরখ করে দেখেন পায়ের নিচের পাটাতন একপাশ খুলে নিচে ঝুলে যায় কি না। পাটাতনের নিচেই ১০ ফুট গভীর কূপ। রশিতে মাখানো হয় বিশেষ এক ধরনের তেল। এক এক করে মঞ্চের পাশে সারিবদ্ধ করে রাখা চেয়ারে এসে বসেন ঢাকার জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মহা কারা পরিদর্শক, উপ মহা কারা পরিদর্শক, ঢাকার সিভিল সার্জন, সহকারী সিভিল সার্জন, কারাগারের তিন চিকিৎসকসহ ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তারা। মঞ্চের অদূরে আরেক পাশে অবস্থান নেয় ১২ জন জল্লাদ। ১২ জন শসস্ত্র কারারক্ষী ও নিরাপত্তা-আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক সদস্যও এ সময় উপস্থিত হন। ফাঁসি কার্যকর করার সময় উপস্থিতির সংখ্যা ছিল এক শর ওপর।

এক এক করে পালা : রাত সাড়ে ১১টার দিকে কারা কর্মকর্তারা যান রজনীগন্ধা সেলে। কর্মকর্তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে একদল যান ৬ নম্বর কক্ষে কর্নেল ফারুকের কাছে। এ সময় সে পায়চারি করছিল। আনুষ্ঠানিক কিছু কথা শেষে কারা কর্মকর্তারা হাতকড়া দিয়ে কর্নেল ফারুককে দুই হাত পেছন করে বেঁধে ফেলেন। এরপর তার মুখ ঢেকে ফেলা হয় মোটা কালো কাপড়ের তৈরি মুখোশ বা 'যমটুপি' দিয়ে। এ সময়ও ইমাম সাহেব উপস্থিত থেকে তাদের তওবা পড়ানোর চেষ্টা করেন এবং দোয়া-দরুদ পড়েন। কারা কর্মকর্তাদের আরেক দল যায় ৭ নম্বর কক্ষে লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানের কাছে। তাকেও একইভাবে প্রস্তুত করা হয়। এ সময় শাহরিয়ার বলে, 'আমাকে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন দেন, কিছুই বলার নেই। কারণ আপনারা ফাঁসি কার্যকরের কোনো নিয়মই মানেননি।'

ডেডলাইন রাত ১২: ০১ : সেল থেকে মঞ্চের দিকে আনা হয় কর্নেল ফারুক আর শাহরিয়ারকে। তারা হেঁটে আসছিল। তবে অনেকটা জোর করেই টেনে আনা হাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে। ১২ টা ১ মিনিটে প্রথমে মঞ্চে ওঠানো হয় ফারুক এবং পরে শাহরিয়ারকে। একই মঞ্চে দূরত্ব রেখে দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করানো হয় পাটাতনের ওপর আর ঝুলন্ত রশির নিচে। বেঁধে ফেলা হয় দুজনের পা। জল্লাদ কালু এসে গলায় রশি পরিয়ে দেয় দুই বন্দির গলায়। তার পাশে এসে দাঁড়ায় অন্য দুই জল্লাদ শাহজাহান ও হাফিজ। গলার রশি পরখ করে দেখেন সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলাম। এরপর তিনি মঞ্চ থেকে নেমে যান। ফাঁসির মঞ্চের সারিবদ্ধ চেয়ারে সবাই বসে। শুধু এক হাতে লাল রঙের রুমাল, আরেক হাতে ঘড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলাম। উপস্থিত সবার দৃষ্টি মঞ্চের দিকে। জল্লাদ কালুর দৃষ্টি জেল সুপারের হাতের রুমালের দিকে আর জেল সুপারের দৃষ্টি তাঁর হাতে ধরে রাখা ঘড়ির দিকে। পিন পতন নীরবতা। এভাবেই ঘড়িতে রাত ১২টা ৫ মিনিট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেল সুপার তাঁর হাতে থাকা রুমাল ফেলে দেন মাটিতে। রুমাল পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মঞ্চের লিভার টেনে ধরে জল্লাদ কালু। একটি লিভার টানতেই পাটাতন সরে যাওয়ায় ঝুলে পড়ে ফারুক আর শাহরিয়ার। ঝরে গেল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুই ঘাতক। এভাবেই ঝুলতে থাকে আধা ঘণ্টা। এরপর অবশিষ্ট ৯ জন জল্লাদ এসে তাদের দুজনের লাশ নামিয়ে স্ট্রেচারে উঠিয়ে নেমে যায় মঞ্চ থেকে। লাশ রাখা হয় মঞ্চের অদূরে রাখা চৌকিতে। সিভিল সার্জনকে সঙ্গে নিয়ে তিন কারা চিকিৎসক যান সেখানে। মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর শুরু হয় ময়নাতদন্ত।

রাত ১২: ৩০ : একদিকে চলছে ময়নাতদন্ত, আরেক দিকে তখন সব প্রক্রিয়া শেষ করে মঞ্চের দিকে আনা হচ্ছে যমটুপি পরা অবস্থায় বজলুল হুদা আর ল্যান্সার মহিউদ্দিনকে। তাদের দুজনকেও যেন অনেকটা টেনে-ঠেলেই মঞ্চে আনা হয়। জল্লাদরা বন্দিদের দুই হাত ধরে আছে দুপাশ থেকে। মঞ্চে প্রথমে ওঠানো হয় বজলুল হুদা, পরে ল্যান্সার মহিউদ্দিনকে। পুরো সময়ই দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন ইমাম মনির হোসেন। আগের মতোই আবারও পিন পতন স্তব্ধতা। রাত যখন ১২টা ৩৫ মিনিট, তখনই আবার সেই লাল রুমালের পতন। কালুর লিভার টানা। সঙ্গে সঙ্গে পতন আরো দুই ঘাতকের। লাশ নামানোর পর শুরু হয় ময়নাতদন্ত। এখন রইল বাকি এক। মহিউদ্দিন আর্টিলারি।
রাত ১২: ৫০ : মঞ্চে পিন পতন স্তব্ধতা চললেও ৪ নম্বর কক্ষ থেকে ভেসে আসছে টানা চিৎকার 'আমি ঘাতক নই, বাবা। আমাকে ছেড়ে দাও, বাবা। বাবা, তোমাদের পায়ে পড়ছি, আমাকে ফাঁসি দিয়ো না। আমি কোনো অন্যায় করিনি, বাবা।' 'বাবা বাবা' বলেই বেশি চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। চিৎকার করছিল মহিউদ্দিন আর্টিলারি। তাকে অনেকটা পাঁজাকোলা করেই মঞ্চে আনা হয়। (জানা যায়, সে কিছুটা অসুস্থ ছিল। কেউ কেউ বলেছেন, দেহের এক পাশ কিছুটা প্যারালাইসিস ছিল আর্টিলারি মহিউদ্দিনের। তবে কারা সূত্র এই অসুস্থতার কথা স্বীকার করেনি। মঞ্চে আনার পরও ছটফট করছিল সে। বসে পড়ে পাটাতনের ওপর। সেখানেও চিৎকার করতে থাকে। রাত ১টা ৫ মিনিটে জেল সুপারের হাত থেকে পড়ে যায় সেই লাল রুমাল। সচল হয় কালু জল্লাদের হাত। ঝুলে পড়ে মহিউদ্দিন আর্টিলারি।

এক ডজন জল্লাদ : এই পাঁচ ফাঁসি কার্যকর করতে তিন জল্লাদ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এরা হচ্ছে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ঢাকার কালু মিয়া। এর আগে সে আরো সাতটি ফাঁসি কার্যকর করেছে। আরেকজন নরসিংদীর শাহজাহান ভুইয়া। হত্যা মামলায় সে ৪২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। এর আগে সে আরো ১৭টি ফাঁসি কার্যকর করেছে। শেষ দলনেতা গাজীপুরের হাফিজ। সে হত্যা মামলায় ৪৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। এর আগে আরো সাতটি ফাঁসি কার্যকর করেছে। বাকি ৯ জন হচ্ছে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মাসুম (আগে আরো দুটি ফাঁসি কার্যকর করেছে), কামরুজ্জামান (এই প্রথম), তানভির হাসান রাজু (আগে আরো চারটি কার্যকর করেছে), আবুল (৫০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত, এই প্রথম), মোয়াজ্জেম (এই প্রথম), মনির হোসেন (এর আগে আরো দুটি কার্যকর করেছে), জালাল ব্যাপারী (এই প্রথম), শেখ সানোয়ার (এই প্রথম) ও বাবুল আলী (এর আগে আরো দুটি ফাঁসি কার্যকর করেছে)।

সেই কক্ষগুলো এখন : বন্দি না থাকলেও কক্ষগুলো তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিটি কক্ষে বন্দিদের বই, কাগজপত্র ও নিত্যব্যবহারের যেসব সরঞ্জাম ছিল, সেগুলো ব্যাগে ভরে যার যার কক্ষের মেঝেতে রাখা হয়েছে। কারা সূত্র মতে, এগুলো পরে ওয়ারিশদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।
কার কেমন আচরণ ছিল : গতকাল বৃহস্পতিবার কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা আর কারারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বন্দিদের নানা আচরণের কথা। ফিরোজ নামের একজন কারা ফার্মাসিস্ট জানান, শাহরিয়ার আর ফারুক দুজনই মজার মজার কথা বলে রক্ষীদের সঙ্গে হাসি-রহস্য করত। তাঁকে দেখলেই বলত, কী খবর, ফিরোজ সাঁই? কেমন আছেন? মহিউদ্দিন আর্টিলারি প্রায় প্রতিদিনই রোজা রাখত। নামাজ পড়ত নিয়মিত। কারারক্ষীদের অনুরোধ করত নামাজ পড়ার জন্য। রক্ষীদের হাতে সে অনেকটা জোর করেই তসবি তুলে দিত। দাড়ি রাখতে বলত সবাইকে। বলত, যারা বিয়ে করেনি, তারা দাড়ি রাখলে ভবিষ্যতে সুন্দর বউ পাবে।

অন্য একাধিক সূত্র মতে, শাহরিয়ার ছিল কিছুটা কড়া মেজাজের। কাপড় ধুয়ে শুকানোর জন্য মেলে দেওয়ার পর বা ঘরে এসে কেউ তার কাপড় স্পর্শ করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। এমনকি এসব নিয়ে কারা কর্মকর্তা বা চিকিৎসকদের সঙ্গেও উচ্চবাচ্য করত। কর্নেল ফারুক প্রচুর বই পড়ত। তার ঘর ছিল যেন ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি। মারা যাওয়ার কদিন আগেও আত্দীয়স্বজন তার সঙ্গে দেখা করে প্রচুর বই দিয়ে যান। এসব বইয়ে কেউ হাত দিলে সে রেগে যেত।

চিকিৎসকরা বলেন : ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী সার্জন মো. শামসুদ্দীন, মেডিক্যাল অফিসার রথীন্দ্রনাথ কুণ্ডু ও মেডিক্যাল অফিসার রফিক আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দিদের কেউ তাঁদের সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করেনি। কারো বড় ধরনের কোনো অসুখ ছিল না। গত ১৯ তারিখের পর থেকে তাঁরা ছয় ঘণ্টা পর পর গিয়ে এই পাঁচ বন্দির খোঁজখবর নিতেন। ফাঁসির রাত ১১টার দিকে তাঁরা এই বন্দিদের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারা স্বাভাবিক ছিল। তবে রক্তের চাপ বা ব্লাড প্রেসারের সিস্টোলিক হিসাবটা কিছুটা বেশি ছিল। চিন্তার কারণে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর ঢাকার সিভিল সার্জন মুশফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে তাঁরা প্রথমে সার্ভাইক্যাল ভারটিব্র্যাক এবং স্পাইনাল কর্ড কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এর পরপরই ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর কারণ লিখে সনদপত্র দেন।

কারা কর্মকর্তা বলেন : কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে কথা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'খুবই স্বাভাবিক আর সম্পূর্ণ কারা বিধিমতেই পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবে আর্টিলারি মহিউদ্দিন কিছুটা সমস্যা করার চেষ্টা করেছে। এর আগেও আমি একাধিক ফাঁসি কার্যকর করেছি। তবে এই পাঁচ বন্দির কাছ থেকে মৃত্যু কার্যকর করার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা পেয়েছি, আগে কখনো সে রকম পাইনি। বন্দি হিসেবেও তারা যথেষ্ট শান্ত ছিল।'
- পারভেজ খান।
সূত্রঃ http://www.dailykalerkantho.com/?view=details&type=single&pub_no=61&cat_...

১৫ই আগষ্ট রাতে যা ঘটেছিল...

মিলটন আনোয়ার:

পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট। ভোররাত। ধানমণ্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আত্মীয় ও মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে যান।

যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিল মো. সেলিম (আব্দুল) ও আব্দুর রহমান শেখ (রমা)।

উপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় ব্যক্তিগত সহকারি এ এফ এম মহিতুল ইসলামকে টেলিফোনে বলেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা।’ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে সাড়া না পেয়ে মহিতুল গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকেন।

ভোর সাড়ে ৫টায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করা মাত্রই বাড়িটি লক্ষ্য করে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়।

একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ঘুম থেকে ওঠে গৃহকর্মী আব্দুল আর রমা। বেগম মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখেন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগুচ্ছে।

রমা বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখেন, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা আর দোতলায় দাঁড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে তুলেন।

ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত।

রমা দোতালায় শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকেও ঘুম থেকে তুলেন। জামা-কাপড় পরে শেখ জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান।

ওদিকে গোলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল।

পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার একপর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি ঃ’। বঙ্গবন্ধু তার কথা শেষ করতে পারেননি। একঝাঁক গুলি জানালার কাচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই জখম হয়। ওই জানালা দিয়ে গুলি আসতেই থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলের হাত ধরে কাছে টেনে শুইয়ে দেন।

এর মধ্যেই গৃহকর্মী আব্দুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তার পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আব্দুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পরেন। নিচতলার এই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘এতো গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছো?’ এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান।

বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আর্মি আর পুলিশ ভাইরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।’ এ সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডিভিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম খান।

ঠিক তখনই মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা ‘হ্যান্ডস্ আপ’ বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান।

কোনো কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। আপনি ওদেরকে বলেন।’ মহিতুল ঘাতকদের বলেন, ‘উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাটুতে, আরেকটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে।

এ অবস্থাতেই মহিতুলকে টেনে নুরুল ইসলাম তার কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তারা দেখেন, পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্য দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। অস্ত্রটা তার পায়ের কাছে পড়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেন।

নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দোতলায় তার ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। একপর্যায়ে ফোনে তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে পান। তিনি তাকে বলেন, ‘জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’

তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাকে বলেন, ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’

জবাবে শফিউল্লাহ বলেন, ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্যা হাউজ?’

বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার পরই কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত লাল রঙের গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েনউদ্দিন মোল্লা। কিন্তু পথেই সোবাহানবাগ মসজিদের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পালিয়ে বেঁচে যান আয়েনউদ্দিন।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল, নুরুল ইসলাম, আব্দুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানো হয়। এর মধ্যে ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে যান।

এরপর ঘাতকরা গুলি করতে করতে ওপরে চলে যায়। তারা শেখ জামালের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া গৃহকর্মী আব্দুলকে গুলি করে। হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতে তিনি সিঁড়ির পাশে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে থাকেন।

‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’

বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসলেই ঘাতকরা তাকে ঘিরে ধরে। মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। ঘাতকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’

#

রক্তে ভেসে যায় সারা সিঁড়ি

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি, বেয়াদবি করছিস কেন?’ এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে।

বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহটা সিঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকে। সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে।

#

রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে

বঙ্গবন্ধুর পেছন পেছন রমাও যাচ্ছিল। কিন্তু, ঘাতকরা তাকে ঘরের মধ্যে চলে যেতে বলে। এর মধ্যে দোতলায় শেখ রেহানার ঘরে থাকা তার চাচা শেখ নাসের ওই কক্ষে যান। তার হাতে গুলি লাগার ক্ষত ছিল। রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে।

এ সময় ওই ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও রমা। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

এরপর পরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেন এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন। ঘাতকরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে।

সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’

#

রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ

বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ঘাতকরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর, বেগম মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন।

বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ।

#

শেখ মুজিব বেটার দ্যান শেখ নাসের

শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এ সময় শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না। কোনো রকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই।’ ঘাতকরা একে অপরকে বলে, ‘শেখ মুজিব বেটার দ্যান শেখ নাসের।’

এরপর তারা শেখ নাসেরকে বলে, ‘ঠিক আছে। আপনাকে কিছু বলব না। আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসেন।’ এই বলে তাকে অফিসের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে নিয়ে গুলি করে। এরপর শেখ নাসের ‘পানি পানি’ বলে গোঙাতে থাকেন। তখন শেখ নাসেরের ওপর আরেকবার গুলিবর্ষণ করা হয়।

#

‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’

লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’

মহিতুল জবাব দেয়, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।’ এ সময় শেখ রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে তাকে দোতলায় নিয়ে যেতে বলে।

আজিজ পাশার কথামতো এক হাবিলদার শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে।

পুরো ঘরের মেঝেতে মোটা রক্তের আস্তর পড়ে গিয়েছিল। এর মাঝেই ঘাতকের দল লুটপাট চালায়।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দু’ মেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। ছোট বোন শেখ রেহানাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন তারা।

#

ঘাতকদের প্রস্তুতি

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের যানবাহনগুলো সচল হয়ে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণে অবস্থিত ইউনিট থেকে ১০৫ এমএম কামানগুলোকে ভারি ট্রাক দিয়ে টেনে নির্মাণাধীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় নিয়মিত নৈশ প্রশিক্ষণের জন্য। রাত ১০টায় সেনানিবাসের উত্তর প্রান্ত থেকে বেঙ্গল ল্যান্সারের টি-৫৪ ট্যাংকগুলো ইউনিট থেকে বেরিয়ে পড়ে। এয়ারপোর্টে ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক একত্রিত হয়।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর পাশা, মেজর রাশেদ প্রমুখ সেখানে জড়ো হয়।

১৫ আগস্ট রাতের প্রথম প্রহরে মেজর ফারুক অফিসারদের নির্দেশ দেয়Ñ বিমান বন্দরের কাছে হেড কোয়ার্টারে স্কোয়াড্রন অফিসে মিলিত হতে। অফিসারদের আপারেশনের পরিকল্পনা জানায় মেজর ফারুক।

সে-ই ছিলো এই অপারেশনের দায়িত্বে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই বাড়িকে ঘিরে দু’টো বৃত্ত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয়, ভেতরের বৃত্তের সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করবে। বাইরে থেকে রক্ষীবাহিনী বা ভেতর থেকে সেনাবাহিনীর কোনো আক্রমণ এলে তা ঠেকানোর দায়িত্বে দেওয়া হয় বাইরের বৃত্তের সদস্যদের।

এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর নূর ও মেজর হুদাকে। সিদ্ধান্ত হয়- তারা ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোড, সোবাহানবাগ মসজিদ এবং ৩২ নম্বর ব্রিজে রোড ব্ল¬ক করবে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাসা আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ধানমণ্ডিতেই শেখ ফজলুল হক মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণেরও সিদ্ধান্ত হয়।

ডালিমকে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণের সময় উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেন মেজর ফারুক। কিন্তু পূর্ব সম্পর্কের অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণে উপস্থিত না থেকে স্বেচ্ছায় সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব নেয় ডালিম।

ভারি মেশিনগান সংযোজিত দ্রুতগতির একটি জিপে রওনা দেয় ডালিম। সঙ্গে এক প্লাটুন ল্যান্সারসহ একটি বড় ট্রাক।

শেখ মণির বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব দেয়া হয় রিসালদার মোসলেমউদ্দিনকে। তার সঙ্গে দেওয়া হয় দু’প্লাটুন সৈন্য।

এক কোম্পানি সেনাসহ রেডিও স্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউমার্কেট এলাকার দায়িত্বে থাকেন মেজর শাহরিয়ার। একই সঙ্গে ওই গ্র“পকে বিডিআর থেকে কোনো ধরনের আক্রমণ হলে প্রতিহত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়।

২৮টি গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে শের-ই বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নেন মেজর ফারুক নিজে। তবে ট্যাংকের মেশিনগানগুলোয় প্রচুর গুলি ছিল। মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের জন্য ১২টি ট্রাকে সাড়ে তিনশ সাধারণ সৈনিককে তৈরি করা হয়।

মেজর রশিদের সরাসরি কোনো আক্রমণের দায়িত্ব ছিল না। তার দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমন্বয় করা।

তার নেতৃত্বে থাকা ১৮টি কামান গোলাভর্তি করে যুদ্ধাবস্থায় তৈরি রাখা হয়। কামানগুলো রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টার এবং বঙ্গবন্ধুর বাসা লক্ষ্য করে তাক করা হয়। একটি মাত্র ১০৫ এমএম হাউইটজার কামান রাখা হয় আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উল্টো দিকে লেকের পাড়ে।

দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর সবাইকে তাজা বুলেট ইসু করা হয়। ঘাতকের দল বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভোররাত ৪টার দিকে ধানমণ্ডির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ফারুকের নেতৃত্বে ২৮টি ট্যাংক বিমানবন্দর সড়কে বনানীর এমপি. চেকপোস্ট দিয়ে সেনানিবাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে ফজরের আজান পড়ে যায়।

ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে ৪৬ ব্রিগেড ইউনিটের লাইনের একেবারে ভেতর দিয়ে বাইপাস সড়ক ধরে সেনাসিবাসের প্রধান সড়কে চলে আসে। ঢাকা সেনানিবাসে সে সময়ে বিমানবাহিনীর যে হেলিপ্যাড ছিল, তার ঠিক উল্টো দিকের একটি গেট দিয়ে ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে বিমানবন্দরের (পুরনো বিমানবন্দর) ভেতর ঢুকে পড়ে। এ সময় ফারুককে অনুসরণ করছিল মাত্র দুটি ট্যাংক। বাকি ট্যাংকগুলো পথ হারিয়ে জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ফার্মগেটের দিকে এগুতে থাকে।

ফারুক এয়ারপোর্টের পশ্চিম দিকের দেয়াল ভেঙে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের সামনে উপস্থিত হয়।

ভোর সোয়া ৫টার দিকে মেজর ডালিম ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মণির বাসা আক্রান্ত হয়।

শেখ মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা করে ঘাতকরা। বেঁচে যান শেখ মণির ছেলেম শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস।

ডালিমের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি বাবু (আবুল হাসনাত আবদুল্লার ছেলে), ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে আবদুল নইম খান রিন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমুর খালাতো ভাই), তিন অতিথি এবং চারজন কাজের লোককে।

#

দাফন

পরের দিন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার আব্দুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর লাশ ছাড়া ১৫ আগস্টে নিহতদের লাশ দাফন করেন। আব্দুল হামিদ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে কফিনে নিহতদের লাশ এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে শেখ মণি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যদের লাশ সংগ্রহ করে বনানী গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

বনানী কবরস্থানে সারিবদ্ধ কবরের মধ্যে প্রথমটি বেগম মুজিবের, দ্বিতীয়টি শেখ নাসেরের, এরপর শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল, ১৩ নম্বরটি শেখ মণির, ১৪ নম্বরটি আরজু মণির, ১৭ নম্বরটি সেরনিয়াবাতের আর বাকি কবরগুলো সেদিন এই তিন বাড়িতে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের। ১৬ আগস্ট সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গীপাড়ায়। সেখানে তাকে দাফন করা হয় তার বাবার কবরের পাশে। সেনাবাহিনীর ওই হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন ফ্লাইট লে. শমশের আলী।

সূত্র: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দেওয়া এ এফ এম মহিতুল ইসলাম, আব্দুর রহমান শেখ (রমা), মো. সেলিম (আব্দুল), অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার মো. কুদ্দুস শিকদার, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আব্দুল হামিদ, সাবেক সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ, আয়েনউদ্দিন মোল্লা ( সোবহানবাগে নিহত বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনের গাড়িচালক) এর সাক্ষ্য এবং অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আব্দুল হামিদের বই ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’।
http://www.amadershomoy.com/content/2010/01/28/news0831.htm

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla

JUST VIEWED

Last viewed: