Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

এক ফুল সাত মালি

Local Election in Bangladesh

লোকটার নিশ্চয় একটা নাম আছে। আছে শহর এবং শহরে একটা ঠিকানা। তবে এ নিয়ে আমার বিশেষ কোন মাথাব্যথা নেই। মূল কথা, সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া পৌর্ নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। হতে পারে তা বরিশালের গৌরনদীতে অথবা নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারে। গায়ের পোশাক দেখে দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করে গেলেও এ মুহূর্তে আমি তা করতে যাচ্ছিনা। পোশাক যাই থাকুক, তার আড়ালে নিশ্চয় তিনি একজন মানুষ। এই মানুষটাকে নিয়েই আমার এ লেখা। উপরের ছবিটা একটু ভাল করে লক্ষ্য করুন। সাতজন মানুষের একটা অনুষ্ঠান। লাল-সাদা ফুলের সমাহারে তৈরি একটা ফুলের তোড়া এবং উপস্থিত ছয় জন তাতে হাত লাগিয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। দেখতে অনেকটা পদ্মফুলের মত দেখালেও অনুমান করা যায় সংবাদ মাধ্যমের জন্য ফটো শুটের এপিসোড এটা। হিমালয় জয় করে নিজ দেশের পতাকা উড়িয়ে অনেকে সমাপ্তি ঘোষণা করেন মিশনের। ছবিটাও একটা মিশনের সমাপ্তি ও বিজয় ঘোষণা। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যাদের সম্যক জ্ঞান নেই তাদের অনেকের জন্য রহস্য হয়ে থাকবে ১৬ কোটি জনসংখ্যার একটা জাতি তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য কেন এতটা উতলা হতে পরে। আর যারা জনসেবা করতে চান তারাই বা কেন এমনটা করার জন্য জনপ্রতিনিধত্বকে একমাত্র মাধ্যম হিসাবে বেছে নেন। প্রশ্ন জাগবে, হাতে যথেষ্ট অর্থ-কড়ি থাকলে মা-বাবার নামে একটা স্কুল, একটা মাদ্রাসা অথবা অতি-দরকারি একটা সেতু করে কেন জনসেবা করতে চান না। কেবল পাবলিক অফিসে বসেই কি জনসেবা করা যায়, বিকল্প বলতে আসলে কি কিছু নেই? উপরের ছবিটাই এর উত্তর দেবে।

নবনির্বাচিত মেয়রকে তার গুনমুগ্ব অনুসারীরা সম্বর্ধনা দেবে, এ দৃশ্য কেবল বাংলাদেশের নয়, গোটা গণতান্ত্রিক বিশ্বের। সাত জনের যে টীম ছবির মেয়রকে অভিনন্দন জানাচ্ছে তাদের পরিচয়ও এখানে মুখ্য নয়। নির্বাচনে তাদের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে ফুলেল সম্বর্ধনাই এখানে বিবেচ্য বিষয়। মেয়রকে ঘিরে যারা পদ্মফুল তৈরি করেছে তাদের জন্য খোদ মেয়রের মতই নির্বাচনটা ছিল একটা বিনিয়োগ মাত্র। সাত জনের প্রতিজন নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মেয়রের পেছনে বাজী ধরেছেন। সময় হলে সবার রাস্তা এক মোড়ে এসে বাঁক নেবে, যার শেষ ঠিকানা হবে পকেট। এখানে ফুলের তোড়াটা হচ্ছে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর সেই লালসালুর মত, যা হাজার হাজার মানুষকে চুম্বকের মত টানবে। চেতনার মাজারে ওরা মাহফিল বসাবে, দেব দেবীর পূজার আয়োজন করবে, শহীদ আর বীরাঙ্গনাদের পুথি শুনিয়ে চোখের পানি নাকের পানিতে একাকার করবে। মেয়রের ডান দিকের জন হতে পারে তার কাছের জন। তার মাধ্যমেই হয়ত পৌর এলাকার উন্নতির জোয়ার বইবে। আর সে জোয়ারে ভেসে ভেসে সম্পদের বস্তা গুলো অতি গোপনে নোঙ্গর করবে মেয়রের বন্দরে। বন্দরের মহাব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক আর চৌকিদার-পাহারাদারের ভূমিকায় বাকিদের দাঁড় করিয়ে দিলে খাপে খাপে মিলে যাবে এক ফুল সাত মালীর সমীকরণ। এমনটাই বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধি, এমনটাই দেশসেবা, এ জন্যেই ক্ষমতার লড়াই, এ জন্যেই ভোটের মাঠে রক্তক্ষরণ, এ জন্যেই ব্যালট বাক্সের গণধর্ষন।

জনাব নবনির্বাচিত মেয়র, মাফ করবেন আমার সীমাবদ্ধতার জন্য। হয়ত আপনি ভাল মানুষ, হয়তবা আপনার কোন বন্দর নেই যেখানে রাতের আধারে রেলের কালো বিড়ালের মত বস্তা আসবে। কিন্তু আমার হাত-পা, মগজ সব বাধা। আমার সীমিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিচার বুদ্ধি এবং দেশকে ভালবাসার সবকটা যন্ত্র বলছে আপনি একজন চোর...একজন ধর্ষক...একজন খুনি এবং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। হয়ত সময় বদলাবে এবং আপনার মতই একজন ক্ষমতায় বসবে, যার পোশাকে থাকবে ভিন্ন দলের আইডেন্টিটি। আমরা ম্যাঙ্গোরা অনেক কিছুই এখন বুঝতে পারি। এবং আগ বাড়িয়ে বলতে পারি, সেও হবে আপনার মতই একজন চোর। অথবা আরও বড় কিছু।

Comments

ভাইজান কি লেখা ছাইড়া দিলেন

ভাইজান কি লেখা ছাইড়া দিলেন নাকি? মাসে অন্তত ২টা লেখা চাই।

আমার কথাই শেষ কথা... আমার ওপর

আমার কথাই শেষ কথা...

আমার ওপর দিয়া অরা কেউ কথা কয় না। আমাগো বিরুদ্ধে কিছু কওয়ার মতো পিরোজপুরে কেউ নাই। রাজনীতি বলতে খালি আমরা চার ভাই-পরিবারই আছি। যা কিছু করি আমরাই করি।’ পিরোজপুর সদর আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আব্দুল আউয়াল নিজের মুখে বেশ দম্ভ নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন কালের কণ্ঠকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে দেশের দক্ষিণ জনপদের জেলা পিরোজপুরে এক রাজনৈতিক পরিবারের রাজত্বের চিত্র।

সবার ছোটজনের নামই মহারাজ। তাঁর ওপরে আছেন আরো দুই ‘রাজা’। আর সবার ওপরে আছেন এক ‘মহারাজা’। এই ‘রাজপরিবারের’ হাতেই শাসিত হচ্ছে পিরোজপুর। কারো সাহস নেই এই পরিবারের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দ করার। কেউ কেউ এক-আধটু ঘাড় ঘোরানোর চেষ্টা করলেই তাদের হতে হয় ‘রাজ্যছাড়া’, থাকতে হয় নির্বাসনে কিংবা কৌশলে ‘মটকে’ দেওয়া হয় ঘাড়। আবার কেউ সব হারিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে না থাকার মতো করে।

এই এক পরিবারের শাসন-শোষণে পিষ্ট হয়ে আছে পিরোজপুরের মানুষ। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কবল থেকে মুক্তির আশায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ পিরোজপুরে ভর করে এ কে এম আউয়ালের ওপর, যিনি আবার রহস্যজনকভাবে ব্যবহার করেন ‘সাইদুর রহমান’ নাম। আউয়াল এখানে দুবারের এমপি; তাঁর এক ভাই মজিবুর রহমান খালেক পিরোজপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান; আরেক ভাই হাবিবুর রহমান মালেক পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র এবং সবার ছোট ভাই মশিউর মহারাজ নেতৃত্বে দিচ্ছেন এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন সেক্টরের। তিনি পিরোজপুর জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি। এই চার ভাইয়ের হাতে এলাকার সব উন্নয়নকাজের কলকাঠিও। প্রশাসন,

ঠিকাদারি, নিয়োগ-বদলি, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সব কিছুই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় আউয়াল তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দিতে পারেননি। এ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট ঘরে তিনি উল্লেখ করেছিলেন— ‘সনদপত্র হাতে না থাকায় তথ্য দেওয়া হইল না।’ তবে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি নিজেকে এইচএসসি পাস বলে উল্লেখ করেছেন।

‘আপনার বিরুদ্ধে তো অনেক অভিযোগ করছেন অনেকে; আপনারা চার ভাই মিলে সব কিছু লুটেপুটে খাচ্ছেন, সব জায়গায় সব পদে নিজেদের লোকজন বসিয়েছেন’— শুনেই এক ধরনের অট্টহাসি দিয়ে আউয়াল বলেন, ‘কারা বলে এসব, একটা নাম বলেন তো! পারলে কেউ আমাদের সামনে এসে বলুক! তা তো কেউ বলছে না। হয়তো হাতে গোনা দুই-তিনজন লোক আছে পেছনে বসে অপপ্রচার করে। তারা তো কেউ এলাকায়ও থাকে না। ঢাকায় উঠছে। এইখানে তাগো কোনো নামগন্ধ নাই। ডাক দিলেও পাই না। পথে নামলেও ওই আমরাই চাইর ভাই-ব্রাদার ছাড়া কাউরে দেহি না।’

এমপির ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান খালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মাথায় কী শিং আছে নাকি? আমরা কী কাউরে গুতাই নাকি? বরং আমাদের সমাজসেবা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে যাদের গাত্রদাহ হয় তারাই আমাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করে থাকে। তারা সবাই জনবিচ্ছিন্ন। পরেরটা দেখে তাদের সহ্য হয় না।’

চার ভাইয়ের দাপটের কারণে অনেকে এলাকাছাড়া হয়েছেন—অভিযোগ তুললে তিনি বলেন, ‘জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেকে এলাকা ছেড়ে নিজেরাই ঢাকায় বসবাস করে। তারা এলাকায় কোনো মানুষকে সাহায্য করে না। কারো বিয়েতে, কেউ মারা গেলে কিংবা রাত-বিরাতে যখনই প্রয়োজন মানুষ আমাদেরকেই কাছে পায়। তারা যদি আমাদের ভয়ে এলাকাছাড়া হয়ে থাকে তবে তাদের কেউ কেউ তো দেখি জমি বিক্রি করতে ঠিকই এলাকায় আসতে পারে; তখন কি আমরা বাধা দেই?’

এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া অভিযোগ ও তথ্য অনুসারে এমপি আউয়ালের স্ত্রী লায়লা ইরাদও পিছিয়ে নেই। তিনি জেলা মহিলা লীগের সভানেত্রী এবং প্রথম শ্রেণির প্রভাবশালী ঠিকাদার। মূলত পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি সুধাংশু শেখর হালদার ও অ্যাডভোকেট সালাম তালুকদারের মৃত্যুর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন (অব.), চণ্ডীচরণ পালসহ অন্য নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় এমন পরিণতির শিকার হয়েছে এলাকাবাসী।

পিরোজপুরের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা আক্ষেপ করে বলেন, কেন্দ্রীয় ও বরিশাল অঞ্চলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ ও বিজয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধি হন একাত্তরের শান্তি কমিটির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার পুত্র এ কে এম আব্দুল আউয়াল। নিজেকে আস্তে আস্তে প্রতিষ্ঠিত করেন পিরোজপুরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে। তিনি ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

জানা যায়, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে সিডরে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দেওয়া ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন আউয়াল। ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় ছিল মাত্র চার লাখ ৩৭ হাজার টাকা মাত্র। অথচ ২০১৩ সালে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ছাড়াও ব্যাংকে জমা আছে দুই কোটি ৯ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে জমা আছে এক কোটি তিন লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি চারটি গাড়ি, ঢাকার আদাবরে ১০ কাঠার ওপরে ছয়তলা বাড়ি, দুটি বিশাল কার্গোর (মেয়ে ও ছেলেদের নামে এমভি মা বুশরা ও এমভি আবদুর রহমান ও আবদুর রহিম) মালিক, যদিও নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় এসব উল্লেখ করেননি। তিনি আইন ভঙ্গ করে ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হয়েছেন (আইনানুযায়ী একজন এমপি সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারেন)। তাঁর স্ত্রীও কমপক্ষে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার কারণে কলেজের নিয়োগ এবং উন্নয়নকর্মের বড় ধরনের কমিশন আউয়ালের পকেটে এসেছে বলে অভিযোগ আছে। ২০১০ সালে সংসদে উল্টাপাল্টা বলে দল থেকে এক মাসের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। সংসদে তিনি দাবি করেছিলেন, যেহেতু তিনি দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীকে হারিয়েছেন তাই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়েও জনপ্রিয়।

এমপি আউয়াল ও তাঁর ভাইদের ঠিকাদারি ও অন্যান্য ব্যবসা ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান খালেক বলেন, ‘সব কিছুই চলে গিভ অ্যান্ড টেকের মাধ্যমে। আমরা যত উন্নয়নকাজ করি তা নিজেদের চেষ্টা-তদবিরের মাধ্যমেই করে থাকি। কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। আর আমরা নতুন ঠিকাদারি করি না। আমরা যখন ঠিকাদারি শুরু করছি তখন অনেকের জন্মই হয় নাই। এ ছাড়া এখন আগের মতো টেন্ডারের নিয়ম নাই। এখন ১৪ আনা টেন্ডারই হয় ই-টেন্ডারের মাধ্যমে, এখানে যে কেউ যেকোনো জায়গা থেকে অংশ নিতে পারে।’

এ কে এম আব্দুল আউয়াল ২০ বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর স্ত্রী মহিলা লীগের সভানেত্রী, সেজো ভাই মজিবুর রহমান খালেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সেজো ভাইয়ের ছেলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। বিভিন্ন থানা কমিটি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বেও তাঁদেরই আত্মীয়স্বজন।

এমপি আউয়াল ও তাঁর ভাই মালেকের বিরুদ্ধে পিরোজপুরে বিভিন্ন সময় খুনের মামলাও ছিল। ১৯৯৩ সালে হুলারহাটে বিএনপি নেতা দেলোয়ার খুন হন, যেখানে আউয়ালের মেজ ভাই হাবিবুর রহমান মালেকসহ ২০ জন আসামি হন। পরে মালেক ওই মামলার চার্জশিট থেকে নিজের নাম বাদ দিতে সক্ষম হন। ১৯৯৮ সালে পিরোজপুর পৌর নির্বাচনের প্রাক্কালে আউয়াল পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শেখ বাদশাকে বেকায়দায় ফেলার জন্য সুমন নামে তাঁদেরই এক লোককে খুন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে আউয়াল ও তাঁর ছেলে নির্যাতন করে কাজের মেয়েকে তিন তলা থেকে নিচে ফেলে দেন বলে খবর ছাপা হয় পত্রপত্রিকায়। এ ছাড়া এমপি আউয়ালের মদদে ২০১১ সালে নাজিরপুর উপজেলার পেনাখালী গ্রামের ১০০টি বাড়ি জালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে, যাতে দুজন নিহত হয়। ২০১৩ সালে এনামুল নামের এক যুবলীগকর্মী খুনের পেছনে আউয়াল পরিবারের হাত ছিল বলেও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।

অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, পল্লী বিদ্যুৎ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ জেলার অধিকাংশ উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন আউয়ালের ছোট ভাই মহারাজ। তাঁর সঙ্গে এমপির স্ত্রী লায়লা ইরাদও রয়েছেন। বড় বড় প্রজেক্ট অন্য কারো পাওয়ার সুযোগ নেই। মিসেস আউয়ালের বুশরা এন্টারপ্রাইজ ও সুবাস এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি ফার্ম রয়েছে। সমস্ত কাজ এই ফার্মগুলোর নামে নিয়ে বিক্রি করা হয়। অসচ্ছল অবস্থা থেকে মাত্র পাঁচ বছরে মিসেস আউয়াল এখন পিরোজপুরে সর্বোচ্চ ট্যাক্সদাতা হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, গত নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহ আলম জনসংযোগ করতে গেলে নাজিরপুর উপজেলার শ্রীরামকাঠি বাজারে আউয়ালের সন্ত্রাসী বাহিনী তাঁর ওপর হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত শাহ আলম ভয়ে নির্বাচন অংশগ্রহণ করেননি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকা সত্ত্বেও এমপি আউয়ালের প্রভাবে দলের সমর্থনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশ ভঙ্গ করে পিরোজপুরের পৌর মেয়র হন তাঁর মেজ ভাই হাবিবুর রহমান মালেক। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মো. নাসিম খান মনোনয়নপত্র দাখিল করলে মালেকের লোকজন তাঁর ওপর হামলা করে। নাসিম ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। পরে ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ‘কাউকে বিনা নির্বাচনে মেয়র হিসেবে ঘোষণা না দেওয়ার’ আদেশ প্রদান করেন। সেই আদেশ অনুযায়ী হাবিবুর রহমান মালেক এখনো অবৈধ মেয়র। আউয়ালের সেজ ভাই খালেক ভয়ভীতি দেখিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এলিজা জামানকে মাঠ থেকে বিতাড়িত করে গত পৌর নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বলে অভিযোগে বলা হয়।

স্থানীয়রা জানায়, ২০০৮ সালে আউয়াল নির্বাচিত হওয়ার পর চরমভাবে প্রতিপক্ষকে দমন-নিপীড়ন শুরু করেন। তাঁর ভয়ে আওয়ামী লীগেরও অনেকে এলাকা ছাড়া। যারা আছে তারাও কোনোমতে চোখ-কান বন্ধ করে থাকে। সাবেক এমপি সাধনা হালদার, মেজর জিয়া উদ্দিন (অব.), অ্যাডভোকেট চণ্ডি চরণ পাল, অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম, ইসাহাক আলী খান পান্না, জি হায়দার, জসিম উদ্দিন খানসহ অন্যরা মানসম্মানের ভয়ে আউয়ালের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেন না। এর মধ্যে কয়েকজন এলাকা ছাড়া। জি হায়দারের গাড়ি এক দফা ভাঙচুর করেন আউয়ালের সেজ ভাইয়ের ছেলে অভি। এরপর জি হায়দার সংবাদ সম্মেলন করেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পান না।

এমপি আউয়ালের প্রভাব নিয়ে খবর প্রকাশ করায় পিরোজপুর, বরিশাল, ঢাকাসহ ১৫-২০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কয়েকজনের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিক ফশিউর রহমান বাচ্চু, শিরীন আক্তার, জহুরুল ইসলাম টিটু, খেলাফত হোসেনসহ অনেকই আউয়াল বাহিনীর হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াই যে হুমকির মুখে জীবন বাঁচাবার জন্য ১৯ জন সাংবাদিক একসঙ্গে পিরোজপুর সদর থানায় জিডি এন্ট্রি করেন।

কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা অস্বীকার করে এমপি আউয়াল বলেন, ‘যাঁরা কল্পকাহিনী লেখেন তাঁদের সেই কল্পকাহিনী মানা যায় না। আমি তো তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবই।’
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/01/21/315775#st...

Post new comment

  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code><b><p><h1><h2><h3><ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd><img><object><param><embed>
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla