Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

এন্ডিস পর্বতমালার বাকে বাকে - ৪র্থ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশের পর)

এ অন্য এক পৃথিবী; ঘন মেঘমালা আকাশ আর মাটির ভালবাসায় সেতুবন্ধন হয়ে জড়িয়ে আছে দিগন্ত জুড়ে। পাহাড়ের চূড়ায় চুড়ায় মেঘদৈত্যদের অলস পদচারনা প্রকৃতির নৈস্বর্গিক স্তব্দতাকে স্বপ্নীল ফ্রেমে বন্দী করে তৈরী করেছে বিস্ময়কর প্যানোরমা। প্রথম ক’টা মিনিট মুখে কথা ফুটেনা, এ যেন সূরা আর সাকির অনাদিকালের মিলনমেলা। মাচু পিচু - ইন্‌কাদের হারিয়ে যাওয়া শহর। স্প্যনিস দখলদারদের হিংস্রতা হতে বাচতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই তৈরী করে বর্তমান বিশ্বের আন্যতম আর্শ্চয্য এক স্থাপনা।

চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। চূড়াগুলো বাহুলগ্না হয়ে ডুবে আছে মেঘ সমুদ্রে। ইচ্ছে করলেই এক খন্ড মেঘ হাতে বাড়িয়ে কাছে টানা যায়, আদর করা যায়। গলার সূর উচু করে হাক দিলে সে হাক পাহাড়ে পাহাড়ে আছড়ে পরে, ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে তীর ভাংগা তরংগের মত। চারদিকে এক ধরনের ভৌতিক নীরবতা, সাথে প্রকৃতি এবং মানুষের নীরব বুঝাপড়ার বিশাল এক ক্যানভাস। ইনকা সাম্রাজ্যের বিশালতার কাছে গিজ গিজ করা পর্যটকদের ফিসফাস হাজার রজনীর আরব্য উপন্যাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়। নিপুন কারিগরের নিশ্চিদ্র পরিকল্পনায় হাতেগড়া পাথরের প্রাসাদগুলো সময়ের স্তব্দ স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে দিগন্ত জুড়ে। প্রথম যে ধাক্কাটা এসে মগজে আঘাত হানে তাহল, কি করে এত উচ্চতায় এই বিশাল পাথরগুলোকে উঠানো হল! প্রযুক্তি বলে জাগতিক পৃথিবীতে কিছু থাকতে পারে এমন ধারণা ঐ নিষিদ্ব অরন্য পর্য্যন্ত পৌছানোর কথা নয়। হাত এবং মগজের চাতুর্য্যপূন্য নৈপূন্যে পাথরগুলোকে উঠানো হয়েছে একটার উপর আরেকটা, শক্ত কাদামাটি দিয়ে আটকানো হয়েছে হাজার বছরের বন্ধনে। একদিকে রাজপ্রাসাদ, অন্যদিকে সাধারণ ইনকাদের বসতি এবং পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষনাগার সবকিছু মিলে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সাম্রাজ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। বলা হয়ে থাকে পেরুরু মাটিতে স্প্যনিশ উপনিবেশবাদের আগমনের একশত বছর আগেই এর নির্মান কাজ শুরু হয়, কারও মতে দখলদার বাহিনীর নৃশংস্যতা হতে বাচার জন্যে ইনকারা পালিয়ে আশ্রয় নেয় মাচু পিচুতে। পরবর্তীতে বসন্েতর মত মহামারিতে বিলীন হয়ে যায় জনসংখ্যা, পরিত্যক্ত হয়ে গাছপালা আর পাহাড়ের আড়ালে চাপা পরে যায় ইনকাদের আর্শ্চয্য স্থাপনা মাচা পিচু। ১৯১১ সালে মার্কিন ইতিহাসবিদ হিরাম বিংগ্নহাম ইনকা সভ্যতার উপর গবেষনা চালাতে গিয়ে বেশ ক’বার এলাকাটিতে জরিপ চালান। এমনই এক আর্কিওলজিক্যাল জরিপে স্থানীয় কুয়্যেচোয়া গোত্রের ১১ বছর বয়সী বালক পাবলিত আলভারেজ হিরামকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় মাচা পিচুর ট্রেইলে। আধূনিক সভ্যতা বিস্ময় এবং হতবাক হয়ে স্বাগত জানায় হিরামের এই আবিস্কারকে।

চারদিকে হরেক রকম ভাষা আর ক্যামেরার ক্লিক শব্দে নেশা ধরে আসে নিজের অজান্েতই। সরু এবং সংকীর্ন পথ বেয়ে অনেকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে হাটছে ইনকা ট্রেইল জয়ের লক্ষ্যে। এমনই এক মিশনে গেল সপ্তাহে দু’জন ইংরেজ পর্বতারোহী পা পিছলে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের মৃত্যু খাদে। কোন কিছুই মানুষের অজানাকে জানার আর অচেনাকে চেনার আদম্য বাসনা আটকাতে পারেনা, মৃত্যুভয় জেনেও কিশোর হতে শুরু করে বুড়োর দলও নিজকে স্বাক্ষী করতে চাইছে সভ্যতার এই মহাবিস্ময়ের সাথে।

বেলা গড়াতে ঘন মেঘ কুন্ডুলী ক্লান্ত বলাকাদের মত উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে, পাহাড়ের চূড়াগুলো সহসাই মুক্তি পেল মেঘের আগ্রাসন হতে। সাথে সাথে সূর্য্যের আলো ভাসিয়ে নিল লোকালয়। কেউ যেন ছবি তোলার প্রেক্ষাপট তৈরী করে দিল ক্ষণিকের জন্যে। ক্যামের ক্লিক ক্লিক শব্দ আর ফ্ল্যাশ লাইটের ঝলকানো আলোতে মায়াবি পরিবেশে হতে কিছুক্ষনের জন্যে হলেও আমাদের নিয়ে এল জাগতিক পৃথিবীতে। কিছুক্ষন আগের কনকনে শীত ছাপিয়ে এবার ঝাকিয়ে বসলো ভ্যাপসা গরম। ট্যুর গাইডের বিরামহীন বর্ণনা একসময় রাজ্যের বিরক্তির নিয়ে এল। ভাল লাগছিলনা ভাংগা ইংরেজীতে ইন্‌কাদের ইতিহাস। মনে হল যাবার আগে প্রকৃতিকে নিজের মত করে কাছে না পেলে এ যাত্রা অসম্ম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছিটকে পরলাম গ্রুপ হতে। এবার উচুতে উঠার পালা। একটার পর একটা বিপদজনক সিড়ি ডিংগিয়ে শেষপর্য্যন্ত সূর্য্যঘড়ির চূড়ায় এসে হাপিয়ে পরলাম। এটাই ছিল জনবসতির সব্বোর্চ চূড়া। সামনে, পিছনে, ডানে এবং বায়ে শুধুই মৃত্যুফাদ, ভারসাম্যের সামান্য হেরফের হলেই আমার আমিত্বে নামবে অমেঘো পরিনতি, ডেথ উদআউট ট্রেইস!

চোখ চোখ দু’টো বন্ধ করে নিজকে হাèা করে নিলাম, পাখীর ডানার মত হাত দু’টো ছড়িয়ে জোড়ে চীৎকার দিতেই সে চীৎকার লক্ষ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল নিজের কাছে। কেন জানি মনে হল আমি এবং আমার ঈশ্বর এখন খুব কাছাকাছি এবং আমার চীৎকার ঈশ্বরের দরবারে পৌছাতে কোন অসূবিধা হচ্ছেনা।

বেলা পরে আসছিল, তাই ফেরার আয়োজন করতে হল। প্রধান ফটক পার হয়ে বাইরে বেরুতেই দেলখলম ২০ডলারের একটা বাফে। ক্ষুধায় পেট উচুস্বরে কথা বলতে শুরু করে দিল। খুব রসিক মেজাজে ভূড়িভোজের পর উল্‌টো পথ ধরলাম। পাহাড় হতে নামতে হবে বাসে চড়ে, তারপর ট্রেন। কুস্‌কো পৌছতে রাত হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ রইলনা। ট্রেনে বসে হঠাৎ করেই মনটা বিষন্ন হয়ে গেল, চারদিকের শুনশান নীরবতা দেখতে ভাল লাগছিলনা। নিজকে বুঝাতে পারলামনা কেন এই বিষন্নতা! তবে কি এতদিনের লালিত স্বপ্ন আর কোনদিন দেখবনা বলেই এই ভাবাবেগ? পৃথিবীর এই অঞ্চলগুলোতে আর কোনদিন পা ফেলবনা বলেই হয়ত এ সাময়িক আচ্ছন্নতা। কিন্তূ কে জানত দু’বছর পরেই আবার আমাকে আসতে হবে এখানে। মাচু পিচুর পাহাড় এবং মেঘেদের লুকোচুরির কোন এক বাকে আমার ভালবাসার মানুষকে আংটি পরিয়ে নিবেদন করব বিয়ে প্রস্তাব! সে অন্য এক কাহিনী, অন্য এক অধ্যায় যার সাথে এ লেখার কোন সম্পর্ক নেই। সময় সূযোগ পেলে তা নিয়েও হয়ত লেখা যাবে।

হোটেলে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। রাতের খাবার শেষে সকাল সকাল শুয়ে পরার সিদ্বান্ত নিলাম। খুব সকালে বাস ধরতে হবে। পরবর্তী ঠিকানা লেক টিটিকাকা, পেরুর সীমান্ত শহর পুনো।

-চলবে

Comments

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla